-
*এলবাম 🏵️
সকালবেলা অনেকটা দেরী করে ঘুম ভাঙল। দুদিন ধরেই ব্যাপারটা ঘটছে- ঘুম ভাঙলেও উঠতে ইচ্ছে করে না।
ফ্রেশ হয়ে এসে চা খেতে খেতে খবরের কাগজে চোখ বুলালাম। পড়তে ইচ্ছে করলো না। মনটা ভীষণ রকমের ভারী হয়ে রয়েছে।
বসার ঘরের চেয়ারে অনেকটা সময় কাটালাম। তারপর খানিকটা পায়চারী করলাম বারান্দায়। একটা বড় অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে বাড়িতে কয়দিন আগে- আমেজটা কোথাও যেন লেগে রয়েছে এখনো।
একটা সময় কি মনে করে দোতালার দিকে পা বাড়ালাম। দোতালার সামনের রুম। রুমটার দরজায় নানারকম নকশা করে লেখা Jinat’s Room. ইংরেজিতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা – নক বিফোর ইউ এন্টার।
রুমটা বন্ধ- কেউ নেই ভেতরে। তারপরেও কোন এক অজানা কারণে দরজায় ঠক ঠক করে আওয়াজ করলাম। ক্ষীণ গলায় জিজ্ঞেস করলাম, মে আই কাম ইন, জিনাত মামনি?ভেতরে কেউ নেই, জবাবও এল না; আমি একটু হাসি দিয়ে রুমের দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। বড় চিরচেনা, বড় আপন, বড় মিষ্টি একটা হাওয়া আমার গায়ে এসে লাগল। গভীর একটা শ্বাস নিলাম। খুলে দিলাম জানালাগুলো- একটা হালকা মৃদু বাতাসে জুড়িয়ে গেল রুমটা।
ড্রেসিং টেবিলের মেকাপ বাক্স – লিপস্টিক, পড়ার টেবিলে কলম দিয়ে রাখা উপন্যাস কিংবা জানালার গ্রিলের ওপারে পাতাবাহার আর ক্যাকটাস গাছ – সব ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে লাগলাম। দেয়াল জুড়ে নকশা আর বিছানা বালিশের উপরের টেডি বিয়ার- সবগুলো খুব চেনা, তবু এখন দেখতে যেন খুব ভালো লাগছে।
টেবিলের পাশে একটা চেয়ার, এখানেই সপ্তাহ খানেক আগে জিনাত বসেছিল। আমিও বসলাম – একই ভঙ্গিতে, এক পায়ের উপর আরেক পা তুলে। ছোটোবেলায় জিনাত বিতর্ক করতো, সে কারণে যেটা হয়েছে- সব জিনিসে তার লজিক দেখা চাই। সপ্তাহ খানেক আগে এরকম একটা সময়ে আমার সামনে বসেছিল জিনাত। হাতে একটা কলম ধরে বলছিল,” দ্যাখো আব্বু…..”
আমিও একটা কলম হাতে নিলাম, চোখ মুখ বাঁকিয়ে জিনাতের মতো বলতে চেষ্টা করলাম, “আব্বু দ্যাখো, ব্যাপারটা হচ্ছে-” হেসে ফেললাম নিজে নিজেই।ঘরে রাখা একটা ছোট্ট শোকেস, সেখানেই একটা এলবাম রাখা- নজরে পড়তেই এলবামটা নিয়ে হাঁটু মুড়ে বিছানায় বসলাম। একটা সাধারণ ছবির-এলবাম। জিনাতের ছোটোবেলার ছবি আছে এই এলবামে। এলবামের প্রথম ছবি, টাওয়েল মোড়ানো অবস্থায় সদ্য জন্ম নেওয়া জিনাত- আমি বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। হুট করে বিশ বাইশ বছর পেছনে চলে গেলাম। তখন তাগড়া জোয়ান, বাহু বলে শক্তি অফুরান। তবুও নার্স এসে যখন ছোট্ট জিনাতকে টাওয়েল মুড়িয়ে আমার হাতে দিল- আমার মনে হল আমার হাত কাঁপছে! কি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলাম ছোট্ট বাচ্চাটির দিকে- এখন মনে পড়লে লজ্জা লাগে, হাসিও পায়।
এলবামের ছবি উল্টাতে থাকি। কাদা মাখামাখি অবস্থায় জিনাতের ছবি, কান্না করছে সে – দেখেই হেসে উঠলাম। সেবার পিকনিকে গিয়েছিলাম, সাদা ধবধবে একটা ফ্রক পড়ে জিনাত গিয়েছিল সঙ্গে। কিন্তু গাড়ি থেকে নেমে একটু দূরে যেতেই পা পিছলে কাদায় পড়ে জিনাতের পুরো ফ্রক নষ্ট হয়ে গেল। সে কি চিৎকার করে কান্নাকাটি!
ছবির এলবাম এগোতে থাকে, ছোট্ট জিনাতও বড় হতে থাকে। কখনো প্রাইজ পাওয়া ছবিতে দাঁত বের করে হাসা তো কখনো কাকাদের সাথে দুষ্টুমির সময় ক্যামেরায় ধরা পড়া – ছবিগুলো উল্টোতে থাকি আর মনের অজান্তে হাসতে থাকি। কতটা দিন পার করে ফেলেছি- এখন ভাবলেও কেমন লাগে! মনে হয় এইতো সেদিন না পিচ্চি জিনাতকে পিঠে চড়িয়ে ঘুরে বেড়াতাম বাড়িময়। কিভাবে কেটে গেল এতদিন!
ছবির এলবামে ছবি শেষ হয়ে আসে। বড় করে দীর্ঘশ্বাস ফেলি আমি। জিনাতের বিয়ে হয়েছে দুদিন হলো। শাড়ি পড়ে বড় ঘোমটা দিয়ে জিনাত যখন রওনা হল, জিনাতের মা কান্না করছিলেন। আমি মনকে শক্ত করে নিলাম, মেয়ে শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছে- সেটাই তো নিয়ম। একটু আধটু মন খারাপ হবে, তবে সে কিছু নয়- সময় গেলেই ঠিক হয়ে যাবে।
দুদিন কেটে গেল। মনটা ঠিক সেরকমই ভারী হয়ে আছে। একটা প্রচন্ড শূন্যতা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আছে মনটাকে। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে তাকিয়ে থাকলাম বাইরের জানালাটার ওপারে।
বসন্তের দুপুরবেলা; মৃদু বাতাসে পাতাগুলো হেলেদুলে নড়ছে। গাছের বড় ডালে বসে দুটো চড়ুই পাখি খুনশুটি করছে, তাদের কিচিরমিচির শব্দ জিনাতের রুমজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে- কত সুন্দর, কত সুন্দর! ছবির এলবামটা বুকে জড়িয়ে পরম আবেশে তাকিয়ে রইলাম তাদের দিকে…..6 Comments
Friends
পৌষী পাল
@poushee-paul
Farhana Hossain
@farhana-hossain
ভাস্কর
@vaskarchou
Prithula Zaman
@prithula
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
অভিমানী মন
@ovimanimon
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor
তুলট ডেস্ক
@toulot


বাৎসল্য রসে ভরা আবেগি গদ্য। গল্প কী এখন শুধু এক লহমার! অভিনন্দন।