-
ভাঙা ভিটের নীরব কান্না
নাজনীন শামীম
চট্টগ্রাম থেকে
২২শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ইং গ্রামে গঞ্জের আর দশটা সাধারণ পরিবারের মতোই ছিলেন রফিক আর জোবেদা দম্পতি। সামান্য কৃষিকাজ আর মানুষের বাড়ি কাজ করে দিন কেটেছে তাদের। পেটে পাথর বেঁধে, নিজেরা জীর্ণ কাপড় পরে একটিমাত্র সন্তান শফিককে তারা মানুষের মতো মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। রফিক সাহেবের জমানো সম্বল বলতে কিছু ছিল না, কেবল ভিটেমাটির ছোট্ট জমিটুকু ছাড়া। শফিকের পড়ালেখার খরচের জোগান দিতে শেষের দিকে নিজের শেষ সম্বল জমিটুকুও বিক্রি করে দিতে পিছপা হননি তিনি।
শফিক পড়াশোনায় ভালো ছিল। গ্রামের স্কুল-কলেজ পেরিয়ে শহরের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো, এরপর চাকরি পেল বহুজাতিক একটি সংস্থায়। শফিকের সাফল্যে বৃদ্ধ জোবেদা আর রফিকের বুক গর্ভে ভরে উঠেছিল। সারা গ্রাম ঘুরে ঘুরে রফিক সাহেব মানুষকে বলতেন, “আমার শফিক এখন বড় অফিসার।”
কিন্তু সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল শফিক। শহরের চাকচিক্য, দামি গাড়ি আর আভিজাত্য তাকে গ্রাস করল। উচ্চবিত্ত ঘরের মেয়েকে বিয়ে করে শহরের এক বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে সংসার পাতল সে। বিয়ের পর প্রথম কিছুদিন বাবা-মাকে দেখতে এলেও ধীরে ধীরে গ্রামে আসা কমিয়ে দিল শফিক।
একদিন রফিক সাহেব খবর পেলেন তার স্ত্রী জোবেদার শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ। হাত-পা কাঁপে, চোখে ঠিকমতো দেখতে পান না। শফিককে ফোন করে কাঁপানো গলায় বললেন, “বাবা শফিক, তোর মায়ের শরীরটা একদম ভালো না। তোকে একবার দেখতে চায়। কিছু টাকা পাঠাবি বাবা? ডাক্তারের ওষুধ কিনতে হবে।”
ওপাশ থেকে শফিকের রুক্ষ উত্তর এল, “আমার এখন অনেক কাজ, বাবা! অফিস নিয়ে ব্যস্ত আছি। আর শহরের খরচ কত তা তো তোমরা বুঝবে না। বারবার ফোন করে বিরক্ত কোরো না তো!”
কথাটা শুনে রফিক সাহেবের বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করে উঠল। যে সন্তানকে হাত ধরে হাঁটা শিখিয়েছেন, নিজের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছেন, তার এই পরোক্ষ তাচ্ছিল্য বৃদ্ধ বাবার বুড়ো বুকটাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিল।
জোবেদা খাতুন চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জল আঁচল দিয়ে মুছে রফিককে বললেন, “ওকে আর কষ্ট দিয়ো না। ও শহরে অনেক বড় মানুষ হয়েছে, আমাদের মতো গরিব মা-বাবার কথা ভাবার সময় ওর কোথায়?”
কয়েক মাস পর, জোবেদা খাতুন আরও অসুস্থ হয়ে পড়লে রফিক সাহেব কোনো উপায় না দেখে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। সন্তানের বিশাল ফ্ল্যাটের দরজায় গিয়ে যখন তারা দাঁড়ালেন, তখন তাদের পরনে ছিল ধুলোবালি লাগা সাধারণ পোশাক আর হাতে একটা ছোট কাপড়ের থলে।
দরজা খুলল শফিকের স্ত্রী। সামনে গ্রামের দু’জন মলিন চেহারার বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে দেখে ভ্রূ কুঁচকে উঠল তার। শফিক ঘর থেকে বের হয়ে বাবা-মাকে দেখে খুশি হওয়ার বদলে বিরক্তিতে মুখ কালো করল। ঘরের ভেতরে অতিথিরা বসে ছিল।
শফিক নিচু গলায় কিন্তু শক্তভাবে বলল, “তোমরা হঠাৎ না জানিয়ে চলে এলে কেন? শহরের বন্ধু-বান্ধবরা এখানে আছে, তোমরা এভাবে চলে এলে মানুষ কী ভাববে? ঘরে তো জায়গা নেই, তোমরা নিচে গিয়ে ক্যাফেতে বসে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো, আমি আসছি।”
নিজের রক্তজল করা সন্তানের মুখ থেকে এমন কথা শুনে জোবেদা খাতুনের বুকের ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কাপড়ের থলেতে রাখা ছেলের প্রিয় গ্রামের চালের পিঠা দুটো আর হাত দেওয়া হলো না।
রফিক সাহেব ধীর শান্ত গলায় শুধু বললেন, “আমাদের কোনো দরকার নেই বাবা। তোর মা তোকে শুধু এক পলক দেখতে চেয়েছিল। আমরা চলে যাচ্ছি।”
বৃদ্ধ মা-বাবা ধীর পায়ে ফ্ল্যাটের সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন। গোধূলির আলোয় শহরের ব্যস্ত রাস্তায় ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছিলেন দুজন জরাজীর্ণ মানুষ। রফিক সাহেব দেখলেন, পাশে হাঁটা বৃদ্ধা স্ত্রীর চোখের জল আর থামছে না।
যে মা-বাবা সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্য নিজের সারাটা জীবন আঁধারে কাটিয়ে দিলেন, আজ সেই সন্তানই তাদের জন্য অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই রেখে যায়নি।9 Comments-
-
নাজনীন শামীম, আপনার লেখাটা পড়ে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল, এমন বাস্তবতার গল্পগুলো সত্যিই ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়।
-
এই করুণ আর মর্মস্পর্শী লেখাটি পড়তে গিয়ে মা-বাবার অসীম ত্যাগ ও সন্তানের বদলে যাওয়ার চিত্রটি আমাদের মনের গভীরে গভীরভাবে দাগ কেটে গেল। আপনি এমন নিপুণভাবে বাবা-মায়ের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ তুলে ধরেছেন যে তা অনেকটা বাস্তব জীবনের কোনো দুঃখের ছায়াছবির কথা মনে করিয়ে দেয়। আপনি দারুণভাবে লিখে চলেছেন, তাই আমাদের এই প্ল্যাটফর্মে আরও এমন সুন্দর ও হৃদয়স্পর্শী লেখা নিয়মিত উপহার দিতে থাকুন।
-
-
Friends
Zahidul Jamy
@zahidul
মোঃ বায়েজীদ
@bayejid
ঈশিতা ঈরু
@eshitabiswaseru15
Shojan Maria Shoche
@shojanmaria
সিরাজুল ইসলাম
@sherajulislam
Santo Mon
@santomon
Ariba Mehzabin Yeana
@aribamehzabin
Md. Jahangir Alam
@md-jahangiralam
Nusrat jahan Sadia
@nusratjahansadia




নিজের ভিটেমাটি বিক্রি করে ছেলেকে মানুষ করা, অথচ শেষে এই পরিণতি—খুব খারাপ লাগলো।