-
কিশোরী_বয়সের_ভালোবাসা।
(না কি অপরিণত বয়সের ভুল )
লেখনীতে মেহের_মেহের_সীমা।পর্বঃ #২৭
সন্তানের প্রতি মায়েদের ভালোবাসা তুলনা হয় না।
মা এমন একটা মানুষ যে সন্তানের সুখের জন্য হাঁসি মুখে নিজের জীবন দিতে পিছু হটেন না।
এইজন্য হয়তো ,ইসলাম মাকে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা। মাকে করা হয়েছে জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম মাধ্যম। বলা হয়েছে, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।
ইসলামের বিধান মতে, আল্লাহ তাআলার পরেই মাতা-পিতার স্থান। এ প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত না করতে এবং মাতা-পিতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে। … এ হাদিসের মাধ্যমে স্পষ্টত বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে সন্তান জান্নাতে ঠাঁই পাবে কিনা তা মায়ের সন্তুষ্টির ওপর নির্ভরশীল।
যে মা নিজের অসুস্থতার কথা ভুলে মেয়ের চিন্তায় মশগুল ছিলেন।
আমার সেই মা আজকে এক মাস ধরে হসপিটালে ভর্তি।
কিন্তু আমি এমন এক সন্তান যে মায়ের কাছে থাকতে পারছি না।
দেখতে আসতে পারছি না।
কিন্তু তবুও মা আমার সাথে রাগ বা অভিমান করছে না।
বরং ফোন করলেই একটা কথায় বারবার বলবেন তুই ভুলে হসপিটালে আসবি না।
এখানে আসলে আমার নাতিরা অসুস্থ হয়ে যাবে।
তাছাড়া মহর এমনিতেই নরম।
হসপিটালে চারদিকে রোগ জীবাণু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
আমার নাতি অসুস্থ হয়ে পড়বে।
মায়ের কথাগুলো শুনে কান্না পায় কিন্তু কাঁদতে পারছি না।
আমি যে মেয়ে থেকে এখন মা হয়ে গেছি।
দুই সন্তানের মা।
তাদের ভালো রাখার দায়িত্ব রয়েছে আমার উপর।
ও আপনাদের তো বলা হয়নি মহর সম্পর্কে!
মহর হচ্ছে আমার ছেলে যাকে জন্ম আমি দিলেও জন্মের পর বেশিক্ষণ ঠান্ডার মধ্যে থাকার জন্য নিউমোনিয়া ও এ্যজমার এটাক হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাহিরে চলে যায় ,ওর বাঁচা মরার প্রশ্ন এসে পড়েছিল।
মহরকে শিশু হসপিটালে থেকে পর্যন্ত ফিরিয়ে দিয়েছে ভর্তি করেনি।
কিন্তু আমার জন্মদাত্রী মা হার মানেনি সে তার নাতি কে নিয়ে ছুটে গেছে ঢাকা মেডিকেল।
সেখান থেকে ও যখন ফিরিয়ে দিচ্ছিল তখন আমার মা ডাক্তারদের হাতে পায়ে ধরে ভর্তি করিয়েছেন।
শুধু তাই নয় আমার ছেলের সুস্থতার জন্য , নামায,রোজ,দান সদকা কিছু বাকি রাখেনি।
আমি বিশ্বাস করি মহর নতুন জীবন পেয়েছে আমার মায়ের উছিলায়।
সে সময়ে মা ভীষণ অসুস্থ ছিলেন কিন্তু কাউকে বুঝতে দেয়নি।
এমনকি ছেলে হওয়ার পর চল্লিশ দিন মায়ের কাছে ছিলাম।
মা’কে কখনো বলতে শুনেনি খারাপ লাগছে।
আমি তো জানতাম না আমার মা তার ভেতর অসুখ নিয়ে চলাফেরা করছে।
মা তো আমাকে দুই মাস তার কাছে রাখতে চায়ছিলেন কিন্তু আমি রাজি হয়নি।
কারণ আমরা চারজন ছাড়াও ,লায়লা ও আমার শ্বাশুড়িকে মা সপ্তাহে তিন-চার দিন আমাদের বাসায় রাখতেন।
এতগুলো মানুষের খরচ তো কম নয়।
অবশ্য তারেক মাঝে দুই তিনদিন মাছ ও মুরগি কিনে আনেন।
কিন্তু মা সেজন্য তারেক কে রাগারাগী করেন এবং কড়া ভাষায় নিষেধ করেন বাজার করতে।
তারপর থেকে তারেক আর সাহস দেখায়নি।
তবে মা যায় বলেন না কেন আমি তো জানি আমার বাবার হাতের অবস্থা সূচনীয়।
কারণ বাবা যে মার্কেটে দোকান করতেন তা ভেঙে দিয়েছে
আমার সিজারের একদিন পরেই।
সিজারের টাকা বাবা না দিলেও হসপিটালে আসা যাওয়া এমনকি আমার ছেলের পিছনে চিকিৎসার টাকাটা বাবা ও ভাইয়েরা দিয়েছে।
হাতে যা টাকা রয়েছে তা দিয়ে নতুন করে বাঁচার লড়াই করতে হবে বাবাকে।
এখন আমি এতজন নিয়ে থাকলে বাবা তো সমস্যায় পড়বে তাই ভেবে চল্লিশ দিন থেকে বাসায় চলে আসি।
প্রথম দুই মাস মা নিয়মিত মহর আর পরিকে দেখতে এলেও এরপর থেকে আসতে পারতেন না।
আস্তে আস্তে মা বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন এদিকে বাবার কাছে যা টাকা ছিল তা দিয়ে কচুক্ষেত দোকান নেওয়া সম্ভব ছিল না।
কারণ এখানে পনেরো লাখ টাকা এডভান্স দিতে হবে দোকান নিতে হলে।
আর বাবার কাছে ছিল সাত আট লাখ তাইতো খুঁজতে খুঁজতে ভাগ্য তাকে নিয়ে যায় আশুলিয়ায় জিরাবো বাজারে।
আমার বাবার একটা গুন ছিল তা হচ্ছে সে শূন্য থেকে বাঁচার মত সম্মান নিয়ে উপরে উঠতে পারেন।
বাবা জিরাবো গিয়ে ওখানে ছোট একটা বাজারে গিয়ে দেখে ওখানে বাঁশ গাছ ও দুই একটা টং দোকান।
বাবা যেহেতু ছোট থেকেই ব্যাবসা করতেন তাই কোথায় ব্যাবসা করলে টিকে থাকতে পারবে তা সহজেই বুঝতে পারতেন।
আব্বা জিরাবো এলাকাটা ঘুরে ঘুরে দেখলেন ওখানে কি কি রয়েছে।
বাবা ঘুরে ঘুরে দেখলেন অনেকগুলো গার্মেন্টসে ফ্যাক্টারি রয়েছে।
কিন্তু বড় কোন দোকান নেয়।
তারমানে এখানে মনোহারি মালপত্র ভালো চলবে।
বাবা আসেপাশের পরিবেশ দেখেশুনার পর জিরাবো বাজারে গিয়ে ওখানকার জায়গার মালিক এর সাথে কথা বললেন।
ওখানে প্রাই দুই বিঘা জায়গা যার মালিকানা তিন জনের।
বাবা তাদের সাথে কথা বলেন, তাদের জানান এই বাঁশ বাগানকে সে একটা মার্কেটে পরিণত করতে পারবে যদি এখানে তাকে দোকান করতে দেওয়া হয়।
জায়গার মালিকেরা বললেন, বাবাকে দোকান করতে হলে দোকান উঠানোর খরচ নিজে বহন করতে হবে।
এবং প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা ভাড়া দিতে হবে।
২০০৮ সালে তিন হাজার টাকা মানে অনেক কিন্তু বাবা তাদের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়।
এমনকি শুধু বাবা ওখানে দোকান নেয়নি তার সাথে চৌদ্দ নাম্বার বাজারের আট দশজন দোকানদার যাদের দোকান ভাঙা হয়েছে তাদেরকে সেখানে দেখাতে আনলেন,
তারা বাঁশ বাগান দেখে দোকান করতে রাজি হননি বাবা অনেক বুঝিয়ে তাদের নিলেন।
বাবা তাদের এটা বলেছেন লস হলে দরকার হলে সে তাদের কিছু ক্ষতিপূরণ ও দিবে
বাবার কথা শুনে ওখানে তারা দোকান করতে রাজি হয়।
ওখানে দোকান দেওয়ার এক মাস পর সবাই বুঝতে পারে বাবা তাদের এখানে দোকান দিতে জোর করে কত বড় উপকার করেছেন।
দুই মাস হয়েছে বাবা ও বড় ভাই দোকান করছেন ওখানে।
আমাদের বাসা ঢাকা হওয়াতে বাবা ও ভাইয়া সকালে যেতেন আর রাত দশটায় ফিরতেন।
বাবা ছোট ভাইয়ের জন্য ওখানে দোকান ঠিক করার আগে মায়ের অপারেশন করানোর সিদ্ধান্ত নেন।
মা’কে ডাক্তারের কাছে নেওয়ার দায়িত্ব পড়ে ছোট ভাইয়ের উপর।
কিন্তু মা অসুস্থ তা আমি জানি না।এদিকে
শ্রাবণ তার ছোট বোনের বরকে সাথে নিয়ে তাদের মাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল,
তিনি ঢাকা মেডিকেল এর একজন সার্জন। তবে রাতে পান্থপথে তার প্রাইভেট চেম্বারে বসেন।
শ্রাবণ তার মা’কে ওখানে নিয়ে দেখান ডাক্তার তাদের বলেন দুই দিনের মধ্যে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তার কাছে নিয়ে আসতে।
আগের পরীক্ষা চলবে না।
দুইদিন পর সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তার রিপোর্ট নিয়ে শ্রাবণ ডাক্তারের কাছে যায়।
ডাক্তার শ্রাবণ কে জানায় তার মায়ের জরায়ুতে টিউমার বেশ বড় হয়ে গেছে।
দ্রুত অপারেশন করতে হবে।
যদি সম্ভব হয় তো আগামীকাল বা পরেরদিন রোগীকে তার ক্লিনিক এ ভর্তি করতে।
কারণ ঢাকা মেডিকেল এ ভর্তি করলে অপারেশন করতে দেরি হবে
শ্রাবণ ডাক্তারের কথা শুনে তাকে জানান বাসায় পরামর্শ করে তাকে ফোন করে জানাবে।
শ্রাবণ বাসায় এসে তার মায়ের বিষয়ে সবার সাথে কথা বলেন।
শ্রাবণের বাবা সিদ্ধান্ত নেন আগামীকাল তার স্ত্রীকে ভর্তি করবেন।
কারণ এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে আর দেরি করতে নারাজ।
সুমনা বেগমের অপারেশন হয়েছে এক সপ্তাহ হয়েছে।
কিন্তু অপারেশন হওয়ার পর থেকে তার ব্যথা বেড়েছে কয়েকগুণ।
শরীরে কেমন নিস্তেজ হয়ে থাকে তার।
সুমনা বেগমের কষ্ট হচ্ছে তবে নিজের কষ্টের থেকে বেশি চিন্তা হচ্ছে মেয়ের জন্য।
সে অসুস্থ বলে আজ তার মেয়েটাকে নাতিদের নিয়ে একা একা কষ্ট করতে হচ্ছে।
তার মেয়েটা ইদানিং কেমন শুকিয়ে গেছে গতকাল এসেছিল তাকে দেখতে।
এসেই কান্না করে দিয়েছে।
যা সুমনার কাছে ভালো লাগেনি।
মেয়েটা মনে হয় তার অসুস্থতার কথা শুনে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
এই জন্যই অপারেশন কথা ওকে বলতে নিষেধ করেছিলেন।
কিন্তু অপারেশন হওয়ার দুইদিন পর তারেক সীমাকে বলে দিয়েছে।
মেয়েটা শুনেই ছুটে যেতে চেয়েছিল হসপিটালে কিন্তু সে তারেক কে নিষেধ করায় হসপিটালে নিয়ে আসেনি।
বাসায় আসার পর তার মেয়েটা এসে তাকে জড়িয়ে ধরেছে, কোথায় কেটেছে তা খুঁজেছে।
সুমনা যখন মেয়েকে বলেছেন,তার পায়ুপথ দিয়ে মেশিনের সাহায্যে টিউমার অপারেশন করেছেন।
তার মেয়ে আশ্চর্য হয়ে বলেছিল,মা এভাবে তো জরায়ুর অপারেশন হয় কখনো শুনিনি?
মেয়ের কথা শুনে সে মুচকি হেসে বলে,না হলে কি ডাক্তার করত!
তুই চিন্তা করিস না দেখবি আমি কিছুদিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাব।
সেদিন তার মেয়ে অনেক সময় মায়ের সাথে কাটিয়ে গেছে।ওদিকে
সীমার কাছে মনে হতে থাকে তার মায়ের ভুল চিকিৎসা হয়েছে।
তবে সে কথা কাউকে বলতে পারছে না।
সবার এক কথা ডাক্তার থেকে সে বেশি বুঝে কিনা?
তবে সীমা মনে কামড় দিচ্ছি কারণ অপারেশনের পর থেকে তার আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
অপারেশন এর দের মাস পর আমার মা ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ডাক্তার জানান মায়ের একটা কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে।
তার অপারেশন করতে হবে।
নাহলে অন্যটা নষ্ট হয়ে যাবে।
আবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় মায়ের অপারেশন করানোর।
আমার এখনো মনে আছে সেদিনের কথা, অসুস্থ মা’কে দেখতে আসছি।
মা আমার হাত ধরে বলেছিল, আচ্ছা মা ডাক্তার যে আমার কিডনি ফেলে দিতে চাচ্ছেন।
কিডনি ফেলে দিলে আমি বাঁচব?
সেদিন মায়ের কথা শুনে কষ্ট বুকের ভিতরে তোলপাড় শুরু হলেও মাকে বুঝতে দেয়নি বরং মায়ের হাত ধরে জড়িয়ে বলেছিলাম ,এক কিডনি নিয়ে তোমার থেকে বুড়ো মানুষ বেঁচে আছে সেখানে তোমার তো এখনও চুল পাকে নি মা।
আল্লাহর রহমতে তুমি অবশ্যই বাঁচবে মা।
কিন্তু সেদিন কি জানতাম,,,,#চলবে
3 Comments

Saifun nesa Shima
Housewife
Friends
Nahar moyna
@moyna
বিপুল চন্দ্র রায়
@sreebipulchondrorayraygmail-com
এমদাদ হোসেন
@emdad123
Jebunnesa jebu (জেবুন্নেছা জেবু)
@jebunnesa-jebu
TARIN
@tarin
Latifur-rahman-Pramanik
@latifur-rahman-pramanik
Md-Nadiruzzaman
@md-nadiruzzaman
Md. Habibur Rahman
@habib
তাওহীদ সুফিয়ান
@tawhidsufian


জীবন ঠিক-ভুল মেনে চলে না। তাইতো জীবনের গল্পগুলো সব গল্প থেকে ভিন্ন। শুভেচ্ছা নেবেন।