-
“মুড নেই, এখন বলতে পারবো না!”
আবরারের নির্লিপ্ততায় বাকহারা হয় মেয়েটা। এসব কি ধরনের মজা? তাই বলে এমন একটা ব্যাপার নিয়ে মজা করবে লোকটা?তিনি কি জানেন, কি নিয়ে কথা বলছেন, সেটা ওর কাছে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ!
আবরার উঠে চলে যেতে নিলে হাত টেনে ধরে মেয়েটা। হাতের দিকে একবার তাকিয়ে সরাসরি ওর চোখে চোখ রাখে লোকটা।ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কি?’“ বলুন না!”
ওর এই সামান্য দুটো শব্দে কি যেন মিশে ছিলো আজ।গলায় কান্না দলা পাকানো ভাব। আবরার দ্রুত বসে পড়ে চেয়ারে।
“ আরে তুমি মন খারাপ কেন করছো? সামান্য একটা ব্যাপার! আর আমি মজা করছিলাম,সরি।”
“ আপনি কি দেখতে যাওয়ার আগে থেকে চিনতেন আমাকে?”
“ এমন কেন মনে হচ্ছে তোমার?আচ্ছা, কি হয়েছে বলো তো? আজ তুমি এই ব্যাপার নিয়ে পড়লে কেনো এমন করে?”
ইন্তিহা ঢোক গিলে। বলা যাবে না। স্বপ্নের কথাটা কিছুতেই বলা যাবে না। এতো বছরের অপেক্ষা, আহাজারি, কিছু প্রকাশ করা যাবে না। কি মনে হতেই আবরারের হাত দুটো ধরে মেয়েটা। উল্টেপাল্টে দেখার চেষ্টা করে কনুই অব্দি। কোন দাগ নাই, একটা কাটাছেড়ার চিহ্ন পর্যন্ত না। এ পর্যায়ে এসে ভীষণ অবাক হয় ছেলেটা। প্রথম দিন থেকে খেয়াল করছে , মেয়েটা ওর হাতে কি যেনো খুজে সবসময়। জিজ্ঞেস করলে কিছু বলেও না।
“ একটা সত্যি কথা বলবে?’’
“ কি?”
“ তুমি কি অন্য কারো হাতের সাথে আমার হাতের মিল খুঁজো?”
বাকরুদ্ধ হয়ে যায় মেয়েটা। লোকটা কি ভুল বুঝছে ওকে? তড়িঘড়ি করে জবাব দেয় সে।
“ না না। কার হাতের সাথে মিল খুজবো, আশ্চর্য! কিসব বলছেন আপনি?”
“তাহলে আমার হাতে সবসময় কি দেখো?”
“কিছুনা।” বলেই ও হাত ছেড়ে দেয় আবরারের। ভ্রুকুটি মিশ্রিত চাহনিতে নজর লুকাতে চায়, পারে না।
“ আচ্ছা, বাদ দাও। ভালো খবর আছে একটা।”
“কি?”
“ আগামী শুক্রবার ঘুরতে যাবো আমরা।তিন দিনের ছুটি পেয়েছি। কোথায় যেতে চাও বলো?”
“ আপনার ইচ্ছা।আপনি যেখানে নিয়ে যাবেন, সেখানেই।”
কিছুক্ষন স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সে মেয়েটার দিকে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে অন্যমনস্ক সে। বিষয়টা নিয়ে আর কথা বাড়ায় না আবরার। বলার হলে এমনিই বলবে নাহয়।
–
–
–দেখতে দেখতেই সপ্তাহ পেরিয়ে যায়। বিয়ের পর এই প্রথমবার কোথাও ঘুরতে যাচ্ছে ওরা। ট্রেনে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকায় ইন্তিহার আর তেমন সমস্যা হয় নি। আসলে ও গাড়িতে উঠতে পারে না। যার কারণে আবরার সবসময়ই চেষ্টা করে ওর সুবিধা অনুযায়ী ব্যাবস্থা করতে। রাতের ট্রেন ভ্রমন মেয়েটার ভীষণ পছন্দের। তাই সেই অনুযায়ী টিকিট কাটে এবারেও।
“ আপনি এর আগে কখনো গিয়েছিলেন সাজেক?”
“ দুইবার।”
“ কার সাথে?”
“ একবার বন্ধুদের সাথে, কলেজ থেকে। আরেকবার বাসার সবাই মিলে।”
“ কলেজ থেকে যখন গিয়েছিলেন, মেয়ে ছিলো না সাথে?”
হুট করে ফোনের দিক থেকে দৃষ্টি ঘুরায় ছেলেটা। তাকায় কৌতূহলী নেত্রে চেয়ে থাকা রমণীর পানে। বউ তার গোয়েন্দা হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। একটু না রাগালে কি চলে?
“ ছিলো তো। অনেকজন।”
আবরারের সংক্ষিপ্ত বাক্যে হুট করে রাগ উঠে যায় মেয়েটার। কেন, তা নিজেও জানে না। মেয়ে ছিল বলে, নাকি লোকটা এই কথাটাকে সেভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে, কে জানে।ভেতরে ভেতরে অভিমানও জমে খানিকটা। আবরার প্রশ্নের উত্তর দিয়েই ফোনে নজর দিয়েছে পুনরায়।তবে সমস্ত খেয়াল তার বোকা বউটার দিকেই।
“ আপনি কথা বলেছেন তাদের সাথে?”
“ হ্যাঁ, স্বাভাবিক। একসাথে থাকলে টুকটাক কথাবার্তা হতেই পারে।”
“ কেমন ছিল সেইবারের ভ্রমন?”
“ জিবনের সেরা সময় ছিলো সেটা। কখনো ভুলতে পারবো না। গোল্ডেন টাইম যাকে বলে।”
অহেতুক কান্না পায় মেয়েটার। লোকটা কি বুঝতে পারছে না ওর প্রশ্নের কারন? নাকি ইচ্ছে করেই এমন করছে? করতেই পারে, বলা তো যায় না। পাজি লোক কিনা! তবুও মন মানে না তার।বেহায়া মনের কাছে হার মেনে করেই ফেলে অহেতুক প্রশ্নটা।“ ওরা কি সুন্দরী ছিলো খুব?”
হাসি চেপে রাখতে না পেরে হাত দিয়ে মুখ আড়াল করে ছেলেটা। স্বাভাবিক হয়ে পুনরায় উত্তর দেয় সে।
“ পৃথিবীর সব মেয়েরাই তো সুন্দরী!”
“ যাবো না আমি আপনার সাথে কোথাও। বাড়ি নিয়ে চলুন আমায়। এক্ষুনি!”
হুট করে এমন কিছু একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিলো ছেলেটার কাছে। কোথায় ভেবেছিলো কথায় কথায় জ্বালাবে মেয়েটাকে। বোমা যে এতো দ্রুত ফেটে যাবে, কে জানতো!
“ আরে, আমি আবার কি করলাম? আর এখন বাড়ি নিয়ে যাবো কিভাবে তোমায়? ট্রেন কি আর তোমার স্বামীর কথায় চলবে?”
আরও কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে যায় মেয়েটা। এসব কি করছে সে? মানে আছে কোন এমন ছেলেমানুষির ? জানালার দিকে ফিরে নিশ্চুপ রয় সে।
“ তুমি জানো ইন্তিহা?”
“কি?”
না চাইতেও অবচেতনেই আবরারের কথার জবাব দিয়ে দেয় সে। এতে ঠোঁট চেপে হাসি আটকায় ছেলেটা।
“ কোথায় যেনো কিছু একটা পুড়ছে মনে হচ্ছে। তুমি কি গন্ধ পাচ্ছো, ইন্তিহা?”
লোকটার কথার ধরন দেখেই মেয়েটা বুঝে যায় মজা করছে লোকটা। ইচ্ছে করে এমন করেছে এতক্ষন। আবরারের কথার জবাব দেয় না সে। বাইরে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে। আবরার আলতো করে হাত ধরে ওর। হাত সরায় না, আবার তাকায়ও না লোকটার দিকে।
“ রাগ কি বেশি করেছো?”
উত্তর আসে না। নাহ, বেশি হয়ে গেলো, এতোটা রাগানো ঠিক হয়নি। বউটা এবার সহজে মানবে না দেখা যায়।
“ কথা বলবে না আমার সাথে?”
জবাব আসে না এবারেও। জোর করে এদিকে ফেরালে ওর চোখে পানি দেখে থমকে যায় ছেলেটা। তাই বলে এতো ছোট একটা ব্যাপার নিয়ে কান্না করে ফেলতে হবে?
“ এই, কান্না কেনো করছো তুমি? আমি তো মজা করছিলাম শুধু।”
ইন্তিহা কিছু বলে না। নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলে ভিজিয়ে দেয় আবরারের পাঞ্জাবীর অংশটুকু। হতাশ শ্বাস ছাড়ে ছেলেটা। বউ তার দেখতে শুনতে পরিপক্ক হলে কি হবে, ওর কাছে বাচ্চা হয়ে যায় পুরো।
“ আম সরি।আর হবে না এমন। কান্না থামাও এবার। “
“ সত্যি সত্যিই কি মেয়ে ছিলো সেদিন?”
হাসবে নাকি রাগ করবে বুঝতে পারে না ছেলেটা। এই মেয়ে এখনো সেই কথা নিয়ে পড়ে আছে।
“ আমি পড়েছি বয়েজ কলেজে। সেখানে মেয়ে আসবে কোথা থেকে? তবে মিথ্যা বলিনি তোমায়। আশেপাশে তো মেয়ে ছিলোই কিছু।আমাদের সাথে যায় নি যদিও। আর…”
“আর?”
“ পৃথিবীর সব মেয়েরাই সুন্দরী। তবে আমার চোখে তো আর না!”
তারপর মাথা নিচু করে খানিকটা নিচু স্বরে বলে,
“ আমার চোখে আমার বউই সেরা।অন্যদিকে তাকানোর সময় আছে নাকি?”
“ সরুন, কথা বলবেন না আপনি। “
মুখে যতোই ভাব দেখাক না কেন, আবরারের দুটো বাক্যেই যে তার অভিমান গলে পানি হয়ে গেছে এতক্ষনে।
“কথায় কথায় এতো কান্না কেনো করো তুমি? তুমি রাগ করবে, প্রয়োজনে আমার চুল ছিঁড়বে। তা না করে ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদতেই পারো। আমার বউ হবে স্ট্রং, কথা একটা বললে সাথে সাথে উত্তর চলে আসবে।”
নাক টেনে আড়চোখে চায় মেয়েটা।
“ আমি ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদি?”
হেসে ফেলে আবরার। কান্না থেমেছে তবে।
“ তো কিভাবে কাঁদো তুমি? ভ্যা ভ্যা করে?”
“ আপনি একটা এক নাম্বারের অসভ্য! সরুন তো, কথা বলবেন না একদম।”
প্রেয়সীর রাগ ভেঙ্ঘেছে বুঝতে পেরে শান্তি পায় ছেলেটা।অমন কথায় কথায় কান্না করা বউটাকে নিয়ে যে কি হবে তার! ভেবে মিছেমিছি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সে।
সময় পেরুতে থাকে নিজের মতো করে। ট্রেনের ছন্দময় উঠানামায় মাথা ধরে আসে মেয়েটার।
“আর কতোক্ষন লাগবে পৌঁছাতে?”“ এই ঘণ্টা দুয়েক। কেন? খারাপ লাগছে তোমার?”
“ বেশি না।”
“ কিছু খাবে? আচার বা টক কিছু?”
“ আরে বমি পাচ্ছে না আমার! খাবো না কিছু।”
কিছুক্ষন পর বাদামওয়ালার কাছ থেকে দুই প্যাকেট কিনে নিলো সে। খোসা ছাড়িয়ে ইন্তিহার হাতে ধরিয়ে দিলো। না, না করেও খেলো মেয়েটা। এমনভাবে হাতে ধরিয়ে দিলে না খেয়ে থাকা যায়? আবরার নিজেও খাচ্ছে মাঝে মাঝে।
ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছাবে আধ ঘণ্টার মধ্যেই। একভাবে বসে থাকতে থাকতে শরীর যেন অবশ হয়ে আসার উপক্রম মেয়েটার। আবরার যদিও মাঝে মাঝে এদিক ওদিক গিয়েছে। ঘাড় ঘুরিয়ে এপাশ ওপাশ করতেই ওর চোখ আটকে যায় অপর পাশের সিটে বসা এক পুরুষের হাতের পানে। একটা কাঁটা দাগ!
স্বপ্নের কথা মনে পড়তেই শিউরে উঠে দেহ। এলোমেলো হয় চিন্তা করার শক্তি। ঢোক গিলে পাশে বসা আবরারের মুখের পানে তাকায় সে। যে কিনা ব্যস্ত ফোনের স্ক্রিনে। ওপাশের লোকটার চেহারার দিকে তাকানোর সাহস হয় না মেয়েটার।যদি, স্বপ্নের সেই মুখটাই হয়! এটা বাস্তব হতে পারে না, কখনোই সম্ভব না।একই চেহারার দুজন ব্যক্তি কিভাবে হয়?হুট করে আবরারের হাত ধরে সে। চমকে ওর দিকে তাকিয়েই দ্রুত ফোন পকেটে রেখে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ছেলেটা।
“ ঠিক আছো তুমি? কি হয়েছে, এমন করছো কেন?”
কথা বলতে পারে না ইন্তিহা। ওর কিছু একটা হয়েছে, আঁচ করতে পেরে অভয় দেয়ার চেষ্টা করে আবরার।
“ কি হয়েছে? খারাপ লাগছে বেশি? বলো আমাকে?”
“ আমি …”
আবরার ওর হাতটা আরো শক্ত করে ধরে।
“ কি হয়েছে বলো?”
(চলবে)
তোমার আকাশ আমার মেঘ
পর্ব-১৪
-তিতা ফুল5 Comments-
আবরার লোকটা যেমন পাজি, তেমনই কেয়ারিং! বউকে জ্বালাতন করার কৌশলগুলো দারুণ। আর ইন্তিহার এই অবুঝ অভিমান আর কৌতূহল গল্পটাকে বড্ড মায়াবী রূপ দিয়েছে।
-
আপনার লেখা এই অংশটিতে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং মান-অভিমানের যে সহজ-সুন্দর চিত্র ফুটে উঠেছে, তা বেশ উপভোগ্য এবং পাঠকদের মনে কৌতুহল জাগিয়ে রাখার মতো। বিশেষ করে ‘পৃথিবীর সব মেয়েরাই সুন্দরী, তবে আমার চোখে তো আর না!’—আবরারের এই একটি বাক্য সত্যিই চমৎকার, যা চরিত্রটির ব্যক্তিত্ব ও ইন্তিহার প্রতি তার ভালোবাসাকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। প্রতিটি মুহূর্তকে আরও প্রাণবন্ত করার জন্য আপনার লেখনীর এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন, শুভকামনা রইল আপনার জন্য।
Friends
Md.Mohsin Ali
@fivertrading007gmail-com
Redowan Hussain
@redowanhussain
নৈশান
@noishan
Hashem Molla
@hashemmolla
Kazi Mahabubur Rahman
@kazimahabuburrahman
mithila jannat
@mithilajannat
Sk Sagor
@sksagor
Md. Ashraful Alam
@md-ashrafulalam
Fazilatun Nesa
@fazilatun-nesa



ছোট্ট এক দাগেই দুলে ওঠে মন, স্বপ্ন আর বাস্তবের সীমারেখা মিলিয়ে যায়…..🤍