-
অপূর্ণ সমীকরণ ”
নাজনীন শামীম
চট্টগ্রাম থেকে
২৬শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ইং স্টেশনের ঘড়িতে তখন রাত পৌনে একটা। প্ল্যাটফর্মের সোডিয়াম বাতিগুলোর হলুদ আলোতে হালকা কুয়াশার এক বিষণ্ণ আস্তরণ জমছিল। আর মাত্র দশ মিনিট পর শেষ ট্রেনটা এসে দাঁড়াবে।
রাশেদ আর নাবিলা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশের কোলাহল ধীরে ধীরে নিভে আসছে, ঠিক যেমন নিভে আসছিল তাদের সাত বছরের সম্পর্কটা। রাশেদের হাতে একটা লাল রঙের ট্রাভেল ব্যাগ, আর নাবিলার হাতে একটা নতুন কেনা বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র। জাঁকজমকপূর্ণ কার্ড, যার ওপর সোনালী অক্ষরে লেখা অন্য একজনের নাম—যে রাশেদ নয়।
”তুমি সত্যি চলে যাচ্ছ রাশেদ?” নাবিলা চোখ তুলে তাকাল। তার কণ্ঠে কোনো নাটকীয়তা ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত শূন্যতা।
”থাকার তো আর কোনো জায়গা রাখোনি নাবিলা,” রাশেদ একটু হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু হাসিটা বড্ড মলিন শোনাল। “বাস্তবতা শব্দটা খুব ছোট, কিন্তু এর ওজন যে এতটা, আগে বুঝিনি।”
নাবিলা জবাব দিল না। সে জানে, রাশেদের কথাটা মিথ্যে নয়। তার বাবা যখন ডেকে বলেছিলেন, “একজন সাধারণ প্রাইভেট টিউটরের সাথে মেয়ে দেওয়ার জন্য আমি তাকে মানুষ করিনি,” নাবিলা তখন একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারেনি। ভালোবেসে হাত ধরে টান মেরে বের হয়ে আসার সাহস নাকি কেবল সিনেমাতেই মানায়। বাস্তব সংসারের টানাফোড়েন, সমাজ আর পরিবারের রক্তের সম্পর্কের ভালোবাসার কাছে তাদের সাত বছরের আত্মিক টানটা হেরে গেছে।
”তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো,” নাবিলা শাড়ির আঁচলটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে বলল।
”ক্ষমা কিসের জন্য?” রাশেদ মৃদু কণ্ঠে বলল, “তুমি তো কোনো অন্যায় করোনি। তুমি তোমার দায়িত্ব বেছে নিয়েছ, আর আমি আমার সীমাবদ্ধতা। দোষ তো আসলে সময় আর ভাগ্যের। আমরা দুজন সঠিক মানুষ ছিলাম, কিন্তু ভুল সময়ে, ভুল পরিস্থিতিতে।”
দূরে ট্রেনের হুইসেলের শব্দ ভেসে এল। চাকা আর লাইনের ঘর্ষণের ভারী আওয়াজে কেঁপে উঠল প্ল্যাটফর্ম। কাল সকালে নাবিলা কনে সেজে বসবে, আর কাল সকালেই রাশেদ পৌঁছাবে অচেনা এক শহরে, যেখানে তার জন্য কেউ অপেক্ষা করে থাকবে না।
ট্রেনটা এসে থামল। রাশেদ তার ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল। ট্রেনে ওঠার আগে শেষবারের মতো নাবিলার দিকে তাকাল। নাবিলার চোখের কোণে একফোঁটা জল জমেছে, যা সোডিয়াম বাতির আলোতে হীরের মতো জ্বলজ্বল করছে।
”একটা কথা বলবে?” নাবিলা হঠাৎ জিজ্ঞেস করে উঠল।
”কী?”
”আমরা কি আসলেই হেরে গেলাম?”
রাশেদ দরজার হাতলটা শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “আমরা হারিনি নাবিলা। আমরা শুধু বাস্তবতার কাছে ঋণী ছিলাম, আজ সেই ঋণ শোধ করে দিলাম।”
ট্রেনটা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল। রাশেদ দরজায় দাঁড়িয়ে রইল, নাবিলা প্ল্যাটফর্মে। দুজনের দূরত্ব বাড়তে লাগল, কিন্তু কেউই আর হাত বাড়াল না।
সব ভালোবাসার শেষ পরিণতি মিলন হয় না; কিছু ভালোবাসা সারা জীবন বেঁচে থাকে দুজন মানুষের দুটি আলাদা, নিঃসঙ্গ পৃথিবীর নীরব হাহাকার হয়ে।9 Comments-
-
“আমরা হারিনি নাবিলা, আমরা শুধু বাস্তবতার কাছে ঋণী ছিলাম” – এই পঙক্তিটিতে সম্পর্কের গভীর আর এক অব্যক্ত যন্ত্রণার চমৎকার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। আপনি চাইলে দৃশ্যপটে আরও কিছু নীরব মুহূর্ত যোগ করে অনুভূতিগুলোকে আরেকটু গভীর করতে পারেন, যা আপনার লেখনীকে পাঠকদের হৃদয়ে আরও দীর্ঘস্থায়ী করবে।
-
কিছু ভালোবাসা মিলনে পূর্ণ হয় না, বিচ্ছেদের নীরবতায়ই তারা চিরকাল অপূর্ণতার পূর্ণ অর্থ হয়ে বেঁচে থাকে……🖤
Friends
Zahidul Jamy
@zahidul
মোঃ বায়েজীদ
@bayejid
ঈশিতা ঈরু
@eshitabiswaseru15
Shojan Maria Shoche
@shojanmaria
সিরাজুল ইসলাম
@sherajulislam
Santo Mon
@santomon
Ariba Mehzabin Yeana
@aribamehzabin
Md. Jahangir Alam
@md-jahangiralam
Nusrat jahan Sadia
@nusratjahansadia


naznin shamim, আপনার লেখা ‘আমরা হারিনি নাবিলা, আমরা শুধু বাস্তবতার কাছে ঋণী ছিলাম’ লাইনটা পড়ে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলাম, সত্যিই খুব গভীর আর মন ছুঁয়ে যাওয়া একটা গল্প লিখেছেন আপনি।