Profile Photo

সাইফুন নেসা সীমা।Offline

  • MeherMeherShima
  • কিশোরী_বয়সের_ভালোবাসা।
    (না কি অপরিণত বয়সের ভুল )
    লেখনীতে মেহের_মেহের_সীমা।
    পর্বঃ ২৮
    মা’কে আমি সেদিন বড় মুখ করে বলেছিলাম,আল্লাহর রহমতে তুমি অবশ্যই বাঁচবে মা।
    একটা কিডনির সমস্যা হলেয় যে মারা যাবে তা ঠিক নয় কারণ।
    তুমিই তো বলো, আল্লাহ না চায়লে কেউ মরে না।
    তাহলে আজকে ভয় পাচ্ছ কেন?
    তুমি না আমার সাহসী মা।
    মা আমার কথা শুনে মুচকি হেসেছে।
    কিন্তু সেদিন কি জানতাম সামনে আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে!
    দুই দিন পর
    ডাক্তারের কথা মত দুইদিন পর মা’কে যা যা পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়েছে তা করিয়ে সেই রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের কাছে ছোট ভাইয়া ও আমার বর যান।
    রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বলেছিলেন তার একটা কিডনি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
    দ্রুত অপারেশন করে কিডনি ফেলে দিতে হবে।
    নাহলে যেটা ভালো রয়েছে সেটাও নষ্ট হয়ে যাবে।
    সেদিন শ্রাবণ ভাইয়া আমার বাসায় এসে ডাক্তারের বলা কথাগুলো বলার পর দুই ভাই বোন অনেক কেঁদেছি।
    আমরা মায়ের কষ্ট সহ্য করতে পারছিলাম।
    আমরা যেহেতু সাধারণ মানুষএতকিছু তো বুঝতে পারি না।
    বাবা সব শুনে বললেন,ডাক্তার যা বলেন আমাদের সেই মতই কাজ করতে হবে।
    তোরা চিন্তা করিস না,দুই একদিনের মধ্যেই টাকার ব্যাবস্থা করে ফেলব।
    সত্যি করে বাবা একদিনের মধ্যেই টাকা জোগাড় করে ফেলেন,
    তাই ভাইয়া ডাক্তারের কথা মত মা’কে অপারেশন করানোর জন্য হসপিটালে টাকা জমা দেন।
    ডাক্তার মায়ের জরায়ুতে টিউমারের অপারেশন নিজের প্রাইভেট ক্লিনিকে করালেও কিডনি অপারেশন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে করানোর কথা বলেন।
    তাছাড়া প্রাইভেট ভাবে অপারেশন করানোর মত এতো টাকাও বাবার কাছে সেই মুহূর্তে ছিল না।
    মায়ের যেদিন অপারেশন হয় সেদিন আমি হসপিটালে যেতে পারিনি।
    কারণ মায়ের কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিল।
    মা’কে অপারেশন রুমে ঢোকানোর পর অপারেশন করতে সাত ঘণ্টা লেগেছে ডাক্তারের।
    অপারেশন শেষ হলে ডাক্তার জানান মায়ের কিডনি ও পেশাবের থলি ফেলে দেওয়া হয়েছে।
    কারণ মায়ের জরায়ুর টিউমারের জীবাণু পেটে জড়িয়ে পড়ছে।
    বাম সাইডে কিডনিতে, জরায়ুতে ও পেশাবের থলিতে ঘাঁ হয়ে গেছে সেজন্য তা কেটে ফেলে দিতে হয়েছে।
    তবে প্রশাবের থলি বড়টা কেটে ফেলা হলেও ছোটটি রেখে দেওয়া হয়েছে।
    তবে পেটের ভেতর কয়েক জায়গায় ঘাঁ দেখা যাচ্ছে রোগীর অবস্থা দেখে বুঝা যাচ্ছে ক্যান্সারের লক্ষণ।
    তাই কিছু সেম্পল দিয়েছে পরীক্ষা করতে।
    নার্সের সাথে গিয়ে যেনো টাকা জমা দিয়ে আসেন।
    আর এই রিপোর্ট আসতে ১০-১৫ দিন লাগবে।
    সেদিন ফোনে ভাইয়ার মুখে এসব শুনছিলাম।

    ঢাকা মেডিকেল আমার বাসা থেকে অনেক দূরে তাছাড়া আমি ঢাকায় বড় হলেও আসেপাশের এলাকায় কখনো একা চলাচল করিনি।
    আমার বাসা থেকে কচুক্ষেত মার্কেট যেতে দশ টাকা লাগে বিয়ের আগে সেখানেও কখনো যাইনি।
    আমার কিছু লাগলে বা ঈদে মা আমার জন্য পোশাক পছন্দ করে কিনে আনতেন আমি খুশি হয়ে যেতাম।
    এমনকি বিয়ের পর কেনাকাটা ব্যাপারে ছিলাম অজ্ঞ।
    আমার সবকিছু আমার বর কিনে আনতে।
    এগুলো বলার কারণ হচ্ছে , আমার মায়ের এত বড় অপারেশন হয়েছে, আমার জন্মদাত্রী হসপিটালে ভর্তি কিন্তু আমি দেখতে যেতে পারিনি।
    মায়ের নিষেধ তো ছিলই তার সাথে ছোট ছোট দুই বাচ্চা নিয়ে একা যেতে পারিনি।
    বাসায় বসে মা’কে এক নজর দেখার জন্য কান্নাকাটি করতাম কিন্তু কেউ আমাকে নিয়ে যায়নি।
    এভাবে কেটে যায় ১০ দিন।
    আমি মা’কে একটু দেখার জন্য সবাইকে আমায় একটু হসপিটালে নিতে অনুরোধ করতাম।
    কিন্তু কেউ নিচ্ছে না।
    এরমধ্যে একদিন ,বড় মামা ফোন করেন।
    আমি মামার ফোন পেয়ে কান্নাকাটি শুরু করি তা দেখে আমার বড় মামা কাউকে না জানিয়ে হসপিটালে যাওয়ার সময় বাচ্চাদের সহ আমাকে নিয়ে হসপিটালে যান।
    মামা জানতেন কাউকে বললে আমাকে নিতে নিষেধ করবেন।
    সেদিন আমাকে দেখে মায়ের প্রথম কথা ছিল, আমি তার নাতি নাতনি কে নিয়ে এসেছি কেন?
    এখন যদি তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে!
    মা রিতিমত রাগ করে আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছিল কিন্তু আমার চোখে পানি দেখে কিছু মুহূর্ত থাকতে দিতে রাজি হন।
    আমি আমার মায়ের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছি।
    মায়ের শরীর নরম তুলতুলে থাকায় আমি সবসময় মা’কে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতাম।
    আজকে সেই মা’কে ছুঁয়ে দেখতে পারছি না।
    তার হাতে সেলাইন লাগানো,পেটের কাছে একটা পাইপ সেট করা সেদিক দিয়ে দূষিত রক্ত বের হচ্ছে।
    মুত্র নির্গতের জন্য নিচের দিকে আরেকটি ব্যাগ সেট করা।
    কোথায় ধরব মা’কে।
    আমি ধরলে আমার মা তো ব্যথা পাবেন।
    আমার মা’কে এভাবে দেখতে বড্ড কষ্ট হচ্ছিল।
    যে মা’কে সবসময় হাসিখুশি দেখেছি তাকে এভাবে দেখব স্বপ্নেও কখনো ভাবিনি।
    আমি যখন অসহায়ের মত মায়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছি।
    তখন মা আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন,সীমা আমার কি ভাগ্য দেখছিস?
    আমি মায়ের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি?
    মা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন জানিস,ছয় মাস আগে মহরকে নিয়ে এই হসপিটালে আমার পাশের রুমেই ভর্তি ছিলাম।
    সেদিন অসুস্থ ছিল আমার মেয়ের বুকের ধন।
    আজকে সেই একই হসপিটালে পাশের ওয়ার্ডে ভর্তি আমি।
    জানিস মা তাতে আমার কষ্ট হচ্ছে না কষ্ট তো হচ্ছে আমার চোখের সামনে তোর মামার কোলে পরি কিন্তু আমি কোলে নিতে পারছি না, ছুঁতে পারছি না, চুমু খেতে পারছি না।
    আমার বুকের মধ্যে অস্থির লাগছে।
    তোরা চলে যা মা।
    এদিকে পরি তার নানুর কাছে যেতে যুদ্ধ করছে মামার সাথে।
    পরি আট মাস থেকে কথা বলতে পারে।
    এখন তো তার ২ বছর ৯ মাস।
    সে এখন গুছিয়ে কথা বলে,তাই তার নানুমনি শুয়ে আছে কেন?
    তাকে নানুমনির কাছে যেতে দিচ্ছে না কেন তা বলছে আর কান্না করছে।
    তা দেখে মায়ের কষ্ট হচ্ছে, তার চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে।
    সেদিন মায়ের কষ্ট দেখে হসপিটালে থেকে চলে আসি।
    ও আরেকটি কথা না বললেই নয়।
    আমার তিন মামার মধ্যে মায়ের এই সময়ে বড় মামা আমার মায়ের সারাক্ষণ সাথে সাথে থেকেছেন।
    মেঝো মামা মাঝে এসে দেখে যেতেন।
    আর ছোট মামা একদিন এসেছে দেখতে।
    তিনি বড়লোক মানুষ ব্যস্ত থাকেন বেশি।
    আর আমার বড় মামা তো গরীব তাই বোনের প্রতি ভালোবাসা বেশি ছিল।
    বড় মামা একটা ছোট খাটো দোকান করতেন।
    মামার দুই ছেলে ছিলেন মামার অবর্তমানে তারাই দোকান করতেন।
    আর আমার মামিও এই সময়ে মায়ের পাশে ছিলেন।
    হসপিটালে মায়ের সাথে বড় মামা,মামি ও ছোট ভাইয়া থাকতেন।
    আমি তো মাত্র একদিন দেখা করার সুযোগ পেয়েছি।
    তারপর আর হসপিটালে যায়নি।
    আসলে আমার মধ্যে মায়ের কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা ছিল না ।
    অন্যদিকে
    সাব্বির ভাই ও বাবা ব্যস্ত ছিলেন দোকানের পিছনে।
    কারণ মা’কে চিকিৎসা করতে টাকা লাগবে তা জোগাড় করতে হলে তাদের কঠোর পরিশ্রম করতেই হবে।
    তাছাড়া খাওয়া দাওয়া, সংসার খরচ তো আর কম নয়।
    পরবর্তিতে আমি এবং শ্রাবণ ভাই মায়ের কাছাকাছি থাকার যতটা সুযোগ পেয়েছি সাব্বির ভাই তা কম পেয়েছেন।
    কারণ সে প্রতিদিন সকাল ছয়টায় দোকানে যেতেন আর বাসায় আসতে রাত ১১-১২ পর্যন্ত বেঁজে যেত।
    তাকে যে ঢাকা থেকে আশুলিয়া যাওয়া আসা করা লাগত প্রতিদিন।
    সেজন্য ভাইয়া মায়ের সাথে হসপিটালে থাকতে পারতেন না।

    ছয়দিন পর
    গতকাল রাতে মা’কে বাসায় নিয়ে এসেছে।
    খবর শুনে আমি সকালে বাসায় এসে পড়ি।
    কারণ মায়ের অসুস্থতার সময়ে কাছে না থাকতে পারলে পরে আসার মানে নেয়।
    তবে এখানে আসার পর যে খবর শুনেছি তা কখনো দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি।
    ডাক্তার জানিয়ে দিয়েছেন আমার মায়ের শরীরে নাকি ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে।
    এই সুন্দর পৃথিবীতে আমার মা মাত্র কয়েকদিনের মেহমান।
    তাকে কেমো দিতে হবে যদি ভাগ্য ভালো থাকে তো বাঁচতে পারেন।
    তবে তার বাঁচার চান্স ১৫%
    আর মৃত্যুর সম্ভাবনা ৮৫%
    যদি তার ভাগ্যে ভালো হয় তো বেঁচে যাবেন।
    সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে প্রথমে পনেরো দিন পর পর দুইটা কেমো দেওয়া লাগবে।
    যদি দু’টো কেমো দেওয়া বিশ দিন টিকতে পারে তাহলে আমার মায়ের বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে।
    আর তার একমাস পর আরেকটি কেমো দিতে হবে।
    কথাগুলো শুনে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না,
    আমার মা বাঁচবে না?
    আমি আর মা বলতে পারব না।
    মাত্র আঠারো বছর বয়সে আমার মাথায় উপর
    থেকে মায়ের মমতার হাত সরে যাবে,,,

    নোটঃ আজকের পর্ব লেখতে গিয়ে আমার হাত বারবার থেমে গেছে।
    বুকের মধ্যে অস্থির লাগছিল।
    শত চেষ্টা করেও সাজিয়ে লেখতে পারছিলাম না।
    কারণ এটা কোন গল্প, সিনেমা বা নাটক নয়।
    এটা আমার মায়ের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা।
    এটা আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ।
    আজৌও মায়ের জন্য বুকের মধ্যে হাহাকার করে।
    এখনও মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে মা’কে দেখার প্রবল ইচ্ছা জাগে।
    চৌদ্দ বছর ধরে কেউ আর বলে না, সীমা তোর পছন্দের সেমাই করেছি , খেয়ে নে মা।
    কেউ বলেনা তোকে না দেখলে থাকতে পারি না।
    কেউ মাথায় চুমু দিয়ে বলে না, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে আয় মা চুলে তৈল দিয়ে দেয়।

    #চলব

    8
    4 Comments

Saifun nesa Shima

Housewife

Skip to toolbar