-
ধারাবাহিক গল্প
:::::::::::::::::::::#জমশেদ আলীর মেহমানদারী
—— শাহ্ কামাল
(১৬)
ইমদাদ হাসে। এ হাসি তার স্বভাবের। কিছু মানুষ শুধু শুধু হাসে। কেউ আবার না হাসলেও বোঝা যায় হাসছে। ইমদাদ তেমন না। ওর হাসিটা খাঁটি হাসি। হাসার সাথে সাথে তাঁর কয়েকটা দাঁত দেখা যায়। হাসার সাথে সাথে দাঁত বের হলে তাকে বিশ্রী লাগে না। কিছু মানুষের হাসির সময় দাঁতের জন্য সৌন্দর্য বেড়ে যায়; অনেককে বিশ্রীও লাগে। ইমদাদ সে ধরনেরই একজন। সে জমুর কথার জবাব দেয়,
– আমার কথা বলছে!
বলেই সে আবার হাসে। জমু বলে,
– হ। তোমার কথা কইলো। কিন্তুক তোমার কথা ক্যান কইলো তা বুঝলাম না।
– আমি কী করে বলি চাচা। তবে আমি খারাপ কোন কাজে যাই না। নামাজ পরি। বাবা-মায়ের কথা শুনি। মানুষের উপকার করি।
জমু চুপ থাকে। তেমন কিছু বলে না। তবে মনে মনে সে তারিফ করে ইমদাদের। বড়ো ভালো পোলা। সবার ঘরে এমন পোলাপান থাকলে কী ভালোই না হইতো। আহ। আফসোস করে জমু।
ইমদাদ বারান্দার দিকে যায় জবাই করার জন্য হাঁসটা আনতে। হরিহরের নাতি, টুকুন আরো কয়েকজন ছেলেপুলে যায় ওর সাথে। চম্পা ওদের দেখে একটু দূরে সড়ে যায় গোলাপজামের কাছে। ওর মনটা খারাপ হয়ে যায়। এ বাড়িতে সে একা একাই থাকে। সঙ্গী-সাথী নাই। হাঁসটা ভোর হতে তাঁর সঙ্গী হয়ে আছে। কেমন যেন একটা মায়া পরে গেছে। ইমদাদ বাঁধন খুলে হাঁসটা হাতে নেয়। হাঁস ডাকতে থাকে প্যাঁক প্যাঁক। বাড়ির সামনের দিকের রাস্তাটায় ইমদাদ এগোয়। সাথে এক দল ছেলেপুলে। রাস্তার পশ্চিম দিকটায় বড় একটা দিঘী। জমুর কোন মালিকানা নেই এই দিঘীতে। যৎ সামান্য যাই ছিল মরার আগে তাও বেঁচে দিয়েছে জমুর বাবা।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে দু’চার জন দাওয়াতী মেহমানও এসে জুটেছে।গেদু পাগলা, দাদন মিয়া, তোতা মিয়াকে দেখা যাচ্ছে জমুর বাড়ি।গাঁও-গ্রামে কোন অনুষ্ঠান হলে এমন মানুষজন জড়ো হয়। জমুর বাড়িতে সে তুলনায় লোক লস্কর তেমন নেই। গেদু পাগলা ঘোরাঘুরি করছে। দাদন মিয়া আর তোতা মিয়াকে চেয়ারে বসতে দিয়েছে। ইমদাদ হাঁস জবাইয়ের জন্য ছুরি চায় জমুর কাছে। ছুরির কথা শুনে জমু থ হয়ে যায়। অনেকদিন হাঁস মুরগি জবাই হয় না জমুর বাড়ি। শেষ কবে এক টুকরো গোশত কপালে জুটেছে তা তাঁর মনে পড়ে না। ঘরে ছুরি ছিল একটা। তা এখন কোথায় কে জানে? খুঁজে পাওয়া গেলেও তাতে ধার থাকে কিনা তা নিয়ে সন্দেহে পড়ে যায় জমু। সে ঘরের দিকে এগোয়। গোলাপ জামের কাছে ছুরি চাইতেই রেগে যায়। কিন্তু মানুষের সামনে মেজাজ দেখায় না। বাতাসার নানী বলে, ছুরি টুরির দরকার কী? বটিটা নে। ধার দিছি। সোন্দর কইরা জবা হইবো।
জমু হাত বাড়িয়ে বটিটা হাতে নিয়ে হাঁসের দিকে এগিয়ে যায়। জমু হাঁসটা হাতে নিয়ে ডানা-পা একমুঠো করে ধরে জবাহের জন্য। চিারদিকে জটলা। হাঁস জবাই করা দেখবে সবাই। এক হাঁসে এতা মানুষের মেহমানদারী কিভাবে হবে তা নিয়ে আলাপ করছে দাদন আর তোতা। দূর হতে একটা সোড়গোল শোনা গেল। পালকি ওয়ালার মেয়ের জামাইয়ের ঘোড়ায় চড়ে দৈনিক সোনালী দিনের পত্রিকার সাংবাদিক শফি আসছে জমুর বাড়ির দিকে। পিছু পিছু মোকলেসও আছে। সচরাচর এ ঘোড়া এ এলাকায় দেখেনি কেউ। কারো বাড়ি বিয়ে হলে ফুলপুরের হাই প্রোফাইলের মানুষজন এ ঘোড়ায় চড়ে। শফি সাংবাদিক মানুষ।চেয়ারম্যান আসবে জুম’আ বাদ। এলাকার নিউজ হবে পত্রিকায়। সম্মানের বিষয়। সে নিউজে চেয়ারম্যানের নামও থাকবে। সে খুশিতে চেয়ারম্যান কিছুটা গদগদ হয়েই শফিকে ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে পাঠিয়েছে নিউজ সংগ্রহের জন্য। শফির ঘোড়া জমুর বাড়ির কাছাকাছি আসতেই সব ছেলেপুলে ওদিকে নজর দিলো। ইমদাদ হাঁসের গলায় বটিটা ধরতেই ঘটল অঘটন। ঘোড়া দেখে সব ছেলেপুলে যখন হৈ করে ওদিকে দৈাড় দিতে চাইলো এমন সময় জমু সেদিকে নজর দেওয়ার সাথে সাথে হাঁসটা হাত থেকে ছুটে গেল। ইমদাদ ধরতে গিয়েও ধরতে পারল না। হাঁসটা জমুর উঠোনের দিকে না গিয়ে উড়াল দিল দিঘীর জলে।
তোতা আর দাদন হায় হায় করতে লাগলো। কেমন একটা ঘটনা ঘটল। বাতাসার নানী দৈাড়ে এসে জমুকে বলল, – জমুরে, হাঁসটা ধর। দেরী হইয়া যাইবো তো।
জমু হা করে রইলো। এটা কি হলো চোখের সামনে। দিঘী হতে হাঁস ধরা তো সহজ কাজ নয়।
ছেলেপুলের ভীর ঠেলে শফির ঘোড়া জমুর উঠোনে। শফি ঘোড়া থেকে নেমে জমুর দিকে গেল। সাথে মোকলেসও। জমুকে সালাম দিয়ে মোকলেস বলল,
– জমু ভাই, দ্যাহো সাম্বাদিক আইছে। তোমারে নিয়া নিউজ করব।
জমুর মুখে হাসি নেই। চিন্তার কোন ছাপও চোখে পড়ছে না। কিঞ্চিৎ হতাশার একটা রেখা তাঁর কপাল জুড়ে। সাংবাদিক যে কি বস্তু তা সে জানে না। চায়ের দোকানে সে খবরের কাগজ পড়তে দেখেছে অনেককে। এ কাগজের খবরগুলো যারা সংগ্রহ করে তাদের যে সাংবাদিক বলে এ কথা জমুর জানা নেই। হাত তুলে শফিকে সে সালাম দেয়,
– সালামু আলাইকুম। আপনে আসছেন খুশি হইছি। কিন্তুক অঘটন ঘইটা গেল।
– ওয়ালাইকুম আসসালাম।কী ঘটেছে?
শফির প্রশ্ন শুনে দিঘীর দিকে হাত উঁচিয়ে জমু বলে,
– জবা দেবার সময় হাঁসটা ছুইটা গেল…
– কী বলেন! ধরার ব্যবস্থা করেন। সময় তো অনেক হচ্ছে।
– ধরতাছি। আপনে বসেন।
মোকলেসের কাছে ব্যাপারটা ভাল লাগলো না। শফিকে সে একটা চেয়ার এনে দিলো। শফি চেয়ারে বসার পর মোকলেস জমুকে বলল,
– ক্যামনে কী হইলো।
তাকে একটা ধমক দেয় বাতাসার নানী,
– চুপ কর ছ্যাড়া। যাইয়া হাঁসটা ধইরা আন।
মোকলেস গাঁয়ের ছেলে। সাঁতারও জানে ভাল। সে লুঙ্গি কাছা দিয়ে এক লাফে নামে দিঘীতে। ইমদাদও পানিতে নেমেছে। হাঁস ডুব মেরে এক দিক হতে আরেক দিকে যায়। মোকলেস আর ইমদাদও সাথে সাথে ডুবে দেয়। কিন্তু হাঁসটা ওদের ধরা দেয় না। ক্লান্ত হয়ে ইমদাদ পাড়ে চলে আসে। জমু নিজেই নামে দিঘীতে। ডুবের পর ডুব দিতে থাকে সে। হাঁসটা সবাইকে ক্লান্ত করে।(চলবে)
7 Comments
Friends
Rakib Rakib
@abdurrakib
Md Ashfak Sayed
@ashfak
আব্দুল মজিদ মারুফ
@abdulmojid
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
Foyzur Khan
@foyzur-khan
sanjida akter jim
@sanjidajim


চলুক।