-
স্টাইরেক্স অ্যাভেনিউর শয়তান
-হাসান জাহিদ
১
রাত খুব বেশি হয়নি, তবে অতি ঠান্ডার কারণে নির্জন হয়ে গেছে স্টাইরেক্স অ্যাভেনিউর চওড়া রাস্তাটা। দুইপাশের বে অ্যন্ড গ্যাবল ধাঁচের বাড়িগুলো ভৌতিক অবয়বে দাঁড়িয়ে আছে। টরোন্টোর পুরোনো অংশের অন্যতম এলাকা এটি। বাড়িগুলোর মন্দিরের মতো চোখা চূড়া ছাড়িয়ে ওক, সুগার ম্যাপল ও আরো অজানা অনেক গাছ পল্লব হারিয়ে কেবলই দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। এই দীর্ঘশ্বাস বড় ভয়ঙ্কর‒বিষাক্ত সর্পের ছোবলের মতো।
গাছের মাথার ওপর দীর্ঘশ্বাসের শব্দে মনে হয় মাতাল ঝড় বইছে। কিন্তু কোথাও কোনো ঝড় নেই; এরা একজাতের অশরীরী বাতাস, যারা রাতে শ্বশ্মানবাসীদের মতো ঘুরে বেড়ায়, মানুষ-জীবজন্তুর হাড়মজ্জায় ঠান্ডা প্রবীষ্ট করানো এদের এক মজার খেলা।
স্টাইরেক্স অ্যাভেনিউর সাইডওয়াক ধরে উত্তরমুখো হাঁটছিল আরিফ। পেটানো শরীর তার, বয়স আনুমানিক উনচল্লিশ এবং অকৃতদার। ভয়ডর বলে ভেতরে কিচ্ছু নেই। মধ্যপ্রাচ্যে কয়েকবছর লেবারগিরি করে তার শরীরটা জুতসই হয়ে গেছে। অল্পবয়স থেকেই দেশ-ছাড়া। রাজনীতি করত, কয়েকবার পুলিসকে পিটিয়েছে, তারপর বাগে পেয়ে পুলিস ওকে পিটিয়েছে। শেষে লাল দালানে কাটাতে হলো অনেকদিন। তারপর একদিন বের হয়ে নিজকে গুছিয়ে সে সোজা চলে যায় মধ্যপ্রাচ্যে। সেখানে গিয়ে সে লেবারদের পক্ষ নিয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করত।
মধ্যপ্রাচ্যে অনেকবছর থাকলেও সেই জীবনটাকে সে মেনে নিতে পারেনি কোনোদিন। এরকম রসকষহীন জীবন, মানে লেবারদের জন্য এমন নিরানন্দময় জীবন আর কিছুই হতে পারে না। কন্সট্রাকশন সাইটের মালিকেরা অফিসে বসে হম্বিতম্বি করে, আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে। আর অবশ্যই সাইটের কাঁচামালের যোগান পেতে এবং সস্তা লেবারের চুক্তি করতে বেছে নেয় বাংলাদেশের মতো দেশ। দেশীয় দালালরা এদের পদলেহন করে আর ‘কাঁচামাল’ যুগিয়ে যায়।
এইরকম বিষয়গুলো আরিফের মনোযাতনার কারণ ছিল। সেজন্য সে সঙ্গোপনে, মনের গহিনে যুক্তরাষ্ট্র বা ক্যানেডায় পাড়ি দেবার ছক করছিল। তার ভেতরের এই খবরটি কেউ জানত না, সেটা ফলাও করে জানানোর মতোও কিছু ছিল না। মনের একটা সুপ্ত ইচ্ছা বৈ নয়।
একবার চটে গেল আরিফ। মালিক বিদেশ সফরে যাচ্ছে, সাইটের ম্যানেজার লেবার সর্দার আরিফকে ডেকে বিশেষ নির্দেশ দিল। লোকটা খোশমেজাজে ছিল, সেটা বুঝে আরিফ মজুরি বৃদ্ধির বিনীত আবেদন জানাল। আরিফ নিজে এবং তার সঙ্গীরা দৃঢ়প্রত্যয়ী ছিল এবার তাদের মজুরি বাড়বে। কিন্তু ব্যাটা ওদের সবার প্রত্যাশায় গুড়ে বালি দিল। সে জানাল, সে মালিকের নির্দেশ ওদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে, শ্রমিকের বেতন বাড়ল না কমল, সে নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। আরিফ ভগ্ন হৃদয়ে তার অধীনস্থ সঙ্গীদের‒বাংলাদেশিই অধিকাংশ, একজন পাকিস্তানি ও বাকি কয়েকজন ভিনদেশির উদ্দেশ্যে বলল, ‘শুয়োরের পয়দা (মালিক) দালালদের ওপর সব দায়িত্ব দিয়ে মুম্বাই-কলকাতা-ঢাকা গিয়ে ‘কাঁচামাল’ যুগাবে। ফুর্তি করবে, আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে।’
কিছুদিন মুখ বুজে পড়ে থাকল আরিফ। তারপর একদিন ভিনদেশে পাড়ি দেবার কাগজপত্র চলে আসে। আরিফ বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে পাড়ি দিল সম্পূর্ণ নতুন-অচেনা এক বরফের দেশে।
…ধীরগতিতে এগুচ্ছিল আরিফ। এরকম খোলামেলা অ্যাভেনিউতে একাকী হাঁটতে যে কোনো সাহসী ব্যক্তির বুক কেঁপে উঠবে। আরিফের বুকটাও কাঁপছিল, যতটা না অস্বস্তিতে, তারচেয়েও ভাইরাস জ্বরের কারণে। তিনদিন ধরে সে জ্বরে ভুগছে। একটা করে টাইলেনল খায়, জ্বরটা কমে, ফের দেখা দেয়। এভাবে সে প্রতিদিন তিনটা টাইলেনল খাচ্ছে। ভাগ্য, সে এখন কর্মস্থলে যাচ্ছে না। সে কোম্পানি কর্তৃক ‘লেইড-অফ’ ঘোষিত হয়ে অন্যরকম জীবন বেছে নিল, যা তার নীতিবিরুদ্ধ ও অপছন্দের। কিন্তু এইরকম জীবনকেই সে বেছে নিয়েছে পরিবর্তনের ছোঁয়া পেতে। শুয়ে শুয়ে ল্যাপটপে মুভি দেখতে, ফেসবুকে চ্যাট করতে কিংবা ভাইবারের মাধ্যমে দেশে স্বজনদের সাথে, জেদ্দায় তার পুরোনো লেবার বন্ধুদের সাথে কথা বলতে ভালোই লাগে। কোম্পানি লে-অফ ঘোষণার সাথে সাথে আরিফ ফটাফট এম্প্লোয়মেন্ট ইন্স্যুরেন্সের জন্য আবেদন করে দিল। সেটা পেতে বেশি সময় লাগল না। এখন সে বিনা শ্রমে, ঘরে বসে আর বগল বাজিয়ে মাসকাবার এগারোশ’ ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে…।
আরিফের হাতের প্লাস্টিকের ব্যাগের ভেতরে তান্দুরি নান ও চিকেন ঝাল কারি। বাতাসের ঝটকায় সেই সুগন্ধ এসে নাকে লাগছে। তার হাতে বাদুরের মতো ঝুলন্ত কালো প্লাস্টিকের ব্যাগটা যৎসামান্য উত্তাপ ছড়াচ্ছে। সেটা চলার ছন্দে মাঝেমধ্যে বাম হাঁটুর নিম্নাংশে উত্তাপের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে।
পথটুকু যেন আর শেষ হতে চায় না। বোধহয় বৃষ্টিও নামবে, আকাশটা মৃত মানুষের চোখের মতো ঘোলাটে। এখন বৃষ্টি হলে সমস্যায় পড়বে সে। স্নো-ফলের সময় মাথায় হুডি তুলে দিলে স্নো সাধারণত মাথার চুল অবধি প্রবেশ করে না। বেশি বৃষ্টি হলে করে; বিশেষ করে যদি ওয়াটারপ্রুফ জ্যাকেট বা রেইনকোট না পরা থাকে। আরিফ কয়েক পরতের কাপড় জড়িয়ে বের হয়েছিল বটে, তবে তার জ্যাকেটের হুডি নেই, মাথায় শুধু কটনের কানটুপি জড়ানো। সে তার চুরাশি নম্বর স্টাইরেক্স অ্যাভেনিউর বেইজমেন্টের বাসার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এক বাঙালি ভদ্রলোক এর মালিক, তিনি বর্তমানে বাংলাদেশে আছেন। তাঁর স্ত্রীর হাতে মাসে পাঁচশ’ ডলার বাড়িভাড়া তুলে দেয় আরিফ।
বাসায় পৌঁছুনোর জন্য রাস্তাটা আজকে অন্যদিনের চাইতে বেশি দূর মনে হচ্ছে। আরিফ এখন আর এগুতে পারছে না। তার শরীরে কাঁপুনি উঠেছে‒কম্পিত শরীরের জন্য সে আগাতে পারছে না; জ্বরটা আবার এসেছে। নিজকে গালমন্দ করে সে, কী দরকার ছিল এতটা পথ হেঁটে এসে চিকেন আর তান্দুরি কেনার?
এখন জ্বরের ঘোরে রাস্তায় পড়ে থাকলে এই খাবার কে খাবে, এখানে তো বাংলাদেশের মতো অসংখ্য নেড়িকুত্তা নেই যে, গন্ধ পেয়ে দৌড়ে এসে খাবার খাওয়া শুরু করবে‒এমনকি জ্বরাক্রান্ত লোকটার দিকেও লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাবে! আরিফ দাঁড়িয়ে পড়ল, কিন্তু হি হি করে কাঁপে সে, হাত পা তার কথা শুনছে না।
এইসময় সে খবিশটাকে দেখতে পেল। আগাগোড়া কালো পোশাকে মোড়া লম্বা আর পৈশাচিক আদলের এক জলজ্যান্ত শয়তান তার দিকে এগিয়ে আসছে। আরিফের মনে হলো তার চেতনা লোপ পাচ্ছে। কিন্তু চেতনা লোপ পাওয়ার মতো তো তার জ্বর ওঠেনি এই পর্যন্ত! তার শরীর কাঁপছে কারণ সে জ্বর গায়ে তান্দুরি নান ও চিকেন ঝাল কারির লোভে ঘরের উষ্ণ আরামদায়ক বিছানা ছেড়ে মাইনাস এগারো তাপমাত্রায় রাতে বাইরে বেরিয়েছে।
তার চেতনা লোপ পায়নি; সে ঠিকই দেখছে জলজ্যান্ত একটা শয়তান এগিয়ে আসছে তার দিকে। এই শয়তানটা কি ওর ব্যাগের তান্দুরি নান ও চিকেন ঝাল কারি চাইবে? বাংলাদেশের গ্রামে তো এমন আকছার ঘটেছে। কেউ হয়তো ইলিশ নিয়ে রাতের অন্ধকারে ঘরে ফিরছে, ব্যস তালগাছ থেকে শয়তান নেমে এসে ইলিশ মাছ চাইল। আর এটা তো একেবারে রেডিমেড‒গরম গরম তান্দুরি আর মুরগির ঝাল-ঝাল তরকারি। না চেয়ে পারেই না। আরিফ মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, চাইলে দিয়ে দেবে কারণ সব জায়গায় বাহাদুরি ফলাতে হয় না। আর এখানে সে কী বাহাদুরি দেখাচ্ছে, সেটা দেখার জন্য বাংলাদেশের শহরের রাস্তায় ক্যানভাসারকে ঘিরে মানুষের কৌতূহলী চোখের মতো হাজারো চোখ তার দিকে তাকিয়ে নেই।
তাই সে টানটান না হয়ে রিল্যাক্সড ভঙ্গিতে কাঁপতে লাগল, মানে তাকে কাঁপাতে জ্বরের যেন বেগ পেতে না হয়, সেই ব্যবস্থা করে দিল।
শয়তানটা কাছিয়ে আসতেই আরিফ দেখল এটা একটা মোটকা শয়তান। একইসাথে চওড়া এবং লম্বা। পরনে কালো ট্রাউজার আর কালো স্পোর্টস জ্যাকেট, হাতে গ্লাভস নেই, কানে কানটুপি নেই। শয়তানটা আরো এগিয়ে এসে, তিলসর্বস্ব লাল থ্যাবড়া মুখ ও কুতকুতে চোখে চেয়ে একেবারে বাংলাদেশের ভাষায় বলল, ‘খাবারটা দে আমাকে, আখেরে ফল দেবে।’
আরিফ তোতলিয়ে বলল, ‘কী! মা-মানে!’ আরিফের মুখ দিয়ে মাতৃভাষা বেরিয়ে এলো।
‘ও তুই হলি ইংরেজি না জানা ইমিগ্র্যান্ট। ফ্রেঞ্চ জানিস?’
‘না।’
‘তোর মাদার-টাং তো আমার জানা নেই, নাইলে সেই ভাষাতেই বলতাম, ‘আই’ম হাংরি, সো অ্যাম অ্যাংরি। খাবারটা না দিলে নটঘট হয়ে যাবে।’
আরিফ ধন্ধে পড়ে যায়; সে তো স্পষ্ট শুনল, প্রথম বাক্যটা ‘লোক’টা ইংরেজিতে বলেনি, বলেছে অন্য ভাষায়। ইস্ট ইয়োরোপের কোনো ভাষা, কিংবা ককেশিয় অঞ্চলের ভাষাও হতে পারে কিন্তু শুনতে লেগেছে বাংলাদেশি ভেক ধরা শেকল-জড়ানো ফকিরদের মতো, এমনকি ভঙ্গিটিও সেরকমই ছিল।
ভাবনাটা বেশিক্ষণ মাথায় রইল না। কেলেঙ্কারির ভয়ে সে প্যাকেটটা দিয়ে দিল, আর বলল, ‘আমি ইংরেজি জানি।’
‘একেবারে উদ্ধার করে ফেলেছিস! এবার যা বাড়িতে। খাবারটা হস্তান্তর করে সুবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছিস যাহোক। নইলে কী হতো বলা যায় না। নে, হ্যান্ডশেক কর, এই খাবারের সুবাদে তোর সাথে বন্ধুত্ব হয়ে গেল।’
আরিফের হাতে কাপড়ের গ্লাভস ছিল, পকেট থেকে ডান হাতটা বের করতেই গ্লাভস ভেদ করে ঠান্ডা ঢুকল। শয়তান বিশাল লালচে উন্মুক্ত থাবা দিয়ে আচ্ছামতো ওর হাত ঝাঁকিয়ে দিল। আরিফ মনে মনে কামনা করল, শয়তান যেন অনেকক্ষণ ধরে ওর হাত ঝাঁকাতে থাকে। ওর মনে হলো গরম কাপড় দিয়ে কে যেন তার হাতটাকে সেঁক দিচ্ছে।
একসময় হাত ছেড়ে দেয় শয়তান। বলল, ‘অ্যাডিয়ো।’
আরিফ মন্ত্রমুগ্ধের মতো বলল, ‘বাই।’
শয়তান ওর পাশ কাটিয়ে সাইডওয়াক ধরে মুহূর্তেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। ঘোরের মধ্যে বিড়বিড় করে উঠল আরিফ, ‘খোদ টরোন্টো শহরে শয়তান!’ তারপর ভাবল, ‘নয় কেন। টরোন্টো উন্নত দেশের উন্নত শহর বলে শয়তান থাকবে না‒এমন যুক্তি কি কেউ খাড়া করাতে পারবে?’
সে এসবই ভেবে চলল, মানে একদিকে সে চলাটা ঠিক রাখল, অন্যদিকে মনের ভাবনাটা চালিয়ে যেতে লাগল। কারণ তার গতি শ্লথ হয়ে গিয়েছিল। আগের চেয়েও সে কম কদম ফেলতে পারছে , আর তার কম্পন আরো বেড়ে গেছে। এই কম্পনের মধ্যেই সে দেখল কালো বিড়ালটাকে। অলস ভঙ্গিতে রাস্তা পার হচ্ছে। মোটা, আয়েশী বিড়াল। তারপরেই সে দেখল র্যাকুনটাকে। সাইডওয়াকের পাশে একটা বাড়ির কাঠের বেড়ার বাউন্ডারির ফোকর দিয়ে বেরিয়ে এসে আরিফের মুখোমুখি হলো। অযাচিত দেখা। র্যাকুনটা ফুলে উঠল, আরিফের কাঁপুনিটাকে সে সন্দেহের চোখে দেখছে। আরিফ কাঁপতে কাঁপতেই সাইডওয়াক ছেড়ে রাস্তায় নামল; যদিও জানে কোনো বদমায়েশ ড্রাইভার পেছন থেকে ওকে ধাক্কা দিয়ে দফারফা করে দিতে পারে। দিক, তবু র্যাকুনের কামড় ও আঁচড়ের চাইতে সেটা ভালো। ওর পশ্চাদপসরণে র্যাকুনটা থমকে দাঁড়িয়ে ওর দিকে চেয়ে বিজয়ের হাসি দিল ঠিক আফ্রিকার হায়েনার মতো শব্দ করে। তারপর গদাইলস্করী চালে একটা ঝোপের ভেতরে ঢুকে গেল।
আরিফ আবার সাইডওয়াকে উঠে এলো। ভাবনাটা পেয়ে বসল তাকে, ‘টরোন্টোর সদর রাস্তায় শয়তান!’ পরক্ষণেই মনে হলো, ‘উন্নত দেশের একটি বৃহৎ প্রদেশের বৃহত্তম রাজধানি বলে সেখানে শয়তান থাকবে না, এ কেমনতরো কথা। আরে টরোন্টো হলো অজস্র ইমিগ্র্যান্টসদের শহর। সেখানে তো বহু শয়তান ইমিগ্র্যান্টস হয়ে আসতেই পারে। হয়তো বাংলাদেশের খানদানি শয়তানেরা মানুষের শয়তানি বুদ্ধির কাছে পরাস্ত হয়ে সুড়সুড় করে চলে এসেছে টরোন্টোতে। হয়তো সুন্দরবনের অনেক গেছো শয়তানদের ছেলেপুলে ট্রলার লিকের কারণে তেলজমা পানিতে ডুবে মরেছে। তাদের কেউ কেউ হয়তো পাড়ি জমিয়েছে এইদেশে। কিছু তালিবান শয়তানও আসতে পারে, নওয়াজ শরীফ কর্তৃক ফাঁসির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবার ঘোষণায়।
এরা তো হলো, যাকে বলে ইমিগ্র্যান্ট শয়তান। টরোন্টোর নিজস্ব ব্র্যান্ডের কিছু ভূত-পেত্নি বা প্রেতযোনি আছে, যারা নিজেদের কামনা বাসনা চরিতার্থ করতে অনেক ইমিগ্র্যান্ট-ইচ্ছুক শয়তানদের স্পন্সর করছে।
পুরোনো বে সাবওয়ে স্টেশনের কথাই ধরা যাক না। সেখানে রাতবিরাতে রক্ত-রাঙা পোশাক পরা তরুণীকে ঘুরতে দেখা যায়।
শুধু কি তাই? খোদ টরোন্টোর শতবর্ষ পুরোনো লেজিসলেটিভ বিল্ডিংয়ে এখনও প্রেতাত্মা চড়ে বেড়ায়। অনেক টরোন্টোবাসী রওনা দেবার সময় কালো বিড়ালের মুখোমুখি হলে নাকি দিনটা মাটি হয়ে যাবে বলে মনে করে। তাহলে বাংলাদেশের লোকেরা যে রওনা দেবার সময় হোঁচট খেলে বা সামনে ঝাঁটা পড়লে তাদের দিন মাটি হয়ে যায় বলে বিশ্বাস করে‒তাতে উন্নত দেশ ‘কুসংস্কারাচ্ছন্ন’ বলে নাক সিঁটকায় কেন?
এদের কালো বিড়াল দেখা বা লালপোশাকের তরুণী দেখা‒এসবকে কী বলা যায়? মিথ, আরবান লেজেন্ড নাকি স্রেফ ফ্যাশন? মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠল আরিফ; ত্রস্ততায় খেয়াল করল, শয়তানটা চলে যাবার পর সে খুব কমই অগ্রসর হয়েছে বাড়ির পথে। সেই র্যাকুনটা একটা কারণ। কিন্তু মোড়ের তান্দুরি হাউসের পর পেভমেন্ট ধরে হেঁটে উঁচু গাছপালার ক্যানোপি-ছাওয়া স্টাইরেক্স অ্যাভিনিউর সাইডওয়াক ধরে শেষ মাথায় পৌঁছে সামান্য ডানে ঘুরে বাসায় পৌঁছুতে তো দশ-বারো মিনিটের বেশি লাগার কথা না! হয়তো শয়তানটার কারসাজি এসব। পৃথিবীতে শয়তান আলবৎ আছে। একটু আগে ওর ক্ষেত্রে যা ঘটে গেল, সেটা ওস্তাদ শয়তানদেরও হার মানায়। আরিফ লক্ষ্য করল, এখন শরীরের কাঁপুনিটা আর নেই। সে একটা সিগারেট ধরাল। কিছুটা যেন উষ্ণতা অনুভব করল।
একসময় বাসায় ঢুকল আরিফ, যতটা নিঃশব্দে সম্ভব। ভাবিকে সে বিরক্ত করতে বা ঘুম থেকে জাগাতে চায় না। আরিফ সাবধানী ভঙ্গিতে ঢুকল। তবুও ভাবি কেমন করে জানি টের পেয়ে গেলেন।
কাঠের সিঁড়িতে ঠকঠক শব্দ হলো। ভাবি নামছেন। আরিফ কান খাড়া করে থাকে। ভাবি নামতে নামতে বললেন, ‘জ্বর শরীরে বাইরে বেরুনোর কী প্রয়োজন পড়ল?’
আরিফ ব্ল্যাংকেট মুড়ে ততক্ষণে শুয়ে পড়ার ভান করল। ভাবি কাছে এসে বললেন, ‘একটু স্যুপ এনেছি। এটুকু খেয়ে একটা অ্যাডভিল খেয়ে তারপর ঘুমিয়ে পড়ো।’
যে মহিলা ওর জন্য হাতে করে স্যুপ বানিয়ে নিয়ে আসতে পারেন, তা-ও আবার বাড়িওয়ালী, সেখানে কি মুখ গুঁজে পড়ে থাকা যায়? আরিফ বিছানায় উঠে বসল। ওর মাথার কাছে একটা চেয়ার টেনে ভাবি তাতে স্যুপ রাখলেন।
‘আপনি কেন এতসব করতে গেলেন।’
‘এতসব আবার কী? সামান্য স্যুপ।’ ভাবি বললেন।
‘ভাত-তরকারি খেয়ে পেটে চাড়া পড়ে গেছিল, তাই একটু তান্দুরি আর চিকেন ঝাল কারি কিনে ফিরছিলাম। কিন্তু পথে…মানে নির্জন রাস্তায় শয়তান এসে কেড়ে নিল তান্দুরি আর চিকেন।’
‘নাউজুবিল্লাহ।’ আপাদমস্তক কালো পোশাকের ভেতরে ভাবির শরীর আর হিজাবে ঢাকা ফর্সা মুখটা কেমন ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠল, ‘এসব কী বলছো?’
‘ঠিকই বলছি ভাবি।’ আরিফ সম্পূর্ণ ঘটনাটা এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল।
‘মনে হয় জ্বরের ঘোরে তুমি উল্টোসিধে দেখেছ।’
‘তাহলে আমার খাবার গেল কোথায়?’
‘হয়তো রাস্তায় ফেলে দিয়েছ।’
‘ভাবি ওইটা শয়তানই, আমি নিশ্চিত।’
‘ঠিক আছে, শয়তানই… আউযু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম…। তুমি এবার ঘুমোও। কাল সকালে তোমার নাশতা নিয়ে আসব, তুমি যেন উঠে কষ্ট করে নাশতা বানাতে যেয়ো না।’
‘আচ্ছা।’
‘আসি, অনেক কাজ পরে আছে। তোমার ভাই ভাইবার খুলে বসে থাকতে বলেছে, কী নাকি জরুরি কথা বলবে। রাতে আমার সামান্য বরাদ্দ খাবারটা এখনও ওভেনে চাপাইনি। আরো অনেক কাজ আছে। তাহাজ্জতের নামাজ আদায় করে একবারে ঘুমোতে যাব।
‘আচ্ছা, ভাবি।’
ভাবির নির্গমন আরিফের মনে একাকীত্বের ঢেউ তুলল। ভাবি আরো কিছুক্ষণ থাকলে সে যে পুলকিত হতো, তা নয়। জ্বর শরীরে কোনো কিছু করার থাকে না বলে নানা বাসনা জাগে মনে। তাই, মনে মনে সে চাচ্ছিল ভাবি আরো কিছুক্ষণ থাকুন।
ভাবি যেমন খুব ফর্সা, ভাই ঠিক তেমনটি কালো। আরিফ যেদিন প্রথম বাড়িভাড়াটা তুলে দেয়, সেদিন দেখল একটা সাদা শাল-এর আড়াল থেকে একটা হনুমানের হাত বেড়িয়ে এসে অর্থটা গ্রহণ করল। আর সে দেখে আসছে ভাবিকে, অতি ফর্সা দুইহাতের কব্জি পর্যন্ত উন্মুক্ত অংশ ও দুইচোখ, ভুরু ও কপালের সামান্য অংশ।
ভাবির চুল কালো না সাদা, সেটা আরিফ আন্দাজ করতে পারছে না। সাদা হবার সম্ভাবনাই বেশি, কারণ ভাবি তার বয়স না বললেও আরিফ হিসেব করে দেখেছে, নিদেন উনসত্তর।
পরিচয়ের শুরুতে ভাবি বলেছিলেন, তার বড় মেয়ের জন্ম উনিশ শ’ সাতষট্টি সালে। তার বিয়ে হয়েছিল একুশ বছর বয়সে। তাদের বিয়ের একবছর পরেই জন্মায় প্রথম সন্তান। ভাই ছিলেন তার চেয়েও সাতবছরের বড়! মানে, ভাইয়ের বয়স এখন ছিয়াত্তর! অনেক তেজি বুড়ো, এখনও স্ত্রীর সাথে কথা বলার জন্য ল্যাপটপে ভাইবার উন্মুক্ত করে বসে থাকেন!
…জ্বর ছাড়ার পরের তিনটি দিন আরিফ মনে মনে শয়তানটাকে খুঁজল স্টাইরেক্স অ্যাভেনিউ ও আশেপাশের এলাকায়, কিন্তু শয়তানের টিকিটিরও নাগাল পেল না। আসল শয়তান বলে কথা, সত্যিকারের শয়তান কি আর দিনেদুপুরে প্রকাশ্যে, জনসমক্ষে খামোখা ঘুরে বেড়াবে।
এদিকে, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে নতুন এক বিপদ ডেকে আনল আরিফ। অনেক লাইক/ডিসলাইক ও কমেন্ট পড়ল। কমেন্টগুলো আপত্তিকর:
একজন বলল, ‘হালায় গাঞ্জা সেবন কইরা পোস্ট দিছে।’
আরেকটি কমেন্ট, ‘এইসব আবর্জনা উন্নত দেশে গিয়া আমাগো ভাবমূর্তি নষ্ট করে।’
অ্যানোনিমাস বলল, ‘সত্যি হতেও তো পারে।’
কেউ একজন উত্তর দিল, ‘আমরা কেমতে বুঝমু মিয়া, ছবি কই!’
অ্যানোনিমাসের হয়ে একজন বলল, ‘প্রকৃত শয়তানকে ছবিতে বন্দি করা যায় না।’
কেউ একজন আবার উত্তর দিল, ‘রঙ্গমঞ্চে দেহি আরেকজন আবদুল্লা আইল, ফর ইয়োর ইনফরমেশন, মিয়া ভাই। আধুনিক জমানার মানে, উন্নত দেশের শয়তানদের ছবি এবং ভিডিও, সব ধারন করা যায়।’
অ্যানোনিমাস‒‘আরিফ ভাইয়ের কাছে ক্যামেরা বা সেলফোন ছিল না।’
কেউ একজন বলল, ‘বুদাই কন, আরিফ ভাই না। রামবুদাই। আমরা তো বাথরুমেও মোবাইল নিয়া হান্দাই। আর উনি, উন্নত দেশে গিয়া মোবাইল ছাড়া রাস্তায় বারাইছে।’
সম্পূর্ণ নতুন একজন বলল, র্যাকুন কী জিনিস?’
‘আরেক জ্ঞানপাপী যোগ দিছে,’ কেউ একজন বলল, ‘মিয়া, মূল বিষয় থেইকা পিছলাইয়া সাইডে গেছেন গিয়া। শয়তানের প্রসঙ্গটাই চলুক।’
অ্যানোনিমাস জানাল, র্যাকুন বিড়ালগোত্রের নিশাচর প্রাণী…।’
বিজলি আক্তার (নায়িকা বিজলি): ‘বেরাদরগণ, আপনারা যদি একটু চোপা সামলাইয়া কথা কইতেন তাইলে আমি আমার মতামত দিতে পারতাম…।’
সম্পূর্ণ নতুন একজন বলল, ‘শিয়োর, শিয়োর।’
…ইত্যাদি, ইত্যাদি। আরিফ ভাবল, ওর উচিত ছিল একটা শয়তানের ছবি ডাউনলোড করে, সেটা ফটোশপে ঝালাই করে স্ট্যাটাসে জুড়ে দিলে শালাদের মুখ এত খুলত না। এখনকার মানুষজন আসলটা চেনে না; নকলটা মেরে দিলে সেটা নিয়ে মেতে থাকে। সত্যিটা প্রমাণের জন্য নকল একটা কিছু বসিয়ে দেয়া সুবিবেচনার কাজ হতো। ভুল হয়ে গেছে।
২
সামার এসে গেল। সামারে ওর কামরাটা সুন্দর দৃশ্য ধারণ করে; ঘরের ভেতর রোদ খেলে যায়। বেইজমেন্ট হলেও ঘরটায় আলো-বাতাসের প্রচুর ব্যবস্থা রয়েছে। আর বাসাটা নিরিবিলি ও ছিমছাম।
ধীরগতিতে, এলোমেলো কাটতে লাগল চাকরিবিহীন জীবন। আরিফ ভাবছিল দূরে কোথাও, মানে মন্ট্রিয়্যাল বা ভ্যাঙ্কুভারে ঘুরে আসবে কিনা। সে চাকরি করছে না, কিন্তু বেতন পাচ্ছে। বেতন পাচ্ছে, কিন্তু তার জন্য কোনো শ্রম দিতে হচ্ছে না।
ক’দিন পরই আরিফ টের পেল বাসায় বসে বসে বিনাশ্রমে বেতন প্রাপ্তির স্বাদ, মানে কত ধানে কত চাল। বাংলাদেশ থেকে বাড়িওয়ালা ভাই ফিরে এসেছেন। তিনি ফিরে আসার আগে আরিফের উচিত ছিল মন্ট্রিয়্যালে পাড়ি দেয়া। তিনি যে একটা চলন্ত ‘বিশ্বকোষ’, এটা জানা ছিল না আরিফের। তার সাথে গতবছর যখন প্রথমবার কথা হয়, তখন অনেকরাত ছিল, প্রচন্ড শীত ছিল। তিনি আগাগোড়া কাপড় মুড়ি দিয়ে কোনোক্রমে হাত বাড়িয়ে বাড়িভাড়ার ডলারগুলো নিয়েছিলেন। আরিফ বাসায় ওঠার কয়েকদিন পরই তিনি বাংলাদেশে রওনা দিলেন। যাওয়ার আগে আরিফকে তিনি বাড়িভাড়াটা তার স্ত্রীর হাতে দেয়ার জন্য বলে গেলেন।
আসার পরদিন থেকে তিনি সামনের বাগানে, ব্যাকইয়ার্ডে‒যখন যেখানে সুযোগ পাচ্ছেন, আরিফকে পাকড়াও করে জ্ঞান ঢালছেন। হাফপ্যান্ট পরে, স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে, বেঁটে-কালো গোলগাল আর বড়বড় চোখের লোকটা গলায় চশমা ঝুলিয়ে মুখে ফেনা ঝরিয়ে লেকচার ঝাড়ছেন তো ঝাড়ছেনই:
‘অ্যাবওরিজিনদের প্রায় পঁয়ষট্টি শতাংশই হচ্ছে ফার্স্ট ন্যাশনস, তিরিশ শতাংশ মেটিস, আর চার শতাংশ হলো ইন্যুয়িট…।’
দুইদিন ভাবি এসে ওকে ছাড়িয়ে নিয়ে অ্যাস্কর্ট করে বাইরে এনে ছেড়ে দিলেন, আর আরিফ ‘আউযু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম,’ পড়তে পড়তে দ্রুত নিষ্ক্রান্ত হয়েছিল। তারপর থেকে ভাবির শলাপরামর্শে নতুন স্ট্র্যাটেজি নিল আরিফ, বুড়ো যে যে সময়টায় ওকে খুঁজতে আসেন সেসময়টায় আরিফ বাসায় অনুপস্থিত থাকতে লাগল।
তারপরও বুড়ো কেমন করে জানি টের পেয়ে যান। বলেন, ‘অ্যাকেডিয়ান কারা ছিল, জানো তো…জানো না? মন্ট্রিয়্যালে এত ফ্রেঞ্চ স্পিকিং পিপল কেন‒এই প্রশ্ন করলে আগেরটার উত্তর বেরিয়ে আসবে…।’
আরিফ ঘনঘন অনুপস্থিত থাকতে লাগল বাসায়। এই অনুপস্থিতি ভালোই হলো একদিকে–ভাবল আরিফ, এখানে আসার সাথে সাথে চাকরিতে যোগ দেয়ায় এলাকাটাকে চেনা হয়ে ওঠেনি।
এখন ঘুরে ঘুরে সে দেখছে। মাঝেমধ্যে সে চলে যাচ্ছে টরোন্টোর বাঙালিপাড়ায়, সেখানে বাংলাদেশি রেস্তরাঁয় বসে পুরি-চপ খেতে খেতে দুইচারজন বন্ধুবান্ধবও যুগিয়ে ফেলল। টরোন্টোতে পা দিয়ে খুব দ্রুত যারা চাকরি পেয়েছে, আরিফ তাদের একজন। মধ্যপ্রাচ্যে তার বিপুল অভিজ্ঞতা, ফর্কলিফটিংয়ে দক্ষতা, এসব কারণে তার চাকরি হতে সময় লাগেনি।
…এভাবে কালো বুড়োর সাথে লুকোচুরি খেলার পালায় একদিন সাদা শয়তানের দেখা মিলে গেল। শয়তানটা গ্রীষ্মের কড়া দুপুরে একটা কোট গায়ে দিয়ে মার্লি স্ট্রিটের মাথায় ল্যাম্পপোস্টে হেলান দিয়ে বসে ভিক্ষে করছিল। কোনো পথচারী দেখলেই হ্যাটটা বাড়িয়ে দিচ্ছে হ্যাটের খোঁড়লে পয়সা ফেলার জন্য। আরিফ কাছে এসে লক্ষ্য করে দেখল, এটা সেইরাতের সেই শয়তানটা ছাড়া আর কেউ নয়। সেই থ্যাবড়া আর লালচে-ফর্সা মুখ। তবে ঘাপটি মেরে বসে থাকার কারণে অতটা লম্বা তাকে লাগছে না। এই লোকটা যে সেইরাতের শয়তানই, আরিফের কোনো সন্দেহ রইল না। তার চিবুকের সেই গোল চওড়া তিলের ওপর জমা স্বেদবিন্দু গ্রীষ্মের রোদে চকচক করছে; সেইরাতে আরিফ বোধহয় লোকটার চোখের দিকে তাকানোর চাইতে এই তিলটাই বেশি দেখছিল।
আরিফ সোৎসাহে লোকটার একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল, এ যখন সত্যিই শয়তান নয়, তখন সেইরাতে তাকে খাবার দেয়ার জন্য নিশ্চয়ই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। আরিফ বলল, ‘হ্যালো।’
লোকটা একথায় নির্বিকার চোখে তাকাল। সাথে সাথে টনক নড়ল আরিফের, লোকটা ওকে চিনতে পারেনি! সেইরাতে আরিফের মাথা ও মুখমন্ডলের প্রায় সম্পূর্ণটাই ঢাকা ছিল টুপিতে।
আরিফ পয়সা দিচ্ছে না অথচ অন্যান্য পথচারীর দৃষ্টি আগলে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে লোকটার চোখেমুখে অধৈর্য ও বিরক্তি ফুটে উঠল। আরিফ চটজলদি মানে মানে কেটে পড়ল। এসে দাঁড়াল হটডগ স্ট্যান্ডে। একটা বিফ হটডগের অর্ডার দিল হটডগওয়ালাকে। হটডগের লোকটা বলল, ‘ওই পাগলটার সামনে দাঁড়িয়ে কী করছিলে তুমি? লোকটা কিন্তু হঠাৎ হিংস্র হয়ে ওঠে এবং আক্রমণ করে বসে। হোমলেস।’
সাদা শয়তানের কবল থেকে দ্বিতীয়বারের মতো মুক্তিলাভ করে আরিফ দ্রুত পদচালনায় স্টাইরেক্স অ্যাভেনিউগামী বাসে চড়ে বসল। বাসে বসেই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, এক কালো শয়তানের শিকারে পরিণত হবার পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য সে শিগগিরই কোনো কোম্পানিতে আবেদন করে ফর্কলিফটিংয়ের কাজে ঢুকে যাবে। গভর্নমেন্টকে জানিয়ে দেবে এম্লোয়মেন্ট ইন্স্যুরেন্স-এ সে আর থাকবে না।
আরিফ যখন এসব ভাবছিল, তখন পিঠে খোঁচা খেয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখল কালো শয়তান বসে মিটিমিটি হাসছে।
কালো শয়তান বলল, জানো দূর ও নিকট অতীতে এই ফার্স্ট ন্যাশনস অনেক অত্যাচারিত হয়েছে। এখনও তারা সুবিধাবঞ্চিত। হারপার গভর্নমেন্টের একটা কিছু করা উচিত, কী বলো। আরিফ সামনে ডস রোড নেমে যাবার উদ্দেশ্যে সিটের পাশে স্টিলের রডের বসানো বোতাম টিপে দিল।
‘সে কি, ডস রোডে নামছো কেন, বাসায় যাবে না?’
‘না, আমি রাতে বাসায় যাব। কাল সকালে সোজা ওটাওয়া চলে যাব। সেখানে গিয়ে অনারেবল হারপার সাহেবকে বলব তিনি যেন ফার্স্ট ন্যাশনসকে সুবিধাদি দেন আর আমাকে যেন সাদা আর কালো শয়তানের থাবা থেকে বাঁচান।’
আরিফ ডস রোডে নেমে হাঁটতে লাগল। সে ভাবছে, রাতের কোন্ সময়টায় বাসায় গেলে কালো শয়তানের খপ্পরে পড়বে না।
(গল্পে উল্লেখিত টরোন্টো শহরের কয়েকটি স্থানের নাম এবং গল্পের চরিত্রগুলোর নাম কাল্পনিক। এর সময়কাল কল্পনা ও বাস্তবের মিশেল)।14 Comments-
-
-
তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 16 March 2023 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!
-
-
-
-
Friends
আহমেদ হানিফ
@hanif
Payel Akhter Jyoti Nur
@payel
মো: কামরুল হাসান (অপু)
@kamrul-hasan
Md Joynul Abedhin
@j-a-sagor
রওনক নাহার "রুনু"
@rodela-dupor
Mahira S
@rahman-n-zinnia
মেহজাবিন হাসান
@mehzabinh
Iqbal-Ahmad
@iqbal-ahmad
Ashaduzzaman-Khokon
@ashaduzzaman-khokon



মেঘলা দিনটা পুরো জমিয়ে দিয়েছেন! দুর্দান্ত গল্প!