Profile Photo

Ratan Chandra RoyOffline

  • ratanchandraroy
  • Profile picture of Ratan Chandra Roy

    Ratan Chandra Roy

    3 hours, 9 minutes ago

    রমার রক্তক্ষরণ
    ✍️রতন চন্দ্র রায়

    গ্রামের সরু কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে একঝলক বকুল ফুলের মিষ্টি গন্ধে বুক ভরে নিল প্রদীপ। পুরো একটা বছর পর বিদেশ থেকে নিজের চেনা ভিটেয় ফেরা। কিন্তু গ্রামের মেঠো বাতাসে আজ কেমন যেন একটা ভারী, অচেনা বিষণ্নতা ভেসে বেড়াচ্ছে।

    পাড়ার মোড়ের বুড়ো বটগাছটার কাছে আসতেই চোখ পড়ল রমার দিকে। পুকুরঘাটের সিঁড়িতে একলা বসে আছে সে। পরনে মলিন একথানা শাড়ি, চুলগুলো আলগা করে খোঁপা করা। মুখখানা বড় শুকিয়ে গেছে—সেখানে চেনা সেই চঞ্চলতার বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। প্রদীপ পা চালিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

    “কিরে রমা! তুই নাকি আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছিস?”

    রমা মাথা তুলে চাইল। প্রদীপকে দেখে তার চোখের কোণে চকিতে একবিন্দু জল ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। ক্ষয়ে যাওয়া এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল, “কী বলব তোমাকে দাদা… মন তো চায় না!”

    প্রদীপ ভুরু কুঁচকে সামনে থাকা এক টুকরো পাথর পায়ে ঠেলে বলল, “মন চায় না মানে? তবে কেন এমন সিদ্ধান্ত?”

    রমা আকাশের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন কোনো ক্লান্তি বা কান্নার তোড় নেই, কেবল এক বিশাল শূন্যতা। “মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ের পিঁড়িতে বসতেছি দাদা। বাবার কারণে আজ আবার দ্বিতীয়বারের মতো এই নরকে পা বাড়াতে হচ্ছে। বাবাকে তো বাঁচাতে হবে…”

    “তোর বাবার কী হয়েছে?” প্রদীপের কণ্ঠে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ল।

    “দাদা, তুমি কিছু জানো না…”

    “নারে, আমি তো একবছর পর বিদেশ হতে গ্রামে এসেছি। কাল রাতেই পৌঁছালাম।”

    “ও, তাই বলো!” রমা এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে একটা শুকনো পাতা কুড়িয়ে হাতের মুঠোয় চাপ দিল। “তাহলে তো তুমি কিছুই জানো না… বাবা ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়েছে, আজ তিন মাস হলো। এই কয় মাসে ভিটে, জমিজমা সব বিক্রি করে পথে বসেছি। কোনো ওষুধ কিনতে পারছি না, শেষবেলায় বাবার একটু সুচিকিৎসার খরচও আর বইতে পারছি না। তাই নিজের মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও দ্বিতীয়বারের মতো আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসতেছি।”

    রমার গলার আওয়াজ কাঁপছিল না, কিন্তু তার প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে থাকা পাথর-চাপা যন্ত্রণা প্রদীপের বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধল। রমা আবার বলল, “দাদা, কী আর করব বলো? বাবাকে চোখের সামনে ধুঁকে ধুঁকে মরতে দিতে পারি না।”

    প্রদীপের মনে পড়ে গেল সকালের ঘটনাটা। বাজারে হাবুলের চায়ের দোকানে বসে একদল লোক নিচু স্বরে আলোচনা করছিল রমার বিয়ে নিয়ে। সে কথাগুলো মনে পড়তেই প্রদীপের মুখ থমথমে হয়ে উঠল। সে রমার আরও একটু কাছে এগিয়ে গিয়ে নিচু গলায় বলল, “রমা… আমি বাজারে চায়ের দোকানে বসে শুনেছি, যার সাথে তোর বিয়ে হচ্ছে, সে তো বেশিদিন বাঁচবে না। তার বয়স আশির কোঠায়। আরও শুনেছি, তার ঘরে নাকি দু’জন বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে আছে। কথাটা কি সঠিক?”

    রমা কোনো ইতস্তত করল না। শান্ত, স্থির চোখে প্রদীপের দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ দাদা, কথাটি সঠিক।”

    প্রদীপ নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। কিছুটা শিউরে উঠে বলল, “তাহলে তুই ওখানে কীভাবে সংসার করবি? একটা আশির বছরের বৃদ্ধ, যার নিজের মেয়েরাই তোর বয়সী, সেখানে তোর স্থান কোথায়? তোর তো ভবিষ্যৎ বলে আর কিছুই থাকবে না রে!”

    রমার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক নির্মম, করুণ আত্মউপহাসের হাসি। বিষণ্ন গলায় সে বলল, “দাদা, সংসার করার স্বাদ তো সেই পাঁচ বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে… যেদিন উনি আমাকে ছেড়ে পরপাড়ে চলে গেছেন।”

    রমার কথা শুনে প্রদীপ স্তব্ধ হয়ে গেল। পাঁচ বছর আগের কথাগুলো এক লহমায় প্রদীপের স্মৃতিতে ভেসে উঠল।

    তখন রমার বয়স কতই বা হবে? আঠারো কিংবা উনিশ। হাসিখুশি, চঞ্চল মেয়েটির প্রেমে পড়েছিল প্রতিবেশী যুবক অনিরুদ্ধ। অনিরুদ্ধ ছিল বড্ড ভালো ছেলে, রমাকে ভালোবাসত নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি। তাদের ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু বিধাতার কলম তো অন্য গল্প লিখছিল। বিয়ের মাত্র ছয় মাসের মাথায় এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় অনিরুদ্ধ চিরতরে চলে যায়। সেদিন ভেঙে পড়েছিল সিথির সিঁদুর, সঙ্গে ভেঙেছিল রমার রঙিন স্বপ্নের পৃথিবীটা। সেই যে রমার হাঁসি আর চঞ্চলতা বিদায় নিয়েছিল, তারপর আর তা ফিরে আসেনি।

    অনিরুদ্ধ মারা যাওয়ার পর রমা বাপের বাড়িতেই ফিরে এসেছিল। নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল চারদেয়ালের মাঝে। সংসার, প্রেম, ভালোবাসা—এসব শব্দগুলো তার জীবনের অভিধান থেকে সেদিনই চিরতরে মুছে গিয়েছিল।

    গত পাঁচটা বছর রমা জীবন্ত লাশের মতো বেঁচে ছিল শুধু একটা মানুষের ওপর ভরসা করে—তার বাবা, সনাতন চক্রবর্তী। যে বাবা তাকে মাতৃস্নেহে আগলে রেখেছিলেন, অনিরুদ্ধ চলে যাওয়ার পর রমার সব ঝড়-ঝাপটা নিজের বুকে সামলে নিয়েছিলেন। আজ সেই বাবাই মৃত্যুশয্যায়। চিকিৎসার অভাবে দিন দিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। ডাক্তার বলেছেন, বড় হাসপাতালে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করালে হয়তো আরও কিছুদিন বাঁচানো সম্ভব। কিন্তু তার জন্য চাই মোটা অংকের টাকা। ভিটেমাটি বিক্রি করেও যে টাকা মেলেনি, সেই টাকা দিতে রাজি হয়েছেন গ্রামের এক প্রভাবশালী ধর্মাঢ্য বৃদ্ধ, বিনিময়ে তার শর্ত একটাই—রমাকে হতে হবে তার স্ত্রী।

    রমার জন্য এই বিয়ে কোনো নতুন জীবনের সূচনা নয়; এটা একটা স্রেফ সওদা। নিজের জীবনের অবশিষ্ট অংশটুকু বিক্রি করে বাবার জন্য কিছুদিনের আয়ু কিনে নেওয়া।

    প্রদীপ কিছু বলতে চাইল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ ফুটল না। সে রমার দিকে তাকিয়ে রইল। রমার চোখের কোণে আজ আর এক ফোটা জলও নেই। যে মেয়ে পাঁচ বছর আগেই নিজের সমস্ত আবেগ আর ভালোবাসার সমাধি দিয়ে এসেছে, তার কাছে সংসার ভাঙা-গড়ার আর কোনো অর্থ হয় না। আশির বছরের বুড়ো কিংবা তার সমবয়সী সৎ-মেয়েদের সংসার—কোনো কিছুই তাকে আর নতুন করে কষ্ট দিতে পারবে না। সে তো শুধু তার বাবাকে বাঁচাতে চায়, ব্যস।

    “দাদা,” রমা ঘাটের শেষ ধাপ থেকে উঠে দাঁড়াল। শাড়ির আঁচলটা গায়ে ভালোভাবে জড়িয়ে নিয়ে বলল, “কাল বিকেলে বরপক্ষ আসবে। আশীর্বাদের আংটি পরাবে। বাবা অনেক কেঁদেছেন, বলেছেন নিজের স্বার্থের জন্য আমায় বলির পাঁঠা বানাচ্ছেন। কিন্তু আমি বাবাকে বলেছি, আমার কোনো কষ্ট নেই। যে হৃদয়ে কোনো অনুভূতিই অবশিষ্ট নেই, সেখানে কষ্ট জন্মাবে কীভাবে, বলো?”

    রমা ধীর পায়ে গ্রামের রাস্তার দিকে হেঁটে চলে গেল। প্রদীপ বটগাছটার ছায়ায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। বিকেলে সূর্যটা যখন পশ্চিম আকাশে রক্তিম আভা ছড়িয়ে ডুব দিচ্ছিল, প্রদীপের মনে হলো—ঐ লাল রঙটা যেন কোনো উৎসবের আনন্দ নয়, বরং রমার নিঃশব্দ আত্মত্যাগেরই রক্তক্ষরণ।

    পরদিন বিকেলে কাজি আর গ্রামের হাতে গোনা কয়েকজন মানুষকে নিয়ে বৃদ্ধ বর উপস্থিত হলো সনাতন চক্রবর্তীদের ভাঙা উঠোনে। উঠোনের এক কোণে কাঠের একটা সাধারণ বিয়ের পিঁড়ি পাতা হয়েছে।

    রমাকে যখন লাল একটা শাড়ি পরিয়ে সেই পিঁড়িতে এনে বসানো হলো, তখন তার মুখে কোনো কনের লজ্জা ছিল না, ছিল না কোনো রোমাঞ্চ। লাল শাড়িতে তাকে দেখাচ্ছিল এক আত্মোৎসর্গকারী দেবীর মতো। পাশে শুয়ে থাকা অসুস্থ বাবা সনাতনবাবু জীর্ণ হাত দুটো বাড়িয়ে কেবল মেয়ের দিকে তাকিয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন।

    রমা পিঁড়িতে বসল। তার চোখ দুটো স্থির হয়ে রইল দূর আকাশের পানে, যেখানে হয়তো অনিরুদ্ধের মুখটা শেষবারের মতো ভেসে উঠছিল। রমা মনে মনে বলল, ‘তুমি আমাকে ক্ষমা করো। আমার এই শরীরটা হয়তো অন্য কারও ঘরে দাসত্ব করবে, কিন্তু আমার হৃদয় তো তোমার সাথেই সেই পাঁচ বছর আগে পরপাড়ে চলে গেছে…’

    কাজী সাহেব মন্ত্র বা কবুলনামা পড়তে শুরু করলেন। রমা যান্ত্রিকের মতো মাথা নাড়ল। বাবার চিকিৎসার টাকা পকেটে নিয়ে বৃদ্ধ বর তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো।

    রমা যখন পিঁড়ি ছেড়ে উঠল, তার পদচিহ্নে কোনো নতুন জীবনের আনন্দচিত্র আঁকা হলো না। সেখানে রয়ে গেল কেবল এক কন্যাসন্তানের নির্মম আত্মত্যাগ, আর চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাওয়া এক নারীর নিঃশব্দ হাহাকার। রক্তিম গোধূলির আলোয় বিয়ের পিঁড়িটা তখনো নিঃসঙ্গ হয়ে উঠোনের এক কোণে পড়ে রইল—একটি জীবন্ত স্বপ্নের জীবন্ত কবর হয়ে।

    1
    2 Comments
    • Ratan Chandra Roy, “যে হৃদয়ে কোনো অনুভূতিই অবশিষ্ট নেই, সেখানে কষ্ট জন্মাবে কীভাবে” – আপনার গল্পের এই লাইনটা পড়ে মনটা সত্যিই খুব খারাপ হয়ে গেল, কিন্তু আপনি কি মনে করেন বাবার জীবন বাঁচানোর জন্য এমন আত্মত্যাগ রমার জীবনের অবশিষ্ট সব স্বপ্নকে চিরতরে শেষ করে দিল না?

Friends

Profile Photo
তাপস মজুমদার
@f250e4a24990b1d81c1a7c3dc96d2a3d
Profile Photo
Abu Baker Al- Farabi Mazumder
@abubakeral-farabimazumder
Profile Photo
Hai Hafiz
@haihafiz
Profile Photo
Kazi Adam
@kaziadam
Profile Photo
AdabenTatali
@adabentatali
Profile Photo
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
Skip to toolbar