-
আর্তনাদের অভিযান
————- সোমা মালাকার তন্দ্রাগত ২৪/১২/২১ ঢাকা ছেড়ে বরগুনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে এমভি অভিযান ১০, তিনতলা বিশিষ্ট লঞ্চটি। সাথে যাত্রা করে হাজারও স্বপ্ন।
হঠাৎ মধ্য রাতে লঞ্চে ভয়াবহ আগুন। একতলা থেকে দোতলা তারপর তিনতলা।
ঝালকাঠির সুগন্ধা নদী পাড়ি দেওয়ার সময় আগুনের গতি বেড়ে যায়। আগুন দেখে লঞ্চের যাত্রীরা লঞ্চের ভেতরে ছুটোছুটি করছে। একদিক থেকে অন্য দিক। কি বাঁচার আকুতি!
রিয়াজুল ইসলামের দেখা হলো না সন্তানের চাঁদ বদন খানি। রিয়াজুলের প্রথম সন্তান পুত্র। ঢাকায় চাকরি করত রিয়াজুল। দশ বছর পর তার স্ত্রী আবারো পুত্র সন্তান প্রসব করেছে। সেই খুশিতে অধিক আনন্দ আর স্বপ্ন নিয়ে রিয়াজুল ছুটেছিল তার গ্রামের বাড়িতে। পুত্রের হাসি মুখ খানি দেখা হলোনা। পথে এমন দুর্ঘটনায় রিয়াজুলের স্বপ্ন ভঙ্গ পরিবারের শুধুই আর্তনাদ।
অন্যদিকে লঞ্চের আরেক যাত্রী হাকিম মিয়া। ঢাকায় এসেছিল তার মেয়ে হাফসারের বিয়ের বাজার করতে। ৩১শে ডিসেম্বর হাফসারের বিয়ে। হাফসারের বাড়ির সবাই খুব খুশি। সেই আনন্দে হাফসারের বাবা-মা ও ছোট ভাই যায় ঢাকায় বিয়ের বাজার করতে। হাফসার হয়তো স্বপ্ন দেখেছিল বিয়ের দিন সে হলুদ দিয়ে গোসল করবে, লাল টুকটুকে শাড়ি পড়ে হাতে মেহেদি দিয়ে বউ সাজবে। সানাই বাজবে, বর আসবে।
কিন্তু হাফসারের ভাগ্যে জুটল……………..
বিয়ের বাজার পুড়ে হলো ছাই।
লঞ্চের আরেক যাত্রী বশিরউদ্দিন।
যখন অভিযান ১০ এ আগুনের বিস্তার তখন বশির উদ্দিন তার সাত বছরের মেয়ে তাইফাকে বাঁচানোর জন্য মধ্যরাতে নদীতে ঝাঁপ দেয়। মেয়েকে বুকে নিয়ে দেড় ঘন্টা সাঁতার কাটার পর পাড়ে ওঠে বশিরউদ্দিন বুঝতে পারে তার মেয়ে বুকেই মারা গেছে।
রিয়াজুল, হাকিম মিয়া, বশির উদ্দিনের এর মতো হাজারও লঞ্চ যাত্রীর স্বপ্ন এক মুহুর্তে ধূলিসাৎ।
এ তো বললাম নামধারী একটি লঞ্চ অভিযান ১০ এর কথা। প্রতিবছরই আমাদের দেশে সচেতনতার অভাবে কতইনা বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটে তার কিছু বিবরণ লিখলাম।
চাঁদপুরের মতলব উপজেলার মেঘনা নদীতে এমভি জোলকপোত ও এমভি রাজহংসী দুটি যাত্রীবাহী লঞ্চের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে প্রাণ হারায় রাজহংসী লঞ্চের ১৬২ জন যাত্রী।
ঘটনাটি ঘটে ২০০০ সালের ২৯শে ডিসেম্বর। এরপর ২০০৩ সালের ৩মে চাঁদপুর যানজট এলাকায় সালাউদ্দিন (২) নামের যাত্রীবাহী লঞ্চের দুর্ঘটনায় ভোলা ও পটুয়াখালী জেলায় ৩৬৩ জন যাত্রী মৃত্যুবরণ করে।
২০০৩ সালের ৮ জুলাই ঢাকা থেকে লাল মোহনগামী এম ভি নাসরিন ও ১ চাঁদপুরের ডাকাতিয়া এলাকায় অতিরিক্ত যাত্রী ও মাল বোঝাই এর কারণে ২ হাজারের বেশি যাত্রীসহ লঞ্চডুবি যায়।
২০০৪ সালের ২২মে, আনন্দ বাজার এম ভি লাইটিং সান দুর্ঘটনায় ৮১ জন এবং এম ভি দিগন্ত লঞ্চ ডুবির ঘটনায় শতাধিক যাত্রীর মৃত্যু হয়।
ভৈরবের মেঘনা নদীতে এমএল মজলিশপুর ডুবে ৯০ জন মারা যায়।
২০০৬ সাল মেঘনা নদীতে এম এল শাহপুরাণ লঞ্চ দুর্ঘটনা ১৯ জন যাত্রী মারা যায়।
মেঘনা নদীতে লঞ্চের সংঘর্ষে দুমড়ে-মুচড়ে যায় এম ভি কোকো ৩। এ দুর্ঘটনা ঘটে ২০১১ সালের ২৮ মার্চ।
২০১৪ সালে মেঘনায় এম ভি মিরাজ ৪ ডুবে অন্তত ২২ জন যাত্রী মারা যায়।
২০১৪ সালের ১৫ মে পদ্মায় ২৫০ জন যাত্রী নিয়ে নদীর মাঝখানে ডুবে যায় পিনাক ৬। পিনাক ৬ লঞ্চটি ৮০ জন যাত্রী তোলার ধারণ ক্ষমতা ছিল। সেখানে ১৭০ জন যাত্রী এবং তাদের মালামাল বেশি উঠানো হয়েছিল। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে এ দুর্ঘটনা গুলো কেন ঘটে। আমাদের দেশের লঞ্চ মালিক, কাপ্তান ও কর্মচারীদের সচেতনতা, দক্ষতা ও কাণ্ডজ্ঞানের অভাবে বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ ঝরে যাচ্ছে অকালে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার স্বপ্ন।
আমি তো এখানে অল্প কয়েকটি দুর্ঘটনার কথা বললাম। আমাদের অজানায় কত যে দুর্ঘটনা ঘটে তার খবর কেউ কি রাখে?
কতশত মায়ের আর্তনাদ, পিতার আর্তনাদ, স্বজনদের আর্তনাদ আহাজারি কেঁদে কেঁদে মুখে বিলাপ পেরে বলতে থাকে আর যেন এমন দুর্ঘটনা না ঘটে!
আমাদের দেশে সব সময় দুর্ঘটনার পর সেই যানের ত্রুটি খোঁজা হয়। কিন্তু আগে কারো কোনো খোঁজ থাকে না।
এসব দুর্ঘটনার দায়ভার রাষ্ট্রের, সমাজের কারোর নেই তাহলে……………?8 Comments
Friends
Foyzur Khan
@foyzur-khan
Md. Ashraful Islam
@ashrafulku-bd
মীর অনাবিল
@miranabil
Shohag arnob
@shohagarnobgmail-com
মোঃ আবু মুনিফ আল মুকিম।
@munifalmukimrocky
mahamuda khaun
@mahamuda
Yusuf Abdullah Harun
@eazylearning
অরিন্দম সাইফুল্লাহ
@arindam-saifullah
আকতারুজ্জামান মোহাম্মদ মোহসীন
@akteruzzaman



শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন!