Profile Photo

mahamuda khaunOffline

  • mahamuda
  • Profile picture of mahamuda khaun

    mahamuda khaun

    4 years ago

    হারিয়ে যাওয়া হীরকযুগল
    মাহামুদা খাতুন
    বাড়িছাড়া সেই কবে থেকে। প্রয়োজনের তাগিদে নিজের শহর ছেড়ে পাড়ি জমাতে হয়েছে অন্য শহরে। নাড়ির টানে প্রতি বছরান্তে আসা হয়।
    পলেস্তারা খসে পড়া একতলা বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে পুরানো স্মৃতির খাতাটা খুলে ধরলাম। চারিপাশের পরিবর্তনের মাঝে পুরানো দিনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন বাড়িটা। দেওয়ালে ছোপ ছোপ লেগে থাকা সবুজ শ্যাওলার আধিপত্য বলে দিচ্ছে বাড়িটার বয়স নেহায়েত কম না। একসময় লোকজনে ভরা বাড়িটা আজ নির্জনতার বোঝা বহন করছে।শৈশব থেকে কৈশোর হয়ে যৌবন পর্যন্ত অসংখ্য ছোট বড় স্মৃতি মিশে আছে এই জরাজীর্ণ বাড়িটার প্রতিটা ইটের সাথে। সরু সিঁড়ি বেয়ে উঠা উদোম ছাদের সাথে স্মৃতি হয়ে আছে অসংখ্য জ্যোৎস্না রাত। নারিকেল আর সুপারি গাছে ঘিরে থাকা প্রশস্ত উঠোনটা সাক্ষী হয়ে আছে খেলায় মেতে থাকা অগণিত বিকেলের। মনের কোণে উঁকি দিচ্ছে কড়া রোদে টিনের ছাদে বসে থাকা ঘুম ফাঁকি দেওয়া খাঁ খাঁ দুপুর, বৃষ্টিস্নাত বর্ষার দিনগুলো।
    দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই চোখ কুঁচকে গেল। ধাতস্থ হয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লাম।পূর্ব দিকের ঘরটা খুলে ভেতরে ঢুকতেই গুমোট ভাবটা জেঁকে বসল। জানালা খুলে দিয়ে গুমোট ভাবটা দূর করলাম। দরজা দিয়ে ঢোকার মুখে মাকড়সার জাল এসে মাথা-মুখ জড়িয়ে ধরল। ধূলার আবরণে ঢেকে থাকা খাটটাতে বসতেই ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে তার দুর্বলতার প্রমাণ দিল।মনের পর্দায় জেগে উঠল প্রিয় দুজন মানুষকে ঘিরে ফেলে আসা অসংখ্য স্মৃতি।
    ক্ষণিকের জন্য মন নাড়া দিল হারিয়ে যাওয়া সোনালী অতীত। প্রতিদিনের বাঁধাধরা রুটিন মেনে বড় হওয়া জীবনে নিয়ম ভাঙ্গার মজাই যেন ছিল আলাদা। তবুও কড়া ব্যক্তিত্বের দুজন মানুষের নিশ্চুপ চাহনী উপেক্ষা করে নতুন নিয়ম গড়ার সুযোগ পাওয়া ছিল রীতিমত দূর্লভ ব্যাপার।
    আমাদের ছিলনা কোন পোশাকের জৌলুস। ছিলনা হালফ্যাশনের আসবাব, মান্ধতা আমলের যা কিছু ছিল তাও আবার নিত্যান্ত প্রয়োজন মেটানোর জন্য। বিলাসিতার ছিটেফোঁটাও স্পর্শ করতে পারেনি আমাদের। আশেপাশের পরিবেশ যে একদমই প্রভাব ফেলতে পারেনি তা কিন্তু না।মাঝে মাঝে নিয়ম ভাঙ্গার নেশা ধরতো। শাসনের প্রাচির ভাঙ্গার অনিয়ম হয়েছে বহুবার। কড়া শাসনের বলয় টপকে নর্দমায় ঝাঁপ দিয়ে পচা শামুকে পা কেটেছে অসংখ্যবার।
    নিয়ম করে ঘুম থেকে উঠা আবার নিয়মের মধ্য থেকেই ঘুমাতে যাওয়ার মত নিত্যদিনের অভ্যাসে মাঝে মাঝে চিড় ধরাতে যে ইচ্ছা জাগতো তাও হজম হয়ে যেত। মায়ের বকুনি আর বাবার শীতল চাহনী উপেক্ষা করে এসব করাকে দুঃসাহসিকতা মনে হত। তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাওয়া এবং ফজরের সময় পড়তে বসা নিয়মের অন্যথা করার সাধ্যি কারোরই ছিলনা। জাগতিক শিক্ষা বঞ্চিত গাম্ভীর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী স্বশিক্ষিত মায়ের বুদ্ধিদীপ্ত শাসন এবং স্বল্প শিক্ষিত, স্বল্পভাষী আর রাশভারী বাবার জ্ঞানের কদর তখন না বুঝলেও এখন তা হাড়ে হাড়ে অনুভূত হয়।
    মানুষ কানে শুনেনা, চোখে শুনে। কথাটা একদম ঠিক। হাজার বার মুখে বলা একটা কথার থেকেও অনেক দামী যদি নিজের ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন সন্তানের মধ্যে ঘটানো যায়। তারা তাই করেছিলেন। তাইতো আজও তারা অমলিন।হৃদয়ের আকাশের নক্ষত্র তারা। মানুষ তাই করতে পছন্দ করে যা সে চোখে দেখে। সন্তানের সামনে নিজেকে তেমনভাবেই উপস্থাপন করার উচিৎ যেমনটা তার কাছ থেকে আশা করা হয়। এই কঠিন সত্যটার অদ্ভুত প্রতিফলন ঘটেছিল তাদের মধ্যে। নিয়মের কথা যতটা মুখে বলতো তার থেকে বেশী নিজেদের আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ করত। বাড়াবাড়ি মনে হলেও মনের অজান্তেই কখন মন মননে সেইসব আচরণের স্থায়ী প্রভাব পড়ে গেছে তা যেন বুঝতেই পারিনি।একদিনের ঘটনা আজ খুব মনে পড়ছে।
    রাত দশটার মধ্যে ঘুমিয়ে ভোরে উঠে ফজরের নামাজ পড়ার নিয়মটা যে কখনও ভাংগতে মন চায়নি তা কিন্তু না। সকালবেলার ঘুমটাকে দুনিয়ার সবথেকে দামী মনে হত। জানালা দিয়ে আসা ভোরের বাতাসের ছোঁয়ায় ঘুমিয়ে কাটতে ইচ্ছা করত সহস্র জনম। কিন্তু বেতের বাড়ির ভয়ে শত ইচ্ছাকে পাশ কাটিয়ে অনিচ্ছা নিয়েই উঠতে হত।
    এমনই এক কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমানো শীতের রাতে খটখট শব্দে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। পাশ থেকে ঘড়িটা হাতে নিয়ে দেখলাম রাত তিনটা বাজে। নাহ্ এখনতো সবাই ঘুমে, ফজরের আগেতো কারোর উঠার কথানা। তাহলে শব্দ হচ্ছে কোথা থেকে। বিড়ালের কথা মনে হলেও দেখার জন্য বিছানা থেকে উঠার ইচ্ছা হলোনা। কিছুক্ষণ থেমে শব্দটা আবার হতে লাগল। না পেরে উঠেই গেলাম। ঘর থেকে বের হয়ে দেখলাম আব্বু-আম্মুর ঘরে আলো জ্বলছে। তাছাড়া কলতলায় যাওয়ার দরজাটাও খোলা। ভয়ে শিরশিরে অনুভূতিতে শরীর অবস হয়ে যেতে লাগল।মনে হল ডাকাত ঢোকেনিতো? এখন বোধহয় আব্বু আম্মুর দিকে বন্দুক তাক করে আছে। কি করবো তখন বুঝতে পারলামনা। চিৎকার করা যাবেনা। ডাকাতটাকে ধরতে হলে সাবধানে সবকিছু করতে হবে।পাশে ঘুমানো আপুকে ডাকতে থাকলাম। ওকে জাগানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলাম কিছুক্ষণ।এতক্ষণে ঐদিক থেকে আসা শব্দটাও থেমে গেছে। জানালা দিয়ে বাইরেরটা দেখার চেষ্টা করলাম। দেখলাম বাইরের দরজাটা আটকানো। বাইরে যাওয়ার করিডরটায় এতক্ষণ আলো জ্বললেও এখন সেখানে অন্ধকার বিরাজ করছে। আব্বু-আম্মুর ঘরের বাতিটাও নিভানো। সেখানে এখন ডিম লাইটের মৃদু আলো শোভা পাচ্ছে।
    কি হচ্ছে বুঝতে পারলামনা। দেওয়াল ঘড়িতে ঢংঢং করে চারটা বাজার সংকেত দিল। ফজরের আজানের এখনও একঘণ্টা বাকি। আবার শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘুম আসলোনা। মনে কু ডাকছে। চোখ লেগে আসার সাথে সাথে এক ভয়ানক স্বপ্ন দেখে দশ মিনিটের মাথায় আবার ঘুম ভেঙ্গে গেল। ভয়ানক স্বপ্নটা দেখে থরথর করে কাঁপতে থাকলাম। আস্তে আস্তে আব্বু আম্মুর রুমের দিকে এগিয়ে গেলাম। গিয়ে কি দেখবো জানিনা তবুও এগোতে লাগলাম। বুকে ফুঁ দিয়ে পর্দা সরিয়ে ঘরটার দিকে তাকিয়ে থ হয়ে গেলাম। এক অসম্ভব ভালো লাগায় মনটা ভরে গেল। গভীর রাতে শুভ্রতায় মোড়ানো দুজন মানব মানবীর রবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দৃশ্যটা সত্যিই মোহনীয় ছিল। নিজেকে ধিক্কার দিলাম। এরপর পর পর কয়েক রাত একই দৃশ্য উপভোগ করলাম।
    দুইজন ষাটোর্ধ মানবের কাছে নিজেকে তখন তুচ্ছ মনে হতে লাগল। মনে পড়ল, হাদিসে এসেছে যৌবন বয়সের ইবাদাত শ্রেষ্ঠ ইবাদত। যে পাঁচটি উত্তর না দিয়ে হাসরের মাঠে এক পাও সামনে যাওয়া যাবেনা তার মধ্যে একটা প্রশ্ন হবে মানুষ তার যৌবন কি কাজে ব্যয় করেছে।
    আর এক মূহুর্ত সময় নষ্ট করতে মন চাইলোনা। ধীরে ধীরে রাতের নামাজের সাথে সখ্যতা গড়ে তুললাম। প্রতিদিন নামাজের শেষে সন্তানের জন্য হাত তুলে দুআ করার যে অভ্যাসটা বাবার মধ্যে দেখেছি নিজের মধ্যে তাও রপ্ত করে ফেললাম। অত্যন্ত আবেগ দিয়ে মহান রবের কাছে সন্তানের হিদায়াতের জন্য বাবার মধ্য যে আকুতি দেখেছিলাম তা এ জনমে আর ভুলবো না।
    স্বল্পভাষী বাবার কাছে সবথেকে প্রিয় বই ছিল কুরআন। তার জীবনে অবসর বলে আদৌ কিছু ছিল কিনা জানিনা। সময় পেলেই তিনি কুরআন নিয়ে বসতেন। কুরআনকে ভালোবাসাটাও আমার তার কাছ থেকে শেখা।
    অত্যন্ত সাধারণ জীবনে অভ্যস্ত মানুষটা সামাজিক অবস্থান আর অর্থের মানদণ্ডে হেরে গেলেও আদর্শিক দিক থেকে আজও দখল করে রেখেছে আমার মনের অলিগলি। অজ্ঞানতার কারণে মূল্যবান সেই হীরকযুগোল থেকে মুখ ফিরিয়ে ভঙ্গুর কাঁচের আঘাতে জর্জরিত জীবনের নষ্ট হওয়া মূল্যবান সময়গুলো যে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে তা কখনই শুকাবার নয়।
    দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বুঝেনা মানুষ। বিত্তের আকাঙ্ক্ষা থেকে বের হয়ে আসল আর নকলের পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয় অধিকাংশ মানুষ। সময়ের আবর্তনে খুব কম মানুষেরই বোধোদয় হয়। ভুলের সমুদ্রে ডুবতে ডুবতে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর জীবনের বাকি সময় কাটে আফসোস আর আত্মগ্লানিতে।
    কবি সত্যই বলেছেন, প্রভু ভুল ভেঙ্গে দাও, যে ভুলে তোমাকে ভুলে-হীরা ফেলে কাঁচ তুলে, ভিখিরি সেজেছি আমি।
    সমাপ্ত

    9
    5 Comments
Skip to toolbar