Profile Photo

রাহেনা বেগমOffline

  • Rahena-Begum
  • Profile picture of রাহেনা বেগম

    রাহেনা বেগম

    2 weeks, 6 days ago

    সমুদ্র বিলাস—একটা পুরোনো নেসক্যাফের ক্যানের ভেতর জমে থাকা সমুদ্র…
    আমার বাসায় একটা পুরোনো নেসক্যাফের ক্যান আছে। ক্যানটা খুব সাধারণ।কিন্তু আমার কাছে মোটেই সাধারণ নয়। ক্যানটার গায়ে খুব সুন্দর করে নিজের হাতে লিখে রেখেছি—
    “সমুদ্র বিলাস”।
    প্রতি মাসে এই ক্যানটায় টাকা জমাই।১০ টাকা।২০ টাকা। কখনো ১০০ টাকা।কখনো ২০০ টাকা। যখন যেটুকু পারি।

    আমি একজন নিম্নবিত্ত পরিবার-প্রধান।
    আমাকে আয় করতে হয়, ব্যয় করতে হয়, সংসারের হিসাব মেলাতে হয়। আর সেই হিসাব সবসময় মেলে না।
    বেশিরভাগ সময় মাসের শেষে দেখা যায়, রিকশা ভাড়া দেওয়ার টাকাটাও নেই।

    তখন কী করি? “সমুদ্র বিলাস” থেকে টাকা ধার নিই। কোনো মাসে সেই ধার শোধ করতে পারি।
    কোনো মাসে পারি না। তারপরও আবার টাকা জমাই।
    কারণ জীবনে কিছু জিনিস প্রয়োজন,
    আর কিছু জিনিস প্রয়োজনের চেয়েও বেশি প্রয়োজনীয়।যেমন—একটু আনন্দ, একটু ঘোরাঘুরি,
    আর মাঝে মাঝে একটু সমুদ্র দর্শন।

    “সমুদ্র বিলাস”-এর আইডিয়াটা অবশ্য আমার নিজের না। অপলার মামার কাছ থেকে নেওয়া।
    তবে আইডিয়াটা ধার করলেও,স্বপ্নটা একেবারেই আমার নিজের।
    ২০২৩ সালে বড় পুত্র এসএসসি পরীক্ষা দিলো।
    পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বললাম—
    “চলো, সমুদ্রে যাই।”

    আপনারা হয়তো ভাবছেন, ছেলেটা অনেক পড়াশোনা করে মাথা জ্যাম করে ফেলেছিল, তাই তাকে একটু রিফ্রেশ করাতে সমুদ্রে নিয়ে গিয়েছিলাম।

    নাহ্, নাহ্!
    একজন পড়াশোনা না করে পরীক্ষা দিলো—
    এইটা দেখতে দেখতে আমার মাথাই জ্যাম হয়ে গিয়েছিল।
    তাই মূলত ছেলেকে নয়,
    নিজের মাথা ঠান্ডা করতেই সমুদ্রে পালিয়েছিলাম।

    ফিরে আসার পরের মাস থেকেই আবার “সমুদ্র বিলাস”-এ টাকা জমাতে শুরু করলাম।

    কারণ আমি বৈষম্যবাদী মা নই।

    আমার কাছে দুই পুত্রই সমান।

    বড় পুত্র সমুদ্র পেয়েছে,
    ছোট পুত্র কেন পাবে না?

    তাই ছোট পুত্রের এসএসসি শেষ হওয়ার আগেই আবার শুরু হলো আমার ছোট ছোট সঞ্চয়।
    ১০ টাকা।২০ টাকা।১০০ টাকা।২০০ টাকা।
    তিন বছর ধরে।
    সংসারের হাজারো প্রয়োজনের ভেতর থেকে একটু একটু করে সরিয়ে রাখা টাকা।
    তিল তিল করে।
    হয়তো এই তিন বছরে অনেক কিছু কিনতে পারিনি।
    কিন্তু একটা স্বপ্ন কিনেছি—

    দুই পুত্রকে নিয়ে আবার সমুদ্র দেখার স্বপ্ন।

    ছোট পুত্র এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে।

    তাই মনের ভিতর আনন্দের নাড়ু কুটছে!

    মাইকিং শুরু করলাম।

    পেপার-পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলাম—

    অর্থাৎ,
    ফেসবুকে পোস্ট দিলাম।

    সাথে যদি সহযাত্রী পাওয়া যায়!

    কিন্তু হিতে বিপরীত হলো।

    আমার এক সমকর্মী বললেন—

    “আপা, আপনার আয়ের উৎস কী?”

    কথা সত্য।

    আমার মতো সামান্য বেতনের একজন মানুষ যখন সমুদ্রে যাওয়ার মতো বিলাসিতা দেখায়, তখন এমন প্রশ্ন আসাটা খুবই স্বাভাবিক।

    আমি বললাম—

    “উৎস খুঁজতে FBI-কে লাগান।”

    ইচ্ছে ছিল সবাই মিলে যাবো।

    কিন্তু আমার পালক পুত্র যাবে না।

    তার কথা—

    সেন্ট মার্টিন হলে যাবে, কক্সবাজারে যাবে না।

    তারপর সে বহু দেন-দরবার করে বড় পুত্রকেও বোঝাতে শুরু করলো।

    বললো—

    “একজন ইউনিভার্সিটিতে পড়া ছেলে মায়ের সঙ্গে বেড়াতে যায়?”

    বড় পুত্রও দেখি দোটানায় পড়ে গেল।

    আমি তখন বললাম—

    “না গেলে নাই।
    আমি ছোট পুত্রকে নিয়েই যাবো।

    যেহেতু তুমি ইউনিভার্সিটিতে পড়ো, মায়ের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া যদি তোমার কাছে ঠিক না হয়, তাহলে তুমি তোমার বেড়ানোর টাকা নিজে রোজগার করে যাবে।”

    শেষ পর্যন্ত বড় পুত্র সিদ্ধান্ত নিলো—

    ইউনিভার্সিটিয়ান হওয়ার চেয়ে মায়ের সঙ্গে যাওয়াটাকেই সঠিক মনে হলো।

    এইটুকু সুখ কি আর কম?
    রাজশাহী থেকে পালক পুত্রের মাকে নিয়ে আসলাম, পালক পুত্রের সাথে থাকার জন্য।

    অনেক সাধ্য-সাধনা করে বাসের টিকিট কাটলাম।

    ট্রেনে যাওয়ার ইচ্ছেটা ইচ্ছেই রয়ে গেল।

    হয়তো কোনো একদিন আবার একটা নতুন ক্যান খুলবো যেখানে লেখা থাকবে-

    “ট্রেন বিলাস”।

    তারপর ১০ টাকা, ২০ টাকা করে সেখানে জমাবো।

    দেখা যাক, সেই ক্যান থেকে আরেকটা গল্প বের হয় কি না!

    আর আমাদের জন্য গতবারের মতো এবারও হোটেলের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন আমার প্রাক্তন সহকর্মী রওশন ভাই।

    রওশন ভাইকে কী বলে ধন্যবাদ দেবো, সত্যিই তার ভাষা আমার জানা নেই।

    তিনি কি শুধু আমাদের হোটেলের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন?

    না। তিনি খোঁজ নিয়েছেন—ঠিকমতো পৌঁছালাম কি না,কোনো সমস্যা হলো কি না,কোথাও কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি না।
    দূরে থেকেও যেন আমাদের সঙ্গে ছিলেন।

    কিছু মানুষের উপকারের প্রতিদান আসলে “ধন্যবাদ” শব্দ দিয়ে দেওয়া যায় না।

    রওশন ভাই,আল্লাহ আপনাকে এর উত্তম প্রতিদান দিন।
    আর আমি কিন্তু বারবার আপনার কাছে আবদার করবো।
    কারণ কিছু মানুষের কাছে আবদার করতে ভালো লাগে।
    তারা বিরক্ত হন না, বরং নিজের মানুষ মনে করে পাশে দাঁড়ান। আপনিও তেমন একজন।

    ২৬ তারিখ রাতে রওনা দিয়েছিলাম।২৮ তারিখ রাতে ফিরে এসেছি।
    দুই রাত, তিন দিন। সমুদ্রের নোনা বাতাস,
    ঢেউয়ের শব্দ, দুই পুত্রের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা, একসঙ্গে খাওয়া, একসঙ্গে ঘোরা—কত ছবি! কত গল্প! আর কত আনন্দ!

    কিন্তু সবচেয়ে বড় যে জিনিসটা সঙ্গে করে নিয়ে ফিরেছি, সেটা হলো— তৃপ্তি।
    মনে হচ্ছে, তিন বছর ধরে “সমুদ্র বিলাস”-এর ক্যানটায় যে ছোট ছোট টাকা জমিয়েছিলাম, তার প্রতিটি টাকার হিসাব সমুদ্রের ঢেউ এসে মিটিয়ে দিয়েছে।
    যারা আমার এই “সমুদ্র বিলাস”-এর বিলাসিতায় কোনো না কোনোভাবে সহযোগিতা করেছেন, পাশে থেকেছেন, উৎসাহ দিয়েছেন—

    তাদের প্রত্যেকের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ।

    বিশেষ করে আমার পুত্রদের ছোট আংকেল ও আন্টিকে অসংখ্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

    তারা সবসময় আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন।

    সমুদ্রে স্পিডবোটে ওঠার সময় সাবধানে থাকতে বলেছেন।

    কোনো বিপজ্জনক জায়গায় যেন না যাই—
    বারবার সতর্ক করেছেন।

    দূরে থেকেও যেন আমাদের সঙ্গে ছিলেন।

    আল্লাহ আপনাদের এই ভালোবাসার উত্তম প্রতিদান দিবেন, ইনশাআল্লাহ।
    ধন্যবাদ বড় ভাবিকে কষ্ট করে রাজশাহী থেকে ঢাকায় এসে আমার পালক পুত্রের সাথে থাকার জন্য।

    আর সবশেষে—আমার সেই পুরোনো নেসক্যাফের ক্যানটার কথা মনে পড়ছে।

    একটা পুরোনো ক্যান।

    গায়ে লেখা—

    “সমুদ্র বিলাস।”

    কতবার যে সেই ক্যান থেকে টাকা ধার নিয়েছি!

    কতবার সংসারের প্রয়োজন এসে আমার সমুদ্রের স্বপ্নটাকে সরিয়ে দিতে চেয়েছে!

    কতবার ভেবেছি,
    এবার আর হবে না।

    তবুও আবার ১০ টাকা জমিয়েছি। ২০ টাকা জমিয়েছি। ১০০ টাকা জমিয়েছি। কারণ আমি বিশ্বাস করি—

    স্বপ্ন শুধু বড়লোকের জন্য নয়।

    স্বপ্ন দেখার জন্য বড় ব্যাংক ব্যালান্স লাগে না।
    লাগে শুধু—একজন মায়ের একটু জেদ,
    দুই সন্তানের জন্য অনেকখানি ভালোবাসা,
    আর প্রতি মাসে ১০ টাকা করে জমিয়ে রাখার মতো একটু সাহস। আমি ধনী নই। আমার জীবন বিলাসী নয়।

    মাসের শেষে অনেক সময় রিকশা ভাড়ার টাকাও থাকে না।

    তারপরও আমি সমুদ্রে যাই।

    কারণ—সমুদ্র শুধু টাকাওয়ালাদের জন্য নয়।

    সমুদ্র তাদের জন্যও,
    যারা সারাবছর সংসারের হিসাব মেলায়,
    আর জীবনের কোনো এক কোণে নিজের জন্য একটু আকাশ রেখে দেয়।

    আমার “সমুদ্র বিলাস” তাই কোনো ক্যানের ভেতর জমে থাকা টাকা নয়। এটা তিন বছরের অপেক্ষা।
    এটা একজন মায়ের জেদ।এটা দুই পুত্রের প্রতি সমান ভালোবাসা।
    এটা জীবনের হাজারো হিসাব-নিকাশের মাঝেও একটু আনন্দ বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা।

    আর আজ বুঝলাম—আমি আসলে টাকা জমাইনি।

    আমি সমুদ্র জমিয়েছিলাম।

    আর সেই জমিয়ে রাখা সমুদ্রের কাছেই এবার দুই পুত্রকে নিয়ে গিয়ে—একটু বিলাস করে এলাম।

    জীবন আবার তার নিজের হিসাব শুরু করবে।

    আবার মাসের শেষে হয়তো রিকশা ভাড়ার টাকা থাকবে না।

    হয়তো আবার “সমুদ্র বিলাস” থেকে ধার নিতে হবে।

    তবুও ক্যানটা আমি রেখে দেবো।

    কারণ ওই ক্যানটা আমাকে মনে করিয়ে দেবে—

    অভাবের সংসারেও স্বপ্ন দেখা যায়।
    ১০ টাকা করেও স্বপ্ন জমে।
    আর কোনো কোনো স্বপ্ন একদিন সত্যিই সমুদ্র হয়ে যায়।
    ভালো থাকবেন।

    5
    5 Comments

Friends

Profile Photo
naznin shamim
@nazninshamim
Profile Photo
Md Mofiz
@mdmofiz
Profile Photo
MAHMUD HAYAT
@mahmudhayat
Profile Photo
wajibad
@wajibad
Profile Photo
MAHAJABIN AFROZE
@mahajabinafroze
Profile Photo
Intisar Jabed
@intisarjabed
Profile Photo
মেঘ
@megh
Skip to toolbar