Profile Photo

Ashik MokamiOffline

  • ashikmokami
  • Profile picture of Ashik Mokami

    Ashik Mokami

    2 days ago

    উপকথা—রুনামিতা
    🍎🍎🍎🍎🍎🍎🍎🍎🍎🍎🍎🍎
    আবির নামটা তার মা রেখেছিল। কিন্তু মা কখনো তাকে ডাকেনি সেই নামে। মা তখন অন্য একজনের সংসারে, অন্য একজনের বিছানায়, অন্য একজনের সন্তানের মুখে ভাত তুলে দিতে ব্যস্ত।
    আবির সেই সংসারের কেউ না। আবির সেই সংসারের লজ্জা। এতিমখানার দারোয়ান চাচা তাকে প্রথমদিন এনে দিয়েছিল একটা নীল রঙের থলেতে করে — দুটো জামা, একটা লুঙ্গি, আর একটা ভাঁজ করা কাগজ।
    কাগজে লেখা ছিল শুধু একটা নাম: আবির হোসেন। বয়স আনুমানিক তিন বছর। আনুমানিক। মানে তার জন্মের তারিখটাও কেউ মনে রাখেনি। এতিমখানাটার নাম ছিল “দারুল আমান”। শান্তির ঘর। কিন্তু সেখানে শান্তি ছিল না।
    ছিল ঠান্ডা মেঝে, পুরনো কাঁথা, আর রাতের বেলা অন্ধকারে কান্নার শব্দ। কে কাঁদত? সবাই। একে একে, পালা করে। আবির কাঁদত না।
    সে শিখে গিয়েছিল খুব ছোটবেলায় — কান্নার কোনো লাভ নেই। কান্না শুনতে আসার কেউ নেই। তার চেয়ে চুপ করে থাকা ভালো। চুপ করে শুয়ে থাকলে রাতটা দ্রুত পার হয়।
    রাত পার হলে সকাল আসে। সকালে ভাত মেলে। ভাত হলেই চলে। ছোট আবির এইভাবেই বড় হতে লাগল। এতিমখানার সাথেই ছিল মাদ্রাসা। সকাল সাতটায় ফজরের নামাজ, তারপর নাস্তা — রুটি আর ডাল, তারপর কিতাব। আরবি হরফ, সুরা মুখস্থ, তাজবিদের নিয়ম। সে মেধাবী ছিল। একবার শুনলেই মনে থাকত।
    হুজুররা তাকে পছন্দ করতেন — পড়া পারে, চুপচাপ থাকে, বেয়াদবি করে না। কিন্তু আবিরের একটা সমস্যা ছিল। আবির আস্তে আস্তে বুঝতে পারছিল সে অন্য ছেলেদের মতো নয়। এটা কোনো একদিনের উপলব্ধি নয়।
    এটা ছিল ধীরে ধীরে, বছরের পর বছর ধরে জমে ওঠা একটা অনুভব। যখন অন্য ছেলেরা দৌড়াদৌড়ি করত, মারামারি করত, গলা উঁচু করে কথা বলত — আবির সেসব পারত না। সে বসে থাকত।
    নরম হাতে কাজ করত। মেয়েদের মতো করে হাঁটত — অন্তত সেটাই বলত বাকিরা। “মাইয়্যা মাইয়্যা হাডে।” “হিজড়া।” “আবির না — আবিরা।” শব্দগুলো পাথরের মতো ছুঁড়ে মারত ওরা। আবির হাসত।
    হাসি দিয়ে ঢাকত। রাতে একা চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকত। ভাবত, এই রাতটাও পার হয়ে যাবে। কিন্তু কিছু কিছু রাত পার হয় না। আবিরের বয়স যখন বারো, তখন মাদ্রাসায় নতুন একজন হুজুর এলেন। মাওলানা সাহেব। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি।
    লম্বা দাড়ি, সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি। কণ্ঠস্বর গম্ভীর। কোরআন তেলাওয়াত করলে মনে হতো দেয়াল কাঁপছে। তিনি আবিরকে প্রথমদিন দেখেই বললেন, “এই ছেলেটাকে আমার কাছে পাঠিও।” কেন? কারণ আবিরের মুখ সুন্দর। মাশাআল্লাহ বলতে হয়।
    বড় বড় চোখ, ফর্সা গায়ের বর্ণ, নরম নরম ঠোঁট। এতিমখানার ছেলেদের মধ্যে এত সুন্দর আর কেউ ছিল না। প্রথমে কিছু বোঝা যায় না। হুজুর পড়ান, দোয়া শেখান, মাথায় হাত রাখেন। বলেন, “তুমি অনেক ভালো ছেলে।” আবির খুশি হয়। কেউ তাকে ভালো বলেনি এত আগ্রহ নিয়ে।
    তারপর একদিন রাতে— সেই রাতের কথা আবির কখনো ভোলেনি। ভুলতে চেয়েছে। পারেনি। ঘুমের মধ্যে সেই রাত ফিরে আসে। স্বপ্ন নয় — দুঃস্বপ্নেও নয়। শুধু একটা ভার হয়ে বুকের উপর বসে থাকে। সেই রাতের পর আর কিছু আগের মতো থাকল না।
    মাওলানা সাহেব থেমে থাকলেন না। বারবার। বিভিন্ন অজুহাতে। “একটু থাকো, তাফসির বুঝিয়ে দিই।” “রাত হয়ে গেছে, এখানেই থাকো।” “তুমি বিশেষ ছেলে, তোমার জন্য বিশেষ তালিম।” আবির বুঝত। কিন্তু কী করবে? কোথায় যাবে? কার কাছে বলবে?
    মা নেই। বাবা নেই। এতিমখানার মোতোয়াল্লি সাহেব মাওলানার বন্ধু। বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। উল্টো বলবে, “মিথ্যা বলছিস। বেয়াদব।” তাই আবির চুপ করে থাকল। চুপ করে থাকতে থাকতে ভেতরে ভেতরে কিছু একটা মরে গেল।
    মাওলানা একা ছিলেন না। এতিমখানায় যারা আসতেন — দানশীল মানুষজন, ধর্মীয় নেতা, মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির সদস্য — তাদের মধ্যে কেউ কেউ জানতেন। জানতেন এবং সুযোগ খুঁজতেন।
    আবিরের মুখ সুন্দর ছিল। আবির চুপচাপ ছিল। আবির কাঁদত না। এই তিনটি গুণ তাকে শিকারে পরিণত করেছিল। বছরের পর বছর। বয়স বাড়ছে। শরীর বাড়ছে। কিন্তু ভেতরে কী বাড়ছে?
    একটা ক্ষত। একটা অন্ধকার। একটা প্রশ্ন যার উত্তর সে খুঁজে পাচ্ছে না। সে কে? সে কি ছেলে? মেয়ে? নাকি এই দুটোর বাইরে কিছু? শরীর বলছে এক কথা। মন বলছে আরেক কথা। আর সমাজ বলছে, “তুই হিজড়া। তোর জায়গা নেই।”
    পনেরো বছর বয়সে আবির প্রথমবার পালানোর চেষ্টা করল। রাত তিনটায়। এতিমখানার পেছনের দেয়াল টপকে। পায়ে জুতো নেই। হাতে কিছু নেই। শুধু একটা ছেঁড়া গামছা আর বুকের ভেতরে একটা অদম্য ইচ্ছা — এখান থেকে চলে যেতে হবে।
    কোথায়? জানে না। শুধু জানে, এখানে থাকা যাবে না। কিন্তু তিন ঘণ্টা পরেই ধরা পড়ল। ফজরের আগে। মাঠের মধ্যে হাঁটছিল, পথ চিনছিল না, একজন রিকশাওয়ালা দেখে এতিমখানায় ফিরিয়ে দিল। শাস্তি হলো। বেত। তারপর কয়েকদিন খাবার কম। আবির সহ্য করল।
    ষোলো বছরে আবার পালাল। এবার ধরা পড়ল না। শহরে এসে প্রথম তিনদিন কিছু খায়নি। রাস্তায় ঘুরেছে। ফুটপাতে ঘুমিয়েছে। বাসস্ট্যান্ডের কাছে একটা চায়ের দোকানে কাজ পেল — গ্লাস ধোয়া, মেঝে মোছা। মাথা গোঁজার ঠাঁই হলো দোকানের পেছনের একটা ছোট্ট চালাঘর। আবির বেঁচে রইল।
    বেঁচে থাকার মধ্যে একটা অদ্ভুত আনন্দ আছে যেটা সুখী মানুষেরা বোঝে না। শুধু যারা অনেকক্ষণ ডুবে ছিল, তারা বোঝে — উপরে উঠে এসে বাতাস টানার সেই প্রথম নিঃশ্বাসের স্বাদ।
    চায়ের দোকানে থাকতে থাকতে আবির আস্তে আস্তে শহর চিনল। শহর একটা অদ্ভুত জায়গা। এখানে কেউ কারো দিকে তাকায় না। এখানে কেউ কাউকে চেনে না। এখানে একটু হলেও মুক্তি আছে।
    সে দেখল শহরে হিজড়ারা আছে। রাস্তায়, বাসে, বাজারে। তারা দল বেঁধে থাকে। নিজেদের ভাষায় কথা বলে। নিজেদের নিয়মে চলে।
    একদিন একজন তার দিকে তাকিয়ে হাসল। “নতুন?” আবির মাথা নাড়ল। “কোথা থেকে?” “মাদ্রাসা থেকে।” মেয়েটি — না, মেয়ে নয়, হিজড়া — হাসল। নাম বলল, “রত্না। তোর নাম কী?” “আবির।” “আবির না। তুই দেখতে আবিরা। নতুন নাম নিবি?”
    নতুন নাম। এই দুটো শব্দ আবিরের বুকে অদ্ভুত একটা কম্পন তুলল। নতুন নাম মানে নতুন পরিচয়। নতুন পরিচয় মানে পুরনো সবকিছু ফেলে দেওয়া — এতিমখানা, মাদ্রাসা, মাওলানা সাহেব, সেই রাতগুলো।
    “রুনামিতা।” কে বলল? রত্না। বলল, “এই নামটা সুন্দর। জাপানি মেয়েদের নামের মতো। রু-না-মি-তা।” আবির মুখে মুখে বলে দেখল।
    রুনামিতা। মনে হলো শরীরের ভেতর থেকে কেউ বেরিয়ে আসছে। যে এতদিন আটকা ছিল।
    সেদিন থেকে আবির আর নেই। রুনামিতা এলো। রত্নার দলে থাকতে লাগল রুনামিতা। এই দলে আরও আছে — মিঠু, সোনিয়া, পারু, চাঁদনি। সবার বয়স কম-বেশি একই রকম। সবার গল্প কম-বেশি একই রকম। পরিবার নেই, ঘর নেই, সমাজে জায়গা নেই। কিন্তু এই দলে একটা উষ্ণতা আছে।
    রত্না রান্না করে সবার জন্য। মিঠু গান জানে, মাঝে মাঝে গায়। সোনিয়া চুল বাঁধতে পারে, সুন্দর করে। চাঁদনি সবচেয়ে বড়, সে নিয়ম বলে দেয়।
    রুনামিতা এখানে প্রথমবার অনুভব করল — পরিবার মানে কী। পরিবার মানে রক্তের সম্পর্ক নয়। পরিবার মানে যারা তোমাকে রাতে একা ফেলে যায় না।
    কিন্তু এই জীবনেও অন্ধকার ছিল। রাস্তায় লোকজন তাদের দেখে হাসত। বাসে উঠলে সরে যেত। দোকানে গেলে মুখ ঘুরিয়ে নিত। পুলিশ মাঝে মাঝে হয়রানি করত। আর পুরুষেরা — কিছু পুরুষ রাতের বেলা আসত। টাকা নিয়ে আসত।
    রুনামিতা বুঝত। রত্না একদিন বলেছিল, “এছাড়া আর কী করব? খেতে হবে না?” রুনামিতা জিজ্ঞেস করেছিল, “আর কোনো উপায় নেই?” রত্না হেসেছিল। ক্লান্ত হাসি। “তুই নতুন, তাই জিজ্ঞেস করছিস। কিছুদিন থাক, বুঝতে পারবি।”
    রুনামিতা বুঝতে চায়নি। সে অন্য কিছু খুঁজছিল। সুযোগ এলো অপ্রত্যাশিতভাবে। পাড়ার একটা সেলুনে কাজ খালি হয়েছে। মালিক লোক খুঁজছেন। রুনামিতা গেল। মালিক — করিম ভাই — দেখলেন। একটু থমকে গেলেন।
    রুনামিতা বলল, “আমি কাজ করতে পারব। চুল কাটা, দাড়ি কামানো, ম্যাসাজ — সব পারি।” করিম ভাই বললেন, “পারো কীভাবে? শিখলে কোথায়?” রুনামিতা বলল, “দেখে দেখে শিখেছি। একটা সুযোগ দিন।” করিম ভাই রাজি হলেন।
    সেলুনে কাজ শুরু হলো। প্রথম দিন হাত কাঁপছিল। কাঁচি ধরতে গিয়ে ভুল হলো। কাস্টমার বিরক্ত হলো। করিম ভাই একটু ধমকালেন। রুনামিতা মাথা নিচু করে কাজ করল।
    রাতে ফিরে হাত দুটো দেখল। এই হাত দিয়ে কাজ করতে হবে। এই হাত দিয়ে নিজের জীবন গড়তে হবে। দ্বিতীয় সপ্তাহে ভালো হলো। তৃতীয় সপ্তাহে কাস্টমার প্রশংসা করল। “ম্যাসাজটা ভালো করো।” “হাত হালকা।” “আবার আসব।”
    রুনামিতার মুখে হাসি ফুটল। সেলুনে কাজ করতে করতে রুনামিতা অনেক মানুষ দেখল। বিভিন্ন রকম মানুষ। ধনী, গরিব, শিক্ষিত, অশিক্ষিত। সবাই তার কাছে আসে চুল কাটাতে, দাড়ি কামাতে, ম্যাসাজ নিতে। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে না সে কে, কোথা থেকে এসেছে। এই না-জিজ্ঞেস করাটা একটা স্বস্তি।
    কাজের মধ্যে রুনামিতা নিজেকে খুঁজে পেত। হাত চালালে মাথা ফাঁকা হয়ে যেত। পুরনো স্মৃতি দূরে সরে যেত। সামনে শুধু থাকত একটা মানুষ, একটা মাথা, একটা কাজ।
    করিম ভাই ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে লাগলেন। মাইনে বাড়ালেন। একটা ছোট্ট ঘর ভাড়া করার সুযোগ হলো। নিজের ঘর। প্রথমদিন রাতে সেই ঘরে একা বসে রুনামিতা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল। চারদিকে চারটা দেয়াল। একটা ছাদ। একটা দরজা যেটা সে নিজে বন্ধ করতে পারে। এটুকুই যথেষ্ট।
    ভালো সময় বেশিদিন থাকে না। রুনামিতার শরীর আস্তে আস্তে ভাঙতে লাগল। প্রথমে ভাবল ক্লান্তি। সেলুনে দাঁড়িয়ে কাজ করে সারাদিন — ক্লান্ত লাগবেই। কিন্তু এই ক্লান্তি সাধারণ নয়। এই ক্লান্তি ঘুমালেও যায় না। জ্বর আসে। ঘাম হয়। ওজন কমে।
    করিম ভাই বললেন, “ডাক্তার দেখাও।” রুনামিতা যায়নি। ভয় লাগে ডাক্তারের কাছে। ছোটবেলা থেকে শিখেছে — ডাক্তারের কাছে গেলে টাকা লাগে। টাকা নেই তো চিকিৎসা নেই।
    কিন্তু একদিন সেলুনে কাজ করতে করতে হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেল। করিম ভাই নিজেই হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। পরীক্ষা হলো। রক্ত নেওয়া হলো। ফলাফল এলো তিন দিন পর। ডাক্তার কাগজটা দিলেন। মুখ গম্ভীর। বললেন, “বসো।”
    রুনামিতা বসল। “তোমার… HIV পজিটিভ।” শব্দটা কানে ঢুকল। কিন্তু মাথায় ঢুকল না। রুনামিতা একবার ডাক্তারের মুখের দিকে তাকাল। তারপর কাগজের দিকে। তারপর জানালার দিকে। বাইরে রোদ উঠেছে। একটা কাক ডাকছে।
    ডাক্তার বললেন আরও অনেক কথা। চিকিৎসা আছে। ওষুধ খেলে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। দীর্ঘদিন বাঁচা যায়। রুনামিতা শুনল। কিন্তু কিছু মাথায় ঢুকছিল না। শুধু একটা কথা মাথায় ঘুরছিল। কেন? কেন আমার সাথে? আমি কী করেছিলাম?
    সেই রাতে রুনামিতা তার ঘরে একা বসে রইল। আলো জ্বালায়নি। অন্ধকারে বসে রইল। বাইরে রাস্তার শব্দ আসছে — রিকশার টুংটাং, গাড়ির হর্ন, কারো কারো কথা। পৃথিবী চলছে। পৃথিবীর কিছু যায় আসে না রুনামিতার কথায়।
    সে ভাবল তার জীবনটার কথা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। জন্ম — কোনো আনন্দ ছাড়া। শৈশব — কোনো উষ্ণতা ছাড়া। কৈশোর — কোনো নিরাপত্তা ছাড়া। যৌবন — কোনো ভালোবাসা ছাড়া।
    সে কি কখনো সুখী ছিল? কখনো কি একটু শান্তি পেয়েছিল? হয়তো সেলুনে কাজের সময়। যখন হাত চলত, মাথা ফাঁকা থাকত। যখন কাস্টমার বলত, “ভালো করেছ।” যখন নিজের ঘরে একা বসে এক কাপ চা খেত। কিন্তু এটুকুই। এটুকুই কি একটা জীবনের জন্য যথেষ্ট?
    পরের কয়েকটা সপ্তাহ রুনামিতা যেন ভেতর থেকে ভেঙে গেল। কাজে যেত। কিন্তু মন থাকত না। হাত কাঁপত। কাস্টমাররা বিরক্ত হতো। করিম ভাই দেখলেন। একদিন বললেন, “কী হয়েছে তোমার?”
    রুনামিতা কিছু বলেনি। “অসুখ হয়েছে জানি। কিন্তু চিকিৎসা নিচ্ছ?” “না।” “কেন?” “টাকা নেই।” করিম ভাই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “আমি সাহায্য করতে পারি।”
    রুনামিতা তাকাল। চোখে জল এলো কি না বোঝা গেল না। শুধু বলল, “কেন করবেন?” “কারণ তুমি ভালো কাজ করো। কারণ তুমি মানুষ।”
    মানুষ। কতদিন পর কেউ তাকে এই কথাটা বলল। কিন্তু চিকিৎসা শুরু হলো না। রুনামিতার মনে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন আসছিল। ডাক্তার যা বলেছেন সেটা সে মানতে পারছিল না। মানতে চাইছিল না।
    রাতের অন্ধকারে সে ভাবত — কেন? কেন আমি চিকিৎসা নেব? কার জন্য বাঁচব? কে আমাকে ভালোবাসে? কে আমার জন্য অপেক্ষা করছে?
    মা? মা তাকে এতিমখানায় দিয়ে চলে গেছে। বাবা? বাবার নামও জানে না। রত্না, মিঠু, সোনিয়ারা? তারা নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। করিম ভাই? তিনি মালিক। সহানুভূতি দেখাচ্ছেন, কিন্তু কতদিন?
    একা। সে সম্পূর্ণ একা। এই একাকীত্ব ধীরে ধীরে তার ভেতরে একটা বিষ হয়ে জমতে লাগল। বিষ থেকে জন্ম নিল ক্রোধ। ক্রোধ থেকে জন্ম নিল একটা অন্ধকার প্রশ্ন।
    আমি যদি বাঁচতে না পারি, তাহলে যারা আমাকে এই জায়গায় এনেছে তারা কি নিরাপদে থাকবে? মাওলানা সাহেব এখন কোথায়? ভালো আছেন নিশ্চয়ই। মাদ্রাসায় পড়াচ্ছেন। নামাজ পড়ছেন। দোয়া করছেন। আর রুনামিতা? রুনামিতা একটা ছোট্ট ঘরে একা।
    ন্যায়বিচার কোথায়? এই ক্রোধটা রুনামিতাকে খেয়ে ফেলছিল।
    রত্না একদিন এলো দেখতে। দেখল রুনামিতার চোখ শূন্য। “কী হয়েছে তোর?” রুনামিতা বলল না। “কথা বল আমার সাথে।” “কী বলব?” “যা মনে আছে বল।” রুনামিতা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, “রত্না, আমার মনে হয় দুনিয়াটা অন্যায়।”
    রত্না বলল, “হ্যাঁ।” “এই অন্যায়ের বিচার কে করবে?” রত্না কিছু বলল না। “কেউ না। কেউ করে না। যারা ভালো মানুষ তারা কষ্ট পায়। যারা খারাপ তারা ভালো থাকে। এটাই নিয়ম।”
    রত্না ধীরে ধীরে বলল, “রুনামিতা, তুই কী করতে চাইছিস?” রুনামিতা জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। বাইরে সন্ধ্যা নামছে। যা হলো তার জন্য রুনামিতা নিজেও প্রস্তুত ছিল না।
    মানসিক ভাঙন একটা অদ্ভুত জায়গায় নিয়ে যায় মানুষকে। যুক্তি কাজ করে না। ভালো-মন্দের হিসেব থাকে না। শুধু থাকে একটা অন্ধ ব্যথা আর সেই ব্যথা থেকে জন্ম নেওয়া অন্ধ সিদ্ধান্ত।
    রুনামিতা ভেবেছিল — পৃথিবী তার সাথে অন্যায় করেছে। পৃথিবীও অনুভব করুক। কিন্তু পৃথিবী একটা বিমূর্ত ধারণা। পৃথিবীকে কষ্ট দেওয়া যায় না। তাহলে? সে যাদের কষ্ট দিতে চেয়েছিল তারা নিরীহ মানুষ। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানো, রেলস্টেশনে ঘোরাফেরা করা সাধারণ মানুষ যারা রুনামিতার কোনো ক্ষতি করেনি। কিন্তু ভাঙা মন এই পার্থক্য বোঝে না।
    কতদিন চলল এই কাজ? কেউ জানে না ঠিক। রুনামিতা নিজেও হয়তো জানত না সে আসলে কতটা ডুবে গেছে। কিন্তু একদিন ধরা পড়ল। বাসস্ট্যান্ডে। ভিড়ের মধ্যে। কেউ একজন দেখে ফেলল। চিৎকার করল। মানুষ জড়ো হলো। রুনামিতা পালাতে পারল না। নিজের রক্ত সিরিংজে ভরে সে অন্যদের সেটা দিয়ে খোজা দিচ্ছে! কত ভয়ানক!
    যা হলো সেটা বলার ভাষা নেই। জনতার হাত কোনো বিচার করে না। জনতার হাত শুধু মারে। রুনামিতা মাটিতে পড়ে গেল। উঠতে পারল না।
    হাসপাতালে রিপোর্ট এলো। তারপর আরও রিপোর্ট। তারপর আরও। স্বাস্থ্য বিভাগে হইচই পড়ে গেল। তিনশোরও বেশি মানুষ। তিনশোরও বেশি মানুষের জীবনে একটা অন্ধকার নেমে এলো যেটার জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না। পরিবার ভাঙল। সংসার ভাঙল। কেউ কেউ চাকরি হারাল। কেউ কেউ ঘর হারাল। কারো কারো স্ত্রী চলে গেল। কারো কারো সন্তান জানতে পারল।
    তিনশোটা জীবনে রুনামিতার ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল।
    রুনামিতার কবর হলো শহরের বাইরে। নাম নেই কবরে। শুধু মাটি। যারা তার ক্ষতির শিকার হয়েছিল, তারা ক্রোধ নিয়ে এলো। ঘৃণা নিয়ে এলো। কেউ কেউ থুতু দিল। কেউ কেউ আরও জঘন্য কাজ করল। কবরের মাটি চুপ করে রইল।
    শীতের পর বসন্ত এলো। ঘাস সবুজ হলো। একটা ছোট্ট ফুলগাছ গজাল — কেউ লাগায়নি, এমনিই এলো। প্রকৃতির কাছে কোনো বিচার নেই। প্রকৃতি শুধু জানে — মাটির নিচে যা আছে সেটা মাটির খোরাক। আর মাটি থেকে ফুল ফোটে।

    -৮ জানুয়ারি

    2
    1 Comment
    • কখনো কখনো একজন মানুষের পতন ব্যক্তিগত নয়—তা হয়ে ওঠে পুরো ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। রুনামিতার গল্প সেই ব্যর্থতারই নাম।

Skip to toolbar