Profile Photo

naznin shamimOffline

  • nazninshamim
  • Profile picture of naznin shamim

    naznin shamim

    • 1 month, 2 weeks ago

    যে নামটি মুছে ফেলা হয়েছিল

    নাজনীন শামীম
    ২৯-০৮-২০২৬ ইং

    শহরটা সেদিনও ঘুমিয়ে ছিল।

    শুধু অপরাজিতা জেগে ছিল—একটা নামের অপেক্ষায়, যে নামটা পাঁচ বছর ধরে তার সমস্ত রাতের দরজায় কড়া নাড়ছিল।

    বাইরে তখন বৃষ্টি।

    জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো এমনভাবে গড়িয়ে পড়ছিল, যেন আকাশও কোনো পুরোনো অপরাধের সাক্ষ্য মুছে ফেলতে চাইছে।

    হঠাৎ টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো মুঠোফোনটা বেজে উঠল।

    অপরাজিতা তাকিয়ে রইল।

    স্ক্রিনে কোনো নম্বর নেই।

    শুধু লেখা—

    “আমি ফিরে এসেছি।”

    তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

    কারণ পাঁচ বছর আগে যে মানুষটি হারিয়ে গিয়েছিল, তার নাম ছিল—

    শিশির।

    শিশির ছিল অপরাজিতার ছোট ভাই।

    অথচ শহরের কাছে সে ছিল একজন অপরাধী।

    পাঁচ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়েছিল, তার নেতৃত্ব দিয়েছিল শিশির।

    পরদিন ভোরে সে নিখোঁজ।

    তারপর খবর ছড়াল—

    শিশির নাকি দেশ ছেড়ে পালিয়েছে।

    কেউ বলল, সে গ্রেপ্তার হয়েছিল।

    কেউ বলল, সে মারা গেছে।

    কিন্তু অপরাজিতা কোনো কথাই বিশ্বাস করেনি।

    কারণ যাওয়ার আগের রাতে শিশির তাকে শুধু বলেছিল—

    “আপু, মানুষ হারিয়ে যায় না। কখনো কখনো মানুষকে হারিয়ে দেওয়া হয়।”

    তারপর আর কোনোদিন তাকে দেখা যায়নি।

    ফোনটা আবার বেজে উঠল।

    অপরাজিতা কল ধরতেই ওপাশে নীরবতা।

    তারপর খুব ধীর একটা কণ্ঠ—

    “আমাকে খুঁজো না।”

    অপরাজিতার চোখে পানি চলে এলো।

    “শিশির?”

    কিছুক্ষণ নীরবতা।

    তারপর উত্তর—

    “তুমি এখনও আগের মতোই বোকা।”

    কল কেটে গেল।

    অপরাজিতা বুঝল—

    শিশির বেঁচে আছে।

    কিন্তু তার আনন্দ স্থায়ী হলো না।

    কারণ ঠিক তখনই দরজার নিচ দিয়ে একটা খাম ভেতরে ঢুকে এল।

    খামের ওপর লেখা—

    “শিশিরকে খুঁজতে চাইলে শশীকে বিশ্বাস করো না।”

    শশী।

    নামটা পড়তেই অপরাজিতা থমকে গেল।

    শশী ছিল শিশিরের সবচেয়ে কাছের বন্ধু।

    পাঁচ বছর ধরে যে মানুষটি প্রতিমাসে অপরাজিতার খোঁজ নিয়েছে, তার চিকিৎসার খরচ দিয়েছে, তার পাশে থেকেছে—

    সেই শশীই কি তবে বিশ্বাসঘাতক?

    পরদিন সন্ধ্যায় অপরাজিতা তাকে ডেকে পাঠাল।

    শশী এসে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

    অপরাজিতা সরাসরি জিজ্ঞেস করল,

    “শিশির কোথায়?”

    শশীর মুখের রং বদলে গেল।

    সে শুধু বলল—

    “তুমি যদি সত্যিই জানতে চাও, তাহলে আজ রাতে পুরোনো লাইব্রেরিতে যেও।”

    “তুমি যাবে না?”

    শশী মাথা নেড়ে বলল,

    “আমি গেলে যে মানুষটা এতদিন লুকিয়ে আছে, সে আর বের হবে না।”

    অপরাজিতা বুঝতে পারল না।

    কিন্তু শশী যাওয়ার সময় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একটা কথা বলল—

    “আর একটা কথা—শিশিরকে খুঁজতে গিয়ে নিজের নামটা হারিয়ে ফেলো না।”

    পুরোনো লাইব্রেরিটা বহু বছর বন্ধ।

    ধুলো জমা তাকের মাঝখানে অপরাজিতা একটা নীল ডায়েরি পেল।

    ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—

    “যদি এই ডায়েরি অপরাজিতার হাতে পৌঁছায়, তবে ধরে নিও আমি ব্যর্থ হইনি।”

    পরের পাতাগুলোতে ছিল নাম।

    অনেক নাম।

    যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।

    যাদের কেউ চাকরি হারিয়েছে।

    কেউ শহর ছেড়েছে।

    কেউ নিখোঁজ হয়েছে।

    আর প্রতিটি নামের পাশে একটা তারিখ।

    সবশেষে—

    শিশির।

    তার নামের পাশে লেখা ছিল—

    “মুছে ফেলা হয়েছে।”

    অপরাজিতার চোখ আটকে গেল।

    হঠাৎ পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—

    “তোমার নামটাও মুছে ফেলা হয়েছিল।”

    অপরাজিতা ঘুরে দাঁড়াল।

    অন্ধকারের মধ্যে একজন দাঁড়িয়ে।

    শিশির।

    চোখে ক্লান্তি।

    মুখে পাঁচ বছরের নীরবতা।

    অপরাজিতা ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতে চেয়েও থেমে গেল।

    শিশির বলল,

    “আমাকে ছুঁয়ো না।”

    “কেন?”

    “কারণ আমি যে মানুষটা পাঁচ বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিলাম, সে আর নেই।”

    অপরাজিতা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

    “তাহলে তুমি আমাকে এতদিন একা রেখে দিলে কেন?”

    শিশির নিচু গলায় বলল,

    “তোমাকে বাঁচানোর জন্য।”

    তারপর ডায়েরিটা খুলে একটা ছবি দেখাল।

    ছবিতে অপরাজিতা নিজেই ছিল।

    কিন্তু ছবির পেছনে লেখা—

    “পরবর্তী লক্ষ্য—অপরাজিতা।”

    তারপর শিশির বলল,

    “আমি হারাইনি, আপু। আমি লুকিয়েছিলাম। কারণ যারা আমাকে চুপ করেছিল, তারা জানত—আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তুমি।”

    অপরাজিতা স্তব্ধ।

    “শশী?”

    শিশির চোখ নামিয়ে বলল,

    “শশীই আমাকে লুকিয়ে রেখেছিল।”

    তাহলে চিঠিতে কেন লেখা ছিল—শশীকে বিশ্বাস করো না?

    শিশির মৃদু হাসল।

    “কারণ শশীকে অবিশ্বাস করাটাই ছিল তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার শেষ উপায়।”

    সেদিন রাতেই সত্যিটা প্রকাশ পেল।

    শিশির পালিয়ে যায়নি।

    তাকে ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

    তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ সাজানো হয়েছিল।

    কিন্তু সে প্রমাণগুলো নষ্ট করেনি।

    পাঁচ বছর ধরে সে একে একে সেই প্রমাণ সংগ্রহ করেছে।

    আর শশী?

    সে নিজের জীবন ঝুঁকিতে রেখে সেই প্রমাণগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

    অপরাজিতা ডায়েরির শেষ পাতাটা খুলল।

    সেখানে লেখা ছিল—

    “একদিন হয়তো আমার নাম মুছে যাবে। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসটা মুছে ফেলতে পারবে না কেউ।”

    অপরাজিতার চোখ ভিজে গেল।

    সে বলল,

    “তাহলে এতদিন তুমি ফিরে এলে না কেন?”

    শিশির জানালার বাইরে তাকাল।

    “কারণ আমি একা ফিরে এসে কী করতাম?”

    তারপর ডায়েরিটা তার হাতে দিয়ে বলল—

    “এবার তোমার পালা।”

    পরদিন সকালে শহরটা অন্যরকম ছিল।

    অপরাজিতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডায়েরির প্রতিটি প্রমাণ প্রকাশ করে দিল।

    একটার পর একটা নাম।

    একটার পর একটা সত্য।

    যে নামগুলো এতদিন মুছে ফেলা হয়েছিল, সেগুলো আবার মানুষের মুখে ফিরতে শুরু করল।

    হাজার হাজার মানুষ সেই লেখা শেয়ার করল।

    কেউ লিখল—

    “সত্যকে বেশি দিন মুছে রাখা যায় না।”

    কেউ লিখল—

    “আমরাও সাক্ষী।”

    আর ঠিক দুপুরে অপরাজিতার ফোনে একটা মেসেজ এলো।

    শুধু একটি লাইন—

    “আজ থেকে তোমার নাম কেউ মুছতে পারবে না।”

    প্রেরকের নাম—

    শিশির।

    অপরাজিতা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে

    4
    5 Comments
    • মুছে ফেলা নাম আবার ফিরে আসে সত্যের জোরে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসেই ..🖤

    • খুব সুন্দর উপস্থাপন করছেন। মাশাল্লাহ

    • “একদিন হয়তো আমার নাম মুছে যাবে, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসটা মুছে ফেলতে পারবে না কেউ” — এই লাইনটা সত্যিই খুব গভীর এবং মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো।

    • নাজনীন শামীম, আপনার লেখায় রহস্য আর আবেগ যেভাবে মিশেছে তা সত্যিই গভীর ও দারুণ হয়েছে। এমন চমৎকার টানটান উত্তেজনাপূর্ণ একটি বিষয়ের ওপর কলম চালিয়ে আপনি যে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন, তা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আপনি নিয়মিত লিখে যান।

    • মুছে ফেলা নাম একদিন ঠিকই ফিরে আসে সত্যের হাত ধরে…..🤍

Friends

Skip to toolbar