-
“ইন্তিহা, তুমি কি ওয়াশরুমে আছ?”
মায়ের ডাকাডাকিতেও বিন্দুমাত্র শব্দ করল না ইন্তিহা। ওয়াশরুমে দরজা বন্ধ করে সেই যে বসে আছে, ২ ঘণ্টা হয়ে যাচ্ছে এখনো বের হওয়ার নাম নেই। এদিকে পুরো বাড়িতে হৈচৈ পড়ে গেছে কনে পালিয়ে গেছে বলে। কয়েকজন তো ইন্তিহার প্রেমিককে চেনে বলেও দাবি করছে।
এদিকে আবরার বেচারার অবস্থা দেখার মতো হয়েছে। না পারছে কিছু বলতে, আর না পারছে সইতে। ওকে বসিয়ে রেখে ঘণ্টাখানিক হলো সবাই বাইরে গেছে। এখনো কেউ আসছেও না, কিছু বলছেও না। এদিকে বাসায় যাওয়ারও সময় হয়ে গেছে। একটু পর হাসিবকে দেখে আশার আলো দেখল খানিকটা, কিন্তু তার কাছ থেকে এমন কিছু শুনবে—এ সে কল্পনাও করেনি।
“ইন্তিহাকে খুঁজে পাচ্ছি না গত ২ ঘণ্টা যাবত।”
এই একটা কথাই যেন যথেষ্ট ছিল ছেলেটার আত্মা কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য। কিছু বলতে চেয়েও মুখ থেকে কোনো শব্দ বের করতে পারল না সে। হাসিব তার অবস্থা দেখে দ্রুত তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল।
“আমার মনে হচ্ছে ও কোথাও লুকিয়ে আছে। তোমার সাথে দেখা করার কথা শুনে নার্ভাস হয়ে গেছে হয়তো। আমি আমার বোনকে খুব ভালো করেই চিনি। ও আর যাই হোক, আমাদের সম্মানহানি হয়—এমন কিছু করার মতো মেয়ে না।”
আবরারকে আশ্বস্ত করে বিদায় জানিয়ে হাসিব নিজেই উঠে এলো দোতলায়। পুরো রুমে ভালোমতো চোখ বুলিয়ে ওয়াশরুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজায় মৃদু টোকা দিয়ে বলল,
“আবরার চলে গেছে। বের হ।”
২ মিনিট না পেরোতেই দরজা খুলে গেল। ততক্ষণে আসিফ সাহেব আর আমিনা বেগমও এসে দাঁড়িয়েছেন সেখানে। ইন্তিহার নত মুখ দেখেই আমিনা বেগম আর নিজেকে সংবরণ করতে পারলেন না। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চড় বসিয়ে দিলেন মেয়েটার বাম গাল বরাবর। মুহূর্তেই পুরো রুমে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সপাটে আরেকটা চড় পড়ল ডান গালেও। হাসিব এবার দ্রুত ছুটে এসে বোনকে নিজের পেছনে রেখে হুংকার দিয়ে উঠল।
“বোধশক্তি পুরোটাই কি লোপ পেয়েছে তোমার? আজ বাদে কাল তো চলেই যাবে, আজকের দিনেও গায়ে হাত তুলতে হলো তোমার?”
হাসিবের চিৎকারে আরও বেশি তেতে উঠলেন তিনি।
“সমস্ত আত্মীয়স্বজনের সামনে আমার মান-সম্মান মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে এই মেয়ে! এর পরেও একে ছেড়ে দিব আমি? ওকে আজকে আমি কবর দিব। ছাড় তুই!”
হাসিব কোনোমতে উনাকে সেখান থেকে নিয়ে গেল। আসিফ সাহেবের প্রস্থান ঘটেছে বহু আগেই। ইন্তিহা কিছুক্ষণ ঢলতে ঢলতে সোফার ওপর ধপাস করে শুয়ে পড়ল। নিঃশব্দে। নড়চড় করার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই যেন। চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল সে। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়া এক ফোটা অশ্রুও যেন তাকে দেখে উপহাস করে উঠল। প্রতিবাদ করার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই যে!
মধ্যরাতে চুপিচুপি তার ঘরে এলো মালিহা। ইন্তিহার মামাতো বোন সে। কাজিনদের মধ্যে ইন্তিহাকে সবচেয়ে বেশি আদর করে মেয়েটা। ইন্তিহার অমন নিথর হয়ে সোফায় শুয়ে থাকা দেখে বুকটা হু হু করে উঠল মেয়েটার। যেই মেয়েটা কিনা মাত্র এক দিনের ব্যবধানে এই বাড়ির অতিথি হয়ে যাবে, তার আজ এই অবস্থা! ইন্তিহাকে আলতো করে জাগিয়ে উঠিয়ে বসাল সে। এমন রাতের বেলায় মালিহাকে এখানে দেখে অবাক হলো কিছুটা। সেসব পাত্তা না দিয়ে তাকে হাত-মুখ ধুইয়ে ভাত খাইয়ে দিতে লাগল সে। ও প্রথমে খেতে না চাইলেও বড় বোনের জোড়াজুড়িতে আর না করতে পারল না।
“তোর ব্যাপারে আমার কিছুই বলার নাই। শুধু একটা দোয়া করব—আবরার যেন কোনোদিন তোকে কষ্ট না দেয়। তোর জীবনের এই একাকীত্ব, কষ্টগুলো সরে গিয়ে সুখের বাতাস বয়ে আনুক।”
বোনের কথায় কোনো জবাব দেয় না মেয়েটা। শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। কারো প্রতি এতটা আশা রাখা কি ঠিক? যাই হোক না কেন, মানুষ তো! তারা সুখ দিয়েও তার খোটা দিতে ভোলে না।
খাওয়া শেষ করে একটা মেহেদির কোণ নিয়ে খাটের ওপর বসে মালিহা। এটা দেখে ইন্তিহা যারপরনাই অবাকের চরম শিখরে পৌঁছায়। এত কিছু হয়ে যাওয়ার পরেও ও নাকি এখন এই মধ্যরাতে মেহেদি পরবে হাতে, ভাবা যায় এসব! ও কিছু বলার আগেই মালিহার স্পষ্ট সতর্কবাণীতে থেমে যেতে হয়।
“একদম কোনো কথা শুনতে চাই না! বিয়ে কালকে তোর। বিয়ের সময়ে মেহেদি ছাড়া হাত দেখতে কেমন লাগবে বল? যাই হয়েছে ভুলে যা। শুধু একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। এখন এই ব্যাপার নিয়ে আর মন খারাপ করে থাকলে কি হবে বল? দেখি, হাস একটুখানি!”
ইন্তিহার মুখে হাসি আসে না। আসবেই বা কীভাবে? জোর করে কি আর হাসা যায়? মালিহা তাকে এটা-ওটা বলে মন ঘোরানোর চেষ্টা করছে। এদিকে মেহেদির রঙে ভরে উঠেছে দুই হাতের আনাচ-কানাচ।
দরজার ওপাশ থেকে বোনের একটুখানি হাসিমাখা মুখ দেখে বুকের ওপর থেকে একটু হলেও ভারী বোঝা নামে হাসিবের। মালিহাকে সে-ই এতরাতে পাঠিয়েছে খাবার নিয়ে। ছোট থেকে ভীষণ আদরে আদরে বড় করেছে বোনটাকে। কখনো বাবা-মায়ের চোখ রাঙানিও সহ্য হতো না বোনের প্রতি। অথচ রাত পোহালেই তাকে পর করে দিতে হবে! কী অদ্ভুত নিয়ম পৃথিবীর। এই রাতটা কি আর একটুখানি দেরিতে শেষ হতে পারত না? ছোট বোনটা কি আরও একটুখানি দেরিতে বড় হতে পারত না? পারত না বোনটাকে আজীবনের জন্য নিজের কাছে, এই বাড়িতে রাখতে? দুনিয়া এত নিষ্ঠুর কেন?
পুরুষ মানুষের নাকি কাঁদতে নেই, নইলে তারা বীরের স্বভাব হারিয়ে ফেলে। বুকে পাথর চেপেও নাকি গম্ভীর হয়ে থাকতে হয় তাদের। তাই তো সেও কাঁদতে পারে না, কাঁদে না।
“এই, তোর বরের পুরো নাম জানিস তুই?”
মালিহার কথায় হঠাৎ চমকে উঠল মেয়েটা। এ আবার কেমন কথা! লোকটার পুরো নাম কী—সেটা ও জানবে কেমন করে, আশ্চর্য! তাকে চুপ করে থাকতে দেখে ঘরময় হেসে উঠল চঞ্চল মেয়েটা।
“মানে কি? কালকে বিয়ে, আর তুই কিনা বলছিস বেচারার পুরো নামটাই জানিস না? আবরার শুনলে কিন্তু একদম হার্ট অ্যাটাক করবে!”
মালিহার কথায় আনমনে মুখ ভেংচি কাটে সে। উনার পুরো নাম জানতে বয়েই গেছে ওর! ও তো এখনো দেখেইনি পর্যন্ত লোকটাকে। একথা শুনলে কি করবে মেয়েটা? কথা বলতে বলতেই তার হাতের তালুতে ফাঁকা জায়গায় গোটা গোটা অক্ষরে “আবরার সোহরাব” নামটা ভীষণ দর্প ভরে জায়গা করে নেয়। এক অচেনা পুরুষের নাম জায়গা করে নেয় ইন্তিহার হাতে। হয়তো আর কিছু ঘণ্টার ব্যবধানে নামটি তার হাত ছাড়িয়ে হৃদয়ের লুকানো কুঠুরিতেও বীরদর্পে পৌঁছে যাবে, কিংবা হয়তো অনেক আগে থেকেই সেখানে তার আধিপত্য বিস্তার করে রেখে দিয়েছে!
মালিহা যাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মেয়েটা। ঘুম আর ধরা দেয় না দুচোখের পাতায়। অদ্ভুত এক কারণে তার যেন বিয়ে নিয়ে কোনো অনুভূতিই হচ্ছে না। না ভালো, না খারাপ। তবু সুপ্ত একটুকরো আশা এখনো মোমবাতির শিখার ন্যায় জ্বলছে-নিভছে। যদি আবরার লোকটা তার স্বপ্নে দেখা পুরুষটা হতো! তাই তো আজ সাহস পায়নি লোকটার মুখোমুখি হতে। যদি তিনি স্বপ্নপুরুষ না হতো? আর যদি হতোও, তাহলে তো ও শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারত না! মরে যাওয়ার উপক্রম হতো না? লোকটার গভীর সেই কণ্ঠস্বরই তো তার পুরো সত্তা কাঁপিয়ে দিয়েছিল, জ্বর চলে এসেছিল। আর বিয়ের পর তার মুখোমুখি কীভাবে হবে ও?
এমন সব আজগুবি চিন্তা করতে করতে আর ঘুমাতে পারেনি একটুও। সকালের মৃদু রশ্মি যখন জানালার পর্দা ভেদ করে রুমের মেঝেতে নিজের অস্তিত্ব জানান দিল, ইন্তিহার ধ্যান ভাঙল সে সময়। হালকা আলোয় হাত দুটো চোখের সামনে এনে ভালো করে দেখতে লাগল—সুন্দর ডিজাইন। “আবরার সোহরাব” নামখানার ওপর নজর পড়তেই শিহরিত হলো সর্বাঙ্গ। এক পুরুষের নাম! তার হাতে! সাহস কত তার! মুখস্থ হওয়া নামটা সে আবার পড়ল, বারবার পড়ল, প্রতিটা শব্দ পড়ল। নতুন কিছুই পেল না, তবুও পড়ল।
খানিক বাদেই উঠে অজু করে আজানের দ্বিতীয় জবাব দিল! সিজদায় অকারণ বেশি সময় নিল। শেষে দুহাত তুলে একেবারেই শব্দহীন রইল। কোনো বাক্য নয়, কোনো আর্জি নয়; শুধু চুপচাপ রবের দরবারে নিজের অস্তিত্বের জানান দিল। কী বলবে আর, কী-ই বা চাইবে? যে তার জীবনের সব সিদ্ধান্তের ভার, সমস্ত আয়োজনের অভিভাবক হিসেবে সৃষ্টিকর্তাকেই মেনে নিয়েছে, তার আর কী-ই বা চাওয়ার আছে?
আছরের কিছুক্ষণ আগেই পুরো বাড়িতে ডাক উঠেছে, ‘বর এসেছে, বর এসেছে’ বলে। বাচ্চাকাচ্চা সব প্রধান ফটকের কাছে দৌড়ে যাচ্ছে। এদিকে বাড়ির ভেতরে বরপক্ষের জন্য আয়োজনের ধূম পড়ে গেছে, সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে পুরোদমে। এর মাঝে কে যেন এসে ইন্তিহাকেও খবরটা দিয়ে যেতে ভুলল না। চিন্তারত রমনীর এবার যেন মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। ও এখনো বুঝতে পারছে না—এসব কী হচ্ছে তার সাথে! কেন অচেনা এই ভদ্রলোকের কথা শুনলেই তার হৃদস্পন্দন লাফিয়ে বেড়ে যায়? কোন সে কারণে আজকাল চিন্তার বেশিরভাগ জুড়েই তার বসবাস? ‘বর এসেছে’—এই একটা কথাই যেন যথেষ্ট ছিল হৃদছন্দ অনিয়ন্ত্রিত করে দেওয়ার জন্য, কপালে সূক্ষ্ম ঘাম চিকচিক করার জন্য।
কবুল বলার মুহূর্ত পর্যন্ত তার মনে হয়েছিল, এটা বুঝি সব মেয়েদেরই হয়; এ বুঝি সাধারণ এক ঘটনা। তবে বরের মুখখানা প্রথমবার সম্মুখপানে দেখতে পাওয়ার পর আর তেমনটা মনে হয়নি। তখন তো মনে করার মতো অবস্থায়ই ছিল না ও। ভরা মজলিসে অজ্ঞান হয়ে নাটকীয়তার ষোলোকলাই যেন পূর্ণ করে দিল।তোমার আকাশ আমার মেঘ
পর্ব-৩
-তিতা ফুল(গঠনমূলক মন্তব্য করলে উৎসাহ পাবো)
3 Comments-
আপনার লেখা এই অংশটিতে ইন্তিহার মনের অস্থিরতা ও পরিণতির চিত্রায়ণ ভীষণ চমৎকার ফুটে উঠেছে, বিশেষ করে “এক অচেনা পুরুষের নাম জায়গা করে নেয় ইন্তিহার হাতে” এই লাইনটি পুরো পরিস্থিতির গভীরতা খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। পরিবারের টানাপোড়েন আর নিজের ইচ্ছের সংঘাতের এই বিষয়টি অনেক বাস্তবসম্মত ও হৃদয়স্পর্শী হয়েছে, যা প্রায়শই আমাদের চারপাশের জীবনের নানা গল্পের সাথে মিলে যায়। আপনারা চাইলে ইন্তিহার অন্তর্দ্বন্দ্বের অনুভূতির জায়গাটিকে আরও কিছুটা বিস্তারিত রূপ দিয়ে গল্পের গতিপ্রকৃতি এগিয়ে নিতে পারেন, যা পাঠকদের আরও বেশি আগ্রহী করে তুলবে। আপনাদের এই চমৎকার লিখনী চর্চা যেন অব্যাহত থাকে, সেই শুভকামনা রইল।
Friends
Mashuk Hossain
@mashukhossain
Noyontara
@bablee
Sazia Islam Mim
@saziaislammim
Md.Mohsin Ali
@fivertrading007gmail-com
Redowan Hussain
@redowanhussain
নৈশান
@noishan
Hashem Molla
@hashemmolla
Kazi Mahabubur Rahman
@kazimahabuburrahman
mithila jannat
@mithilajannat


অচেনা একজনের সঙ্গে জীবনের শুরু—এই ভয় ও উত্তেজনা খুব বাস্তব!