-
ধারাবাহিক গল্প
:::::::::::::::::::::#জমশেদ আলীর মেহমানদারী
—— শাহ্ কামাল
(৪)
কালা আজগরের বাড়ির দিকে রওয়ানা করে জমু। আসেপাশে তাকায় আর হাঁটতে থাকে।লোক লস্কর তো কম আর বলা হয়নি মেহমানদারীতে।কালা আজগরকে না বললে খারাপ দেখা যায়।কালা আজগর এ গ্রামের গর্ব।এক সময় ঘুড়ি ওড়ানোতে সে চ্যাম্পিয়ন হতো।রোজ বিকেলে তার বাড়ি বসতো গাঁজার আসর।পুলিশের ঝক্কি সামাল দিতে মেলা বেগ পেতে হতো। তাই আর ছাইপাশ বেচাবিক্রি করে না। বয়াতির ভাবটা বাপদাদা থেকে পেয়েছে কালা আজগর। গ্রামে আজগর দুইটা। সহজে চেনার জন্য গাঁয়ের লোক এই নামে ডাকে তারে। গায়ের রং মিচমিচে কালোপ্রায় সন্ধ্যায় গানের আসর বসে তাঁর বারান্দায়।বেবাক লোক মেহমানদারীতে দাওয়াত পাচ্ছে জমু’র বাড়ি। কালা আজগর বাদ পড়লে ময়মুরুব্বী দুএক জন বাদ পড়বে।তাছাড়া সে হাতে গোণা কয়েক জনের মধ্যে একজন।জমু তাঁর বাড়ির কাছে এসে গেছে।দূর থেকেই শোনা যাচ্ছে আজগর আলীর গানের গলা,
‘কারে ও মন আপন ভাবো
কেউ তো তোমার আপন না
জগতে চলছে শুধু ভাবের বাহানা
আপন আপন করে তুমি
দিলা যারে মন
জানো কী জানো ও সে
নয় তোমার আপন…..
জমু গান শুনতে শুনতে কালা আজগরের উঠোনে এসে পরে। তাকে দেখে দোতরা থামায় আজগর। বলে,
– কেমন আছো জমু?
– আলহামদুলিল্লাহ ভালা। তুমি আছো কেমন?
– আছি। আলহামদুলিল্লাহ,ভালাই। মাওলার ইচ্ছা।
– সবই তো তাঁর ইছ্ছা। গানডা থামাইলা ক্যান? কত সোন্দর কথা… কেউ আপন না….
– তোমারে দেইখা থামলাম।
– এইডা বানলা কবে? আগে শুনি নাই।
– নতুন বানছি।
কথার ফাঁকে জমুকে বসতে বলে আজগর। জমু বারান্দায় বসে। বারান্দার এক পাশে কাত হয়ে শুয়ে আছে গেদু পাগলা। লোহার রডটা মাথার কাছে দাঁড় করে বা কাতে শুয়ে আছে সে। আজগর জমুকে প্রশ্ন করে,
– অবেলা কী মনে কইরা আসলা?
– তেমার বাড়ি আসতে টাইম লাগে? মন চাইলে আইসা পরি।
– মাইকে এলান শোনলাম। তুমি মেহমানদারী করবা।
– হ সত্যই শোনছো। যাইবা কিন্তু?
– যামু। ইনশাল্লা যামু।
– সামনের শুক্কুর বার। জুমা বাদ। হাঁসের গোশত দিয়া চিকন চাউলের গরম ভাত।
– যামু। রিযিকের বেপার। আল্লা নিলে যামু, ইনশাল্লা।
– শুইনা খুশি হইলাম।
– একটা কথা….
– কী কথা?
– আমারে হাঁসের মাথা দিতে হইবো।মাথা মেলা পছন্দ আমার।
জমু হাসতে হাসতে কালা আজগরকে হাঁসের মাথা দেবে বলে সায় দেয়। আজগরের এগারো বছরের মেয়ে ঝুনঝুনি ওর বাপের পাশে এসে বসে। ঝুনঝুনির একটা স্বভাব ভাল। বাড়িতে কেউ আসলে তাঁর খোঁজ খবর নিতে মনটা আনচান করে। স্বভাব সুলভভাবে জমুর সাথে তার কথা হয়,
– সালামালাইকুম কাকা।
– অলাইকুম আসসালাম।
– কাকী – চম্পা বু্ কিমুন আছে?
– ভালা। সবাই ভালা-ই আছে।
– তোমার মা কই? দেখতাছি না।
– মা শাক আনতে কাসু দাদার মাচান বাড়ি গেছে। আফনেরে শরবত দেই এক গেলাস।
– খাওয়াইবা? দ্যাও।
– যাই কাকা, বানায়া আনি।
– যাও। লেবু পাতা কচলাইয়া দিও। বাস আছে একডা।
– আচ্ছা, কাকা।ঝুনঝুনি চলে যায় জমুর জন্য শরবত বানাতে। কালা আজগর মেয়ের সুনাম পারতে থাকে। বাব মা আজব এক সৃষ্টি খোদা তায়ালার। নিজের ছেলেপুলে একটু সংসারের প্রতি মনোযোগী থাকলে বাবা-মায়ের বুক ভরে যায় খুশিতে। সবার সাথে তা বলেও বেড়ায়। জমু আর আজগরের কথার মাঝে আধো ঘুমানো গেদু পাগলা জেগে উঠে। মহাঋষি যোগী পুরুষের মতো ভাব নিয়ে দু হাটু পেতে বসে গেদু। জগতে চিন্তার কতো কছিু। তার সবটা যেন ভর করেছে গেদুর উপর। “হ্যাৎ মাওলা…” বলে চোখ বন্ধ করে চুপ থাকে সে। জমু আর আর আজগরের দৃষ্টি পরে। ঝুনঝুনি দু গ্লাস শরবত আনে। এক গ্লাস বাবার জন্য। অন্যটা জমুর জন্য। কাঠ ফাটা রোদ্দুর না থাকলেও একটু গরম গরম লাগছে আজ। জমু শরবতের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলে,
– খুব ভালা হইছে। শ্বশুর বাড়ি যতনে থাকবা। আমার চম্পাও ঘরের কাম কাজ করে মা’র সাথে।
শরবত খেয়ে অন্যদিকে রওয়ানা দেয় জমু।মাগরিবের আজান হবে একটু পর। প্রকৃতির নীরবতা স্পষ্ট হচ্ছে চারদিকে। রোদেও তেজ নাই। বিকেলটা বলছে শীত এসে গেছে। শীত আসতে দেরী আছে এখনো। এক ঝাঁক বক ওড়ে যাচ্ছে। ঠিকানা স্থায়ী না হলেও তাদের একটা থাকার জায়গা আছে। চিন্তা নাই, ভাবনা নাই। পেটের কোন দায় নাই। ভর পেটা থাক আর আধ পেটা থাক কোন অভিযোগও নাই তাদের। কাল আবার বেরুবে বাসা থেকে।
গোলাপজাম বিবি এমন সময় একটা মাটির ঘটিতে পানি নিয়ে ঘরের চারদিকে ছিটিয়ে দেয়। জ্বিন সাধন সহজ বিষয় না। মেলা নিয়ম কানুন। যদিও বই পুস্তকে এসব নিয়ম কানুন থাকে না। বইয়ের নিয়মে তো আর জ্বিন চলে না। জ্বিন চলে নিজের নিয়মে আর তাদের নিয়ে কতো যে নিয়ম রসম এ জগতে আছে তা কেউ জানে না। গোলাপজামের সাথে যে জ্বিনদেও কথা র্বাতা হয় তারা নানান কিসিমের। কেউ বোবা জ্বিন, কেউ নেক জ্বিন, কেউ বদ জ্বিন। কোন কোনটা আজোর জ্বিনও। ওরা জঙ্গলে আর তে-পথে থাকে। একবার ধরলে সহজে ছোটে না। জমু কতোবার কতো জ্বিন দেখার জন্য উঁকি ঝুঁকি মেরেছে নিজের ঘরেই। দেখে নাই। ঘরের চারদিকে সন্ধ্যা বেলা গোলাপজাম বিবি যে পানি ছিটায় তা মন্ডলের গাঁয়ের দরগা বাড়ির বড়ো হুজুর পরে দিয়েছে। নিয়মতি ছিটিয়ে দেয় বলেই তাঁর ঘরের সবাই সহী সালামতে আছে। এটাই গোলামজাম বিবির বিশ্বাস। তাঁর এ বিশ্বাসকে কটাক্ষ করে আজ পর্যন্ত কোন কথা বলেনি জমু।
ঘরের মেঝেতে লম্বা গোছের ঘোমটা টেনে কুরআন তিলোয়াত করছে গোলাপজাম বিবি। বাবার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কাঠের চৌকিতে বসে আছে জমু। পাশে চম্পাও আছে। কোন কথা বলে না। দু’জনেই কুরআন তিলোয়াত শুনছে। তিলোয়াতের সময় কথা বললে আল্লাহ নারাজ হয়। আল্লাহ নারাজ হন এমন কাজ করলে সমস্যা। বালা মসিবত এসে পরতে পারে। তাই কোন কথা বলে না জমু আর চম্পা। চুপ থাকলে মেলা সওয়াব। অক্ষরে দশ নেকী। ওযু করে শোনলে দশেরও বেশি। ওরা ওযু করেই বসে বসে ককুরআন তিলোয়াত শুনছে।
এশার আজান আরম্ভ হবার সাথে সাথে গোলাপজাম বিবি’র তিলোয়াত থেমে যায়। গিলাফ লাগিয়ে কুরআন শরীফ চুমু খেয়ে তিলোয়াত বন্ধ করে সে। আজান শেষ হতেই জমু প্রশ্ন করে বউকে,
– চম্পার মা, দিনক্ষণ আগায়া আসতাছে। আজ মঙ্গলবার।
– আমি কী করতাম? আমার কী কিছু করোন লাগবো?
– তোমার কাছে কত টেকা আছে?
গোলাপজাম একটু রাগ করে উত্তর দেয়,
– আমার কাছে কত দিছেন আফনে? এই সপ্তা কাজ কাম করছেন কিছু? বইসা খাইলে রাজার ভান্ডার ফুরায়। আফনে ত রাজাও না। আফনের ফুরাইবো ঘরের চালা..
– রাগ কইরো না বউ। আছে কতো?
– তিনশো। হইবো আফনের?
– কী কও! এই টেকায় ক্যামনে হইবো?
– দাওয়াত দিবেন জিগাইছেন একবার? সখ হইছে মেহমানদারী করাইবেন। করান..
– সমস্যা নাই। আম গাছ বেচার টেকাটা তো পামু লতু ভাইয়ের কাছে। কাল নিয়াসমু যাইয়া।
– আইনেন। এতো মানুষ বলতাছেন। চম্পার নানারে বলেন নাই?
– এই দ্যাহো। ভুল হইয়া গেল। উনিও তো মুরুব্বী। বলা দরকার। কাল যামু নে।
– যাইয়েন। অহন যাইয়া নমাজ পইরা আসেন।(চলবে)
7 Comments
Friends
Rakib Rakib
@abdurrakib
Md Ashfak Sayed
@ashfak
আব্দুল মজিদ মারুফ
@abdulmojid
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
Foyzur Khan
@foyzur-khan
sanjida akter jim
@sanjidajim



পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম।