-
গজলের অবকাঠামো ব্যবচ্ছেদ
লিখনেঃএ,কে,এম সাঈদুর রহমান খান।গজল- হাজার বছর পুরোনো এক কাব্যিক কাঠামো।আরব চারণ কবিদের হৃদয় থেকে উৎসারিত আর্তনাদের নাম গজল।গজল সৃষ্টির পেছনে কিছু উপকথা প্রচলিত আছে।সবচেয়ে প্রচলিত যে গল্প রয়েছে তা মরুচারী হরিণ গাজালাকে কেন্দ্র করে।যে গাজালা বেঁচে থাকার বুকভরা তৃষ্ণা নিয়ে ঘুরে মরেছে অথচ কোথাও তৃষ্ণা নিবারণের জল পায়নি।কোথাও মেলেনি সাধের জীবন বাঁচানোর জন্য এতটুকু ঘাস,গুল্মলতা। নিভে যাবার আগে প্রদীপ যেমন ধপ করে জ্বলে ওঠে শেষবারের মতো,ডুবে যাওয়ার আগে সূর্য যেমন তার অন্তিম আলোর বিচ্ছুরণ ঘটায় যেন বোঝাতে চায় আজকের দিনটি তার-ই ছিল,তেমনি ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর গাজালা মৃত্যুর বাহুতে ধরা দেবার আগে তার অন্তিম আর্তনাদ প্রকাশ করে এক হৃদয় বিদীর্ণ করা ডাক দিয়ে।এই আর্তনাদের অপর নাম হচ্ছে গজল।পৃথিবীর সকল গজলেরই সারবস্তু ও ভাবসম্পদ গাজালাকে কেন্দ্র করে এ ধরণের গল্পে নিহিত আছে।বিষয়বস্তু হতে পারে বিচিত্র,বহুমাত্রিক তবু শায়েরদের উক্ত ভাবগত কাঠামোর উপরে নির্মাণ করতে হয় গজলের সৌধ।
আসলে গজলের সূচনা সপ্তম শতাব্দীতে আরবী কবিতায় হলেও দ্বাদশ শতাব্দীতে দিল্লী সালতানাতের প্রতিষ্ঠা এবং মরমী সুফিবাদের প্রভাবে এ উপমহাদেশে গজলের প্রচলন হয়।এর আগে পারস্যের সাহিত্যে গজলের পরিপুষ্টি ঘটে।নজরুলের হাত দিয়ে বাংলাভাষায় গজল প্রচলিত হয়।ভাবগত অবকাঠামো ছাড়াও গজল মেনে চলে বিধিবদ্ধ নন্দনশাস্ত্রের অনুশাসন।কমপক্ষে পাঁচটি দ্বিপদী উর্ধ্বে পঁচিশটি দ্বিপদী নিয়ে রচিত হয় গজলের শরীর।শের মূলত গজলের অংশ।কিন্তু স্বতন্ত্র কবিতা হিসেবে শের রচনার প্রচলনও আছে।উর্দুতে এসব স্বতন্ত্র শেরকে বলে ফর্দ।প্রতিটি শের দুটি মিশরা বা লাইনের সমন্বয়ে রচিত হয়। শের এর প্রথম লাইনকে বলে মিসরা-ই-উলা আর শেষ লাইনকে বলের মিসরা-ই-সানি।শের এ অন্ত্যমিল থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে।গজলের প্রতিটি শের স্বতন্ত্র ভাব বা বিষয় প্রকাশ করে।
গজল রচনায় পাঁচটি নিয়ম অনুসরণ করা হয়।সেগুলো হলো:
১.গজলের সূচনা শেরকে বলে “মাতলা”।মাতলায় গজলের মূল সুরটি ফুটিয়ে তোলা হয়।মাতলার গঠনের সাথে অবশিষ্ট সব শের এর গঠনগত ও ছন্দ সংগতি থাকতে হয়।
২.মাতলার উভয় লাইনের রাদীফ (শব্দ বা শব্দগুচ্ছের মিল) বা ধুয়া পরবর্তী সকল শের এর দ্বিতীয় লাইনের রাদীফ একই থাকতে হবে।
৩.রাদীফের আগের শব্দাবলী বা বাগধারা যে কাফিয়া (অন্ত্যমিল) বা মিলের ধরণ তা পরবর্তী সকল শের এ বজায় রাখতে হয়।
৪.গজলের শেষ শেরকে বলা হয় ” মাকতা”।মাকতায় সাধারণত:কবির তাখাললুক বা নাম/ছদ্মনাম(যেমন গালিব লিখতেন আসাদ) ব্যবহার করে সমাপনী শেরকে ঋদ্ধ করা হয়।
৫.সকল শের এ বিষয় বৈচিত্র্য বা স্বাতন্দ্র্য থাকলেও একই ছন্দ ও সমান মাত্রা ব্যবহার করতে হয়।একে বলে বাহ’র বা বেহের।বিংশ শতাব্দীর মহান উর্দুকবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ রচিত গজলের কয়েকটি শের বিশ্লেষণের মাধ্যমে গজল রচনার অনুশাসন সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাবো।গজলটির কয়েকটি শের এমন:
গুলো মে রঙ্গ ভরে বাদে নওবাহার চলে
চলে ভি আওকে গুলশান কা কারোবার চলে।কাফাস উদাস হ্যায় ইয়ারো সাবাসে কুছ তো কাহোঁ
কাহিঁ তো ব্যহরে খুদা আজ জিকরে ইয়ার চলে।মাকাম ফয়েজ কোয়ি রাহ মে যাচা হি নেহি
জো কুয়ে ইয়ার সে নিকলে তো সুয়ে দার চলে।উপরের গজলেএ মাতলার (সূচনা শের) দিকে খেয়াল করলে রাদীফ-কাফিয়ার রন্ধন স্পষ্ট হবে।এখানে চলে শব্দটি রাদীফ ও রাদীফের আগের শব্দের অন্তে “নওবাহার” এর “আর”,দ্বিতীয় লাইনের কারোবার এর “আর” কাফিয়া হিসেবে এসেছে।গজলের মাতলায় এই বন্ধন বাধ্যতামূলক।
দ্বিতীয় শের লক্ষ্য করলে প্রথম লাইন স্বাধীনভাবে রচিত হয়েছে কিন্তু দ্বিতীয় লাইনে রাদীফ-কাফিয়ার নিয়মিত বন্ধন দৃষ্টিগোচর হয়।গজল অবকাঠামোর আরেকটি বিশেষ দিক হলো মাতলার পরবর্তী শেরগুলোতে প্রথম লাইন বন্ধনমুক্ত থাকবে এবং পরের লাইন বরাবরের মত আবদ্ধ থাকবে।
গজলটির মাখতার দিকে খেয়াল করলে কবির তাখাললুক বা কবিনাম দৃষ্টিগোচর হয়।যা গজলের অবকাঠামোগত অনুশাসন।তথ্য সুত্র:মনন রেখা(ষান্মাসিক পত্রিকা)।
4 Comments
Friends
jannatul ferdoushi moni
@jannatmoni321gmail-com
Md Saifullah Sarkar Atik
@md-saifullah-sarkar-atik
Prodip Roy
@prodip
মোঃ আব্দুল মোমিন
@mdabdulmomin
মন কলম
@md-faridul-islam
Md. Pavel Forajy
@pavelforajy
Afruza Khatun
@afruza78
Afroza khatun
@roza
TAPAN MALAKAR
@tapan



ধন্যবাদ। গজল সম্পর্কে তথ্যপূর্ণ লেখার জন্য। অনবদ্য।