Profile Photo

তাহমিনা মোরশেদOffline

  • RBTM796923t
  • Profile picture of তাহমিনা মোরশেদ

    চারপাশে মানুষ আছে, কফির গন্ধ আছে, নিচুস্বরে গান বাজছে— তবু নন্দিনীর মনে হচ্ছিল যেন পুরো জায়গাটা নিঃশব্দ হয়ে গেছে।
    আরিয়ান তার সামনে বসে আছে। বহুদিন পর এমনভাবে। কোনো তর্ক নেই। কোনো তীক্ষ্ণ কথা নেই। শুধু চোখদুটো ক্লান্ত… আর ভীষণ সত্যি।
    ওয়েটার এসে জিজ্ঞেস করলো, “স্যার, অর্ডার?”
    আরিয়ান চোখ না সরিয়েই বললো, “দুটো কফি। আগের মতো।”
    নন্দিনী ভ্রু কুঁচকে তাকালো। “আপনি এখনো মনে রেখেছেন?”
    “সব ভুলে গেছি ভেবেছিলে?”
    নন্দিনী উত্তর দিল না। কারণ সত্যিটা হলো— সে নিজেও ভুলতে পারেনি।
    কিছু সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও, তাদের অভ্যাসগুলো মানুষকে ছাড়ে না।
    কফি আসার আগ পর্যন্ত দু’জনের মাঝখানে শুধু নীরবতা ছিল। কিন্তু সেই নীরবতাও আজ আগের মতো অস্বস্তিকর লাগছিল না।
    আরিয়ান ধীরে বললো, “আমি জানি শুধু ‘সরি’ বললে সব ঠিক হবে না।”
    “হবে না।”
    “তবু বলতে চাই।”
    নন্দিনী এবার তার দিকে তাকালো। “তুমি জানো তোমার সবচেয়ে বড় সমস্যা কী?”
    “হুম?”
    “তুমি কাউকে ভালোবাসলে তাকে নিজের ভেতরে আটকে ফেলো। কিন্তু কখনো বুঝতে দাও না।”
    আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।
    তারপর নিচু গলায় বললো, “কারণ আমি কখনো ভালোবাসা টিকে থাকতে দেখিনি।”
    কথাটা শুনে নন্দিনীর বুক কেঁপে উঠলো।
    আরিয়ান জানালার বাইরে তাকিয়ে বললো, “ছোটবেলায় প্রতিদিন ভাবতাম— আজ হয়তো বাবা বাসায় ফিরে মাকে চিৎকার করবে না। আজ হয়তো প্লেট ভাঙার শব্দ হবে না। আজ হয়তো কেউ কাঁদবে না…”
    সে থামলো।
    “কিন্তু প্রতিদিনই কিছু না কিছু ভাঙতো। একসময় বুঝে গেলাম— মানুষ কাছে এলে একদিন না একদিন কষ্ট দিতেই চলে যায়।”
    নন্দিনীর চোখ নরম হয়ে এলো।
    এই প্রথম— আরিয়ান নিজের দেয়ালটা সরিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়েছে।
    নন্দিনী আস্তে বললো, “তাহলে আমাকেও সেই একই শাস্তি দিলে?”
    আরিয়ান হালকা হেসে মাথা নিচু করলো। “হয়তো।”
    কফির কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে। সেই ধোঁয়ার ফাঁকে নন্দিনী তাকিয়ে রইলো মানুষটার দিকে।
    তার রাগ এখনো শেষ হয়নি। অভিমানও না।
    কিন্তু আজ সে প্রথমবার বুঝতে পারছে— আরিয়ানের নীরবতা অবহেলা ছিল না, ছিল ভয়।
    হঠাৎ নন্দিনীর ফোন বেজে উঠলো।
    স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠলো— “মি. সেন”
    সে ফোনটা কেটে দিল।
    আরিয়ান ভ্রু তুললো। “ইম্পর্ট্যান্ট কল?”
    “হুম।”
    “রিসিভ করলে না কেন?”
    নন্দিনী কাপের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো। “সব গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিতে হয় না।”
    কথাটা শুনে আরিয়ানও হাসলো।
    বহুদিন পর— একটা স্বাভাবিক হাসি।
    ঠিক তখনই বাইরে বৃষ্টি শুরু হলো।
    জানালার কাঁচে টুপটাপ শব্দ পড়ছে। ধানমন্ডির রাস্তা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে পানির রেখায়।
    নন্দিনী জানালার দিকে তাকিয়ে বললো, “মনে আছে? প্রথম দিনও এমন বৃষ্টি ছিল।”
    “আর তুমি ছাতা আনোনি।”
    “আর তুমি ইচ্ছে করে গাড়ি দূরে পার্ক করেছিলে।”
    আরিয়ান দুষ্টুমি মেশানো গলায় বললো, “কারণ তোমার সাথে একটু বেশি হাঁটতে চেয়েছিলাম।”
    নন্দিনী এবার সত্যি সত্যি হেসে ফেললো।
    আর সেই হাসিটা দেখেই আরিয়ানের বুকের ভেতর চাপা একটা ব্যথা ধীরে ধীরে নরম হয়ে গেল।
    হয়তো সবকিছু এখনো ঠিক হয়নি।
    হয়তো সামনে আরও ঝড় আসবে।
    কিন্তু এই মুহূর্তে— তারা দু’জনই প্রথমবার একই দিকে হাঁটার চেষ্টা করছে।
    ক্যাফের কাঁচের ওপাশে বৃষ্টি পড়তেই থাকলো।
    আর ভেতরে, দু’টো মানুষ ধীরে ধীরে নিজেদের ভাঙা অংশগুলো একে অপরের সামনে খুলে রাখতে শুরু করলো।

    3
    3 Comments
হ্যাঁ বা না শব্দ দুটি সবচেয়ে পুরনো এবং ছোট। কিন্তু এ কথা দুটো বলতেই সবচেয়ে বেশি ভাবতে হয়।

পীথাগোরাস

Skip to toolbar