<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?>
<rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>তুলট | Hasan Zahid হাসান জাহিদ | Activity</title>
	<link>https://toulot.com/n_members/hzwriter/activity/</link>
	<atom:link href="https://toulot.com/n_members/hzwriter/activity/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<description>Activity feed for Hasan Zahid হাসান জাহিদ.</description>
	<lastBuildDate>Mon, 08 Jun 2026 16:05:53 +0600</lastBuildDate>
	<generator>https://buddypress.org/?v=</generator>
	<language>en-US</language>
	<ttl>30</ttl>
	<sy:updatePeriod>hourly</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>2</sy:updateFrequency>
	
						<item>
				<guid isPermaLink="false">f80dcf80c948bdfb136fdb0bd949a397</guid>
				<title>অভিনয়
-হাসান জাহিদ

‘আপনাকে যেই জন্য বুলাইছি...আরে, আপনি নিচে বইলেন কেলা? সোফায় বহেন।’
‘আমার কাছে সোফা আর নিচ কোনো পার্থক্য বহন করে না।’
‘কথা তো ভালোই কন, আচ্ছা নিচে বইয়া যদি দিলখুশ হয় তো বইয়া থাকেন।’
‘আমাকে ডেকেছেন কেন?’
‘মাফ চাইতে...।’
‘আপামনি আমাকে মাফ করেন...।’
‘আরে, মর জ্বালা। আপনে না, আমি মাফি মাংবো। মানে, আমারে ক্ষমা করেন। আই অ্যাপলোজাইজ ফর হোয়াট আই হ্যাভ ডান... প্লিজ মাফ কইরা দেন।’
‘এই জগতের মার-মার কাট-কাট খেলায় একজন মার খাবে, অন্যজন মার দিবে। এখানে মাফ চাওয়া-চাওয়ির কিছু নেই। জগতের নিয়ম আমি ভাঙতে পারব না।’
নীলু কথা খুঁজতে লাগল। সে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল–তার সামনে বসালোকটাকে সিনেমার দুঃখী চরিত্রের মতো লাগছে।  
তার চেহারাটা দর্শকের মধ্যে করুণার সঞ্চার করবে। কোনো ভাবুক দর্শক সিনেমা দেখে রাতে বিছানায় শুয়ে এই লোকটার চরিত্রে অভিনয় করবে। আর নায়িকার হাতে মার খেয়ে বঞ্চনা ও না পাওয়ার বেদনার মধ্যে সূখ আনন্দ খুঁজে নেবে। 
নীলু সিলিং থেকে চোখ নামিয়ে হেসে উঠল। নীলুর হাসি দেখে লোকটা কিঞ্চিৎ অবাক চোখে তাকাল। 
	‘আপনিও কি সেরকম নাকি?’ নীলু বলল।
‘ম্যাডাম, আপনার কথা বুঝতে পারছি না।’ এবার সত্যিই বিস্মিত হয়ে বলল লোকটা।
‘ব্যস, এবার আপনি সোফায় বসুন।’
‘না।’
‘তবে চলে যান।’
লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে যেতে উদ্যত হলে নীলু বলল, ‘উঠবেন না। কথা শেষ হয়নি আমার।’
	‘আপনি দুইরকম ভাষায় কথা বলছেন।’
	‘তা বলছি, আপনাকে দেখে আমার মেয়েবেলার এক হারিয়ে যাওয়া বন্ধু’র কথা মনে পড়ছে, তার সাথে আমি আমাদের পারিবারিক ভাষায় কথা বলতাম। আপনি দেখতে আমার ছোটোবেলার বন্ধুর মতো। সে আমার সাথে আমাদের পারিবারিক ভাষায় কথা বলত। আমাদের প্রতিবেশী ছিল–মানে একটা কমন বাউন্ডারি দেয়ালের এপাশে-ওপাশে থাকতাম আমরা। সে মারা গেছে। কীভাবে মারা গেছে শুনতে চান?’
‘না।’
‘কেন?’
‘মারা যাবার কথা আমার শুনতে ভালো লাগে না। এমনকি জন্মের কথাও শুনতে ইচ্ছা করে না; দুইটাই বিচ্ছিরি ব্যাপার।’
‘তবু বলি, আমার বন্ধু মারা যায় গাছ থেকে পড়ে। বড় একটি আমগাছ থেকে পড়ে। এবার বুঝলেন তার মৃত্যুর কারণ?’
‘গাছ থেকে পড়ে সে মারা যায়Ñএটা তার মৃত্যুর কারণ।’
‘কিন্তু তাকে গাছে উঠিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। আর তাকে গাছে উঠিয়েছিলাম আমি। সুতরাং হত্যাকারী আমি, অথচ এই হত্যার কোনো বিচার হয়নি।’
‘আপনি সূত্রের ভেতরেই আছেন, ম্যাডাম।’
‘মানে কী?’ 
‘ওই যে বললাম, এই জগতে একজন মারে, অন্যজন মরে।’ 
‘গল্পটা বলব? মানে বন্ধু মরে যাবার ঘটনা। আসলে বন্ধুকে হত্যা করার গল্পটা?’
‘আপনি কি গল্প শুনানোর জন্য আমাকে ডেকেছেন?’ 
‘না, আপনার কাছে ক্ষমা চাইতে ডেকেছিলাম, অবশ্য একটা ব্লান্ডার হয়ে গেছে। কাউকে ডাকিয়ে এনে তার কাছে ক্ষমা চাওয়াটা শোভনীয় না; তার কাছে গিয়ে মাফ চাইতে হয়। এই জন্য হয়তো আপনি আমাকে মাফ করছেন না। তাই না?’ 
নীলু আবার পরখ করল সামনে বসা লোকটিকে। সে দরজার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। ‘আপনি কি চলে যেতে চাচ্ছেন?’
‘জ্বি।’
‘	‘গল্পটা শুনবেন না?’
নীলু ও কার্পেটে বসা লোকটার মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হলো। তারা ‘নীলু, নীলু’ ডাক শুনে দরজার দিকে তাকাল। এক দশাসই মহিলা ঢুকে বললেন, ‘তুই এহানে। তরে বিচরাইতাছি। নাহাইবি না? গরম পানি দিছে ইসুফের মা।’
‘অহন যাও মা, পরে নাহামু।’
‘ক্যাঠা?’ তাঁর চোখ গেল কার্পেটে বসা লোকটার দিকে। ‘আমাগো বাড়িতে নয়া আইছে সেই লোক?’
নীলু ঘাড় নাড়ল। সেদিকে তাকিয়ে মহিলা বললেন, ‘দুপুরে খাইয়া যাইবার কইস। আউজকা পোলাও পাকাইছি।’
নীলু লজ্জা পেল। বলল, ‘তুমি যাও মা, পরে নাহামু ।’  মহিলা চলে গেলে নীলু হাসল। তারপর বলল, ‘আমার মা। বহুত পুরানা লোক।’
লোকটার মুখে কোনো ভাবান্তর হলো না। সে ফের দরজার দিকে তাকাল। নীলু বলল, ‘শুনুন গল্পটা।’
‘শুনতে চাচ্ছি না।’
‘কেন শুনাতে চাচ্ছি জানেন? আজ থেতে কুড়ি বছর আগের ঘটনা। আজ পর্যন্ত কাউকে আমি প্রকৃত গল্পটা বলিনি; আপনিই প্রথম শুনবেন।’
	‘আচ্ছা বলুন।’ লোকটা এবার জানালার বদলে দরজার দিকে তাকাল।	
‘আমার একটা পোষা টিয়া পাখি ছিল। সে কথা বলতে পারত। কিন্তু সে ভিতরে ভিতরে খুব পাজি ছিল। বহুদিন যাবৎ সে ব্লেডের মতো ধারালো ঠোঁট দিয়ে তার কেটে একদিন খাঁচা থেকে বের হয়ে যায়। প্রথমে সে উড়তে পারল না, লাট খেল। তারপর সে উড়ে গিয়ে আমাদের পুরনো আমগাছটায় গিয়ে বসে। আমি পাখির দিকে তাকিয়ে কাঁদছিলাম, এমন সময় আরমান এলো।’
‘আপনাদের পুরনো আমগাছ তো দেখলাম না।’
‘সেটা আমাদের আগের বাসার কথা। পুরনো বাসা, দরদালান। বহু ইতিহাসের সাক্ষী। সেই বাসা ছেড়ে আমরা চলে এসেছি এই বাসায়। পুরনো বাড়িটা দুই বিঘা জমির ওপর ছিল, এখন সেটা মার্কেট।’
লোকটা ঘনঘন জানালার দিকে তাকাচ্ছিল, সেদিকে তাকিয়ে নীলু বলল, ‘কী দেখছেন!’
‘না, তেমন কিছু না। আপনি গল্পটা বলুন।’
‘আমি আরমানকে বললাম, যে করেই হোক পাখিটা ধরে দিতে। আরমান ছিল আমাদের মহল্লার সেরা গেছো মানব। কিন্তু সেদিন সে ইতস্তত করছিল–আগের রাতে খুব বর্ষণ হয়েছিল। আমি তাকে জোর করে গাছে উঠালাম। সে ধীর ভঙ্গিতে গাছে উঠল। টিয়া তার দিকে পেছন ফিরে বসে ছিল। সে একহাতে একটা ডাল ধরে অন্য হাতে টিয়া পাখিটা ধরতে যাবে, এমন সময় পা পিছলে যায় তার। প্রথমে সে পড়ল আমাদের গোসলখানার টালির ছাদে, সেখান থেকে গড়িয়ে মাটিতে পড়ল। তার পড়ার সেই ভোঁতা আওয়াজ এখনও আমার কানে লেগে আছে। হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল তাকে, কিন্তু পরদিন সে মারা যায়।’

নীলু মাথা নিচু করে বিষণ্ন ভাবালুতায় ছেয়ে যায়। লোকটা উঠে দাঁড়াল, তারপর দরজার দিকে অগ্রসর হলো। 
‘দাঁড়ান,’ নীলু বলল, ‘আমারই গাফিলতি হয়েছে। আমি আপনার ঘরে গিয়ে আপনার কাছে মাফ চেয়ে আসব।’ 
লোকটা কিছু না বলে বেরিয়ে গেলে নীলু বিড়বিড় করে বলল, ‘মাফি মাঙতেও এতো পেরেশানি! না, আর মাফ চাইতে যামু না। দেখি হালায় কী করে।’
‘ও আফা, পানি তো জুড়াইতাছে। নাহাইবেন না?’ ইউসুফের মায়ের চিৎকারে ঝট করে ঘাড় ঘুরাল নীলু–ইচ্ছে হলো মেয়েলোকটাকে কষে একটা ঠাপ্পড় লাগাতে। 

সন্ধ্যায় নীলু হাজির হলো লোকটার গ্যারাজের মাথায় ঘরটায়। লোকটা উদাসীন দৃষ্টিতে জানালা গলিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। 
‘আমি এখন আপনার দরজায়, আমার জানালার পাশে না। এদিকে তাকান।’
লোকটা আমতা-আমতা করে বলল, ‘আপনি!’ 
‘এতো অবাক হবার কী আছে। বলেছিলাম না আমি আসব?’
লোকটা হা করে আছে। নীলু মেঝেতে বসে পড়ল। লোকটা বিছানার কিনারা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাহাকার করে উঠল, ‘এ কী করছেন। মেঝেতে কেন? ওই চেয়ারটায় বসুন,’ বলে সে দেয়ালে টানানো একটা শার্ট টেনে সেটা দিয়ে চেয়ার ঝেড়ে দিল।’  
‘ব্যস্ত হবেন না। আপনিও তো আমার বাসায় গিয়ে নিচে বসেছিলেন।’
‘সেটা কার্পেট ছিল, আর এটা নোংরা মেঝে। আপনার অ্যালার্জি হবে।’
‘হোক, আমি এখানেই বসব।’ সামান্য ইতস্তত করে নীলু বলল, ‘মাফ পাব না?’
‘কিন্তু আমি আজও বুঝতে পারছি না, সেদিন আপনি আমাকে মেরেছিলেন কেন?’
নীলু অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘মারিনি, আমি কি গুন্ডা নাকি যে আপনাকে মারব? বলতে লজ্জা লাগছে, একটা থাপ্পড়...।’
‘সেটাই বা কেন করলেন?’ লোকটা চট করে একবার জানালার দিকে তাকাল।
‘আমি তো এখানে, আবার আমার জানালার দিকে তাকাচ্ছেন কেন! আপনার বাসায় চা আছে?’
‘না।’
‘চা নেই! চা খান না আপনি?’
‘না। কফি খাই।’
‘কফি আছে?’
‘জ্বি।’
‘কফি দেন।’
‘চিনি ছাড়া কালো কফি খাই আমি, খাবেন?’
‘না। তিতা লাগবে, চা খান না কেন?’
‘এমনি। তিতা কফি এনে দেব?’
‘দিন।’
লোকটা চলে গেল কফি আনতে আরেকটা খোপে। 
তিতা কফি আনবে সে? নীলুর চোখে ভাসল ফেনা ওঠা ক্রিম মেশানো কফি। মাঝেমধ্যে কাপ উপচে ওঠা ওইরকম কফি খেতে ভালোই লাগে। কিন্তু বাসায় কেউ সেই কফি বানাতে পারে না; সে নিজেও চেষ্টা করেছিল; দোকানের মতো হয়নি।
‘এই যে, কফি।’
নীলু কফিতে চুমুক দিয়ে মুখ কুঁচকাল। লোকটা আগ্রহভরে নিচু হয়ে নীলুর দিকে তাকিয়ে ছিল–যেন অদ্ভুত কোনো জন্তু দেখছে। নীলু তার দিকে তাকালে তড়াক করে সোজা হয়ে দাঁড়াল লোকটা।
‘এতো বিটার কেন? এই কফি খান আপনি?’
‘চড়ের মতো তিতা, তাই না?’
‘লজ্জা দিচ্ছেন কেন?’ নীলু অভিমান ভরে বলল, ‘আমি তো মাফ চাইতেই এসেছি।’
‘আপনি চেয়ারে বসুন, মেঝেতে অনেক ধুলা।’
‘এক কথা বারবার বলছেন কেন? বিরক্ত হচ্ছি। এমন বিরক্ত করলে আর আসব না। আমি এসেছিলাম...।’
‘মাফ চাইতে।’
	‘ঠিক, কিন্তু আপনি বাধাগ্রস্ত করছেন।’
‘কফিটা বোধহয় ভালো লাগেনি আপনার, তাই না?’
‘আপনাকে খুশি করার জন্য বলা উচিৎ ভালো লেগেছে, কিন্তু মিথ্যা আমি বলতে পারি না। কী জানেন, এরচেয়ে চিরতার পানি খাওয়া অনেক বেটার হতো।’
‘দুঃখিত। এখন বলুন চড় খাওয়ার মতো কী কাজ আমি করেছিলাম।’
‘আপনি আমার জানালার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে ছিলেন সেদিন, তাই।’
‘চোখ, এবং আরো দুয়েকটি ইন্দ্রিয় মানুষের বশে থাকে না। চোখ অনেকসময় নিজের অজান্তেই সিসি ক্যামেরার মতো তাকায়।’
‘ডোউন্ট অ্যাক্ট ওভারস্মার্ট। মেয়েদের জানালার দিকে তাকিয়ে থাকাটা অভদ্রতা। তবুও আমি এসেছি মাফ চাইতে, চড়টা চার কেজি ওজনের সমান ছিল বলে। জানেন, আপনাকে যে ওজনে চড়টা বসিয়েছিলাম, সেই অনুপাতে ওয়েয়িং স্কেলে থাবড়া মেরে দেখলাম সেটা চার কেজি।’
‘কী মিন করছেন?’
‘আই মিন, আপনার অপরাধের তুলনায় চার কেজির থাপ্পরটা দুই কেজির হওয়া উচিৎ ছিল। তাই মাফ চাইতে এসেছি।’
‘কষ্ট করে মাফ চাইতে আসার দরকার কী? আপনাকে দুই কেজি ফেরৎ দিয়ে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।’
‘না থাক, মাফই বরং চাই। আপনি যদি চড়ের ওজন আন্দাজ করতে না পারেন।’
‘মিস নীলু, আপনি দয়া করে মেঝে থেকে উঠুন আর চড়ের বিষয়টা মাথা থেকে গায়েব করে দিন।’
‘আপনিই না বললেন মানুষের ইন্দ্রিয় বশে থাকে না; আমি চড় দেবার বিষয়টি মাথা থেকে দূর করতে পারছি না।’
লোকটা ঘরজুড়ে পায়চারি করল, দার্শনিকের মতো তার দুইহাত পেছনে। নীলু টেবিল ফ্যানের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লোকটার অদ্ভুত পায়চারি দেখল। লোকটা আচানক পায়চারি থামালে, হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাবার মতো নীলুও থেমে গেল।
লোকটার মুখজুড়ে হাসি–সেই হাসি সংক্রমিত হলো মেঝেতে বসে থাকা নীলুর মুখে। নীলু বলল, ‘কী হলো?’
লোকটা বারকয়েক জানালার দিকে দৃষ্টিপাত করে বলল, ‘একটা আইডিয়া এসেছে মাথায়।’
‘কী আইডিয়া?’ কপট খুশিতে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলল নীলু।
‘বুঝতে পারছি, আপনি মাফ চাইতে পারছেন না। তারচেয়ে এক কাজ করি, যে কাজের জন্য আমি চড় খেয়েছিলাম, সেই কাজটাই আমি ফের বারকয়েক করে ফেললে শোধবোধ হয়ে যায়।’
‘মানে, আমার জানালায় তাকিয়ে থাকা?’
‘হ্যাঁ, তবে এখন তাকাব না। আপনি চলে গেলে।’
‘ওকে, ডান। তবে একটা কথা, টাংকি মারতে পারবেন না কিন্তু। শুধু তাকাবেন।’
‘ঠিক আছে।’
তড়াক করে উঠে দাঁড়াল নীলু। দুলে দুলে হাসতে লাগল। বলল, ‘আপনি খুব ভালো লোক। এখন আসি আমি?’
‘আসুন।’

একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজকে বারদুয়েক ভেংচি কাটল লোকটা। নিজকে বলল, ‘দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলে নিজেকে লুকিয়ে রেখে ভেক ধরেছ। কাপুরুষ, বাস্তবের মুখোমুখি হবার সাহস হলো না কোনোদিন?’
আয়না জবাব দিল, ‘নতুন কেনা রেজর-কাঁচি চালাও গালে, বেশি বাক্য প্রয়োগের দরকার নেই। বোকারা বেশি কথা বলে।’
লোকটা রেজরের দিকে তাকাল, কাঁচিটা নেড়েচেড়ে দেখল। তারপর কাঁচি হাতে নিয়ে প্রায় জটা ধরা দাড়ির একাংশ ঘ্যাঁচ করে কেটে হো-হো করে হেসে উঠল। তার ছাত্রছাত্রীরা তাকে দেখে আকাশ থেকে পড়বে।
সে শেভিং ফোম মাখল গালজুড়ে। রেজর চালাল, কাজ শেষ করে মসৃণ গালে হাত বুলোতে বুলোতে আরেকবার হাসল।
দৃশ্যটা কল্পনা করল সে: নাজমা জিজ্ঞেস করবে, ‘স্যার চাকরি পেয়েছেন? আমাকে আর পড়াতে আসবেন না?’ সুজন বলবে, ‘স্যারকে খুব হ্যান্ডসাম লাগছে।’ রাবেয়া বলবে, ‘স্যারের কি বিয়ে ঠিক হয়েছে?’
সবার প্রশ্নের উত্তর হবে, ‘না।’ 
সবাই অবাক হবে। হোক, এখন মানুষ কোনোকিছুতে সহজে অবাক হতে পারে না। সামান্য কারসাজি করে মানুষকে অবাক করে দেবার মধ্যে বাহাদুরি থাকবে নিশ্চয়ই।
আচ্ছা, নীলু কি খুব অবাক হবে? কতটা? ভিড়মি খাবে?


‘তুমি নীলুর কথা ভাবছ কেন? কোনো বিশেষ কারণ আছে কি?’
‘না।’
‘তবে?’
আয়নার প্রশ্নের উত্তরে সে বলল, ‘জগতে সব তবে’র উত্তর নেই। আমার মাথায় ভাবনা উদিত হতে পারে, ভাবনারা তো ডায়াবেটিসের রোগী না যে নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলবে। নীলুর কথাও তাই ভাবলাম।’
শেভ-গোসল সেরে সে টেবিলে বসল, সুজনের জন্য নোট তৈরি করতে হবে। পাঠ্যপুস্তক, গীতবিতান, গড অভ স্মল থিংস, নোটবই, খাতা, কাগজ-কলম, প্রোফাইল ফোল্ডার–প্রত্যেকেই জানান দিল–এই টেবিলে কেউ এসেছিল, তার স্পর্শ বই-খাতায়। কখন এলো!

কেউ অবাক হয়নি; তবে মামুলি দুয়েকটা প্রশ্ন করেছে। যেমন, আপনার কি ইন্টারভিউ ছিল? একজন বলল–দাড়িগোঁফই তো ভালো ছিল। সবচেয়ে কম অবাক হলো নীলু। কিংবা এতো বেশি অবাক হয়েছে যে, বিস্ময় প্রকাশ করতে ভুলে গেছে।
পরদিন দুপুরে নীলুকে ওর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল সে। নীলু বলল, ‘ভেতরে আসতে পারি?’ 
‘পারেন, তবে নিচে বসবেন না। বিছানায়, না হয় চেয়ারে বসবেন।’
‘নিচেও বসব না, বিছানায় বা চেয়ারেও বসব না।’
‘তবে কোথায় বসবেন?’
‘বসব না, দাঁড়িয়ে থাকব।’
‘আচ্ছা।’
নীলু ভেতরে এসে বলল, ‘কাল আপনি খাননি, আজ মা খেতে ডেকেছে। মা মানুষকে খাওয়াতে ভালোবাসে। আসবেন না?’
‘আসব, মুরুব্বি মানুষ ডেকেছেন।’
নীলু সরু চোখে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার চোখে অনেক প্রশ্ন, মানে আপনি ভাবছেন আমি কেন জিজ্ঞেস করছি না দাড়িগোঁফ কাটার পর আপনাকে কেমন লাগছে।’
‘ভাবছিলাম বৈকি।’
‘আমি বিস্মিত হইনি কারণ আমি জানতাম আপনি এই কাজটি একদিন করবেন।’
‘কীভাবে জানতেন?’
‘জানতাম। কিন্তু কীভাবে, তা আপনাকে বলব না।’ নীলু রহস্যময় হাসি দিল। তারপর বলল, ‘দুপুরে আসবেন কিন্তু।’

বিশাল ডাইনিং টেবিলে বিরাট এক লোক বসে আছে। চোখে চশমা, গালে খোঁচা সাদাকালো দাড়ি। মুখটা মাংসল-তেলতেলে। টেবিলে সাজানো অনেক রকমের খাবার–পোলাও-মাংস-সব্জি, ভাত-তরকারি, মাছভাজা, আলুভর্তা, আর চটপটি।
‘বসুন।’ নীলু বলল।
‘উনি ক্যাঠায় রে?’
‘উনি আমাদের এখানে নতুন এসেছেন ‘ নীলু তাকাল তার দিকে, বলল, ‘আমার বড়ভাই, জুয়েলারির দোকান আছে।’
‘আমার নাম জহির আহমেদ। শিক্ষকতা করি।’ সে নিজের পরিচয় দিল।
‘বহেন ভাই, একটু খানাপিনা করেন। দোকান নিয়া ব্যস্ত থাকি, আপনার সাথে তাই দেখা হয় নাইক্কা। আউজকা দোকান বন রাখছি।’
সে বসল খাবার টেবিলে, সংকোচ ও লজ্জায় নীলুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনিও বসুন না আমাদের সাথে।’
‘হ বইন, একলগে বহ, উনি শিক্ষক মানুষ, শরম কীসের।’
‘আপনি সোনার ব্যবসা করেন?’
‘হ্। তেরো বচ্ছর চলতাছে। আমাগো এই বাড়িতে আহনের পর। আগের বাড়ি বাবায় কিনছিল পাকিস্তান আমলে। নতুন ঢাকায়। সেই সময়ের নতুন ঢাকা আছিল বন-জঙ্গল। ৯৩ সালে ওই বাড়ি ডেভেলপারদের দিয়া আমরা আমাগো দাদার পুরান ঢাকার এই বাড়িতে উঠি। আগে আমার চম্পাতলিতে ঘড়ির কারবার আছিল।’ 
‘বড়ভাই কিন্তু ভালো কাওয়ালি গায়ক।’ নীলু মৃদুস্বরে বলল।
‘তাই নাকি! একদিন ভাইসাহেবের কাওয়ালি শুনব।’
হা-হা করে হেসে উঠলেন তিনি–এহন আগের মতো দম নাই। আর কাওয়ালি করতে দল লাগে, দলটা ভাইঙা গেছে। মাগার আশুরা আর রমজানের সময় হ্যারা আহে, তখন করি।’
এই সময় নীলুর মা এলেন। তিনি টেবিলের একপাশে বসে বললেন, ‘বাবা, খানা ভালো হইছে?’
‘জ্বি চাচি।’
‘আপনেরা গল্প করেন, আমি একটু বিশ্রাম নেই উপরে গিয়া, সপ্তাহে একদিনের ছুটিতে ওয়াইফ ছেলেমেয়ে গো সময় দেই।’
‘জ্বি ভাইসাহেব, আপনি রেস্ট করুন।’
নীলুর বড়ভাই উঠে গেলে নীলু বলল, ‘একটু চটপটি দিব?’
‘দিন, একটুই দেবেন।’
সে চটপটির বাটি নিয়ে আড়চোখে তাকাল নীলুর দিকে–নীলু একটা হাড্ডি নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল। মুখে স্মিত হাসি।
সে এবার তাকাল নীলুর মা’র দিকে। তিনি একদৃষ্টে তার খাওয়া দেখছিলেন। সে বলল, ‘চাচি, খাবার খুব ভালো হয়েছে।’
‘মাঝেমধ্যে আইসা খাইবা।’
‘আচ্ছা।’

***
নীলু। এই নামটি ও এই বাড়ির পরিবেশ নতুন মাত্রা যোগ করল তার একঘেয়ে জীবনে। তার প্রায় ভবঘুরে জীবনে কয়েকটি ভাড়া বাড়িতে ও ব্যাচেলরদের সাথে থেকে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছে, তার কয়েকগুণ বেশি অভিজ্ঞতা হলো মাত্র তিনমাস এই বাড়িতে অবস্থান করে।
বাড়িটা গথিক ধাঁচের। অনেক জায়গা জুড়ে আছে। সে জানতে পারল নীলুরা তিনভাই, একজন মারা গেছে ছোটোকালে। অন্য ভাই সুইজারল্যান্ডে থাকে–সুইস মেয়ে বিয়ে করেছে। সোনা ব্যবসায়ী ভাই সবচেয়ে বড়, আর সবার ছোটো নীলু।
ভেতরে এখনও কিছু গাছপালা রয়ে গেছে। গ্যারেজটা নির্মিত হয়েছিল আশির দশকে, যখন নীলুর বড়ভাই ও সুইজারল্যান্ডপ্রবাসী মেজোভাই সাইদ দুটি টয়োটা গাড়ি কিনেছিলেন। দারোয়ান বা গেস্ট থাকার জন্য গ্যারেজের ওপর কোঠা বানানো হয়। প্রথম কিছুদিন নীলুর মায়ের দিকের আত্মীয় এক হস্তরেখাবিদ অকৃতদার ভদ্রলোক থাকতেন, সেই ভদ্রলোক একদিন নিখোঁজ হয়ে যান, তার আর সন্ধান মেলেনি। সেই থেকে কোঠাটা শূন্য পড়ে ছিল। নীলুর স্কুল জীবনের এক সহাঠিনী লুৎফা তার ছাত্রী। সে-ই সন্ধান দেয় নীলুদের এই কোঠার।
নীলুর মা জানালেন, তাঁর হস্তরেখাবিদ চাচাতো ভাইয়ের স্কিটসোফ্রেনিয়া রোগ ছিল। সে নাকি দেখত নীলুর দাদার রেসের ঘোড়া রাতে এই ভাঙাচুরা শেডে এসে হ্রেষারব করছে।

বাড়িটাতে চোর-ডাকাত ভুলেও ঢোকে না, আর প্রতিবেশীরা এই বাড়ির একজন সদস্য রূপে তাকে সম্মান করে। এর কারণ, নীলুর দাদার প্রতিপত্তির চিহ্ন এখনও বাড়ির সর্বত্র ও মহল্লায় বিদ্যমান। তিনি নিজ খরচে একটি এতিমখানা, দুটি মসজিদ ও একটি দুঃস্থ বোর্ডিং স্থাপন করেছিলেন।
নীলুর মা সেদিন কথায় কথায় বলেছিলেন, এই বাড়িটার ভেতর ঘোড়া ও ঠিকাগাড়ি দুইটিই অস্তিত্বমান ছিল। নীলুর দাদার দুটি কারাবাখ ঘোড়া ছিল, যা রেসের কাজে ব্যবহার করতেন তিনি, রেসকোর্সে ঘোড়ার বাজিতে প্রচুর আয় করতেন। আর ছিল চারটা দেশি প্রজাতির ঘোড়া। ঘোড়া ও ঠিকাগাড়ির চিহ্ন এখনও এই বাড়ির বাউন্ডারি ওয়াল ঘেঁষা বহু পুরনো শেড বহন করছে। 
শুধু একটা ব্যাপারে তার করোটিতে অস্বস্তির ঢেউ খেলে যায়। একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার শোনা যায়, সেইসাথে ধাতব ঝনঝনানির শব্দ। কখনও গভীররাতে, কখনও ভরদুপুরে, কখনও বা সাঁঝের বেলায়। শব্দটা আসে বাড়ির দোতলা থেকে।
সেদিন দুপুরে সে চিৎকারটা শুনল তার সিঁড়ির গোড়ায়। অমানবিক চিৎকার। তাকে লক্ষ্য করেই কেউ বলছে, ‘আমি কইছিলাম না আমার ভাইয়ে থাকব এই কোঠায়। তুই কোন জাওড়া এইহানে আইছস।’
‘জহির ভাই দরজা খুলবেন না।’ নীলু তার জানালা দিয়ে বলল, ‘খবরদার, দরজা খুলবেন না।’
দরজা না খুললে সিঁড়ির গোড়ায় কে শাসাচ্ছে তাকে, তা দেখা যাচ্ছেনা; তবে সেটা যে ভয়ংকর কিছু তা মালুম হলো।
সে জানালার কাছে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে। একটু পরে বাড়ির ফটক দিয়ে তিনজন দজ্জাল মহিলাকে ঢুকতে দেখল। 
তার সিঁড়ির গোড়ায় ধ্বস্তাধ্বস্তির শব্দ হলো। খানিক বাদে দেখতে পেল শেকল বাঁধা এক উন্মাদিনীকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে যাচ্ছে সেই বৃহদাকার তিন মহিলা।
সন্ধ্যেয় নীলু এলো। কোঠায় ঢুকে তার বিছানায় ধপাস করে বসল। ‘কী হয়েছে? ওই মহিলা কে?’ সে জিজ্ঞেস করে।
‘ভাবি। বড় ভাইয়ের বউ। উন্মাদ। কেমন করে জানি আজকে ছাড়া পেয়ে যায়। মাকে কামড়ে রক্তাক্ত করে ফেলেছে। বড়ভাই মাকে ক্লিনিকে নিয়ে গেছে।’
‘উনাকে বিদেশে চিকিৎসা করানো হয়েছে?’
‘কয়েকবার, কাজ হয়নি। আমরা জানতাম না যে, উনারা বংশগতভাবে পাগল। এমনিতে ভালোই থাকে, বড়ভাইয়ের সাথে কোনোদিন খারাপ ব্যবহার করেনি; কিন্তু হঠাৎ কেমন সব তান্ডব শুরু করেন উনি।’
নীলু উদাস দৃষ্টি মেলে বলল, ‘আমার বড়ভাই খুব ভালোমানুষ। এই মানুষটার কষ্ট আমি সহ্য করতে পারি না।’
‘একটা কথা বলব?’
‘বলুন।’
‘আমি কি এই কোঠায় থাকব না চলে যাব?’
‘কেন বলুন তো, চলে যাবার প্রশ্ন এলো কেন!’
‘না, বলছিলাম আপনার ভাবি...।’
‘ও কিছু না। ভাবির পাগলামি বেড়ে গেলে একেক সময় একেকটা ইস্যূ তুলে ধরে।’
‘বলছিলেন উনার ভাইকে নাকি এখানে রাখবেন উনি।’
‘কীভাবে? তার ভাই তো কবেই মরে গেছেন–উনিও উন্মাদ ছিলেন।’
‘তাই নাকি?’
‘আমি যাই, মাকে ক্লিনিক থেকে আনার কথা। দেখি গিয়ে, বুড়ো মানুষ। শেষে কি কুকুরের কামড় খেয়ে মরে যাবে নাকি।’ বিড়বিড় করতে করতে নীলু চলে গেল।

***
নীলু অনেকদিন আসে না। বিদেশ চলে যাবে–এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মাঝখানে একদিন এসেছিল, আইইএলটিএস লেসন বুঝতে। একদিনই এসেছিল, আর আসেনি। হয়তো নীলু এখন পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত, সে অনুমান করল।
শূন্যতা গ্রাস করে তাকে। নীলু আসছে না বলেই কি! কিন্তু তা কী করে হয়। নীলু তো তার কেউ নয়। তবু বুকটা এতো ভারী লাগছে কেন! সামান্য শব্দেই সে চমকে ওঠে–এই বুঝি নীলু এলো।

তার সাথে নীলুর আচরণ অদ্ভুত ঠেকলেও, মনে হয়েছিল, কোথায় যেন একটা ছন্দ লুকিয়ে আছে। হঠাৎ কেন ছন্দপতন হলো, নীলু কি ওকে নিয়ে খেলেছে? ওর মাঝে কোনো প্রত্যাশা জাগিয়ে তারপর নিজকে গুটিয়ে নিয়েছে?
সে নিজে কি নীলুকে নিয়ে কোনো স্বপ্নের জাল বুনেছিল? তার অবচেতন মন কোনো মায়াজাল বুনেছে?
মনে হলো নীলুর সাথে কথা হওয়া দরকার। কিন্তু কেন মনে হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা সে খুঁজে পেল না।
অস্থিরতার সাথে সে তার কক্ষে পায়চারি করে। সহসাই উত্তরটা মিলল। গোটা পর্বটা একটা অভিনয় ছিল। নীলুর বারবার তার কাছে ক্ষমা ভিক্ষার বিষয়টা জলবৎ তরলং। নীলু খেলেছে তাকে নিয়ে–ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে একধরনের রসিকতা ছিল। কিন্তু এমন নির্মম রসিকতা নীলু তার সাথে করতে পারল!

উত্তরটা পেয়ে গেল সে: নীলুকে ঘিরে তার অবচেতন মন একটা আশার জাল বুনেছে। নীলুর সঙ্গ, এই বাড়ির পরিবেশ, একটি নিরালা বাসস্থান, আর নির্ঝঞ্ঝাট জীবন যাপন তাকে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছিল।
স্বপ্ন যে সত্যি হয় না–সে ভুলে গিয়েছিল। একটা কমনীয় ও রূপসী মেয়ে, অগাঢ অর্থের মালিক, যুবতী-চপলা মেয়ে, তার ঢাকাই লেবাস বদলাতে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়েছে, এমএ পাস করেছে ইংরেজি সাহিত্যে। সেই মেয়ে কি একটা টিউশ্যনি করে জীবিকা নির্বাহকারী বিগতযৌবন পুরুষকে তার সত্তায় মিশিয়ে একাকার করে ফেলবে? 
দরজায় টোকা পড়ার শব্দে আশার সলতে দপ করে জ্বলে উঠল। সে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘আসছি নীলু।’ 
সে ছুটে গিয়ে দরজা খুলে নীলুর বড়ভাইকে দেখতে পেল।
‘একটা জরুরি বিষয়ে আইলাম।’
‘জ্বি বলুন ভাইসাহেব।’
‘আপনি শিক্ষিত ও শিক্ষক মানুষ। আপনি ভালো লোক। কিন্তু একটু অসুবিধা হইয়া গেছে। আপনাকে এই কোঠা ছাড়তে হইব। আমার স্ত্রী আপনারে দেইখা চেইতা গেছে। ডাক্তার কইছে, স্ত্রী যখন যা বলে তা করতে। জানেন তো সে অসুস্থ।’
‘জ্বি, জানি।’
‘তাইলে ওই কথাই রইল।’
	সে আনমনা ভঙ্গিতে ঘাড় নেড়ে সায় দেয়।

তারপর...। 

আবার সেই পুরনো গণ্ডিতে প্রত্যাবর্তন। একটা রান্নাঘর ও একটা বাথরুম চারজন শেয়ার করে আশাহীন ও বোধহীন জীবন যাপন। একজন অবসরপ্রাপ্ত কেরানি বাবার পুত্রের জীবন এরকমই হবার কথা।
মাঝখানের তিনটি মাস ছিল অভিনয়ের পালা। জীবনে সুখ না মিললেও সুখের অভিনয় তো সুলভ। এরকম সুলভ, জাদুবাস্তবতাময় জীবনে আমরা সবাই কোনো না কোনো সময় বিচরণ করি।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/220724/</link>
				<pubDate>Thu, 19 Sep 2024 19:53:19 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>অভিনয়<br />
-হাসান জাহিদ</p>
<p>‘আপনাকে যেই জন্য বুলাইছি&#8230;আরে, আপনি নিচে বইলেন কেলা? সোফায় বহেন।’<br />
‘আমার কাছে সোফা আর নিচ কোনো পার্থক্য বহন করে না।’<br />
‘কথা তো ভালোই কন, আচ্ছা নিচে বইয়া যদি দিলখুশ হয় তো বইয়া থাকেন।’<br />
‘আমাকে ডেকেছেন কেন?’<br />
‘মাফ চাইতে&#8230;।’<br />
‘আপামনি আমাকে মাফ করেন&#8230;।’<br />
‘আরে, মর জ্বালা। আপনে না, আমি মাফি মাংবো। মানে, আমারে ক্ষমা করেন।&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-220724"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/220724/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>0</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">0790df88663e73baafff613594353900</guid>
				<title>জলার দানব, রোজ কেয়ামত কিংবা জাদুবাস্তবতার গল্প
-হাসান জাহিদ

সেইসময় জাদুবাস্তব নামের কোনো টার্ম আবিষ্কৃত হয়নি। কিন্তু জাদুবাস্তবতা উদ্বাস্তুর মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। ড. ব্রডির প্রতিবেদনের মতো বিজাতীয় অপরিহরণীয় সংবিত্তি ঘিরে রেখেছিল বস্তিবাসী ও নিম্নবিত্ত মানুষদের। কুসংস্কারাচ্ছন্ন সেইসব মানুষেরা শেয়াল, সাপখোপ ও জলাভূমির লম্বা গ্রীবার দানবের গল্প করত। সেইসব বস্তিবাসী লোকগুলোর চোখ ছিল কোটরের গভীরে। মুখগুলো ছিল ঘোড়ার মতো লম্বাটে।
বসতবাড়ি সংলগ্ন কবরখানায় লাশ তুলে নিত শেয়ালেরা। মাটি ক্ষয়ে অনেক কবর ছিল উলঙ্গ শিশুর মতো উদোম। বাঁশগুলো দেখা যেত। ভেতরে ছিল জাদুকরের লাঠির মতো কালচে হলদেটে হাত, হলুদ খুলি। এই কবর নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা ছিল না। রাতে মানবশিশু শকুনির বাচ্চার মতো উয়া-উয়া করে কাঁদত। সকালে সেই শিশুর স্থান হতো কবরখানায়। মহামারিতে মরতে লাগল অনেক মানুষ।
সবারই ধারণা ছিল রোজ কেয়ামত আসন্ন। ঝাঁকড়াচুলো বস্তিবাসীরা খোল করতাল সহযোগে রাতভর গীত করত। এই গীত মহামারি তাড়াতে পরম পবিত্র আত্মার কাছে নিবেদন ছিল। মহামারি তাড়াতে তারা ওঝাদের ডাকত। ওঝারা মড়ার খুলি ও হাতের হাড় ও শেকড়বাকর নিয়ে হাজির হতো।
এক ওঝার পরামর্শে দুগ্ধবতী কুকুরীরা ধরা পড়তে লাগল। তাদের দুধ খাওয়ানো হতে লাগল মানব শিশুদের।
কিছু ভদ্র পরিবার ‘ওয়াক থু’ বলে কোরান শরিফ নিয়ে তেলাওয়াতে বসে যেত। তারা হারাম কাজকারবার আর আসন্ন কেয়ামতের ভয়ে ভীত ছিল।
একদিকে গাদাগাদি বাড়িঘর, অন্যদিকে প্রান্তর কিংবা বিল। বর্ষায় প্রান্তর গর্ভবতী নারীর মতো ফুলে উঠত পানিতে, আর শীতে বা শুকনো সময়ে প্রান্তরজুড়ে থাকত ঘাস, সব্জি খেত কিংবা পানাভর্তি পুকুর। বড় বড় ডোবা বা পুকুরে থাকত লম্বা গলাওয়ালা দানব। গলা বাড়িয়ে অনেক মানুষকেই তারা মুখে নিয়ে ডুব দিত জলার গভীরে।
স্নান সারতে ও কাপড় ধুতে স্থানে স্থানে ঘাট ছিল। সেইসব ঘাটে ভিড়ত বেদে-বেদেনিরা। তারা মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে চুড়ি বিক্রি করত আর সাপের খেলা দেখাত। তারা আরও একটি কাজ করত। কোনো যুবতী মেয়েকে জিনে ধরলে তার চিকিৎসা করত। আরেকটি দল ঘুরত–শিঙাওয়ালী। খাঁড়া খোঁপা বাঁধা আঁটো শাড়ি পরা মহিলা বা মেয়েদের দল হাতে মোষের শিং নিয়ে ‘বাতের ব্যথা সারাইবেন’ বলে হাঁক দিত। 
কেউ তাদেরকে ডাকলে তারা পিঠে যে স্থানে ব্যথা, সে জায়গাটা ব্লেডের আঁচড়ে কেটে সেখানে শিং ঠেকিয়ে শিংয়ের অপরপ্রান্তে মুখ আটকে দূষিত রক্ত টেনে নিত। দুপুর বেলা ঘাটে ধোপাদের কাপড় কাচার ধপাস ধপাস শব্দ বহুদূর পর্যন্ত শোনা যেত।
বিল ঘেঁষে এক দরদালানে একটা মধ্যবিত্ত পরিবার বাস করত। সেই পরিবারের দুরন্ত এক ছেলে প্রান্তরে ছুটে বেড়াত। বাসা থেকে দুপুরে একটা শব্দ শুনে সে দৌড়াত প্রান্তরের অন্য প্রান্তে। শব্দের উৎসের সন্ধানে যেতে দূরত্ব কমাতে সে কবরখানার ওপর দিয়ে যেত। সেখানে সে কয়েকবারই কবরের গর্তে পড়ে গিয়েছিল। 
একবার সে কাঠের তক্তা মনে করে কবরস্থানে এক অজগরের পিঠে পাড়া দিয়েছিল। অজগরটি কোনোকিছু বুঝার আগেই সে বিদুৎগতিতে ছুটে নেমে যায় নাবালে। ওই পাড়ে, বহু দূরে চলন্ত যান দেখে সে টং ঘর ও গাছপালার আড়ালে। যেন অনেকগুলো বাস একটার সাথে আরেকটা জোড়া লেগে ছুটে চলেছে।
একদিন চলন্ত যান দেখতে ছুটতে গিয়ে পড়ে যায় পানার ফাঁদে। ভেতরে অতি শীতল পানি। সে ডুবছিল। কোনো একটা কাঠামো, লম্বা-আবছা, তাকে টেনে তুলল। কী বা কে সে, তা আজও সে জানে না।
উত্তর দিকে সে যায় না। বাড়ি থেকে নিষেধ ছিল। তাছাড়া ভয়টাকে সে অতিক্রম করতে পারেনি। ওখানে জলার দানব বাস করে।
পুঁথি-বই বা ইশকুল, এসব বস্তিবাসীর মাথায় ছিল না। তার মাথাতেও ছিল না। তার ইশকুলে যাবার বয়স হয়নি। সে বস্তিবাসী আধ-ন্যাংটো ছেলেমেয়েদের অদ্ভুত খেলা দেখত। পিঁপড়ের গর্তের কাছে মুঠো দিয়ে আঘাত করতে করতে একটি মেয়ে বলছিল:
পিঁপড়ার মা লো, উইঠ্যা চা লো,
তর পোলারে বাঘে ধরছে,
উইঠ্যা চা লো।
মেয়েটির পরনে ছিল মোরগের মতো দেখতে কুঁচি করা মলিন হাফ প্যান্ট। শরীর উদোম। তার ফ্রক পরার কথা থাকলেও সে ছিল খালি গায়ে। বুকে তার কেবল বড়ইয়ের মতো স্তন জাগছিল।
খুব সকালে একটা টিনের ঘর থেকে সমবেত স্বরে কায়দা-আমপারা পড়ার শব্দ শোনা যেত। 
সে তার মায়ের কাছে খুব একটা ঘেঁষতে পারত না। মা ব্যস্ত থাকতেন নবজাতক নিয়ে। তার ছোট্ট একটা ভাই হয়েছিল।

***
বহুযুগ পর সেই বিশাল এলাকা এখন অন্যরকম। অতি আধুনিক স্থাপনা, পাঁচতারা হোটেল, মল, ডিপার্টমেন্ট স্টোর। সড়কে চলে আধুনিক গাড়ি, রাতে হাজারো বাতির নানা রঙের ঠমকে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। মানুষগুলোও আগের মতোই জাদুবাস্তবীয়; তবে অন্য আদলে।
মোড়ের এককোণে আইসক্রিমের তিনচাকার গাড়ি নিয়ে সে আইসক্রিম বিক্রি করে। মাঝেমধ্যে তার মন চলে যায় সেই জলার ধারে। প্রান্তরে। তার বাবা হার্ট অ্যাটাকে হুট করে মরে যান। তার লেখাপড়া হয়নি। অথচ লেখাপড়া না জানা অনেক লোক গাঁও-গেরাম থেকে এসে বহুতল বিলাসী বাড়ি বানিয়েছে, বিলাসী গাড়িতে চড়ে তারা।
সে আইসক্রিমের গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আন্দাজ করার চেষ্টা করে পাঁচতারা হোটেলটা প্রান্তরের ঠিক কোন্ জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছে। ধোপাদের সেই ঘাটটার কাছেই কি?
সে ভাবে, আচ্ছা সেই যুগটায় কি ফিরে যাওয়া যায় না? কেয়ামত তো সেই কবেই হবার কথা ছিল।  এত অনাচারের পরও এখনও তার আলামত দেখতে পাই না কেন?
প্রচন্ড রোদে দাঁড়িয়ে সে কপালের ঘাম মোছে।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/213044/</link>
				<pubDate>Mon, 22 Apr 2024 18:23:43 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>জলার দানব, রোজ কেয়ামত কিংবা জাদুবাস্তবতার গল্প<br />
-হাসান জাহিদ</p>
<p>সেইসময় জাদুবাস্তব নামের কোনো টার্ম আবিষ্কৃত হয়নি। কিন্তু জাদুবাস্তবতা উদ্বাস্তুর মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। ড. ব্রডির প্রতিবেদনের মতো বিজাতীয় অপরিহরণীয় সংবিত্তি ঘিরে রেখেছিল বস্তিবাসী ও নিম্নবিত্ত মানুষদের। কুসংস্কারাচ্ছন্ন সেইসব মানুষেরা শেয়াল, সাপখোপ ও জল&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-213044"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/213044/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>8</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">c5517f38930c54b0879108c139df86b1</guid>
				<title>ভালোবাসার রকমফের
-হাসান জাহিদ

লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে রেখা দেখল বারান্দায় শাহান বসে আছে। রেখা চলে যাচ্ছিল, ওকে থামিয়ে শাহান বলল, ‘এই যে রেখা একটা ব্যাপার আছে।’ রেখা কিছুটা কৌতুহল আর খানিকটা তাড়াহুড়োয় বলল, ‘তুমি আজ ক্লাস করলে না যে বড়?’
‘আজ আমার মন ভালো তাই।’
‘তাহলে তো ক্লাস করার কথা।’ রেখা বলল।
‘না, কথা না। আমরা ঘুরে বেড়াব আজ।’ 
‘আমরা মানে!’ রেখা অবাক চোখে তাকাল।
‘মানে-টানে আবার কী! তুমি আর আমি।’ শাহান দিল খোলা মুচকি হেসে বলল।
‘না বাবা। ওসব আমি-তুমির মধ্যে আমি নেই।’ রেখা চলে যেতে উদ্যত হলো।  
‘আরে দাঁড়াও না।’
লাইব্রেরির বিশাল বারান্দার কোণে বসে ছিল শাহান। সে এবার বারান্দায় বসে থেকেই দুই পা ছড়িয়ে দিল নিচে ঘাসের ওপর। তারপর বলল, ‘আমার আজ জন্মদিন।’ 
‘তাই নাকি! হ্যাপি বার্থডে।’ রেখা এবার বসল শাহানের পাশে।
‘যাক, সহজে পাওয়া গেল। জানো, রাত তিনটায় ছোটোবোন বাঁধনকে জাগিয়ে উইশ করতে বললাম। বেচারি কেঁদেকেটে সারা।’
‘রাত তিনটায় কেন? বারোটা এক মিনিটে...।’ রেখা পুরোটা শেষ করল না।
‘মনে পড়লে তো, তিনটায় মনে পড়ল।’ শাহান ক্লাউনের মতো মাথা নেড়ে, শব্দ করে হাসল। রেখা শাহানের এরকম হাসির কোনো কারণ খুঁজে না পেয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকাল রহস্যময় সহপাঠীর দিকে। সেদিকে তাকিয়ে শাহান বলল:
‘আমাদের বাসাটা একদম ভূতের মতো বেরসিক। মনে পড়ার মতো পরিবেশে আমি থাকি না,’ শাহান বলে চলল, ‘মা বলেন, আমি নাকি কুক্ষণে জন্মেছি। আর বাবা একেবারে খাঁটি জল্লাদ। তাঁর চোখ দেখলে বুক কাঁপে।’
 মুখে ওড়না চাপা দিয়ে হাসছে রেখা।  হাসতে হাসতে বলল, ‘বুঝা যাচ্ছে বাবা-মাকে খুব জ্বালাও। এসব জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতি ছেড়ে ক্লাসটাস একটু করো।’
‘আমাকে ভুলাতে চাচ্ছ, তাই না? বলছিলাম আমরা আজ ঘুরব।’ শাহান রেখার কাঁধে আলতো খোঁচা দেয়।

রেখার ভেতরে চনমনে ভাব জাগল। ঘাড় নিচু করে কী যেন ভাবল। তারপর মিনমিনিয়ে বলল, ‘ভাবছি এবিষয়ে আরো ভাবব আমি।’
‘লে হালুয়া। এতে ভাবাভাবির কী আছে?’ শাহান অবাক হয়ে তাকায় মাথা নিচু করে থাকা মেয়েটার দিকে।
রেখা উঠে দাঁড়ায়।
শাহানকে বিমূঢ় করে দিয়ে হনহনিয়ে চলে গেল রেখা। বাসায় চলে এলো সে সটান। বাসার সবাই খেতে বসেছে তখন। রেখা সেদিকে গেল না। শিখার সাথে জরুরি বৈঠক দরকার। প্রথম খাওয়া শেষ করল আরিফ। ছোটোখালার বড় ছেলে। এই বাড়িতে থাকে। অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে। আরিফ বলল, ‘ভগ্নি তোমাকে টেন্‌স মনে হইতেছে। এনিথিং রং?’
‘না।’
‘তবে সামথিং গ্র্যান্ড?’
‘না, তাও না।’
‘তাও না। মানুষ সাধারণত দুঃখ-আনন্দ দুই কারণেই উত্তেজিত হয়। দুটোর কোনোটি না তবে রহস্যটা কোথায়?’ 
রেখা তিতিবিরক্ত হয়ে বলল, ‘তুমি যাবে আরিফ ভাই? এবাড়িতে প্রাইভেসি বলে কিছু নেই। এক দঙ্গল লোক এসে বলবে-কী হলো, কেন হলো। যত্তোসব।’
 রেখার বাবা হাকিম সাহেব বারান্দায় ওৎ পেতে থাকেন বরাবর। তিনি চেঁচিয়ে বললেন‒‘প্রাইভেসি থাকবে না কেন? প্রাইভেসির তুই কী বুঝিস? সবসময় প্রাইভেসি/পার্সোনাল। কী সাংঘাতিক পার্সোনালিটি তোর হয়েছে, এ্যাঁ!’

***
শিখা ও রেখা দুইবোন ফিসফিসিয়ে কীসব আলোচনা করল। শিখা বলল, ‘বুঝতে পারছি না। তোকে না করি কীভাবে। প্রেম মনের ব্যাপার। মন চাইলে প্রেম হয়। সিদ্ধান্ত তোর হওয়া উচিত।’
‘প্রেম করে তুই তো ঠকেছিস আপা।’
‘হুম, ভুল করেছি। সম্ভবত একই ভুল দ্বিতীয়বার করতে যাচ্ছি।’
‘তুই কি আলম সাহেবকে নিয়ে ভাবছিস আপা? উনি খুব বড়লোক?’
‘খুব। গোটাতিনেক গার্মেন্টস। একটা ট্রাভেল এজেন্সি। দুইখানা আলিশান বাড়ি। প্রতি হপ্তায় ইয়োরোপ-অ্যামেরিকা যাচ্ছে।’
‘তবে এক কাজ কর্‌ আপা, আমার কাছে রেফার করে দে। আমিই ঝুলে পড়ি।’
‘ইয়ার্কি করছিস আমার সাথে!’

শিখার সামনে দাঁড়ানোটা আর যুক্তিসঙ্গত মনে করল না রেখা। শিখার আঁতে ঘা দিয়েছে সে এইমাত্র। 
বিরসমুখে বারান্দায় এলো রেখা। বাবা ডায়েরিতে কী যেন লিখছেন। রেখার হাসি পায়−শিম্পাঞ্জির ল্যাজ নেই কেন এবিষয়টি নিয়ে ক’দিন ধরে দুর্ভাবনায় আছেন বাবা।
‘পেছনে কী, এ্যাঁ! সামনে আয়।’ হাকিম সাহেব বাজখাঁই গলায় বললেন, ‘গোরিলাদের নিয়ে লিখছি আজ। শুনবি?’
‘আমার মাথা ধরেছে।’
‘তোর মাথা কখন ধরে না?’
‘সবসময় ধরে। ইদানিং এমন হচ্ছে।’ রেখা কাতর স্বরে বলল।
‘তাতে কোনো অসুবিধে নেই। মাথা ধরাটা উর্বর মস্তিষ্কের লক্ষণ। মাথা যাদের ধরে না, তাদের মাথায় শুধু গোবর।’

বসল রেখা। সেদিকে তাকিয়ে উদার একখানা হাসি দিলেন হাকিম সাহেব। তারপর হাঁক ছাড়লেন-‘শুনছো, আমাকে এককাপ চা দিয়ে যাও। রেখাটাকেও দিয়ো। সাথে একটা নাপা এক্সট্রা।’
‘তুমি যখন-তখন নাপা খাচ্ছ বাবা।’

তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে মধুর ভঙ্গিতে হাসলেন-‘আমার জন্য না। তোকে দিতে বললাম।’ খুক খুক করে কেশে রেখা বলল-‘না বাবা, মানে অল্প মাথাব্যথা।’ 
‘অল্প বলেই তো খেতে বলছি বেড়ে যাবার আগে।’ তিনি আবার হাসলেন।
‘তোমার গোরিলার গল্প বলো।’

দুইঘন্টা গল্প করলেন হাকিম সাহেব। তিনবার চা খেলেন। রেখা এককাপ চা আর একটা ট্যাবলেট খেল। গল্প শুনতে শুনতে সত্যিই মাথা ধরে গিয়েছিলো রেখার।
‘মাথা ব্যথা বাবা। আমি আরেকটা ট্যাবলেট নিয়ে আসি।’
‘তুই বড্ড ফাঁকিবাজ হয়েছিস। এখন আর ট্যাবলেট খেতে হবে না। বেশি পেইনকিলার খেলে শরীরের ক্ষতি হয়। চুপচাপ শুনে যা।’ 
রেখা সাংঘাতিক মাথাব্যাথা নিয়ে শুনতে লাগল গোরিলার গল্প। হাকিম সাহেব ডায়েরি থেকে পড়ে যাচ্ছেন‒‘বৃহত্তম বনমানুষ আফ্রিকার জায়ারের গোরিলা। তাহাদের ওজন ২৯২ কেজি হইতে ৩০০ কেজি। বৃহত্তম উটপাখির আবাসস্থল উত্তর আফ্রিকার আপার সেনেগাল, নাইজার, সুদান...।’

***
রেখাকে ভালো না লেগে উপায় নেই। অথৈ রেশমী কালো জলে ভেসে আছে যেন লাল পদ্ম। ভর বিকেলে শাহান বিছানায় শুয়ে রেখার কথা ভাবছে। কানের কাছে স্টেরিও সেটে লো ভল্যূমে বাজছে-‘ও আমার মন যমুনার অঙ্গে অঙ্গে ভাব তরঙ্গে কতোই খেলা, বধূ কি তীরে বসে মধুর হেসে দেখবে শুধু সারাবেলা।’

অন্যদিকে শাহানদের বাসায় নিভৃত কক্ষে বসে ভাবালুতায় ছেয়ে যায় নাদিয়ার মন। ওর বেডের কাছে সাইড ডেস্কে টেবিল ল্যাম্প‒তার নিচে ওর মা’র ছবি। নাদিয়া হওয়ার পর তোলা। মায়াবী। ঠোঁটের কোণে মন কেমন করা হাসি। মা’র অনেক কিছু নাদিয়ার মনে আছে। তবে মায়ের চলে যাবার মুহূর্তটুকু সে দেখেনি। শুধু আবছাভাবে মনে পড়ে: আতর-লোবানের গন্ধে মা সাদা কাপড় পরে শুয়ে ছিলেন দেখতে অন্যরকম একটা খাটে। সেটা যে মৃত্যু তা বোঝেনি ছোট্ট নাদিয়া।
এই কক্ষ আগে শাহানের ছিল। শাহানের বাবা-মা কক্ষটা সম্প্রতি নাদিয়াকে বরাদ্দ দিয়েছেন। লাগোয়া রুমটা ওঁদের হওয়ায় শাহানের হল্লায় অতিষ্ঠ হয়ে থাকতেন তাঁরা। আলফাজউদ্দিন খান আর মরিয়ম খান বিজনেস ও পার্টি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। একমাত্র ছেলে শাহান অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ছে আর ছোটো মেয়ে বাঁধন ইন্টারমিডিয়েট দেবে। 
নাদিয়া ইংরেজিতে অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি বাসার দেখাশোনার কাজ সে-ই চালিয়ে যায়। ছোটোবেলা থেকে এবাড়িতে আছে সে। নাদিয়ার ছয়বছর বয়সে ওর মা কোনো এক অজ্ঞাত রোগে মারা যান। ওর বাবা বিদেশিনী বিয়ে করে এখন লন্ডন না অ্যামস্টারডাম, নাকি টেক্সাস‒কোথায় যেন আছে। মেয়ের খোঁজখবর রাখে না। শাহানের বাবা-মা মেয়েটাকে এখানে এনে রেখেছেন। নাদিয়া উনাদের দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়।
নিজের কক্ষ মনের মতো করে সাজিয়েছে নাদিয়া। সব ঝকঝকে, তকতকে। ওর রুমে আছে একটা পড়ার ডেস্ক, মিনি ড্রেসিং টেবিল আর একটা সিঙ্গল বেড। দেয়ালে পেইন্টিং, মেঝেতে সেন্ট্রাল কার্পেট। লাইলাক মিস্ট-এর প্লাস্টিক পেইন্টে রুমের সর্বত্র রহস্যের লুকোচুরি। 

পড়ায় মন বসছে না তার। শাহান ভাই পুরোপুরি মজে গেছে। নাদিয়া স্বগত সংলাপে লিপ্ত হয়:
‘তুমি যাকে প্রেম ভাবছো, তা হলো মোহ। কারণ তোমার চোখের পাতায় আমি প্রেমের ছায়ার কম্পন দেখিনি। দেখছি ক্ষণিকের উন্মাদনা। কপটতার আবরণে ঢেকে গেছে তোমার সত্তা।
সেদিন বান্ধবীরা ঘিরে ধরল আমাকে। তারা বলল, তোর হাঁদা ভাইটা একটা ফচকে মেয়ের পাল্লায় পড়েছে। চিনিস না? সোসিওলোজির রেখা। রেখাকে নিয়ে বড্ড বেশি তড়পাচ্ছে তোর গাধামার্কা ভাই।’
নাদিয়া অস্থির হয়ে কক্ষজুড়ে পায়চারি  করে।
আমি তোমাকে সেদিন বললাম‒বড্ড হেঁয়ালি করছো। তুমি কি সত্যিই রেখাকে ভালোবাসো? রেখা কি তোমাকে ভালোবাসে? তুমি থমকে গিয়েছিলে শাহান ভাই। যার মানে দাঁড়ায়-তোমরা দু’জনই কেউ কাউকে জানো না, ভালোবাসা কাকে বলে তাও বোঝো না।

নাদিয়ার চোখ বেয়ে অশ্রু নামে‒মনে পড়ে শাহান ভাই, একদিন তুমি কেমন আনমনা হয়েছিলে? তুমি বলেছিলে‒আমার কিছু ভালো লাগে না নাদিয়া। 
জানো শাহান ভাই, আমার ভেতরটা সেদিন উথলে উঠেছিল। কী এক অব্যক্ত ভালোলাগায় এ পৃথিবীকে বড় মধুর লেগেছিল। আমি বলেছিলাম, চলো শাহান ভাই আমাদের প্রিয় রাস্তাটায় ঘুরে আসি। রাস্তার দু’ধারে সারি সারি রাধাচুড়া আর তাদের নিচে মে ফ্লাওয়ার গাছের বাগান। সন্ধ্যায় স্ট্রিটলাইট জ্বলে উঠলে পেভমেন্টের ওপর চিকরিকাটা আলপনা সৃষ্টি করে। সেই সুখকর রহস্যময় আলোছায়ায় দু’জন হাত ধরাধরি করে হেঁটেছিলাম। কোথাও থেকে ফুলের সুবাস বয়ে আনছিল এলোমেলো হাওয়া।
তোমার জন্মদিনে কাল একটা রঙিন প্যাকেট নিয়ে তোমার কাছে গিয়েছিলাম। তুমি বললে‒নাদিয়া এখন যাও, আমার মন ভালো নেই। এত অধঃপতন তোমার? তুমি শুধু হেয় করোনি আমাকে, অপমানও করেছো। 
কী যেন ভাবল সে। ডেস্কে বসল সে। নাদিয়ার অভিমানী হাত একটি ছত্র লিখে যায় নোটবুকে:
‘When lamps are pale in morning,
Heart quits heart and hand quits hand
Cold is that unlovely dawning,
Loveless, ray less, joyless you shall stand!’

আর লিখতে পারল না সে। কান্নার দমকে কেঁপে কেঁপে উঠছে তার শরীর। কাঁদছে নাদিয়া। বালিশ ভিজে গেছে। বারান্দায় এক টুকরো  বৈশাখী হাওয়া ঘুরপাক খেয়ে শ্যাওলাধরা পাঁচিলের কাছ থেকে হাসনোহানার সুবাস নিয়ে এলো। 
নাদিয়া কাঁদছে...।
হঠাৎ জানালার কাচে একটা ছায়া যেন নড়েচড়ে উঠল। নাদিয়া ভয়ে চিৎকার করতে গিয়েও থেমে গেল একটা কন্ঠ শুনে।
‘চুপ। চিৎকার করার দরকার নেই। আমি ভূত নই। মানুষ। তবে পুরোপুরি মানুষ নই। ভেতরে আসব নাদিয়া?’
‘এসো।’
‘কী বলবে, বলে তাড়াতাড়ি চলে যাও। কাল আমার পরীক্ষা।’
‘কাল তোমার পরীক্ষা তাহলে কাঁদছিলে কেন? তোমার তো পড়ার কথা।’
‘আমি কাঁদি আর হাসি, সে আমার একান্ত, তুমি এখন যাও।’
‘সত্যিই চলে যাব, একটু গল্প করব না।’ শাহান বিটকেলে হাসি দিল।
‘এমন বিচ্ছিরি হাসি তুমি দেবে না। আর একটু বলে যাও তুমি পুরোপুরি মানুষ নও কেন।’
‘এটা বলতে গেলে তো কাহিনি হয়ে যাবে। তোমার পরীক্ষার পড়া হবে না।’
‘না হোক, তবু বলে যাও তুমি অর্ধেক মানুষ কেন।’
‘কারণ, আমি অর্ধেক পশু।’
‘এসব কী বলছো শাহান ভাই?’ নাদিয়া বিস্মিত চোখে তাকাল।
‘ঠিকই বলছি। আব্বা-আম্মার আদর-স্নেহ কী, তা তুমি যেমন পাওনি; আমিও পাইনি। তারা থাকে পার্টি আর ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে। আমার মনে পড়ে না, তারা কোনোদিন আমাকে মানুষ হবার শিক্ষা দিয়েছে কিনা। তাদেরকে আমি কেন জ্বালাই জানো? তারা জীবনে টাকা আর সম্পদ ছাড়া কিছু বোঝেনি।’
শাহান নাদিয়ার বিছানায় আধশোয়া হয়ে বলল, ‘তোমাকে তারা লালন করেছে মানবতা থেকে নয়। বাধ্য-বাধকতা থেকে।
‘মানে, কী বলছো শাহান ভাই!’
‘হুম, ঠিকই বলছি, তোমার মা মারা যাবার আগে সমস্ত সম্পদ আর টাকা-পয়সা আমার বাবা-মা’র হাতে তুলে দিয়ে যান। বাবা-মা তখন গরিব ছিল। বাবা কেরানির চাকরি করতেন। তোমার মায়ের টাকা দিয়েই তারা আজ ধনী। ক্লাব-পার্টি করে বেড়ান।’
‘কিন্তু তারা তো আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন।’
‘আশ্রয় দিয়েছে। তবে আদর স্নেহ দেয়নি। তারা তোমাকে সময় দিয়েছে? স্নেহের স্বরে ডেকেছে? তাদেরকে তো তুমি মাসে একবার কি দু’বার দেখ। তারা তোমাকে দেখা দেয় না। বাসার সব কাজ তোমাকে দিয়ে করায়। আর আমাকে বলে কুলাঙ্গার।’
নাদিয়া মাথা নিচু করে সব শুনল।
তারপর সে মুখোমুখি হলো শাহানের দিকে। বলল, ‘একটা প্রশ্নের জবাব দেবে?’
‘বলো।’
‘তুমি কি রেখাকে খুব ভালোবাসো?’
‘বিছানায় আধশোয়া থেকে উঠে বসল শাহান বলল, ‘উপায় কী?’
‘নাদিয়া আহত কন্ঠে বলল, ‘তোমার কোনো &#x200d;উপায় নেই! রেখা জোর করে তোমার কাছ থেকে ভালোবাসা আদায় করে নিয়েছে?’
সামান্য হাসল শাহান। বলল, ‘এক কাপ চা হলে জমিয়ে বলতে পারতাম।’
নাদিয়া বিরস মুখে বলল ‘তুমি বোসো আমি বানিয়ে নিয়ে আসছি।’
নাদিয়া চলে গেলে নোটবুকটা ডেস্ক থেকে টেনে নেয় শাহান। লেখাটা পড়ে আপনমনে মাথা দোলায় শাহান, ‘আরে বাবা, এই মেয়ে দেখি আমার মতো অর্ধ মানুষ। অভিশাপ দিয়ে দিল!
নাদিয়া চা এনে দিলে তাতে চুমুক দিয়ে শাহান বলল, ‘ফার্স্ট ক্লাস হয়েছে। কিন্তু আমাকে অভিশাপ দিলে কেন?’
‘অভিশাপ! আমি দিয়েছি!’ নাদিয়া হা করে তাকাল।
‘ওই যে লিখেছ, Loveless, ray less, joyless you shall stand!’
‘ও, ওটা তো কবিতার ছত্র। আমার ইমোশন বলতে পারো। কারুর ঘাড়ে চাপাইনি।’
 ‘যাক, তবু ভালো।’
‘তুমি কিন্তু আমার প্রশ্নের জবাব দাওনি।’
‘রেখার বিষয়টা তো? না ভালোবেসে উপায় কী?’
‘একই কথা বারবার বলছো।’
‘হুম, বলছি। কেন বলছি জানো? শাহান ইতস্তত করে বলল, ‘আমি একদিন আড়ি পেতে শুনেছি। তোমার মামা এসেছিলেন। তোমার আমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। বাবা নাকচ করে দিয়ে বলল, ‘আমার ছেলেটা বাউন্ডুলে হলেও তোমার ভাগ্নীর মতো বাপ পরিচয়বিহীন মেয়ের সাথে তা বিয়ে হতে পারে না।’
মামা ভীষণ অপমানিত হলেন। টাকার জোর নেই বলে তিনি মাথা হেঁট করে চলে গেলেন। আমি পেছন থেকে ডাকলাম। তিনি এতটাই অপ্রস্তুত হয়েছিলেন যে, তার মাথা নিচু করে চলে যাওয়া ছাড়া গতি ছিল না।
‘এতোকিছু, কই আমি তো কিছু জানি না।’
‘তুমি জানবে কেন? তুমি নিখাদ সরল একটা মেয়ে। ঘোর-প্যাঁচ নেই। তবে একটু থাকার দরকার ছিল।’
‘থাক সেসব কথা। তুমি রেখাকে নিয়েই সুখি হও। আমার কিছু বলার নেই।’
‘আবারও রেখা। তুমি যে জন্মদিনে আমাকে একটা গিফট দিয়েছিলে, আমি প্যাকেট খুলেও দেখিনি, সেই গিফট টা কোথায়?’
‘কেন, আছে তো। আমার ডেস্কে। রেখা ছুটে গিয়ে ডেস্ক ঘেঁটে প্যাকেট না পেয়ে বিমূঢ়ের মতো তাকাল। শাহান বাঁ হাত নাচিয়ে নাচিয়ে বলল, ‘হেঁ হেঁ, ওটা আমার হাতে। কিন্তু এতো দামি ঘড়ি কিনতে গেলে কেন?’
‘তুমি আমার গিফটি নিয়েছ, কখন নিলে?’
‘সে তুমি বুঝবে না।’
‘রেখা যদি জানতে চায়, কে দিয়েছে. কী বলবে?’
‘যে দিয়েছে, তার কথা বলব।’
‘যদি কিছু মনে করে?’
‘তাতে আমার কী? ও কী মনে করল, সে নিয়ে আমার সময় নষ্ট করার মতো সময় নেই। তাছাড়া, তার সাথে আমার যোগাযোগ নেই।’
‘কেনো যোগাযোগ নেই?’
‘নেই, এটাই শেষ কথা। তার অনেক কদর্য দিক আছে। সে লোভী, আরেকটা ছেলের সাথে তার ভাব ভালোবাসা আছে। সেসব বাদ দাও নাদিয়া।’
‘বাদ দিব?’
‘হ্যাঁ’, শাহান হাই তুলে বলল, ‘কেলিনু শৈবাল দামে, ভুলি কমল কানন।’
‘হুম, মাইকেল মদুসূদনের কবিতা। এখানে তার কী সম্পর্ক?’
‘সম্পর্ক নেই?’ শাহান পাল্টা প্রশ্ন করল।
‘কী জানি, কী সম্পর্কের কথা তুমি বলছো।’
‘বলছি কি, তোমার ঘরে একটা সিগারেট খাওয়া যাবে?’
‘হুম। প্রথম এবং শেষ।’
শাহান সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘তোমার মতো রত্ন থাকতে আমি কেন পচা শামুকে পা কাটতে যাই।’
‘তুমি আমাকে কেমন ঘোরের মধ্যে ফেলে দিলে।’ কম্পিত স্বরে নাদিয়া বলল।
‘কীসের ঘোর! আমি তোমাকে বরং ঘোরের জগত থেকে বাস্তবে নিয়ে যাব। এই পঙ্কিল আবহে তুমি আমি থাকব না। আমরা অন্য কোথাও চলে যাব । তোমার আমার পরীক্ষা শেষ হোক। আমরা অন্য কোথাও চলে যাব।
‘সত্যি! সত্যি বলছো শাহান ভাই!!’
শাহান নাদিয়ার মাথায় হাত রেখে বলল, ‘সত্যি। এটা বাস্তব, কোনো প্রহেলিকা নয়। আমি চিরদিন তোমাকে আগলে রাখব। 
নাদিয়ে দৌড়ে এসে শাহানের বুকে মাথা-মুখ ঘষতে লাগল, বলতে লাগল, ‘আজ আমার নারীজীবন সার্থক।’ ‘আর আজ থেকে আমি অর্ধ মানুষ নই। পূর্ণ মানব। যেখানে আমার প্রিয়া আছে, সেখানে আমি অসম্পূর্ণ নই।’
‘তোমার স্পর্শে, তোমার জাদুকরি প্রভায় আজ আমিও পূর্ণ মানবী।’
‘তবে চলো আমাদের প্রিয় রাস্তাটায় ঘুরে আসি। কিন্তু তোমার পরীক্ষা?’
	‘ওটা কাল দিব না; টিচারকে বলে পরে দিব।’
	দুই মানব-মানবী পেভমেন্ট ধরে হাঁটতে থাকে। দূর থেকে তাদেরকে দেখে মনে হবে তোনো ইম্প্রেশনিষ্ট আর্টিস্টের আঁকা জাদুকরি ছবি যেন জলজ্যান্ত রূপ ধরে হাঁটছে।







-</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/199266/</link>
				<pubDate>Sun, 16 Apr 2023 13:45:29 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>ভালোবাসার রকমফের<br />
-হাসান জাহিদ</p>
<p>লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে রেখা দেখল বারান্দায় শাহান বসে আছে। রেখা চলে যাচ্ছিল, ওকে থামিয়ে শাহান বলল, ‘এই যে রেখা একটা ব্যাপার আছে।’ রেখা কিছুটা কৌতুহল আর খানিকটা তাড়াহুড়োয় বলল, ‘তুমি আজ ক্লাস করলে না যে বড়?’<br />
‘আজ আমার মন ভালো তাই।’<br />
‘তাহলে তো ক্লাস করার কথা।’ রেখা বলল।<br />
‘না, কথা না। আমরা ঘুরে বেড়াব আজ।’<br />
‘আমরা মানে!&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-199266"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/199266/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>0</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">4719a713a4cd0cef43e89eac40546a09</guid>
				<title>রাক্ষুসে নগরের গল্প
-হাসান জাহিদ

বহু বছর বাদে সফদের সাহেব দেশে আগমন করলেন। যে শহরটা স্বচ্ছ জলে প্রতিবিম্বের মতো প্রায় দুই দশক ধরে চৈতন্যে গেঁথে ছিল, সেই চেনাজানার মধ্যে যোগ হয়েছে অজানা অনেক কিছু। এই অজানার আতিশয্যে তাঁর মানসপটের তৈলচিত্রের ফ্রেম দুমড়ে-মুচড়ে গেল।
বিমানবন্দরে তাঁর বন্ধু আসবার কথা। বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করেও বন্ধু না আসায় তিনি ট্যাক্সি ডেকে রওনা হলেন প্রিয় বোর্ডিংয়ের উদ্দেশে। কামনা করলেন বোর্ডিংটা যেন খুঁজে পান।
ট্যাক্সিতে বসে তাঁর মনে হলো যেন জাদুরাজ্যের অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানার ভেতর দিয়ে চলেছেন। যা দেখছেন সত্যি নয়, এক ধরনের প্র্যাংক। যেসব রাস্তা তিনি পেরিয়ে এলেন, সেইসব রাস্তাঘাট তিনি চিনতে পারলেন না। দুয়েকটি স্থানে এসে তাঁর পরীক্ষা দিতে বসে জানা উত্তর মনে না আসার মতো অবস্থা হলো।
মনের সিল্যুয়েটে দুলতে লাগল রাস্তায় বাঁদরের নাচ, ক্যানভাসারদের অঙ্গভঙ্গি, রাতের বিবরে দেহপসারিণীদের আনাগোনা, নিম্নআয়ী মানুষের ঘর্মাক্ত মুখ, শ্যাওলাধরা পাঁচিলের পাশে উদোম গায়ে বসে পাখার বাতাস, উত্তেজনাকর ফুটবল ম্যাচ, প্রভৃতি।
বোর্ডিং খুঁজে পেলেও চেনা মানুষগুলোকে পেলেন না তিনি। সাখাওয়াত সাহেব মারা গেছেন তিন বছর আগে, এখন তাঁর ছেলে বোর্ডিং চালায়। পুরোনো কর্মচারিদের মধ্যে কেরামত মিয়া এখনও আছে। সে খাতির করে সফদের সাহেবকে বোর্ডিংএ ওঠাল।
চারদিকে প্রচুর শব্দ, হট্টগোল। অনেক বড়ো বড়ো অট্টালিকা। স্থানটাকে তাঁর কাছে চিড়িয়াখানার মতো লাগছে।
এইসময় বন্ধু ফোন করলেন সফদের সাহেবের রোমিং মোবাইলে। তিনি জানালেন, জ্যামে আটকা পড়ে আছেন। সফদের সাহেব বললেন ফিরে আসতে। বন্ধু জানালেন, তিনি এমনভাবে আটকা পড়েছেন যে, তাঁকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে তার পর আবার ফিরে আসতে হবে। ফ্লাইওভারে তাঁর সিএনজি ভুল পথে গেছে।
হতাশায় ফোন রাখলেন সফদের সাহেব।
সাধু খাবার নিয়ে এল। চর্বিসমৃদ্ধ কালো রঙের গোরুর গোশত ও তেলতেলে পোলাও। সফদের সাহেব বললেন যে, পোলাও খাবেন না তিনি। করলা, মাছ ও শুঁটকির তরকারি থাকলে নিয়ে আসতে বললেন। সাধু জানাল, ভাতের সাথে আলুভাজি ও ডাল আছে।
‘নিয়ে আয়।’
ভাত ও বন্ধু একসাথে ঢুকল। সফদের সাহেব সাধুকে আরো এক প্লেট ভাত আনতে বললেন। ভাত খেতে খেতে জ্যামের গল্প করলেন বন্ধু আছির শিকদার। আছির সাহেবের ঘর্মাক্ত মুখমণ্ডল দেখে ও জড়ানো বাক্য শুনে সফদের সাহেব বললেন, ‘তোমার জীবনীশক্তি ক্ষয়ে গেছে।’
‘হ্যাঁ, ভেজাল খেয়ে, জ্যামে পড়ে, দূষণের শিকার হয়ে জীবন আর জীবন নেই।’
‘গ্রামের দিকে চলে যাও। শহরটা কেমন যেন বিলোম ঠেকছে।’
‘গ্রামে যাব কী হে, সেখানেও তো দূষণ। আমার গ্রামের বাড়ির পেছনে ইটের ভাঁটা গড়ে ওঠেছে। গিয়েছিলাম গ্রামে, টিঁকতে পারিনি।’
খাওয়া থামিয়ে তাকালেন সফদের সাহেব। বন্ধু নতমুখে খেয়ে চললেন। নতমুখেই তিনি বললেন, ‘জ্যামে-ভেজালে-দূষণে মানুষের মন খিটখিটে হয়ে গেছে।’
দুজনের আলাপ তেমন জমল না। আছির সাহেব কাল ফের আসবেন জানিয়ে রাত বারোটায় বিদেয় নিলেন।
ক্লান্ত সফদের সাহেব একটা বিচ্ছিরি অনুভূতি নিয়ে বিচ্ছিন্ন ভাবনায় ডুবে শেষ পর্যন্ত ঘুমে তলিয়ে গেলেন। সকালে ঘুম ভাঙল উদ্দীপনায়। বোধহয় ঘুমের মধ্যে তাঁর অবচেতন মন দিনটির একটা রূপরেখা তৈরি করে রেখেছিল।
সাধু নাশতা নিয়ে এল। কম তেলে ভাজা পরোটা ও ফুলকপি ভাজি। জুত করে খেতে বসলেন সফদের সাহেব। মনে মনে নিজেকে সাধুবাদ জানালেন--বড়ো কোনো হোটেলে উঠলে এই খাবার তিনি পেতেন না। সেইসাথে তাঁর ছাত্রজীবনের স্মৃতি রোমন্থন করার মওকা পেতেন না।
***
তিনি ছেলেবেলায় এই শহরে এসেছিলেন। বাবা ধোপার কাজ করতেন। পরে নিজেই ধোপার ব্যবসা ধরেন, যাকে ভদ্র ভাষায় লন্ড্রি বলে। লন্ড্রি স্থাপন করে সুনামের সাথে ব্যবসা চালিয়ে যান তিনি।
বাবা গত হওয়ার পর লন্ড্রির হাল ধরেননি সফদের, লন্ড্রির কাজটাকে ছোটোমানের কোনো কাজ মনে করতেন তিনি। সফদের সাহেব লেখাপড়ায় মন দিলেন। ভগ্নিপতি কুদ্দুস লন্ড্রিটাকে আপন করে নিয়ে সফদের সাহেব বা তাঁর মাকে লাভের কিছুই দিতেন না। সফদের সাহেবের নসিব ভালো ছিল। তাঁর বাবা দুই কাঠা জমি কিনে একটা সেমিপাকা বাড়ি বানিয়েছিলেন। সেই বাড়িতে সফদের সাহেব প্রৌঢ়া মাকে নিয়ে থাকতেন। তিনি ততদিনে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে একটা কন্স্ট্রাকশন কোম্পানিতে চাকরি জুটিয়ে নিয়ে মা-ছেলের সংসার চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
তিনি লন্ড্রি নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা করতে পারেন ভেবে ভগ্নিপতি কুদ্দুস তাঁর স্ত্রী সফদের সাহেবের বড়ো বোন ও তাঁর ছেলেমেয়েদেরকে সফদের সাহেবের বাড়িতে আগমন বা কোনোরূপ যোগাযোগ নিষিদ্ধ করে দেন।
সফদের সাহেবের সরলমনা মাতা ব্যথিত হয়েছিলেন, আর সফদের সাহেব হয়েছিলেন যুগপৎ উপহত ও বিস্মিত। তাঁর জন্য আরো বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। ভগ্নিপতি কুদ্দুস লন্ড্রির রোজগারের টাকায় ঠাটবাট দেখাতে নিজ গ্রামে বেড়াতে গিয়েছিল। রাতে ভু্রিভোজনের পর সে সিগারেট ধরিয়ে বাড়ির পেছনে শুকনো নালার ধারে বসে আপনমনে গান গাইছিল। এইসময় বজ্রপাত হয়। আক্ষরিক অর্থে বিনা মেঘে বজ্রপাত। মারা যায় কুদ্দুস। পরিবারের সদস্যরা শহিদের মর্যাদায় তাঁর লাশ দাফন করে, যেহেতু বজ্রপাতে হত হওয়াটা শহিদের শামিল।
কুদ্দুসের মৃত্যুর পর সফদের সাহেবের বুবু ছেলে-সহ বাপের বাড়িতে চলে আসেন শ্বশুরবাড়ির লোকদের অত্যাচারে। লন্ড্রি উচ্ছন্নে গেল--কে লন্ড্রি দখল করবে, এরকম কোনো সিদ্ধান্তে কেউ পৌঁছাতে না পেরে। সফদের সাহেব ততদিনে বিয়ে করেছেন, একটি ছেলে হলো। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন বিদেশে চলে যাবেন। মাকে দেখার জন্য বড়ো বোনকে অনুরোধ করলেন, বোনের ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেন।
সফদের সাহেবের বউ সেতারা বিএ পাস, আকর্ষণীয়া ও বুদ্ধিমতী, আর তেমনি ছিলেন মায়াবতী। বিদেশ যাত্রার ব্যাপারে তাঁর উৎসাহের কোনো কমতি ছিল না। সব আয়োজন যখন পাকাপোক্ত, বিদেশ যাত্রা চূড়ান্ত—সেই সময় সেতারা ধরাধাম ত্যাগ করলেন। দরিদ্র ঘরে জন্ম নেয়া সেতারা বেগম একটা রোগ পুষছিলেন। সেই রোগ বহুবছর যাবত বহন করে তিনি স্বামীকে এই বিষয়ে কিছু জানাননি। লিভার সিরোসিস ঘাতক হয়ে হানা দেয় অবশেষে।
বিদেশ যাত্রা বন্ধ করেননি সফদের। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে তিনি দূরদেশে পাড়ি দিলেন। স্ত্রীর খুব শখ ছিল ছেলেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেন। সেই শখ সফদের সাহেব পূরণ করবেন...।
সফদের সাহেব হাঁক ছাড়লেন, ‘সাধু।’
একটা কিশোর ছেলে সামনে এসে দাঁড়ালে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোর নাম সাধু হলো কেন? তুই কি সাধু বংশের সন্তান?’
বিটকেলে হাসি দিল সাধু।
‘হাসছিস কেন?’
‘হাসি আইল তাই হাসলাম। আমি বদ বংশের সন্তান। আমার জর্ম হওয়ার পর আমি যেন বাপের মতো পিচাশ না হই সেইজন্য আমার মা আমার নাম দিল সাধু। আমার বাপ ছিল খাড়া শয়তান। মারে অত্যাচার করত। গাঞ্জা খাইত। আর আমার নানার বাড়ি গিয়া খালি টাকা চাইত।’
‘ও আচ্ছা। কথা সুন্দর করে বলবি। মানুষজন পছন্দ করবে তোকে। শব্দটা জর্ম না, জন্ম। আর পিচাশ না, পিশাচ।’
‘জি।’ সাধু ইতস্তত করে।
‘আর কিছু বলবি?’
‘জি, কইতে চাইছিলাম যে, আমিও গাঞ্জা ধরছিলাম; অহন ছাড়ান দিছি। কাজ লইছি এই বডিংয়ে।’
‘হুমম। ভালো কাজ করেছিস। গাঁজাটাজা খাবি না তো আবার?’
‘না, আমি অহন ভালো আছি। আপনে কোন্ দেশে থাহেন? সৌদি?’
‘না, অন্য একটি দেশে। আচ্ছা সাধু, শিকদার এখনও আসছে না কেন?’
‘বোধহয় জামে পড়ছে।’
‘এটা তো জ্যামে পড়ার বিষয় না। দিন গড়িয়ে গেল। আমার মনে হয় সে অসুস্থ। কাল মাথা ধরেছে বলেছিল।’
‘মোবাইলে ফোন দেন।’
‘দিয়েছিলাম, ধরছে না।’
সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলেও এলেন না শিকদার সাহেব। অনেকটা অভিমান ভরেই সফদের বেরিয়ে পড়লেন বাইরে। বোর্ডিং থেকে পশ্চিমের সোজা রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকেন তিনি। তারপর লোকে লোকারণ্য যে স্থানে এসে থামলেন তিনি, সেই স্থানটা তিনি চিনতে পারলেন। এককালে এই স্থানে তিনি অনেক বিচরণ করেছেন। শীতের সময় সস্তা দামে শীতবস্ত্র কিনেছেন। জুতা পলিশ করিয়েছিলেন। গুলিস্তান সিনেমা হলে সিনেমা দেখেছেন ব্ল্যাকে টিকেট কেটে।
...ফুটপাত দখল করে বসা আজব ও চাকচিক্যময় পণ্যসামগ্রীর দিকে তাকিয়ে থাকেন সফদের। রাস্তার একপাশে টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখা হয়েছে অজস্র ইলেক্ট্রনিক সামগ্রী। এক জোড়া ছোটো কালো স্পিকারের দিকে চোখ আটকে গেল--তিনি লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকালেন। এত সুন্দর স্পিকার এই শহরের রাস্তায় মেলে, এমনটি কখনও কল্পনা করেননি।
দরদাম করে স্পিকার দুটি কিনলেন তিনি। ল্যাপটপে লাগিয়ে পছন্দের গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যাবেন। তিনি বিক্রেতা ছেলেটাকে বললেন স্পিকার মোবাইলে লাগিয়ে টেস্ট করে দিতে। ছেলেটি একটা চওড়া মোবাইলে লাগিয়ে সাউন্ড টেস্ট করে দিল, একটা ব্যাগে ভরে দিল ছোট্ট দুটি যন্ত্র।
কেন যেন আনন্দে ভরে উঠল মনটা। তিনি ব্যাগ হাতে ঝুলিয়ে উল্টো পথে বোর্ডিংয়ের দিকে চললেন। এইসময় পেছন থেকে একটা কন্ঠ শুনতে পেলেন সফদের।
‘দাঁড়ান, স্যার।’
তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। সেই বিক্রেতা ছেলেটা এসে বলল, ‘আমার মোবাইল, স্যার। কিছু মনে করবেন না।’
কথাটা বলে তরুণ ছেলেটি সফদের সাহেবের ব্যাগ দেখল। তারপর হাহাকার করে বলল, ‘আমার মোবাইল নাই। ওইটা তো পাইতেছি না। ‘স্যার কিছু মনে করবেন না’ বলে ছেলেটি সফদের সাহেবের প্যান্ট-শার্টের পকেট হাতড়াতে শুরু করল। তিনি অসহায় ভঙ্গিতে তাঁর শরীরের যত্রতত্র হাত রাখতে দিলেন ছেলেটিকে। ছেলেটি তার গোপনাঙ্গও হাতড়াল।
‘হায়, হায়। কই গেল মোবাইল।’
বলে ছেলেটি আক্ষেপ করতে লাগল। সফদের সাহেব বললেন, ‘আমার পায়ের জুতা খুলব? মোজার ফাঁকে তো লুকিয়ে রাখতে পারি।’
‘সরি, স্যার। জুতা খুলতে হবে না।’
ছেলেটির চোখেমুখে সন্দেহের ছায়া মিলিয়ে গেলেও সেখানে ফুটে উঠল হতাশা।
কথা না বাড়িয়ে সফদের সাহেব ফের হাঁটা ধরলেন। বোর্ডিংয়ে ফিরে এসে দেখলেন বসে আছেন আছির শিকদার। সফদের সাহেব খুশি মনেই বললেন, ‘এই তোমার আসার সময় হলো? মোবাইল ধরো না। ব্যাপারটা কী?’
‘সেটটা হঠাৎ নষ্ট হয়ে গেছে। ঠিক করতে দিতে গিয়েছিলাম, তাই দেরি হলো।’
সাধু রাতের খাবার নিয়ে এল। মেনু পছন্দ হলো সফদের সাহেবের। বার বার ঠেলে আসছিল সন্ধ্যের অপাঙ্কতেয় ঘটনাটা। তিনি পাবদা মাছের তরকারি-করলাভাজি-ডালে মিশে গিয়ে ভুলে গেলেন বিচ্ছিরি ঘটনাটা।
খেতে খেতে আছির শিকদার বললেন, ‘নিজের বাড়িতেও তো যাও নাই মনে হচ্ছে।’
‘বাড়ি কি আর আমার নিজের আছে? দখল হয়ে গেছে।’
‘কী বলছো! বাড়িটা তো তোমার। দখল হবে কেন?’
‘বাড়িটাতে আছে কুদ্দুস মিয়ার জ্ঞাতিগোষ্ঠী। আমি বিদেশে চলে যাবার পর পরই বুবু আমাকে সব জানায়। তারপর বুবুও মারা গেল শোকে-দুঃখে। বুবুর কচি ছেলেটাকে তারা ঘর থেকে বের করেই দেয়। সে পথে পথে ঘুরে একসময় মদ-গাঁজা ধরে। পরের বার এসে ছেলেটাকে পাইনি। সে নানা কুকীর্তি করে বেড়ায় বলে শুনেছিলাম। কিন্তু তার সন্ধান আমি পাইনি।’
‘তুমি বলছো, তোমার বাড়ি আর তোমার নাই?’
‘তা বলছি না। দলিলপত্র তো সব আমার কাছে। তারা ভোগদখলে আছে।’
‘তাহলে উদ্ধার করো। দেখি আমি তোমাকে সহযোগিতা করতে পারি কিনা।’
‘এই যাত্রায় তা আর করছি না।’
‘হুমম,’ মাথা নাড়লেন শিকদার সাহেব। কৌটা থেকে পান বের করে মুখে পুরে বললেন, ‘কতদিন থাকবে?’
‘আমার বউ আর ছেলে একমাস মাত্র অনুমোদন করেছে।’
‘তোমার কি আর সন্তানাদি হয়নি?’
‘না, আমার বউ সন্তান ধারণ করতে পারেনি। তবু আমি সুখী। কেন জানো? সে সেতারার মতোই মমতাময়ী ও কেয়ারিং। আমার ছেলেটাকে সে নিজের করে নিয়েছে। ছেলেও তার মাকে পছন্দ করে। এদিক থেকে ভাগ্যবান আমি।’
সফদের সাহেব পরদিন গেলেন কবরস্থানে। তিনি বিদেশে পাড়ি দেবার আগে একটি বছর প্রতি জুম্মাবারে নিয়মিত কবরস্থানে যেতেন। কবর পরিচর্যার জন্য কবরস্থানের এক কর্মচারিকে নিয়মিত টাকা দিতেন।
তাঁর চোখে সুস্পষ্টভাবে ভেসে ওঠে সেতারার কবর। একটা জবা গাছ, তাতে বুলবুলি পাখির লাফালাফি। সরুপথ থেকে বাঁ-দিকে একটা মাজারের মতো ঘরের পাশের সারিতে সেতারার কবর।
...স্থানটিতে এসে বিচলিত হলেন সফদের সাহেব। তিনি চিনতে পারলেন না সেতারার কবর। অসহায় ভঙ্গিতে তাকালেন। অনেকগুলো জবা গাছ। সবগুলো কবর দেখতে একইরকম। নামফলকবিহীন কবরগুলোর একটি হবে, কিন্তু কোনটি তা তিনি চিনতে পারলেন না।
‘ভাবি সাহেবার কবর খুঁজে পেতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই,’ আছির শিকদার বললেন, ‘দোয়াখায়েরই মূল কথা। এসো, এখানে কোনো এক স্থানে দাঁড়িয়ে মুনাজাত করি।’
...কবরস্থান থেকে সফদের সাহেব বেরিয়ে এলেন ভারাক্রান্ত মনে।
এই চিরচেনা শহরটায় একটি পরিচিত মুখ দেখতে পেলেন না সফদের সাহেব। একমাত্র শিকদার সাহেব ছাড়া আর কোনো বন্ধুর খোঁজ বা দেখা পেলেন না। তাঁর এক কলিগের সন্ধান দিলেন বন্ধু।
‘তোমার এক কলিগ ছিল না, নাম শাহ আলম?’
‘শাহ আলম? ছিল। সে কোথায়? কেমন আছে?’
‘সে আমাদের মহল্লায় থাকত চাকরিতে জবাব পাবার পর। তোমার সেই কন্স্ট্রাকশন কোম্পানি তার চাকরি নট করে দেয়। এখন সে পাগলাগারদে। মাথা খারাপ হয়ে গেছে। সারা জীবন অভাব-অনটনে কাটিয়ে শেষ বয়সে মস্তিষ্ক সেই ধকল আর সইতে পারেনি।’
স্তব্ধ হয়ে গেলেন সফদের সাহেব। একটা বিচিত্র ক্লেদাক্ত ঢেউ খেলে যায় বুকের ভেতর।
***
দুজন পার্কে বসে ছিলেন। কোথাও গিয়ে স্বস্তি পাচ্ছিলেন না সফদের সাহেব। শেষে শিকদার একদিন বন্ধুকে পার্কে নিয়ে আসেন। অযুত কালো মাথার ভিড় ও চিৎকার-শব্দের বাইরে সবুজ ঘাস ও গাছ তাঁকে স্বস্তি দিল।
তারপর যে কদিন সফদের সাহেব ছিলেন এই শহরে, বন্ধুকে সাথে নিয়ে এসে বসতেন পার্কের গাছতলায়।
দীর্ঘ এক দশক পর তিনি এই দেশে এসেছেন। এক দশকের অর্ধেক তাঁর কেটেছে স্বপ্নে, অর্ধেক বাস্তবে। স্বপ্ন দেখতেন তিনি বাংলাদেশে এসে একটা বাংলোবাড়ি বানিয়ে সেখানে বসে চা খেতে খেতে পাখির গান শুনছেন। আর বাস্তবে চলে যেতেন মন্ট্রিয়াল নামের অতি আধুনিক শহরে তীব্র তুষারপাতের মধ্যে একটা চেইন স্টোরের ভেতরে দাঁড়িয়ে স্টোর সাফসুতরোয় ব্যস্ত হয়ে গিয়ে। তবু একটুকরো প্রশান্তি ছিল তাঁর। ছেলেকে মনের মতো করে গড়ে তুলতে পারছিলেন। ছেলেটিও হয়েছে সেতারার মতো, মায়ের মতো চোখ। শান্ত, ধীরস্থির ও পড়াশোনায় ভালো। সবচেয়ে বড় কথা, সে বাপের কষ্টটা বুঝতে পারত।
ছেলে এখন সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে পার্ক-ক্যানেডায় ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড প্ল্যানিং স্পেশালিস্ট হিসেবে চাকরি করছে। সে বিএমডব্লিউ গাড়ি চালায়। ব্লেনভিল এলাকায় যেখানে সফদের সাহেব আছেন নিজের কেনা হাউসে, কাছাকাছি স্থানে ছেলে জারিফ একটা অ্যাপার্টমেন্ট বুকিং দিয়েছে। এই বিষয়টিতে তিনি পরম সুখী, স্ত্রীর ব্যাপারেও তিনি তৃপ্ত। কেবল একটি বিষয়ে মন তাঁর খুঁতখুঁত করে উঠল...।
...লাগেজ চেক করিয়ে ইমিগ্রেশনে ঢোকার আগে সফদের সাহেব রেলিংয়ের ওপাশে অপেক্ষমান বন্ধুর কাছে এলেন। টলমল করছিল শিকদার সাহেবের চোখ। তিনি বললেন, ‘সফদের, মরার আগে আরেক বার বুঝি দেখা হবে না।’
‘এসব কথা না বললেই কি নয়,’ ভাঙা গলায় কোনোক্রমে কথাটা বলে সফদের সাহেব পকেট হাতড়ে পার্স বের করে সেখান থেকে কিছু ডলার বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘ভালো কোনো কাজে লাগিয়ো টাকাটা। দুই হাজার ডলার।’
‘এত টাকা!’ বলে শিকদার সাহেব মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাত বাড়িয়ে দিলেন।
‘আর এখানে দুই হাজার ডলার। সাধুর জন্য।’
‘সাধুর জন্য!’
‘হ্যাঁ, সে আমার ভাগ্নে, মানে বুবুর ছেলে। আমি বিদেশে পাড়ি দেবার সময় খুবই ছোটো ছিল সে।’
রুদ্ধকন্ঠে বললেন সফদের সাহেব, ‘হতভাগাটাকে ওই দেশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। একেবারেই অখাদ্য।’
সফদের সাহেব চোখ মুছতে মুছতে ইমিগ্রেশনের দিকে চললেন। সেদিকে দুই হাত বাড়িয়ে আগাতে গিয়ে শিকদার সাহেব ধাক্কা খেলেন স্টেইনলেস স্টিলের রেলিংয়ে।
…ইমিগ্রেশন অফিসার নিরাসক্ত ভঙ্গিতে ক্যানেডিয়ান পাসপোর্ট দেখলেন। তারপর সেটা সফদের সাহেবের কাছে ফেরত দিলেন তেমনি ভঙ্গিতে।
প্লেনে তাঁর নির্ধারিত আইল সিটে বসে আরেকবার চোখ মুছলেন সফদের সাহেব। প্লেন অনেকক্ষণ দৌড়ে তারপর উড়াল দিল। পাকস্থলির আশেপাশে একধরনের শূন্যতা অনুভব করেন তিনি। সফদের সাহেব চোখ বুজে ডুবে গেলেন এক সুখকর ভাবনায়। দুইটি চেনা ও আপন মুখ দেখবেন তিনি। একটি তাঁর সন্তানের, অন্যটি স্ত্রীর মুখ।
এই দুইটি মুখ ছাপিয়ে তাঁর চেতনায় ছায়া ফেলে অস্পষ্ট আরেকটি মুখ।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/198004/</link>
				<pubDate>Fri, 31 Mar 2023 14:28:32 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>রাক্ষুসে নগরের গল্প<br />
-হাসান জাহিদ</p>
<p>বহু বছর বাদে সফদের সাহেব দেশে আগমন করলেন। যে শহরটা স্বচ্ছ জলে প্রতিবিম্বের মতো প্রায় দুই দশক ধরে চৈতন্যে গেঁথে ছিল, সেই চেনাজানার মধ্যে যোগ হয়েছে অজানা অনেক কিছু। এই অজানার আতিশয্যে তাঁর মানসপটের তৈলচিত্রের ফ্রেম দুমড়ে-মুচড়ে গেল।<br />
বিমানবন্দরে তাঁর বন্ধু আসবার কথা। বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করেও বন্ধু না আসায় তিনি&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-198004"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/198004/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>6</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">7640adb95fd7e021f6ff35f042312975</guid>
				<title>স্টাইরেক্স অ্যাভেনিউর শয়তান
-হাসান জাহিদ
১
রাত খুব বেশি হয়নি, তবে অতি ঠান্ডার কারণে নির্জন হয়ে গেছে স্টাইরেক্স অ্যাভেনিউর চওড়া রাস্তাটা। দুইপাশের  বে অ্যন্ড গ্যাবল ধাঁচের বাড়িগুলো ভৌতিক অবয়বে দাঁড়িয়ে আছে। টরোন্টোর পুরোনো অংশের অন্যতম এলাকা এটি। বাড়িগুলোর মন্দিরের মতো চোখা চূড়া ছাড়িয়ে ওক, সুগার ম্যাপল ও আরো অজানা অনেক গাছ পল্লব হারিয়ে কেবলই দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। এই দীর্ঘশ্বাস বড় ভয়ঙ্কর‒বিষাক্ত সর্পের ছোবলের  মতো।  
গাছের  মাথার ওপর দীর্ঘশ্বাসের  শব্দে মনে  হয় মাতাল ঝড় বইছে। কিন্তু কোথাও কোনো ঝড় নেই; এরা একজাতের  অশরীরী বাতাস, যারা রাতে শ্বশ্মানবাসীদের মতো ঘুরে বেড়ায়, মানুষ-জীবজন্তুর হাড়মজ্জায় ঠান্ডা প্রবীষ্ট করানো এদের এক মজার খেলা।
স্টাইরেক্স  অ্যাভেনিউর  সাইডওয়াক ধরে  উত্তরমুখো হাঁটছিল আরিফ। পেটানো শরীর তার, বয়স আনুমানিক উনচল্লিশ এবং অকৃতদার। ভয়ডর বলে ভেতরে কিচ্ছু নেই। মধ্যপ্রাচ্যে কয়েকবছর লেবারগিরি করে তার শরীরটা জুতসই হয়ে গেছে। অল্পবয়স থেকেই দেশ-ছাড়া। রাজনীতি করত, কয়েকবার পুলিসকে পিটিয়েছে, তারপর বাগে পেয়ে  পুলিস ওকে পিটিয়েছে। শেষে লাল দালানে কাটাতে হলো অনেকদিন। তারপর একদিন বের হয়ে নিজকে গুছিয়ে সে সোজা  চলে  যায় মধ্যপ্রাচ্যে। সেখানে  গিয়ে সে লেবারদের পক্ষ নিয়ে অন্যায়ের  প্রতিবাদ করত।
মধ্যপ্রাচ্যে অনেকবছর থাকলেও সেই জীবনটাকে সে মেনে নিতে পারেনি কোনোদিন। এরকম রসকষহীন  জীবন, মানে লেবারদের  জন্য এমন নিরানন্দময় জীবন আর কিছুই হতে পারে না। কন্সট্রাকশন সাইটের  মালিকেরা অফিসে বসে হম্বিতম্বি  করে, আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে। আর অবশ্যই সাইটের কাঁচামালের যোগান পেতে এবং সস্তা লেবারের চুক্তি করতে বেছে নেয় বাংলাদেশের মতো দেশ। দেশীয় দালালরা  এদের পদলেহন করে আর  ‘কাঁচামাল’ যুগিয়ে যায়। 
এইরকম  বিষয়গুলো  আরিফের  মনোযাতনার  কারণ ছিল। সেজন্য সে সঙ্গোপনে, মনের গহিনে যুক্তরাষ্ট্র বা ক্যানেডায় পাড়ি দেবার ছক করছিল। তার ভেতরের এই খবরটি কেউ জানত না, সেটা ফলাও করে  জানানোর মতোও কিছু ছিল না। মনের একটা সুপ্ত ইচ্ছা বৈ নয়। 
একবার  চটে গেল আরিফ। মালিক বিদেশ সফরে যাচ্ছে, সাইটের ম্যানেজার লেবার সর্দার আরিফকে ডেকে বিশেষ নির্দেশ দিল। লোকটা খোশমেজাজে ছিল, সেটা বুঝে আরিফ মজুরি বৃদ্ধির বিনীত আবেদন জানাল। আরিফ নিজে এবং তার সঙ্গীরা দৃঢ়প্রত্যয়ী ছিল এবার তাদের মজুরি বাড়বে। কিন্তু ব্যাটা ওদের  সবার প্রত্যাশায় গুড়ে বালি দিল। সে জানাল, সে মালিকের  নির্দেশ ওদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে, শ্রমিকের বেতন বাড়ল না কমল, সে নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। আরিফ ভগ্ন হৃদয়ে তার অধীনস্থ সঙ্গীদের‒বাংলাদেশিই অধিকাংশ, একজন পাকিস্তানি ও বাকি কয়েকজন  ভিনদেশির  উদ্দেশ্যে  বলল, ‘শুয়োরের পয়দা (মালিক) দালালদের ওপর সব দায়িত্ব দিয়ে মুম্বাই-কলকাতা-ঢাকা  গিয়ে ‘কাঁচামাল’ যুগাবে। ফুর্তি করবে, আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে।’   
কিছুদিন মুখ  বুজে পড়ে  থাকল আরিফ। তারপর  একদিন ভিনদেশে পাড়ি দেবার কাগজপত্র চলে আসে। আরিফ বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে পাড়ি দিল সম্পূর্ণ নতুন-অচেনা এক বরফের দেশে।   
...ধীরগতিতে এগুচ্ছিল আরিফ। এরকম খোলামেলা অ্যাভেনিউতে একাকী হাঁটতে যে কোনো সাহসী ব্যক্তির বুক কেঁপে উঠবে। আরিফের বুকটাও কাঁপছিল, যতটা না অস্বস্তিতে, তারচেয়েও ভাইরাস জ্বরের কারণে। তিনদিন ধরে সে জ্বরে ভুগছে। একটা করে টাইলেনল খায়, জ্বরটা কমে, ফের দেখা দেয়। এভাবে সে  প্রতিদিন তিনটা  টাইলেনল  খাচ্ছে। ভাগ্য, সে এখন কর্মস্থলে  যাচ্ছে না। সে কোম্পানি কর্তৃক ‘লেইড-অফ’ ঘোষিত  হয়ে  অন্যরকম  জীবন বেছে নিল, যা তার নীতিবিরুদ্ধ ও অপছন্দের। কিন্তু এইরকম জীবনকেই  সে বেছে নিয়েছে পরিবর্তনের ছোঁয়া পেতে। শুয়ে শুয়ে ল্যাপটপে মুভি দেখতে, ফেসবুকে চ্যাট করতে কিংবা ভাইবারের মাধ্যমে দেশে স্বজনদের সাথে, জেদ্দায় তার পুরোনো লেবার বন্ধুদের সাথে কথা বলতে  ভালোই  লাগে। কোম্পানি  লে-অফ ঘোষণার সাথে সাথে আরিফ ফটাফট এম্প্লোয়মেন্ট ইন্স্যুরেন্সের জন্য আবেদন করে দিল। সেটা পেতে বেশি সময় লাগল না। এখন সে বিনা শ্রমে, ঘরে বসে আর বগল বাজিয়ে মাসকাবার এগারোশ’ ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে...।
আরিফের  হাতের প্লাস্টিকের  ব্যাগের ভেতরে তান্দুরি নান ও চিকেন ঝাল কারি। বাতাসের ঝটকায় সেই সুগন্ধ এসে নাকে  লাগছে। তার হাতে বাদুরের মতো  ঝুলন্ত কালো প্লাস্টিকের ব্যাগটা যৎসামান্য উত্তাপ ছড়াচ্ছে। সেটা  চলার ছন্দে  মাঝেমধ্যে বাম হাঁটুর নিম্নাংশে উত্তাপের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে।       
পথটুকু যেন আর শেষ হতে চায় না। বোধহয় বৃষ্টিও নামবে, আকাশটা মৃত মানুষের চোখের মতো ঘোলাটে। এখন বৃষ্টি হলে সমস্যায় পড়বে সে। স্নো-ফলের সময় মাথায় হুডি তুলে দিলে স্নো সাধারণত মাথার  চুল অবধি প্রবেশ করে না। বেশি বৃষ্টি হলে করে; বিশেষ করে যদি ওয়াটারপ্রুফ জ্যাকেট বা রেইনকোট  না পরা থাকে। আরিফ কয়েক পরতের কাপড় জড়িয়ে বের  হয়েছিল বটে, তবে  তার  জ্যাকেটের  হুডি নেই, মাথায় শুধু কটনের  কানটুপি  জড়ানো। সে তার চুরাশি নম্বর  স্টাইরেক্স অ্যাভেনিউর বেইজমেন্টের বাসার  দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এক বাঙালি ভদ্রলোক এর মালিক, তিনি বর্তমানে বাংলাদেশে আছেন। তাঁর  স্ত্রীর  হাতে মাসে পাঁচশ’ ডলার বাড়িভাড়া তুলে দেয় আরিফ। 
বাসায় পৌঁছুনোর জন্য রাস্তাটা আজকে অন্যদিনের চাইতে বেশি দূর মনে হচ্ছে। আরিফ এখন  আর এগুতে পারছে না। তার শরীরে কাঁপুনি উঠেছে‒কম্পিত শরীরের জন্য সে আগাতে পারছে না; জ্বরটা  আবার এসেছে। নিজকে গালমন্দ করে সে, কী দরকার  ছিল এতটা পথ হেঁটে এসে চিকেন আর তান্দুরি কেনার?     
এখন জ্বরের ঘোরে রাস্তায় পড়ে থাকলে এই খাবার কে খাবে, এখানে তো বাংলাদেশের মতো অসংখ্য নেড়িকুত্তা নেই যে, গন্ধ পেয়ে দৌড়ে এসে খাবার খাওয়া শুরু করবে‒এমনকি জ্বরাক্রান্ত লোকটার দিকেও লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাবে! আরিফ দাঁড়িয়ে পড়ল, কিন্তু হি হি করে কাঁপে সে, হাত পা তার কথা শুনছে না। 
এইসময় সে খবিশটাকে দেখতে পেল। আগাগোড়া  কালো পোশাকে মোড়া  লম্বা আর পৈশাচিক আদলের এক  জলজ্যান্ত  শয়তান  তার দিকে এগিয়ে  আসছে। আরিফের  মনে হলো তার চেতনা লোপ পাচ্ছে। কিন্তু চেতনা লোপ পাওয়ার মতো তো তার জ্বর ওঠেনি এই পর্যন্ত! তার শরীর কাঁপছে কারণ সে জ্বর গায়ে তান্দুরি নান ও চিকেন  ঝাল কারির লোভে  ঘরের উষ্ণ  আরামদায়ক  বিছানা ছেড়ে মাইনাস এগারো তাপমাত্রায় রাতে বাইরে বেরিয়েছে।
তার চেতনা লোপ পায়নি; সে ঠিকই দেখছে জলজ্যান্ত একটা শয়তান এগিয়ে আসছে তার দিকে। এই শয়তানটা  কি ওর ব্যাগের  তান্দুরি  নান ও চিকেন  ঝাল কারি চাইবে? বাংলাদেশের গ্রামে তো এমন আকছার  ঘটেছে। কেউ  হয়তো ইলিশ নিয়ে রাতের অন্ধকারে ঘরে ফিরছে, ব্যস তালগাছ থেকে শয়তান নেমে এসে  ইলিশ মাছ চাইল। আর এটা তো একেবারে রেডিমেড‒গরম গরম তান্দুরি আর মুরগির ঝাল-ঝাল  তরকারি। না চেয়ে পারেই না। আরিফ মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, চাইলে দিয়ে দেবে কারণ সব জায়গায় বাহাদুরি ফলাতে হয় না। আর এখানে সে কী বাহাদুরি দেখাচ্ছে, সেটা দেখার জন্য বাংলাদেশের শহরের রাস্তায় ক্যানভাসারকে  ঘিরে  মানুষের কৌতূহলী চোখের  মতো  হাজারো চোখ তার দিকে তাকিয়ে নেই। 
তাই সে টানটান না হয়ে রিল্যাক্সড ভঙ্গিতে কাঁপতে লাগল, মানে তাকে কাঁপাতে জ্বরের যেন বেগ পেতে না হয়, সেই ব্যবস্থা করে দিল। 
শয়তানটা  কাছিয়ে আসতেই আরিফ দেখল এটা একটা মোটকা শয়তান। একইসাথে চওড়া এবং লম্বা। পরনে কালো ট্রাউজার আর কালো স্পোর্টস জ্যাকেট, হাতে গ্লাভস নেই, কানে কানটুপি নেই। শয়তানটা  আরো এগিয়ে এসে, তিলসর্বস্ব  লাল থ্যাবড়া  মুখ ও কুতকুতে চোখে চেয়ে একেবারে  বাংলাদেশের  ভাষায়  বলল, ‘খাবারটা দে আমাকে, আখেরে ফল দেবে।’
আরিফ তোতলিয়ে বলল, ‘কী!  মা-মানে!’ আরিফের মুখ দিয়ে মাতৃভাষা বেরিয়ে এলো। 
‘ও তুই হলি ইংরেজি না জানা ইমিগ্র্যান্ট। ফ্রেঞ্চ জানিস?’  
‘না।’  
‘তোর মাদার-টাং তো আমার জানা নেই, নাইলে সেই ভাষাতেই বলতাম, ‘আই’ম হাংরি, সো অ্যাম অ্যাংরি। খাবারটা না দিলে নটঘট হয়ে যাবে।’ 
আরিফ ধন্ধে পড়ে যায়; সে তো স্পষ্ট শুনল, প্রথম বাক্যটা ‘লোক’টা ইংরেজিতে বলেনি, বলেছে অন্য ভাষায়। ইস্ট ইয়োরোপের কোনো ভাষা, কিংবা ককেশিয় অঞ্চলের ভাষাও হতে পারে কিন্তু শুনতে লেগেছে বাংলাদেশি ভেক ধরা শেকল-জড়ানো ফকিরদের মতো, এমনকি ভঙ্গিটিও সেরকমই ছিল।  
ভাবনাটা বেশিক্ষণ মাথায় রইল না। কেলেঙ্কারির ভয়ে সে প্যাকেটটা দিয়ে দিল, আর বলল, ‘আমি ইংরেজি  জানি।’  
‘একেবারে  উদ্ধার  করে ফেলেছিস!  এবার  যা বাড়িতে। খাবারটা হস্তান্তর করে সুবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছিস  যাহোক। নইলে কী হতো  বলা  যায় না। নে, হ্যান্ডশেক কর, এই খাবারের সুবাদে তোর সাথে বন্ধুত্ব হয়ে গেল।’ 
আরিফের  হাতে কাপড়ের গ্লাভস ছিল, পকেট থেকে ডান হাতটা বের করতেই গ্লাভস ভেদ করে ঠান্ডা ঢুকল। শয়তান বিশাল লালচে উন্মুক্ত থাবা দিয়ে  আচ্ছামতো ওর হাত ঝাঁকিয়ে দিল। আরিফ মনে মনে কামনা করল, শয়তান যেন অনেকক্ষণ ধরে ওর হাত ঝাঁকাতে থাকে। ওর মনে হলো গরম কাপড় দিয়ে কে যেন তার হাতটাকে সেঁক দিচ্ছে। 
একসময় হাত ছেড়ে দেয় শয়তান। বলল, ‘অ্যাডিয়ো।’  
আরিফ মন্ত্রমুগ্ধের মতো বলল, ‘বাই।’   
শয়তান ওর পাশ কাটিয়ে সাইডওয়াক ধরে মুহূর্তেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। ঘোরের মধ্যে বিড়বিড় করে  উঠল  আরিফ, ‘খোদ টরোন্টো  শহরে শয়তান!’ তারপর ভাবল, ‘নয় কেন। টরোন্টো উন্নত দেশের উন্নত  শহর বলে শয়তান থাকবে না‒এমন যুক্তি কি কেউ খাড়া করাতে পারবে?’  
সে এসবই ভেবে চলল, মানে একদিকে সে চলাটা  ঠিক  রাখল,  অন্যদিকে মনের  ভাবনাটা চালিয়ে যেতে লাগল। কারণ তার গতি শ্লথ হয়ে গিয়েছিল। আগের চেয়েও সে কম  কদম ফেলতে পারছে , আর তার কম্পন আরো বেড়ে গেছে। এই কম্পনের  মধ্যেই  সে দেখল  কালো  বিড়ালটাকে। অলস ভঙ্গিতে রাস্তা পার হচ্ছে। মোটা, আয়েশী বিড়াল। তারপরেই সে দেখল র‌্যাকুনটাকে। সাইডওয়াকের  পাশে একটা বাড়ির কাঠের বেড়ার বাউন্ডারির ফোকর দিয়ে বেরিয়ে এসে আরিফের মুখোমুখি হলো। অযাচিত দেখা। র‌্যাকুনটা ফুলে উঠল, আরিফের কাঁপুনিটাকে সে  সন্দেহের চোখে দেখছে। আরিফ  কাঁপতে  কাঁপতেই সাইডওয়াক ছেড়ে রাস্তায়  নামল; যদিও জানে কোনো  বদমায়েশ  ড্রাইভার পেছন থেকে ওকে ধাক্কা দিয়ে দফারফা করে দিতে  পারে। দিক, তবু র‌্যাকুনের  কামড় ও আঁচড়ের  চাইতে সেটা  ভালো। ওর পশ্চাদপসরণে র‌্যাকুনটা  থমকে  দাঁড়িয়ে ওর দিকে চেয়ে  বিজয়ের  হাসি দিল ঠিক আফ্রিকার হায়েনার মতো শব্দ করে। তারপর গদাইলস্করী চালে একটা ঝোপের ভেতরে ঢুকে গেল। 
আরিফ আবার সাইডওয়াকে উঠে এলো। ভাবনাটা পেয়ে বসল তাকে, ‘টরোন্টোর সদর রাস্তায় শয়তান!’ পরক্ষণেই  মনে  হলো, ‘উন্নত দেশের একটি বৃহৎ প্রদেশের  বৃহত্তম রাজধানি বলে সেখানে শয়তান থাকবে না, এ কেমনতরো  কথা। আরে টরোন্টো হলো অজস্র ইমিগ্র্যান্টসদের শহর। সেখানে তো বহু শয়তান  ইমিগ্র্যান্টস  হয়ে  আসতেই পারে। হয়তো  বাংলাদেশের  খানদানি  শয়তানেরা মানুষের শয়তানি  বুদ্ধির  কাছে পরাস্ত  হয়ে সুড়সুড়  করে চলে এসেছে টরোন্টোতে। হয়তো সুন্দরবনের অনেক গেছো শয়তানদের ছেলেপুলে ট্রলার লিকের কারণে তেলজমা পানিতে  ডুবে মরেছে। তাদের কেউ কেউ হয়তো পাড়ি জমিয়েছে এইদেশে। কিছু তালিবান  শয়তানও  আসতে পারে, নওয়াজ  শরীফ কর্তৃক ফাঁসির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবার ঘোষণায়।   
এরা তো হলো, যাকে বলে ইমিগ্র্যান্ট শয়তান। টরোন্টোর নিজস্ব ব্র্যান্ডের কিছু ভূত-পেত্নি বা প্রেতযোনি আছে, যারা নিজেদের কামনা বাসনা চরিতার্থ করতে অনেক ইমিগ্র্যান্ট-ইচ্ছুক শয়তানদের স্পন্সর করছে।
পুরোনো বে সাবওয়ে স্টেশনের  কথাই ধরা যাক  না। সেখানে রাতবিরাতে  রক্ত-রাঙা পোশাক পরা তরুণীকে ঘুরতে দেখা যায়।   
শুধু কি তাই? খোদ টরোন্টোর  শতবর্ষ পুরোনো লেজিসলেটিভ  বিল্ডিংয়ে এখনও প্রেতাত্মা চড়ে বেড়ায়। অনেক টরোন্টোবাসী রওনা দেবার সময় কালো বিড়ালের মুখোমুখি হলে নাকি দিনটা মাটি হয়ে যাবে বলে মনে করে। তাহলে বাংলাদেশের লোকেরা যে রওনা দেবার সময় হোঁচট খেলে বা সামনে ঝাঁটা পড়লে তাদের দিন মাটি হয়ে যায় বলে বিশ্বাস করে‒তাতে উন্নত দেশ ‘কুসংস্কারাচ্ছন্ন’ বলে নাক সিঁটকায় কেন?  
এদের কালো বিড়াল দেখা বা লালপোশাকের তরুণী দেখা‒এসবকে কী বলা যায়? মিথ, আরবান লেজেন্ড  নাকি স্রেফ  ফ্যাশন?  মাথা  ঝাড়া  দিয়ে উঠল আরিফ; ত্রস্ততায় খেয়াল করল, শয়তানটা চলে যাবার পর সে খুব কমই অগ্রসর হয়েছে বাড়ির পথে। সেই র‌্যাকুনটা একটা কারণ। কিন্তু মোড়ের তান্দুরি হাউসের  পর পেভমেন্ট  ধরে হেঁটে উঁচু গাছপালার  ক্যানোপি-ছাওয়া স্টাইরেক্স অ্যাভিনিউর সাইডওয়াক ধরে শেষ মাথায় পৌঁছে সামান্য ডানে ঘুরে বাসায় পৌঁছুতে তো দশ-বারো মিনিটের বেশি লাগার কথা না! হয়তো  শয়তানটার  কারসাজি  এসব। পৃথিবীতে শয়তান আলবৎ আছে। একটু আগে ওর ক্ষেত্রে যা ঘটে গেল, সেটা ওস্তাদ  শয়তানদেরও হার মানায়। আরিফ লক্ষ্য করল, এখন শরীরের কাঁপুনিটা আর নেই। সে একটা সিগারেট ধরাল। কিছুটা যেন উষ্ণতা অনুভব করল।  
একসময় বাসায় ঢুকল আরিফ, যতটা নিঃশব্দে সম্ভব। ভাবিকে সে বিরক্ত করতে বা ঘুম থেকে জাগাতে চায় না। আরিফ সাবধানী ভঙ্গিতে ঢুকল। তবুও  ভাবি কেমন করে জানি টের পেয়ে গেলেন।  
কাঠের সিঁড়িতে  ঠকঠক  শব্দ  হলো। ভাবি নামছেন। আরিফ কান খাড়া করে থাকে। ভাবি নামতে নামতে বললেন, ‘জ্বর শরীরে বাইরে বেরুনোর কী প্রয়োজন পড়ল?’ 
আরিফ  ব্ল্যাংকেট  মুড়ে ততক্ষণে শুয়ে পড়ার ভান করল। ভাবি কাছে এসে বললেন, ‘একটু স্যুপ এনেছি। এটুকু খেয়ে একটা অ্যাডভিল খেয়ে তারপর ঘুমিয়ে পড়ো।’  
যে  মহিলা ওর জন্য  হাতে  করে স্যুপ বানিয়ে  নিয়ে  আসতে পারেন, তা-ও আবার বাড়িওয়ালী, সেখানে কি মুখ গুঁজে পড়ে থাকা যায়? আরিফ বিছানায় উঠে বসল। ওর মাথার কাছে একটা চেয়ার টেনে ভাবি তাতে স্যুপ রাখলেন।
‘আপনি কেন এতসব করতে গেলেন।’ 
‘এতসব আবার কী? সামান্য স্যুপ।’ ভাবি বললেন। 
‘ভাত-তরকারি খেয়ে পেটে চাড়া পড়ে গেছিল, তাই একটু তান্দুরি আর চিকেন ঝাল কারি কিনে ফিরছিলাম। কিন্তু পথে...মানে নির্জন রাস্তায় শয়তান এসে কেড়ে নিল তান্দুরি আর চিকেন।’
‘নাউজুবিল্লাহ।’ আপাদমস্তক কালো পোশাকের ভেতরে ভাবির শরীর আর হিজাবে ঢাকা ফর্সা মুখটা কেমন ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠল, ‘এসব কী বলছো?’ 
‘ঠিকই বলছি ভাবি।’ আরিফ সম্পূর্ণ ঘটনাটা এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল।  
‘মনে হয় জ্বরের ঘোরে তুমি উল্টোসিধে দেখেছ।’ 
‘তাহলে আমার খাবার গেল কোথায়?’ 
‘হয়তো রাস্তায় ফেলে দিয়েছ।’
‘ভাবি ওইটা শয়তানই, আমি নিশ্চিত।’  
‘ঠিক আছে, শয়তানই... আউযু বিল্লাহি মিনাশ  শায়তানির  রাজীম...।  তুমি এবার ঘুমোও। কাল সকালে তোমার নাশতা নিয়ে আসব, তুমি যেন উঠে কষ্ট করে নাশতা বানাতে যেয়ো না।’
‘আচ্ছা।’ 
‘আসি, অনেক  কাজ পরে আছে। তোমার ভাই ভাইবার খুলে বসে থাকতে  বলেছে, কী নাকি জরুরি কথা বলবে। রাতে আমার সামান্য বরাদ্দ খাবারটা এখনও ওভেনে চাপাইনি। আরো অনেক কাজ আছে। তাহাজ্জতের নামাজ আদায় করে একবারে ঘুমোতে যাব।  
‘আচ্ছা, ভাবি।’    
ভাবির নির্গমন আরিফের মনে একাকীত্বের ঢেউ তুলল। ভাবি আরো কিছুক্ষণ থাকলে সে যে পুলকিত হতো, তা নয়। জ্বর শরীরে কোনো কিছু করার থাকে না বলে নানা বাসনা জাগে মনে। তাই, মনে মনে সে চাচ্ছিল ভাবি আরো কিছুক্ষণ থাকুন।
ভাবি যেমন খুব ফর্সা, ভাই ঠিক তেমনটি  কালো।  আরিফ যেদিন প্রথম বাড়িভাড়াটা তুলে দেয়, সেদিন দেখল একটা সাদা  শাল-এর আড়াল থেকে একটা হনুমানের  হাত বেড়িয়ে এসে অর্থটা গ্রহণ করল। আর  সে দেখে  আসছে  ভাবিকে,  অতি ফর্সা দুইহাতের  কব্জি পর্যন্ত উন্মুক্ত অংশ ও দুইচোখ, ভুরু ও কপালের সামান্য অংশ।
ভাবির  চুল  কালো  না সাদা, সেটা আরিফ আন্দাজ করতে পারছে না। সাদা হবার সম্ভাবনাই বেশি, কারণ ভাবি তার বয়স না বললেও আরিফ  হিসেব করে দেখেছে, নিদেন উনসত্তর। 
পরিচয়ের  শুরুতে  ভাবি বলেছিলেন, তার  বড় মেয়ের জন্ম  উনিশ শ’ সাতষট্টি সালে। তার বিয়ে হয়েছিল একুশ বছর বয়সে। তাদের বিয়ের একবছর পরেই জন্মায় প্রথম সন্তান। ভাই ছিলেন তার চেয়েও সাতবছরের   বড়!  মানে, ভাইয়ের  বয়স এখন ছিয়াত্তর!  অনেক তেজি বুড়ো, এখনও স্ত্রীর সাথে কথা বলার জন্য ল্যাপটপে ভাইবার উন্মুক্ত করে বসে থাকেন!  
...জ্বর ছাড়ার পরের তিনটি দিন আরিফ মনে মনে শয়তানটাকে খুঁজল স্টাইরেক্স অ্যাভেনিউ ও আশেপাশের এলাকায়, কিন্তু  শয়তানের  টিকিটিরও  নাগাল পেল না। আসল শয়তান বলে কথা, সত্যিকারের শয়তান কি আর দিনেদুপুরে প্রকাশ্যে, জনসমক্ষে খামোখা ঘুরে বেড়াবে।
এদিকে, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে নতুন এক বিপদ ডেকে আনল আরিফ। অনেক লাইক/ডিসলাইক ও কমেন্ট পড়ল। কমেন্টগুলো আপত্তিকর: 
একজন বলল, ‘হালায় গাঞ্জা সেবন কইরা পোস্ট দিছে।’
আরেকটি কমেন্ট, ‘এইসব আবর্জনা উন্নত দেশে গিয়া আমাগো ভাবমূর্তি নষ্ট করে।’
অ্যানোনিমাস বলল, ‘সত্যি হতেও তো পারে।’ 
কেউ একজন উত্তর দিল, ‘আমরা কেমতে বুঝমু মিয়া, ছবি কই!’ 
অ্যানোনিমাসের হয়ে একজন বলল, ‘প্রকৃত শয়তানকে ছবিতে বন্দি করা যায় না।’  
কেউ একজন আবার উত্তর দিল, ‘রঙ্গমঞ্চে দেহি আরেকজন আবদুল্লা আইল, ফর ইয়োর ইনফরমেশন, মিয়া ভাই। আধুনিক জমানার মানে, উন্নত দেশের শয়তানদের ছবি এবং ভিডিও, সব ধারন করা যায়।’ 
অ্যানোনিমাস‒‘আরিফ ভাইয়ের কাছে ক্যামেরা বা সেলফোন ছিল না।’ 
কেউ একজন বলল, ‘বুদাই কন, আরিফ ভাই না। রামবুদাই। আমরা তো বাথরুমেও মোবাইল নিয়া হান্দাই। আর উনি, উন্নত দেশে গিয়া মোবাইল ছাড়া রাস্তায় বারাইছে।’ 
সম্পূর্ণ নতুন একজন বলল, র‌্যাকুন কী জিনিস?’ 
‘আরেক জ্ঞানপাপী  যোগ দিছে,’ কেউ একজন বলল, ‘মিয়া, মূল বিষয় থেইকা পিছলাইয়া সাইডে গেছেন গিয়া। শয়তানের প্রসঙ্গটাই চলুক।’
অ্যানোনিমাস জানাল, র‌্যাকুন বিড়ালগোত্রের নিশাচর প্রাণী...।’
বিজলি আক্তার (নায়িকা বিজলি): ‘বেরাদরগণ, আপনারা যদি একটু চোপা সামলাইয়া কথা কইতেন তাইলে আমি আমার মতামত দিতে পারতাম...।’ 
সম্পূর্ণ নতুন একজন বলল, ‘শিয়োর, শিয়োর।’   
...ইত্যাদি, ইত্যাদি। আরিফ ভাবল, ওর উচিত ছিল একটা শয়তানের ছবি ডাউনলোড করে, সেটা ফটোশপে ঝালাই করে স্ট্যাটাসে জুড়ে দিলে শালাদের মুখ এত খুলত না। এখনকার মানুষজন আসলটা চেনে না; নকলটা মেরে দিলে সেটা নিয়ে মেতে থাকে। সত্যিটা প্রমাণের জন্য নকল একটা কিছু বসিয়ে দেয়া সুবিবেচনার কাজ হতো। ভুল হয়ে গেছে।
২
সামার এসে গেল। সামারে ওর কামরাটা সুন্দর দৃশ্য ধারণ করে; ঘরের ভেতর রোদ খেলে যায়। বেইজমেন্ট হলেও ঘরটায় আলো-বাতাসের প্রচুর ব্যবস্থা রয়েছে। আর বাসাটা নিরিবিলি ও ছিমছাম।   
ধীরগতিতে, এলোমেলো কাটতে লাগল চাকরিবিহীন জীবন। আরিফ ভাবছিল দূরে কোথাও, মানে মন্ট্রিয়্যাল  বা ভ্যাঙ্কুভারে ঘুরে আসবে কিনা। সে চাকরি করছে না, কিন্তু বেতন পাচ্ছে। বেতন পাচ্ছে, কিন্তু তার জন্য কোনো শ্রম দিতে হচ্ছে না।  
ক’দিন পরই আরিফ টের পেল বাসায় বসে বসে বিনাশ্রমে বেতন প্রাপ্তির  স্বাদ, মানে কত ধানে কত চাল। বাংলাদেশ থেকে বাড়িওয়ালা ভাই ফিরে এসেছেন। তিনি ফিরে আসার আগে আরিফের উচিত ছিল মন্ট্রিয়্যালে পাড়ি দেয়া। তিনি যে একটা চলন্ত ‘বিশ্বকোষ’, এটা জানা ছিল না আরিফের। তার সাথে গতবছর যখন প্রথমবার কথা হয়, তখন অনেকরাত ছিল, প্রচন্ড শীত ছিল। তিনি আগাগোড়া কাপড় মুড়ি দিয়ে কোনোক্রমে  হাত  বাড়িয়ে  বাড়িভাড়ার  ডলারগুলো  নিয়েছিলেন। আরিফ বাসায় ওঠার কয়েকদিন পরই তিনি বাংলাদেশে রওনা দিলেন। যাওয়ার আগে আরিফকে তিনি বাড়িভাড়াটা  তার স্ত্রীর হাতে দেয়ার জন্য বলে গেলেন।
আসার পরদিন থেকে  তিনি সামনের বাগানে, ব্যাকইয়ার্ডে‒যখন যেখানে সুযোগ পাচ্ছেন, আরিফকে পাকড়াও করে জ্ঞান ঢালছেন। হাফপ্যান্ট পরে, স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে, বেঁটে-কালো গোলগাল আর বড়বড় চোখের লোকটা গলায় চশমা ঝুলিয়ে মুখে ফেনা ঝরিয়ে লেকচার ঝাড়ছেন তো ঝাড়ছেনই:
‘অ্যাবওরিজিনদের প্রায় পঁয়ষট্টি শতাংশই হচ্ছে ফার্স্ট ন্যাশনস, তিরিশ শতাংশ মেটিস, আর চার শতাংশ হলো ইন্যুয়িট...।’  
দুইদিন ভাবি এসে ওকে ছাড়িয়ে নিয়ে অ্যাস্কর্ট করে বাইরে এনে ছেড়ে দিলেন, আর আরিফ ‘আউযু বিল্লাহি  মিনাশ  শায়তানির রাজীম,’ পড়তে পড়তে দ্রুত নিষ্ক্রান্ত  হয়েছিল। তারপর থেকে ভাবির শলাপরামর্শে নতুন  স্ট্র্যাটেজি নিল আরিফ, বুড়ো যে যে সময়টায় ওকে খুঁজতে আসেন সেসময়টায় আরিফ বাসায় অনুপস্থিত থাকতে লাগল। 
তারপরও বুড়ো কেমন করে জানি টের পেয়ে যান। বলেন, ‘অ্যাকেডিয়ান  কারা  ছিল, জানো তো...জানো না? মন্ট্রিয়্যালে এত ফ্রেঞ্চ স্পিকিং পিপল কেন‒এই প্রশ্ন করলে আগেরটার উত্তর বেরিয়ে আসবে...।’
আরিফ ঘনঘন  অনুপস্থিত থাকতে লাগল বাসায়। এই অনুপস্থিতি ভালোই হলো একদিকে--ভাবল আরিফ, এখানে আসার সাথে সাথে চাকরিতে যোগ দেয়ায় এলাকাটাকে চেনা হয়ে ওঠেনি। 
এখন ঘুরে ঘুরে সে দেখছে। মাঝেমধ্যে সে চলে যাচ্ছে টরোন্টোর বাঙালিপাড়ায়, সেখানে বাংলাদেশি রেস্তরাঁয় বসে পুরি-চপ খেতে খেতে দুইচারজন বন্ধুবান্ধবও যুগিয়ে ফেলল। টরোন্টোতে পা দিয়ে খুব দ্রুত যারা চাকরি পেয়েছে, আরিফ তাদের একজন। মধ্যপ্রাচ্যে তার বিপুল  অভিজ্ঞতা, ফর্কলিফটিংয়ে দক্ষতা, এসব কারণে তার চাকরি হতে সময় লাগেনি। 
...এভাবে  কালো বুড়োর  সাথে লুকোচুরি খেলার পালায় একদিন সাদা শয়তানের দেখা মিলে গেল। শয়তানটা  গ্রীষ্মের  কড়া  দুপুরে একটা কোট গায়ে দিয়ে মার্লি স্ট্রিটের মাথায় ল্যাম্পপোস্টে হেলান দিয়ে বসে ভিক্ষে  করছিল। কোনো পথচারী দেখলেই হ্যাটটা বাড়িয়ে দিচ্ছে হ্যাটের খোঁড়লে পয়সা ফেলার জন্য। আরিফ কাছে এসে  লক্ষ্য করে দেখল, এটা সেইরাতের সেই  শয়তানটা  ছাড়া  আর কেউ নয়। সেই থ্যাবড়া আর লালচে-ফর্সা মুখ। তবে ঘাপটি মেরে বসে থাকার কারণে অতটা লম্বা তাকে লাগছে না। এই লোকটা যে সেইরাতের  শয়তানই, আরিফের কোনো  সন্দেহ  রইল না। তার চিবুকের সেই গোল চওড়া তিলের ওপর জমা স্বেদবিন্দু  গ্রীষ্মের রোদে  চকচক করছে; সেইরাতে আরিফ বোধহয় লোকটার চোখের দিকে তাকানোর চাইতে এই তিলটাই বেশি দেখছিল।
আরিফ সোৎসাহে লোকটার একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল, এ যখন সত্যিই শয়তান  নয়, তখন সেইরাতে তাকে খাবার দেয়ার জন্য নিশ্চয়ই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। আরিফ বলল, ‘হ্যালো।’   
লোকটা একথায় নির্বিকার চোখে তাকাল। সাথে সাথে টনক নড়ল আরিফের, লোকটা ওকে চিনতে পারেনি! সেইরাতে আরিফের মাথা ও মুখমন্ডলের প্রায় সম্পূর্ণটাই ঢাকা ছিল টুপিতে।
আরিফ  পয়সা দিচ্ছে না  অথচ  অন্যান্য পথচারীর  দৃষ্টি আগলে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে লোকটার চোখেমুখে অধৈর্য ও বিরক্তি ফুটে উঠল। আরিফ চটজলদি মানে মানে কেটে পড়ল। এসে দাঁড়াল হটডগ স্ট্যান্ডে। একটা  বিফ হটডগের অর্ডার দিল হটডগওয়ালাকে। হটডগের লোকটা বলল, ‘ওই পাগলটার  সামনে  দাঁড়িয়ে কী করছিলে তুমি? লোকটা কিন্তু  হঠাৎ হিংস্র হয়ে ওঠে এবং আক্রমণ করে বসে। হোমলেস।’ 
সাদা শয়তানের কবল থেকে দ্বিতীয়বারের মতো মুক্তিলাভ করে আরিফ দ্রুত পদচালনায় স্টাইরেক্স অ্যাভেনিউগামী  বাসে  চড়ে  বসল। বাসে বসেই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, এক কালো শয়তানের শিকারে পরিণত হবার পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য সে শিগগিরই কোনো কোম্পানিতে  আবেদন করে ফর্কলিফটিংয়ের  কাজে  ঢুকে  যাবে। গভর্নমেন্টকে  জানিয়ে দেবে এম্লোয়মেন্ট ইন্স্যুরেন্স-এ সে আর থাকবে না। 
আরিফ যখন এসব ভাবছিল, তখন পিঠে খোঁচা খেয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখল কালো শয়তান বসে মিটিমিটি হাসছে।
কালো শয়তান বলল, জানো দূর ও নিকট অতীতে এই ফার্স্ট ন্যাশনস অনেক অত্যাচারিত হয়েছে। এখনও তারা সুবিধাবঞ্চিত। হারপার গভর্নমেন্টের একটা কিছু করা উচিত, কী বলো। আরিফ সামনে ডস রোড নেমে যাবার উদ্দেশ্যে সিটের পাশে স্টিলের রডের বসানো বোতাম টিপে দিল।
‘সে কি, ডস রোডে নামছো কেন, বাসায় যাবে না?’
‘না, আমি রাতে বাসায় যাব। কাল সকালে সোজা ওটাওয়া চলে যাব। সেখানে গিয়ে অনারেবল হারপার সাহেবকে বলব তিনি যেন ফার্স্ট ন্যাশনসকে সুবিধাদি দেন আর আমাকে যেন সাদা আর কালো শয়তানের থাবা থেকে বাঁচান।’
আরিফ ডস রোডে নেমে হাঁটতে লাগল। সে ভাবছে, রাতের কোন্ সময়টায় বাসায় গেলে কালো শয়তানের খপ্পরে পড়বে না।
(গল্পে উল্লেখিত টরোন্টো শহরের কয়েকটি স্থানের নাম এবং গল্পের চরিত্রগুলোর নাম কাল্পনিক। এর সময়কাল কল্পনা ও বাস্তবের মিশেল)।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/196316/</link>
				<pubDate>Tue, 14 Mar 2023 16:11:00 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>স্টাইরেক্স অ্যাভেনিউর শয়তান<br />
-হাসান জাহিদ<br />
১<br />
রাত খুব বেশি হয়নি, তবে অতি ঠান্ডার কারণে নির্জন হয়ে গেছে স্টাইরেক্স অ্যাভেনিউর চওড়া রাস্তাটা। দুইপাশের  বে অ্যন্ড গ্যাবল ধাঁচের বাড়িগুলো ভৌতিক অবয়বে দাঁড়িয়ে আছে। টরোন্টোর পুরোনো অংশের অন্যতম এলাকা এটি। বাড়িগুলোর মন্দিরের মতো চোখা চূড়া ছাড়িয়ে ওক, সুগার ম্যাপল ও আরো অজানা অনেক গাছ পল্লব হারিয়ে&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-196316"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/196316/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>14</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">d518d41a8b711cc93b81e4bca8610d9f</guid>
				<title>মাধবী
-হাসান জাহিদ

রাস্তার পাশের আবর্জনার স্তূপনিঃসৃত দুর্গন্ধ, কোলাহল, গাড়ির শব্দ, দাবদাহ, চিৎকার-খিস্তি প্রভৃতি থেকে অন্তত তিনযুগ পেছনে ছিলাম আমি।
আমার পেছুবার কারণ, রাস্তার পাশে যানবাহনের জন্য অপেক্ষমাণ মেয়েটি। তার লাল ওড়না ও কপালে বসা চুল স্থির। কোথাও হাওয়া নেই। তার ঘর্মাক্ত মুখে ক্লান্তির ছাপ ছিল না; রৌদ্রকরোজ্জ্বল দুপুরে তাকে যেন দোকানে সাজানো ম্যানিকিনের মতো লাগছিল--এমনি সোনারঙা ঔজ্জ্বল্য তার অবয়বে। 

...মেয়েটিকে দেখার আগে আমি গুনগুন করে সুর ভাঁজছিলাম, আর কোনো একটি মেয়েকে দেখে সেই গানের আবহ মিলিয়ে নিয়ে একটি সিল্যূঅ্যাট তৈরির প্রচেষ্টা-রত থাকার অভ্যেস তৈরি হয়ে গিয়েছিল আমার। 

রিকশায় ওঠার পর থেকে রোড ডিভাইডারের পাংশু বর্ণের গাছ ছাড়া অন্য কোনো গাছ দেখতে পাচ্ছিলাম না। দুইপাশে আবদ্ধ-তাতানো দালানকোঠা, বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান, দোকান, নোংরা ফুটপাথ, ব্যানার-সাইনবোর্ড, টেলিফোন-বিদ্যুৎ তারের জঞ্জাল, হকার-ভিক্ষুক আর মনুষ্য কর্মকান্ড ঘেরা যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর কীর্তি দেখে আমার উপলব্ধি হলো, আমি যেন সুকুমার রায়ের হিজিবিজি রাজ্যে এসে পড়েছি।

মাথার ওপর গনগনে সূর্য। রাস্তা থেকে তাতানো গরম উঠছিল, কিন্তু‘ আমার গুনগুনানি থামেনি। ভেতরে চলছিল সুর। সেই সুর হাজারো শব্দের মাঝেও আমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করছিল।

আমি সুরের সাথে কাউকে মেলাতে চাই।
সিগন্যালে এসে রিকশা থামল। কীসের সিগন্যাল, জানি না। সিগন্যাল, জ্যাম, ট্রাফিক পুলিসের তৎপরতা, গাড়ির উদ্ধত নাক, ড্রাইভারের খিস্তি, হেলপারের চিৎকার প্রভৃতিতে সিগন্যালের মাহাত্ম হারিয়ে গেছে। 

রিকশা থেমে ছিল।
আমি কামনা করছিলাম, সুরটা মেলাতে পারি, এমন একটা মুখ দেখার। হঠাৎ কেউ আমার সামনে হাত পাতল। তাকিয়ে দেখলাম এক বুড়ি। মনে মনে মহাকবি শার্ল বোদলেয়ারকে ডাকলাম, আর বললাম, ‘বুড়ি বেশ্যার শহীদ স্তন।’
আমার চোখে খারাপ দৃষ্টি দেখে বুড়ি যৌবনের শরমে-মরমে পিছিয়ে গিয়ে কী যেন বলল বিড়বিড়িয়ে। বলুক। পরম পবিত্র আত্মা মানবজাতিকে দিয়েছেন মুখ--যাতে সে খেতে পারে, সুর ভাঁজতে পারে, কুৎসা রটনা করতে পারে, অশ্রাব্য বাক্য প্রয়োগ করতে পারে, এমনকি খেয়ে ফেলতে পারে।

আমি জানি, একটু এগুলেই পৌঁছে যাব প্রশস্ত সড়কটায়, যার একদিকে রয়েছে চওড়া ফুটপাথ, তারপর উঁচু পাঁচিল। এবং পাঁচিলের ওপারে ততোধিক উচ্চতার বৃক্ষরাজি। সবুজ বৃক্ষ, অরণ্যানী, নীল আকাশ দেখলে আমার সুরের মুর্ছনা তরঙ্গায়িত হয়। নীল আকাশ দেখলেও হয়, তবে এখন দেখতে ইচ্ছে করছে না। ওপরে তাকালে মধ্যাহ্নের কড়া মেজাজের গনগনে সূর্য আমার চোখ ঝলসে দেবে।

রিকশা চলল। 
সেই চওড়া ফুটপাথে, পাঁচিলের পটভূমিকায় লাল ওড়না, সাদা জামা আর হালকা নীল সালোয়ারের মেয়েটিকে দেখলাম। আমার মাঝে প্রথম প্রেমের অনুভূতি খেলল। আমার ভেতরের সুরটা মিলে গেল মেয়েটির অবয়ব ও কাঠামোর সাথে, এবং...।

ফিরে গেলাম তিনযুগ আগে।
এক বিয়েবাড়িতে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল রঙ্গন ঝোপের পাশে। তার মুখে বিয়েবাড়ির লাল-নীল-হলুদ-সবুজ-বেগুনি-সাদা রঙের অসংখ্য ক্ষুদ্র বাতির বর্ণিল আলোছায়া খেলছিল। নেপথ্যে একটা গান বাজছিল তখন--‘মাধবী ফুটেছে ওই, তারা সব ওঠেছে ওই। আমি কি তোমার নই।’
মনে মনে বলেছিলাম--সত্যিই কি আমি তোমার নই! ওগো মেয়ে, এত রূপ নিয়ে, এখানে এই রঙ্গন ঝোপের ধারে, তুমি কোন্ রং-তামাশায় মেতেছো? 
আমি কিছু একটা হারিয়েছি--এমন ভঙ্গিতে ঘাসের বুকে তাকাতে তাকাতে মেয়েটিকে ছাড়িয়ে একটু দূরে গিয়ে ফের ফিরে এলাম মেয়েটির কাছে। মেয়েটি তেম্নি দাঁড়িয়ে ছিল।
মেয়েটিই বলল, ‘কিছু খুঁজছেন কি?’
বললাম, ‘হ্যাঁ, লাইটার।’
‘ও, আচ্ছা।’
‘কিছু যদি না মনে করেন,’ আমি দাঁড়িয়ে পড়ে কাল্পনিক লাইটার খোঁজায় ইস্তফা দিয়ে মেয়েটিকে শুধোলাম, ‘কোনো সমস্যা? না, মানে এখানে একা দাঁড়িয়ে আছেন...।’
মেয়েটি সামান্য হাসল, বলল, ‘আমার মাইগ্রেন আছে। ভিড়ে-শব্দে মাথা ধরেছে। তাই একটু ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে আছি।’
আমি হেসে বললাম, ‘খেয়েদেয়ে বাসায় চলে যান। সাথে কে আছে?’
‘আমার দুই বান্ধবী, তাদের একজনের বোনের আজ বিয়ে।’
‘কী অবাক কান্ড!’ বললাম আমি, ‘আপনি পাত্রীপক্ষের? মানে নীলার বোনের বান্ধবী? আর নীলা কে হয় আমার জানেন?’
‘আমি কী করে জানব?’ মেয়েটির কন্ঠে সামান্য বিরক্তি।
‘নীলা আমার ছাত্রী। মানে ওকে আমি পড়াতাম।’ নাছোড়বান্দার মতো বললাম।
‘ও, আচ্ছা।’
‘আমার নাম হাসান।’
মেয়েটি ঘাড় নাড়ল। আমি তখন সাহস করে বললাম, ‘আপনি নীলার বোনের বান্ধবী, আর নীলা আমার ছাত্রী, অনেকটা সেই সুবাদেই আপনার নামটা জানতে চাচ্ছি।’
‘জানলেন তো আমি নীলার বোনের বান্ধবী, তারপর নাম দিয়ে আবার কী হবে?’
‘কিছু তো হতে পারে। দেখব শুধু আপনার এই অপূর্ব সুন্দর ভঙ্গিমায় বিয়ের আসরে বাগানের কিনারায় দাঁড়ানোর সাথে নামের মিল খুঁজে পাই কিনা।’ বললাম, এবং আগ্রহভরে তাকালাম।
‘আপনি শিক্ষক না কবি?’
‘শিক্ষক। তবে সব মানুষই কোনো না কোনো সময় কবি হয়ে যায়।’
‘আপনি কবি হয়ে গেছেন!’
‘হয়েছি, ওই গানটার জন্য। ওই যে বাজছে--গানটায় কেমন মাদকতা আছে। ‘মাধবী ফুটেছে ওই...।’
‘বাব্বা! এখন দেখি গায়কও হয়ে গেছেন!’
‘হতে পারলে ধন্য হতাম, তবে গান করি আমি।’
‘তার মানে!’ মেয়েটি বিস্মিত হয়ে বলল, ‘গায়ক হতে পারলে ধন্য হতেন, আবার বলছেন গান করেন--কেমন হেঁয়ালি মনে হচ্ছে।’
আমি তখন নিচুস্বরে গাইলাম-- ‘মাধবী ফুটেছে ওই...।’
‘ভালোই তো গাইলেন। কিন্তু‘...।’
‘কিন্তু হলো, গান গাই তবে প্রকৃত গায়ক নিজকে মনে করছি না এখনও। গায়ক হতে গেলে সাধক হতে হয়। তাই...।’
‘ও আচ্ছা।’ মেয়েটি এবার খিলখিল করে হেসে উঠে বলল, ‘আমার নাম সোনালি।’
‘ঠিক, একদম ঠিক।’ আমি বললাম, ‘আপনার কাঁচা হলুদের মতো রঙের সাথে আর আজকের এই স্বর্ণালি রাতের সাথে নামটা মিলে গেছে।’
‘কিন্তু‘ কালো রাত কেমন করে সোনালি হলো!’
‘হবে না! বিয়ের বাসর তো হাজারো ঝালরে আর বাতির রঙে সোনালি হয়ে আছে। আর বিয়ের পর্ব মানেই তো মানুষের জীবনের একটি সোনালি অধ্যায়।’
‘বাব্বা! আপনি দেখছি দার্শনিকও বটে। যাক বাবা, এবার আমি একটু নড়ি। ঠাঁই দাঁড়িয়ে থেকে পা ধরে গেছে।’
‘আর মাইগ্রেন? ওটা গেছে?’
‘না, আরো বেড়েছে। আচ্ছা চলি।’

আর...আমি কেমন উত্তাল হয়ে উঠলাম, আর বলেই ফেললাম, ‘আর দেখা হবে না?’
‘কেন দেখা করতে চান?’ 
‘না, এমনি।’
‘দেখা হবে না।’
‘হবে না!’ আমার মুখটা কেমন দেখতে হয়েছিল, জানিনা। বোধহয় বিয়ের খাবারের এঁটো বাসনপত্রের মতো।
সেদিকে তাকিয়ে মেয়েটি বলল, ‘ঠিক আছে, দেখা হবে।’
আমার মুখ এবার দুইশ’ ওয়াটের বাল্বের মতো উজ্জ্বল হলো। বললাম, ‘কবে আবার দেখা হবে?’
মেয়েটা ঘাড় হেঁট করে বলল, ‘নী-নীলার কাছে জেনে নেবেন।’ বলেই মেয়েটা কেমন এঁকেবেঁকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল। 
তখন আমি পকেটে অস্তিত্বমান লাইটার বের করে সিগারেট ধরালাম। অস্ফুটে বললাম, ‘সোনালি, ওগো সোনার মেয়ে।’

***
 তারপর প্রেম, সংলাপ। বেড়ানো, আশা-আকাঙ্ক্ষার গল্প। কত কী...। তারপর একদিন ভেঙে গেল মিলনমেলা। আমি সামান্য বেতনের চাকরি করি, থাকি মেসে আর খাইদাই, চলি কোনোক্রমে। 

মেলেনি। ওদের সাথে মেলেনি।
সব জানতে পেরে সোনালির অভিভাবক ওকে গৃহবন্দি করে পাত্র খুঁজতে লেগে গেলেন। পাত্র তারা পেয়েছিলেন। সোনালি অর্ধেক গররাজি, অর্ধেক নিমরাজি। তবে সে কোনো এক নিরালা দুপুরে পালিয়ে এসে আমার সাথে দেখা করেছিল মেসে। আমি তখন কাঁচা আমের ডাল দিয়ে ভাত খাচ্ছিলাম। 
সোনালি বলল, ‘আমার হাত-পা বাঁধা।’
বললাম, ‘চলো, পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করি।’
সোনালি আঁৎকে উঠে বলল, ‘সেটা সম্ভব নয়।’
আমি খেপে উঠলাম: কেন সম্ভব নয়, সোনালি! রেগে গেল সোনালি--‘এটা কি ছেলেখেলা নাকি! তুমি বরং ভালো একটা চাকরি যুগিয়ে বাবা’র মন জয় করো, ততদিন আমি ঠেকিয়ে রাখি।’

স্তম্ভিত হয়ে গেলাম আমি। সোনালি শর্ত দিল!
আমাকে স্তম্ভিত করে, অচেনা সংবিত্তির ঘেরাটোপে আটকে দিয়ে সোনালি সেদিন চলে গেল।

আমার ভালো চাকরি হয়নি, এমনকি প্রেমানলে পুড়ে চলতি চাকরিটাও চলে যেতে বসেছিল। সোনালি আসেনি আমার জীবনে।

যে এসেছিল তার নাম রূপালি। সোনা পাইনি, রূপা পেলাম। তাই বা মন্দ কী? অনেকে তো পুড়ে পুড়ে তামাটে হয়ে শেষে তামাও পায় না। সেই হিসাবে আমি ভাগ্যবান বটে।

...শুরু করলাম সংসারজীবন। হা হতোস্মি! ম্যান প্রোপোজেস, বাট গড ডিসপোজেস...। আমার টিউশ্যনির সামান্য টাকা আর প্রাইভেট অ্যাড ফার্মের বেতনের টাকায় রূপালি অষহিষ্ণু হতে হতে শেষে কুঞ্চন রূপ ধারণ করল। রূপালি নদীতে কৃষ্ণ কালো ঝড় উঠল। 
বিয়ে আর দাম্পত্য জীবনের সলিল সমাধি রচিত হলো।

তারপর...। কত বছর, অনেকগুলো বসন্ত পার হয়ে গেল। মাধবী আর ফোটেনি, তারারাও অভিমান করে মেঘের কোলে মুখ লুকলো।
...
স্বপ্নের অপ্সরী স্বপ্নেই ডানা মেলে থাকে। একে একে বসন্তেরা চলে যায়। কোকিলের কুহুতান হারিয়ে যায় হিংস্র দাড়কাকের মুখগহ্বরে। নতুন করে ভাবতে বসেছিলাম কোনো রমণীর মুখচ্ছবি। 
মনে হয়, এইতো সেদিন...ওরা ছিল। এখন নেই। 
মাথা ঝেড়ে যখন হিসাব কষলাম, তখন দেখি মাঝখানে ফুরুৎ করে চলে গেছে তিনটি যুগ। যখন পরিচয় হয়েছিল সোনালির সাথে, আর রূপালি এসেছিল বর্ষার ভরা রূপ ধরে, তখন দাড়িগোঁফে ছিল চকচকে তৈলাক্ত ঝলক। এখন তা বিবর্ণ, ধূসর। কালো ঢেউয়ে সূর্যের ঝিকিমিকি, সাদা আঁচড়ের মতো চুলদাড়িতে উঁকি দেয় সাদা কাশবন।
তবু আমি গুনগুনিয়ে গান করি--রিকশায় বসে, টিউশ্যনিতে যাওয়া-আসার পথে।

আমি সেই স্মৃতিগুলো খুঁজি। একটি মেয়ে রঙ্গন ঝোপের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল অপূর্ব গ্রীবা বাঁকিয়ে। আমার প্রথম প্রেম। স্বপ্ন, জীবন।

...তারপর সব চুরমার হয়ে গেল। মাঝখানে রূপালি ফিতার মতো যে নদীটি বয়ে গিয়েছিল আমার জীবনের বাঁকে, সে আমাকে নিঃস্ব করে দিয়ে গেছে।
এতকিছু, এতকিছু--এত পতন, অধঃপতন। আমি ভুলতে পারি না মাধবীলতাকে, আকাশের তারাগুলোকে।

***
আমি রিকশা থামিয়ে তড়াক করে নেমে লাল ওড়না জড়ানো মেয়েটির দিকে তাকালাম। ঠিক সেইরকম বিয়েবাড়ির মতো! আর সূর্যটা যেন আজদাহা এক ফ্লাডলাইট। আর পাঁচিলটা বিয়েবাড়ির সীমানা প্রাচীর। মেয়েটি যেন সোনালি।
বললাম, ‘কেমন আছেন?’
মেয়েটি অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল, ‘আপনাকে তো চিনতে পারছি না!’
বললাম, ‘আপনি কি সোনালি, মানে আপনার নাম সোনালি?’
‘না তো!’ মেয়েটির চোখে সামান্য ভীতি।
‘সরি,’ আমি আবার বললাম, ‘ঠিক সোনালির মতো দেখতে আপনি।’
‘হতে পারে।’ মেয়েটির গম্ভীর স্বর।

বললাম, ‘ইয়ে, আচ্ছা। মানে...।’
মেয়েটি এবার বলল, ‘বললাম তো, আমার নাম সোনালি না। আপনি তবু দাঁড়িয়ে আছেন কেন?’
‘সরি।’ বললাম।
মেয়েটা বিড়বিড় করে কিছু বলল। তারপর একটা বাস থামতেই তাতে উঠে গেল। বাসটা চলে গেলে সেদিকে কিছুটা সময় তাকিয়ে থাকলাম।

***
আমি জানতাম মেয়েটার নাম সোনালি নয়; দৈবক্রমে নাম সোনালি হলেও সে আমার কেউ নয়। আমি তার কেউ নয়।
কিছু অদ্ভুত ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ আজকাল আমি করে থাকি। সেটা আমার অভিনয় হলেও তো মেয়েটা তা জানত না। বলতে পারত, ‘আমার নাম না-ই বা হলো সোনালি। আপনি আমাকে সোনালি বলেই ডাকবেন।’

কিন্তু আমি জানি, এমন বলবে না কোনো মেয়ে।
কেননা, আমার খোঁচা-খোঁচা বিবাগী শশ্রুতে রূপালি আভা। চুলে মেহেদিজনিত কারণে সোনালি ছোপ।

তবু আমি সুর ভাঁজি, কোনো নন্দিনীকে দেখলে গুনগুনিয়ে মনের মাঝে একটা আবেশ তৈরির প্রয়াস নিই--মাধবী ফুটুক আর না ফুটুক। তারারা উঠুক আর না-ই উঠুক।

(রচনা তারিখ: ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬)</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/114056/</link>
				<pubDate>Sun, 22 May 2022 22:45:58 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>মাধবী<br />
-হাসান জাহিদ</p>
<p>রাস্তার পাশের আবর্জনার স্তূপনিঃসৃত দুর্গন্ধ, কোলাহল, গাড়ির শব্দ, দাবদাহ, চিৎকার-খিস্তি প্রভৃতি থেকে অন্তত তিনযুগ পেছনে ছিলাম আমি।<br />
আমার পেছুবার কারণ, রাস্তার পাশে যানবাহনের জন্য অপেক্ষমাণ মেয়েটি। তার লাল ওড়না ও কপালে বসা চুল স্থির। কোথাও হাওয়া নেই। তার ঘর্মাক্ত মুখে ক্লান্তির ছাপ ছিল না; রৌদ্রকরোজ্জ্বল দুপুরে&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-114056"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/114056/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>9</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">ab843762b0e4be052203fed76be10faf</guid>
				<title></title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/114051/</link>
				<pubDate>Sun, 22 May 2022 21:38:37 +0600</pubDate>

				
									<slash:comments>0</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">3b87b2230cd63ffb3444c273c85a5583</guid>
				<title>Hasan Zahid হাসান জাহিদ changed their profile picture</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/113984/</link>
				<pubDate>Sun, 22 May 2022 16:00:09 +0600</pubDate>

				
									<slash:comments>3</slash:comments>
				
							</item>
		
	</channel>
</rss>