Profile Photo

মারুফ হুসেইনOffline

  • peranhafish
  • Profile picture of মারুফ হুসেইন

    মারুফ হুসেইন

    4 years, 8 months ago

    ভাড়ায় চালিত

    হেলমেট পরে, মোটরবাইকের উপর বসে, মোবাইলের দিকে চেয়ে বসে আছে যোহান। হেলমেটের কাচ কালো রঙের বলে ওর চেহারা বোঝা যাচ্ছে না। গায়ে চকচকে কালো রঙের জ্যাকেট। জ্যাকেটের কারণে ওর ফিগার দেখেও কেউ ওকে হুট করে চিনে ফেলবে সেটাও বলা যায় না।
    দুই বিল্ডিং পর একটা বাসা থেকে একটা মেয়ে বের হল। বের হয়ে বাসার সামনে দাঁড়িয়ে সে মোবাইল বের করে পাঠাও এপ্স ওপেন করে সার্চ দিল। যাকে এভেইলএবল পেল তার নাম্বারে কল দিল। কলটা এল যোহানের মোবাইলে। কল রিসিভ করে যোহান বলল, হ্যালো
    সিমিঃ পাঠাও থেকে বলছেন?
    যোহানঃ জ্বি।
    সিমিঃ ভাইয়া, আপনার লোকেশন কোথায়?
    যোহানঃ ৬ নং রোডে।
    সিমিঃ আমার লোকেশনে আসতে কত সময় লাগবে?
    যোহানঃ ২ মিনিট।
    সিমিঃ আচ্ছা। আসুন।

    দেড় মিনিট দেরি করে বাইক স্টার্ট দিয়ে মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেল ও।
    গত তিন ধরে ও পাঠাও এপ অন করে বসে থাকে যোহান। মেয়েটা বাসার নীচে এসে সার্চ দিয়ে যদি ওকে পেয়ে যায়, এই আশায় ওর এত আয়োজন। মেয়েটা ওর নিজের ক্লাসমেট কিন্তু সে ধরা না খেয়ে মেয়েটিকে মোটর বাইকের পেছনে বসিয়ে প্রতিদিন তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাবে। এই হচ্ছে অভিপ্রায়।
    মেয়েটার কাছে গিয়ে মোটরসাইকেলে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পরল। মেয়েটাকে বযোহান বলল, আপু আপনি কল দিছিলেন?
    সিমিঃ জ্বি।
    যোহানঃ কোথায় যাবেন?
    সিমিঃ ঢাবিতে যাব।
    যোহানঃ ওকে, বসেন।
    সিমি মোটর বাইকে উঠে বসল। কাপড় আর ব্যাগ গুছিয়ে নান্দনিক ভঙ্গীতে বসা দেখলেই বলে দেওয়া যায় এই মেয়ে নিয়মিত বাইকে বসে।
    প্রতিদিন সকালে বাসা থেকে বের হয় সাতটায়। ভার্সিটির ডাবল ডেকার বাস মিরপুর-২ এলাকায় দাঁড়ায়। ৭.০৫ এর আগে যদি সে অত্র জায়গাতে উপস্থিত হতে পারে তো বাসে যাবার সুযোগ হয় আর যদি দেরি করে ফেলে তো বাসার সামনে থেকে পাঠাও বা উবারের বাইক ভাড়া করে নিয়ে মিরপুর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়। সিমি সকালের ঘুম অত্যন্ত ভালোবাসে তাই বেশিরভাগ দিনেই তার দেরি হয়ে যায়। সিমির বাবা মোটামুটি মাঝারি মাপের ব্যবসায়ী, কাচা টাকা একেবারে কম না। মেয়ের হাত খরচ দেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত। তাই টাকার অভাব নেই। তাছাড়া বাইকে চড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেও অত্যন্ত ভাল লাগে ওর।

    বাইকের পাশে বসে সিমি একটা মিষ্টি গন্ধ পেল। গন্ধটা পুরোপুরি পারফিউমের নয়। যোহানের গায়ের গন্ধ আর পারফিউমের গন্ধটা মিলে মিশে এই গন্ধটা তৈরি হয়েছে। ভীষণ মিষ্টি গন্ধটা সিমির নাসারন্ধ্র দিয়ে প্রবেশ করে অস্তিত্বের গহীনে ঢুকে কোথায় যেন জোড়ে সোরে আঘাত করে বসল। এই মিষ্টি গন্ধে ও বুক ভরে নিশ্বাস নিল। সিমি ভাবলো এটা সম্ভবত দামী পারফিউমের-গন্ধ। শাহবাগ আশার পর মেয়েটি বলল, ভাইয়া, কার্জন হলে নিয়ে যাবেন আমাকে।
    যোহানঃ আচ্ছা।
    কার্জন হলের সামনে মেয়েটিকে নামিয়ে দিল যোহান। ভাড়া মিটিয়ে মেয়েটি চলে গেল। মোটর সাইকেলের উপর বসে থেকে মেয়েটির চলে যাওয়া গভীরভাবে খেয়াল করল ও। তার নিতম্বের আলোড়ন যোহানের বুকেও আলোড়ন তুলে দিল। এই আলোড়নটা অবশ্য নিয়মিত অনুভব করে সে। মেয়েটাকে অল্প কিছুক্ষণ কাছে পাবার জন্যে সবকিছু দিয়ে দিতে পারে।

    বাইকটা হলের পার্কিং এরিয়ায় নিয়ে গিয়ে পার্ক করল যোহান। তারপর হেলমেট আর জ্যাকেট খুলে বাইকে ঝুলিয়ে রাখল। বইয়ের ব্যাগটা নিয়ে ক্লাসের দিকে পা বাড়ালো।

    এদিকে যোহান সিমির ক্লাসমেট হলেও ওর জীবনের চিত্রটা আলাদা। ও সকাল সাড়ে পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে ছটায় একটা বইয়ের ব্যাগ, অতিরিক্ত একটা হ্যালমেট সহযোগে বাইক নিয়ে বের হয়। উবার বা পাঠাও এপ্স এর সাহায্যে কয়েক ঘন্টা রাইড শেয়ার করে যে টাকা হয় তা পকেটে ভরে নির্দিষ্ট সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় ক্লাস করতে। দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে খেয়ে নেয়। আবার দুপুরে ক্লাস শেষ হলে রাইড শেয়ার করতে বের হয়।

    _______
    ক্লাস শেষ করে বিকেলে পার্কিং-এ এসে হেলমেট আর জ্যাকেট পরে বাইকে টান দিয়ে দোয়েল চত্ত্বরে এসে পৌছুতেই ফোন বেজে উঠল। বন্ধু হাতিমের ফোন। এই একটা ছেলের সাথেই ওর যা কিছু মেশামিশি আছে। বাইক থামিয়ে ফোন বের করে রিসিভ করল,
    যোহানঃ হ্যালো, হাতিম।
    হাতিমঃ হ্যা। কোথায় তুই?
    যোহানঃ বাইক নিয়ে বের হলাম।
    হাতিমঃ আজ বের হতে হবে না। তুই আজ আমাদের সাথে চল।
    যোহানঃ কোথায় রে?
    হাতিমঃ যাদের বাইক আছে তারা সবাই মিলে মাওয়া যাবে ঠিক করেছে।
    যোহানঃ আমাকে রাইড শেয়ারিং-এ যেতে হবে রে! তুই তো জানিস! বাসাতে সমস্যা আছে।
    হাতিমঃ আন্টি এখনো সুস্থ হয়নি?
    যোহানঃ মা কিছুটা সুস্থ কিন্তু ছোট ভাই এসএসসি দেবে, বোনটা ইন্টার পড়ছে। ওদের দায়িত্বও তো আমার!
    হাতিমঃ আচ্ছা। যা। তবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের সুখ আহলাদ ভুলে বসিস নে যেন!
    যোহানঃ আরে না না! পরের বার যাব দেখিস!
    হাতিমঃ আচ্ছা, রাখছি।
    ফোন রেখে যোহান বাইক নিয়ে এগিয়ে যায়।

    পরদিন সকালে আবার সিয়াম একই জায়গায় দাঁড়িয়ে৷ দূর থেকে খেয়াল করে দেখছে মেয়েটা বের হয় কিনা। মেয়েটা বের হল। দাঁড়িয়ে থেকে মোবাইলে সার্চ দিল। তারপর কাছের রাইডারকে কল দিল। কলটা যোহান রিসিভ করে দুমিনিটে হাজির হবার প্রতিশ্রুতি দিল।
    দেড় মিনিট ধরে যোহান ভাবতে থাকলো, এত দায়িত্ব নিয়ে যে ছেলে পথ চলে সেই ছেলে কে এসবে মানায়? তবুও নিজেকে নিয়ন্ত্রণের বাধে আটকাতে পারে না। জীবনে একটা মেয়ের কাছাকাছি যেতেই হয়; নিজেকে আটকানো যায় না।
    কাছে যেতেই মেয়েটা বলল, আপনি! আজকেও!
    যোহানঃ আমার বাসা কাছেই। সকালে বের হয়ে দাঁড়াই। একই সময়ে আপনি কল দেন।
    সিমিঃ আচ্ছা। চলুন।
    সিমি বাইকে উঠে বসল। চলতে শুরু করে বাইক। ঘন ঘন লবা দম নিয়ে বুক ভরে শ্বাস নেয় সিমি। বিশেষ পারফিউমের মিষ্টি গন্ধে ভরে ওঠে তার ফুসফুস। গন্ধটা এত আপন লাগে মনে হয় বাইক ওয়ালার পিঠ জড়িয়ে বসে ও। কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে দূরে থাকাই শ্রেয় মনে করে।

    গতদিনের মতই কার্জন হলের সামনে তাকে নামিয়ে দেয় যোহান। বাইক নিয়ে চলে যায় পার্কিং-এ।

    _______
    বই হাতে কলা ভবনের সামনে হাতিমের সাথে বসে আছে যোহান। আরো দুজন বন্ধু আসবার কথা রয়েছে। হাতিম বলল, কেসটা কিরে? ওরা আমাদের কেন ডাকল?
    যোহানঃ আমি কি জানি? তবে শুনলাম কি একটা ব্যবসা খুলবে?
    হাতিমঃ আমরা কেন?
    যোহানঃ তাও জানি না। ব্যবসা করবে, করুক। আমাকে নিলে যেতেও পারি কিন্তু কোন ধরণের ইনভেস্ট আমার পক্ষে করা পসিবল না। বাইকের লোন টানতে, সংসার চালাতে চালাতে আমার জীবন শ্যাষ! কাছে কোন টাকা পয়সা নেই!
    হাতিমঃ তোর তো তাও ইনকাম আছে।
    যোহানঃ ধুর! আজকাল কেমন ফ্যাসফ্যাসে যাচ্ছে! ইনকাম টিনকাম নেই!
    হাতিমঃ কেমন?
    যোহানঃ সকালে মাত্র একটা দুটো ট্রিপ হয়।
    হাতিমঃ কেন? তুই তো আগে ভালোই ট্রিপ মারতিস!
    যোহানঃ এমনিই……
    হাতিমঃ কি হয়েছে বলবি তো? কোন সমস্যা?
    যোহানঃ সমস্যা তেমন না। তবে……
    হাতিমঃ তবে…..
    যোহানঃ একটা মেয়েকে ভাল লাগে। কদিন হল, তাকে বাসা থেকে নিয়ে আসার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকি।
    হাতিমঃ কস কি? তুই? মেয়ে? কে রে মেয়েটা?
    যোহানঃ প্রেম ট্রেম কিছু নাহ! জাস্ট ওর কাছাকাছি থাকতে খুব ইচ্ছা করে।
    হাতিমঃ আরে এটাই তো প্রেম!
    যোহানঃ ধুর বাল! সবকিছুর ভিতর খালি প্রেম টানিস!
    হাতিমঃ আরে আগে মেয়েটা কে বলত?
    যোহানঃ বললে যদি কাউকে বলিস তাইলে কিন্তু আমি শ্যাষ!
    হাতিমঃ আমি চিনি?
    যোহানঃ চিনোস!
    হাতিমঃ কস কি? ক্লাসমেট?
    যোহানঃ হু।
    হাতিমঃ কে, বলত?
    যোহানঃ কাউকে বলবি নাতো?
    হাতিমঃ আরে নাহ! সেই প্রথম দিন থেকেই আমি আর তুই একসাথে মিশি। একদিনো কি বিট্রে করছি?
    যোহানঃ তা করিস নি!
    হাতিমঃ তাইলে বল মেয়েটা কে?
    যোহানঃ সিমি!
    হাতিমঃ সিমি! বলিস কিরে!
    যোহানঃ হ্যা।
    হাতিমঃ ক্লাসে তো কথা বলতে দেখি না! তোর মোটর সাইকেলে ও আসলো!
    যোহানঃ আরে! আমার তো মাথায় হেলমেট থাকে। ও চেনে না আমাকে। আমি ওকে যাত্রী হিসেবে আনি!
    হাতিমঃ ওওও!!!!
    যোহানঃ কাউকে বলিস না যেন!
    হাতিমঃ তা ঠিক আছে! কিন্তু তুই জানিস ওর কি ডিমান্ড?
    যোহানঃ কিছুটা জানি!
    হাতিমঃ কিছুটা কেন?
    যোহানঃ ক্লাস করা ছাড়া আমি কারো সাথে মিশি?
    হাতিমঃ হুম। তা ঠিক। তবে তোর চান্স নেই দোস্ত।
    যোহানঃ আমি চান্স নিচ্ছি কে বলল? আমি শুধু ওর কাছাকাছি থাকতে চেয়েছি। এই তো! ওর সাথে কথা বলতে গেছি? মিশতে গেছি? নিজের পরিচয় দিয়েছি?
    হাতিমঃ ঐ একই কথা হল। শোন, আমাদের ক্লাসের হ্যান্ডসাম চার চারজন ওর ক্যান্ডিডেট। এর মধ্যে দুজনের সাথে নিয়মিত ফোনে কথা হয়। বন্ধুত্ব গভীর। বাকি দুজন-ও নিয়মিত লাইন মারছে। এছাড়া থার্ড সেমিস্টারের বড় ভাই আছে কয়েকজন। তারাও দেখতে শুনতে মন্দ না। তোর একদম চান্স নেই।
    যোহানঃ বাদ দে ভাই! আমার চান্স লাগবে না। তুই কাউকে বলিস না। আমি শুধু ভাড়া নিয়ে মিরপুর থেকে ভার্সিটিতে আসব। আমার আর কিছু লাগবে না। এটুকু ভাল লাগা তুই নষ্ট করিস না।
    হাতিমঃ না, দোস্ত। তোর ভালো লাগার দাম আমি দেব। কাউকে জানতে দেব না। কিন্তু পরে যদি কষ্ট পাস?
    যোহানঃ কষ্ট মানুষ পায়-ই। প্রেমে পরলেও পায়, না পরলেও পায়৷।
    হাতিমঃ তা ঠিক বলছিস তুই।

    এই সময়ে আর দুজনের আগমন। ওদের একজন শাকিল, অপর জন মজনু।
    শাকিলঃ আরে বন্ধু! তোরা আগেই এসেছিস!
    হাতিমঃ আগে আসিনি! সময়মত এসেছি! তোদের আসার কথা তিনটায়, তোরা আসলি পৌনে চারটায়! তোরা দেরিতে এসছিস।
    মজনুঃ সরি, দোস্ত৷
    যোহানঃ সরি টরি বাদ দিয়ে কাজের কথা বলো, বন্ধু।
    শাকিলঃ এত তারা কিসের?
    হাতিমঃ আমার তারা নেই। ওর তারা আছে। বাসায় যেতে হবে।
    মজনুঃ তাহলে কাজের কথা বলি। আমরা বন্ধুরা মিলে একটা বিজনেস স্টার্ট করব। শুরুতে ছোট খাট কাজ হবে। পরবর্তীতে বড় করব।
    হাতিমঃ কিসের বিজনেস?
    শাকিলঃ আমার এক ভাই জেলা শহরে ভ্যারাইটি মালের ব্যবসা করে। ও আমাদের বলেছে, আমরা শুধু ঢাকা থেকে পাইকারি বাজার গুলোতে ঘুরে ঘুরে সস্তা দামে ওর পাঠানো তালিকার মাল কিনে কুরিয়ার করে পাঠিয়ে দেব।
    যোহানঃ তাতে লাভ?
    শাকিলঃ লাভ দুটো। এক ও যা লাভ করবে তার একটা পার্সেন্টেজ আমরা পাব। আর ও যে মূল্য ধার্য করবে তার থেকে কম দামে কিনে পাঠাতে পারলে সেটা আমাদের থাকবে।
    হাতিমঃ এটা তো তোরা নিজেরাই করতে পারতিস! আমাদেরকে নিচ্ছিস কেন?
    মজনুঃ তা পারতাম। তোদের নিচ্ছি কারণ হল, যোহানের বাইক আছে দেখে। আমাদের কাজ হবে ঘুরে ঘুরে মাল কেনা। তাতে বাইক লাগবে। তোরা দুজনে একটা সাইড সামলাবি।
    যোহানঃ আমার তো কোন পুজি নেই, বন্ধু!
    শাকিলঃ পুজি লাগবে না। প্রথম প্রথম শুধু বাইকের তেল যাবে দুই চার লিটার৷ লাভ হলে ওখান থেকে কেটে নিয়ে পুজি দার করাবো।
    যোহানঃ তাহলে শুরুর টাকা কে দেবে?
    শাকিলঃ আমার ঐ ভাই দেবে। যে জেলাতে ব্যবসা করে।
    হাতিমঃ ও আচ্ছা। তাইলে তো আগানো যায়-ই। কি বলিস, যোহান?
    যোহানঃ দ্বারা, আমি একটু ভেবে নেই। কাল জানাবো।
    মজনুঃ ভাবাভাবি করিস না, বন্ধু। কাজ কম হবে; সর্বোচ্চ বিকাল তিনটা থেকে পাচটা। অবশ্য প্রথম কয়েকদিন একটু চাপ থাকবে। রাস্তা আর হিসেব চিনে নিলে দ্রুত কাজ করে ফেলা যাবে। এমন সুযোগ আর আসবে না, বন্ধু।
    যোহানঃ হুম। সেটা ঠিক। আচ্ছা। ধরো আমি রাজী। তবুও কাল জানাবো। আর আমি এখন যাব। অনেক কাজ পরে আছে।
    শাকিলঃ আচ্ছা। তুই না হয় যা।
    যোহান চলে গেল। শাকিল হাতিমকে বলল, ও একটু আলাদা! তাইনা?
    হাতিমঃ আলাদা কেমন?
    শাকিলঃ কারো সাথে মেশে টেশে না!
    যোহানঃ ওর ফ্যামিলিতে একটু চাপ আছে। অনেক কিছু সামলাতে হয়। মেশা টেশার টাইম পায় না।
    মজনুঃ যেমন!
    হাতিমঃ ওসব ফ্যামিলি ম্যাটার। শেয়ার করা যাবে না। বাদ দে এসব।
    শাকিলঃ আচ্ছা। তবে আমাদের প্রস্তাবে রাজী হলে ও উপকৃত হবে। এটা গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি।

    _____
    সকালে একটা ট্রিপ নিয়ে উত্তরা গিয়ে যাত্রী নামিয়ে দিয়ে এসে মিরপুর-৬ এসে নির্দিষ্ট বাসার সামনে এসে দাড়ালো যোহান। ও যখন দাড়ালো ঠিক তখনই সিমি অন্য একটি মোটর সাইকেলে উঠে বসে ওকে অতিক্রম করে চলে গেল। যাবার সময় সিমি ঘাড়টা ঘুরিয়ে ওকে একবার দেখে নিল। মাথায় হেলমেট, কাল চকচকে জ্যাকেট। প্রতিদিন একই ড্রেস হওয়াতে যোহানকে নির্দিষ্ট সেই বাইক রাইডার বলে চিনতে সিমির অসুবিধা হল না। যোহান মন খারাপ করে লক্ষ্য করল সিমির চোখেও কি যেন একটা রয়েছে যেটা ঔৎসুক্যের পর্যায়ে পরে যায়।
    হোন্ডা টান দিয়ে মিরপুর-১০ নম্বর গোল চক্করে এসে দাড়ালো যোহান। যদি একটা ভাড়া পাওয়া যায়৷

    ______
    অন্য একদিন সকালে নির্দিষ্ট সময়ে সিমির বাসার কাছের মোরে দাঁড়িয়ে আছে যোহান। সিমি এসে পাঠাও সার্চ দিল। কাছের লোককে কল করতে যোহান রিসিভ করল।
    যোহানঃ হ্যালো।
    সিমিঃ হ্যালো। কালো জ্যাকেট ওয়ালা ভাই।
    যোহানঃ হা হা! আপনি চিনলেন কিভাবে?
    সিমিঃ আপনার কণ্ঠ পরিচিত হয়ে গেছে৷ তাছাড়া নাম্বার তো এটাই।
    যোহানঃ হুম।
    সিমিঃ কই আছেন? চলে আসেন।
    যোহানঃ আচ্ছা। আসছি।
    মোটর বাইক এসে সিমির সামনে থামলো। বাইকে ওঠার আগে সিমি বলল, গত সাত দিন আপনাকে দেখি না। কেন বলুন তো? কোথাও গিয়েছিলেন?
    যোহানঃ (একটু চমকে গিয়ে) না। কোথাও যাইনি।
    সিমিঃ (কণ্ঠে শাসনের সুর)তাহলে আসেন নি কেন?
    যোহানঃ একটু ব্যস্ত ছিলাম।
    সিমিঃ কি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন?
    যোহানঃ একটা নতুন ব্যবসা শুরু করেছি।
    সিমিঃ ও। যাই করুন না কেন, আমাকে প্রতিদিন দিয়ে আসবেন!
    যোহানঃ (সামান্য হেসে নিয়ে) আচ্ছা৷
    সিমিঃ আর একটা কথা। আপনি যদি এই এলাকার হয়ে থাকেন তো ফোন করলেই পাওয়া যাবে?
    যোহানঃ এই নাম্বারে পাবেন না।
    সিমিঃ যে নম্বরে পাব সেই নম্বর দিবেন আজকে।
    যোহানঃ ওকে।
    সিমি মোটর সাইকেলে উঠে বসল। যোহান বাইকে আওয়াজ তুলে রওয়ানা হল ওদের গন্তব্যের দিকে।
    পথে আর কেউ কোন কথা বলল না। মনে মনে সিমি বেশ লজ্জিত আর অহঙ্কার বোধে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বলল, ছি সিমি! ছি! একজন পাঠাও বাইক চালকের প্রতি তুই এত অধিকার দেখালি! কে হয় তোর? তুই কেন এভাবে কথা বললি? ছি! ছি! আবার নাম্বার-ও চাইলি! কত ছেলে তোর নাম্বার পাবার জন্য পাগল! ক্লাসমেটরা তোকে প্রতিদিন কল দিয়ে বিরক্ত করে মারে! আর তুই কিনা একটা বাইক চালকের নাম্বার চাইলি! চু……মা……নী। মা,……
    পরে আবার সিমি নিজেকে বুঝ দিল এই বলে, আরে এত আফসোসের কি আছে! নাম্বার চেয়েছি। নিইনি তো! তাছাড়া নাম্বার তো নিব সকালে বাইকে চড়ে ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্যে। এ নিয়ে এত আফসোসের কি আছে?
    আজ সিমি কার্জন হলের সামনে বাইক থেকে নেমে কোন কথা না বলে ভাড়া মিটিয়ে চলে গেল। নাম্বার নেওয়া তো দূরের কথা, মুখে কোন শব্দই উচ্চারণ করল না।

    একদিন পর যথারীতি যোহান নির্দিষ্ট মোরে এসে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে খেয়াল করল সিমি বের হল। মোবাইল বের করে সার্চ দিল। তারপর কল দিল। কিন্তু কলটা যোহানের সেটে গেল না। পাঁচ মিনিট বসে থাকার পর যোহান লক্ষ্য করল আর একটি মোটর বাইক এল এবং সিমি তাতে উঠে বসল। দূর থেকে এটাও লক্ষ্য করল সিমি কাধ ঘুরিয়ে আশপাশ দেখল না।

    ——–
    ক্লাসরুমে সিমি একা একা বসে আছে। মাঝে মাঝে একটা মিষ্টি গন্ধ মস্তিষ্কে ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে৷ বার বার ঐ বাইক ড্রাইভারের কথা মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে! নিজেকে ধিক্কার দিয়ে মনে মনে বলল, ধুর! ঐ ড্রাইভার লোকটাকে এভয়েড করব বলে অন্য বাইকে আসলাম আর ওর কথাই মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে! শালার লোকটা কি একটা সস্তা পারফিউম ইউজ করে! একদম মগজে গেথে গিয়েছে!
    সিমি নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছে কিন্তু ঐ লোকটাকে মাথা থেকে দূর করতে পারছে না।
    রিমা নামের একটা মেয়ে এগিয়ে এসে বলল, কিরে সিমি! একা একা বসে আছিস যে!
    সিমিঃ হুহ! ভাবছি!
    রিমাঃ কি ভাবছিস?
    সিমিঃ কিছুনা!
    রিমাঃ একবার বলছিস, ভাবছিস! আবার বলছিস কিছুনা! সবুজের সাথে কিছু হয়েছে?
    সিমিঃ ধুর! সবুজের সাথে আমার আবার কি হবে?
    রিমাঃ সবুজের সাথেই তো হবে!
    সিমিঃ তোরা না! সবুজের সাথে কি হবে?
    রিমাঃ হবে না কেন বলত? ক্লাসের সবাই জানে, ডিপার্টমেন্টের সবাই জানে তোর সাথে ওর সম্পর্ক।
    সিমিঃ (কিছুটা রেগে গিয়ে) সবুজ সেটা বলেছে?
    রুমাঃ বলেনি৷ কিন্তু ওর সাথেই তো ঘুরিস ফিরিস! তোর কথা বললে সবুজ কেমন লজ্জ্বা পায়!
    সিমিঃ কেন? আমি তো রবিনের সাথেও ঘুরি ফিরি৷ তাই বলে ওর সাথেও আমার হয়ে গেছে!
    রিমাঃ তা ঘুরিস! কিন্তু সবুজের ব্যাপারটা আলাদা।
    সিমিঃ হ বলছে তোরে! একারণেই আমি ছেলেদের সাথে মিশি! মেয়েরা খালি আন্দাজে কুটকাচালি করে!
    রিমাঃ কি? আমি কুটকাচালি করি? থাক তুই! আমি আর তোর সাথে নেই!
    কথাটা বলে রিমা উঠে চলে যেতে লাগলো।
    সিমিঃ আরে শোন পাগলী! আমি তোকে বলিনি তো!
    রিমা দূরে চলে গেল। সিমি একা একা বসে রইল। একা হতেই আবার সেই পরিচিত মিষ্টি গন্ধের ব্যাপারটা মস্তিষ্কে ধাক্কার মত হয়ে উপস্থিত হলো। নিজেকে ধিক্কার দিয়ে সিমি মনে মনে বলল, ধ্যাত বাল! কি হচ্ছে এসব?

    _____
    কাল কাচের হেলমেট আর কাল জ্যাকেট পরে দুতিন দিন অপেক্ষায় থাকার পর-ও বিমর্ষ হয়ে যোহান মনে মনে বলল, সিমি ইচ্ছা করেই আর আমাকে কল করছে না। অর্থাৎ সে আর পাঠাওতে সার্চ দিচ্ছে না। উবার অথবা অন্যভাবে ম্যানেজ করে নিচ্ছে! কিন্তু কেন? আমি কি কোন বেয়াদবি করেছি৷ সেরকম তো কিছু মনে পরেনা।

    ঐদিন ভার্সিটিতে গিয়ে ক্লাস শেষে যোহান ক্লাসরুমে একা আলাদা এক কোনে বসে আছে, হাতিম ওর কাছে গিয়ে বসল। ওর উদাস ভাব ভঙ্গী দেখে বলল, কিরে যোহান! কি হয়েছে? কোন সমস্যা?
    যোহানঃ কোন সমস্যা না!
    হাতিমঃ সমস্যা তো বটেই! রাইড শেয়ারিং এ সমস্যা?
    যোহানঃ হু।
    হাতিমঃ কি সমস্যা বল তো?
    যোহানঃ কোন সমস্যা না। অন্তত বলার মত না।

    বিঃদ্রঃ অন্তত একজন ব্যক্তির ভাল লাগলে তিন পর্বে শেষ হবে এই গল্প।

    3
    3 Comments
Skip to toolbar