-
নিষ্প্রভ
হাসনাত সৌরভ
===================================শিশির দুশোটা কবিতার বই ছাপিয়েছিল। বইমেলার শেষে দেখল বিক্রি হয়েছে আটত্রিশটা। এক এক বইতে তিরিশটা কবিতা। বন্ধুর ছাপাখানা থেকে ছাপিয়েছে, একদম সাধারণ ছাপা।
শিশির প্রাইমারি স্কুলে পড়ায়। পঁয়ত্রিশ বছর বয়েস। বউ, প্রেমাও আসে প্রতি বছর। দুজনেই সারা মেলায় হেঁটে হেঁটে বই বিক্রি করে। বই কেনে। একদিন কি দুদিন একটু ভালো খাবার কেনে, খায়। এবারে কিচ্ছু হল না। প্রেমার ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়ল। কেমো শুরু হয়েছে। প্রেমার শরীরটা বদলে যাচ্ছে। সাথে সে নিজেও
বাড়ি ফিরে গেলেও হতো। ইচ্ছা করল না। শিশির আবার মেলার মাঠে এলো। স্টল ভেঙে দিচ্ছে একে একে। তার বইগুলো আজও কাঁধের ব্যাগে। এইটা নিয়ে তার এগারো নম্বর বই।
প্রেমার ফোন।
খেয়েছ?
হ্যাঁ, তুমি?
এই খেলাম। আজ ফিরছ?
হ্যাঁ আজই।
এখন নিশ্চয়ই মেলায়। মন খারাপ।শিশির কথা বাড়ালো না বেশি। গ্রামের বাড়িটার কথা ভাবছে। ফেলে আসা জীবনটার কথা ভাবছে। এত ভুল এত ভুল। যদি গোটা মন দিয়ে সংসার করত? যদি অনেক টাকা জমাতো? এখন অনেক টাকার দরকার। প্রেমার চিকিৎসায় লাগবে। প্রেমা চলে যাবে? থাকবে না?
শেষ অবধি তা আর হলো কই। প্রেমা চলে গেল। শিশিরের হাতে প্রেমার সাজগোজ করা একটা ছবি, কোনকালে সমুদ্রে বেড়ানোর। এবছর আবার বইমেলা শুরু হয়ে গেছে। এবার কিন্তু নতুন বই নেই। পুরোনো বইগুলো নিয়েই শিশির মেলায় যাবে।
বইমেলায় প্রচণ্ড ভিড়। শেষ শনিবার। সকাল থেকে কিছু খায়নি শিশির। ইচ্ছা করেনি। একটু জটলা দেখলে, সামনে দাঁড়িয়েছে, বই কিনতে বলেনি এবারে, ডায়েরি খুলে কবিতা শুনিয়েছে। এই কবিতাগুলো সব প্রেমার শেষের কদিনে লেখা। মাথার কাছে বসে। টয়লেটের বাইরে প্রেমার জন্য অপেক্ষায়। হাসপাতালের সিঁড়িতে বসে। রাতে ছাদে বসে, মোবাইলে লিখেছে। নীচ থেকে গোঙাচ্ছে প্রেমা। জানলার ধারে খাট তো। ডায়েরিটার নাম দিয়েছে গোঙানি। সেই ডায়েরির পাতা থেকে কবিতা শোনাচ্ছে।
একজন কি দুজন শুনছে। কিন্তু কেউ না শুনলেই ভালো লাগছে, কেউ শুনলে, কারোর চোখেমুখে কবিতার ব্যথাটা ফুটে উঠলে, গলার কাছে শ্বাস আটকিয়ে কান্না জমে আসছে। যেন গুঁড়োদুধের দলা আটকিয়েছে গলায়। হলো তো কয়েকবার। কবিতা সম্পূর্ণ না করেই পালিয়ে এসেছে। ভিড়ে কাঁদা যায় নাকি?
তবু বিক্রি হলো বই। চোদ্দোটা। খুব অল্প দামে বিক্রি করে দিল। আর তো আসবে না বইমেলায়। কবিতা লিখবে। এরপর লিখবে উদাসীন কবিতাগুচ্ছ। মৃত্যু অবশেষে উদাসীন করে। যত গভীর ভালোবাসার শিকড়, মৃত্যুর পরে তত অভিযোগহীন মানুষ। তত অভিযোগহীন উদাসীনতা। উদাসীন কবিতা কত টাকায় বিক্রি করবে? থাক, তার চাইতে একা একা পড়বে। বইমেলা শেষ হলে, কোনো মানুষ যদি উদাসীন বসে থাকে মাঠে এসে, তাকে শোনাবে। যদি না শুনতে চায়, তার কথা শুনবে।
বাস থেকে নেমে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে শিশির। বসন্তকালের গরমে পুড়ছে মাটি, গাছ, পুকুর। শিমুল, পলাশে ভরে আছে গাছ। তাদের এই গ্রামটার নাম টুরিস্ট লিস্টে নেই, তাই শহুরেদের ভিড়ও নেই।
একটা পুকুরের ধারে দাঁড়ালো শিশির। পলাশের ছায়া পড়েছে জলে। টলটল করছে। কতগুলো পানকৌড়ি জলে নেমে আসা একটা ডালের উপর বসে। শিশির বসে পড়ল। শীতঘুম ছেড়ে গ্রীষ্মে জাগছে জগতসংসার। শিশির আর ঘুমাবে না। অপেক্ষা করবে সে উদাসীনতার কবিতাগুচ্ছের। আসবেই, জানে শিশির। শিশির প্রেমাকে ধারণ করবে। প্রেমা আর তার আদরে জন্মাবে কবিতাগুচ্ছ। উদাসীন। তারা এ পৃথিবীর কবিতা না। প্রেমা যেখানে গেছে, সে পৃথিবীরও না। তারা তৈরি করবে তাদের পৃথিবী, যেখানে শিশিরের ছায়া সবুজ পুকুরের জলে পড়ে, অপেক্ষা করবে পূর্ণিমার চাঁদের। সাদা বক হয়ে উড়ে যাবে প্রেমা আর সে, পালকের মত নরম কবিতাদের ছড়িয়ে দিয়ে, এই প্রেমহীন, ধৈর্যহীন মানুষগুলোর জন্য।
@হাসনাতের হস্তাক্ষর
4 Comments-
-
@drako এ লেখাটি প্রায় একদিন পর মডারেটর এপ্রুভড করল
-
-
Friends
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
জিকরুল ইসলাম
@zikrul
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
তাজুল ইসলাম তন্ময়
@tazulumgmail-com
সাব্বির হোসেন।
@shadowhunter3d
ফরহাদ আহমেদ
@forhad2004
অসীম রহমান
@ashim_rahman
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
AdabenTatali
@adabentatali



কবিদের নিয়ে যত না কবিতা লেখা যায় তার চেয়ে বেশী লেখা যায় গল্প! এই গল্পটা তার জলজ্যান্ত উদাহরণ! অভিনন্দন মঞ্চবন্ধু!