Profile Photo

Syed FarahOffline

  • syedfarah
  • Profile picture of Syed Farah

    Syed Farah

    2 months, 1 week ago

    মরুছায়ায় মায়া

    মরুভূমির তপ্ত বাতাসের ঝাপটা যখন জাহিদের মুখে লাগে, ওর বারবার মনে পড়ে আড়িয়াল খাঁ নদীর ধারের সেই শীতল হাওয়ার কথা। রিয়াদের এক নির্মাণাধীন ভবনের নিচে এক চিলতে ছায়ায় বসে জাহিদ ঘাম মুছছিল। আজ ঠিক দুই মাস হলো ওর সৌদি আরবে আসা। পাসপোর্টের সিল, বিএমইটি (BMET) স্মার্ট কার্ড আর সেই ‘তাকামুল’ পরীক্ষার ধকল পার করে যখন সে বিমানে উঠেছিল, বুকটা এক বুক গর্বে ফুলে ছিল। কিন্তু বিদেশের তপ্ত মাটিতে পা রাখার পর থেকেই বুকের ভেতরটা কেন জানি সারাক্ষণ খাঁ খাঁ করে।

    ওর চোখে বারবার ভাসে সেই বিদায়বেলার দৃশ্য। সোফিয়া যখন সোহানকে কোলে নিয়ে বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিল, জাহিদ ওর চোখের দিকে তাকাতে পারেনি। আড়াই বছরের সোহান তখন কেবল আধো-আধো বোলে ‘আব্বু’ ডাকতে শিখেছে। সোফিয়া আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বলেছিল, “নিজের শরীরের দিকে খেয়াল রাইখো, ঠিকমতো খাওন-দাওয়া কইরো। টাকা তো হইবোই, কিন্তু আপনি সুস্থ না থাকলে আমরা কারে নিয়া থাকুম?” সোফিয়ার সেই ভেজা কণ্ঠস্বর মরুভূমির এই উত্তপ্ত দুপুরেও জাহিদের কানে শীতল পরশ বুলিয়ে দেয়।

    জাহিদের চোখে ভাসে তার বৃদ্ধ মা-বাবার মুখ। বাবা সারাজীবন রোদে পুড়ে জাহিদকে মানুষের মতো মানুষ করেছেন। আর মা? শেষদিনেও ছেলের ব্যাগে এক কৌটা গাওয়া ঘি আর নকশী পিঠা ভরে দিয়ে দরজার আড়ালে কত যে কেঁদেছেন—সেই কান্নার শব্দ আজও জাহিদকে তাড়া করে ফেরে।

    কাজের ফাঁকে যখন জাহিদ মেসে বসে বিশ্রাম নেয়, তখন বন্ধু শফিকের কথা মনে পড়ে। গ্রামের সেই সাধারণ জীবনটা কত মায়ার ছিল! মেম্বর চন্নু ভাইয়ের চড়া গলার সালিশ, সোনা ভাইয়ের সবুজ ধানের ক্ষেত—সবই যেন চোখের সামনে জীবন্ত সিনেমার মতো ভেসে ওঠে। সেখানে অভাব ছিল, ছোটখাটো দ্বন্দ্ব ছিল, কিন্তু দিনশেষে স্বামী-স্ত্রীর এক থালায় ভাত খাওয়ার যে গভীর তৃপ্তি, তা এখানে বিদেশের যান্ত্রিকতায় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

    মোবাইলটা বের করে সোফিয়ার ছবিটা একবার দেখে নিল জাহিদ। সোফিয়া ছিল ওর জীবনের প্রশস্ত ছায়ার মতো। সংসারে কোনো অভাব বা অশান্তি এলে সোফিয়া তা অদ্ভুত ধৈর্য দিয়ে সামলে নিত। জাহিদ ভাবে, আর কতদিন? কতদিন পর আবার দেখা হবে ওদের? বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে যখন মনে হয়, সোহান বড় হয়ে ওঠার প্রতিটি মুহূর্ত ও মিস করছে।

    তবে জাহিদের একটা বড় স্বপ্ন আছে। সে ঠিক করেছে, বোয়েসেল-এর মাধ্যমে যেভাবে একদম নিয়ম মেনে বৈধ পথে এসেছে, ঠিক সেভাবেই একদিন সোফিয়া আর সোহানকেও এই দেশে নিয়ে আসবে। অনেক প্রবাসীই তো পরিবার নিয়ে থাকে। সোহান যখন একটু বড় হবে, ওর জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা করবে—তখন ওদের সংসারটা হবে পূর্ণাঙ্গ ও সুখী।

    মরুভূমির এই ধু ধু বালু আর কঠোর পরিশ্রমের চাপে পিষ্ট হয়েও জাহিদ হার মানে না। সে জানে, এই বিদেশের তপ্ত নিঃশ্বাসগুলোই একদিন তার গ্রামের বাড়ির দাওয়ায় হাসির ফোয়ারা ছোটাবে। সোহান সুশিক্ষিত হবে, সোফিয়ার মুখে থাকবে অমলিন তৃপ্তির হাসি।

    সূর্য ডুবছে। দূরে আজানের সুর ভেসে আসছে। জাহিদ উঠে দাঁড়ায়। আবার কাজে ফিরতে হবে। শরীরের এই নোনা ঘামটুকুই তো ওর পরিবারের আগামীর ভবিষ্যতের সার। ভালোবাসার এক অদৃশ্য টান তাকে প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দেয়—সে একা নয়, সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে তার ছোট্ট এক টুকরো পৃথিবী প্রতিদিন তার ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।

Skip to toolbar