আমি, তুমি, আমরা

আমি, তুমি, আমরা

পটু
আমি তখন খারাপ হওয়া শুরু করসি।
বৈয়াতী বংশের পোলা আমার এলাকার বন্ধু অশ্রু যারে ওর চাচায় খসরু বইলা ডাকে কইল,
‘একটু পটু নিতে মন চাইতেসে, ‘
আমাদের তখন খরা চলে পকেটে, টাকা পয়সা থাকে না,
আমাদের এক সিনিয়র বন্ধু সারেং বংশের তাওহীদ, যে অনেক সিনিয়র ছিল, তবে বাইক এক্সিডেন্টের পর মাথায়
গন্ডগোল হওয়ায়, মগজের সিনিয়রিটি জুনিয়রিটি মেইনটেইন এর অংশ কাজ করা বন্ধ করে দিসে,
তাই সে সবার সাথে মিশে,
তাওহীদরে অশ্রু ওরফে খসরু তার সমস্যা জানাইলে তাওহীদ আমাদেরকে নিয়া যায় শাহ আলীর মাজারে,
শাহ আলীর পুব পাশের গেইটে এক লোেক পাগড়ি মাথায়, যার দুই পা ই নাই, কাঠের হুইলচেয়ারে বইসা আছে, চোখ লাল,
তাওহীদ তারে গিয়া সালাম দিল,
আমগোরে কইল টাকা দিতে,
আমরা দুইজন মিলা পঞ্চাশ টাকা দিলাম,
পঞ্চাশ টাকা দেইখা তাওহীদের রাগে নাক ফুইলা গেলো, এক পটু তে কী হইব? এসব প্রশ্ন করতে লাগল তাওহীদ,
পরে গিয়া ঐ লোকের কাছে দুই পটু চাইল, তাওহীদের কাছে জীবনেও টাকা থাকে না, ওর মাথায় গন্ডগোল, ফুল কেরেক।
লোকটারে পঞ্চাশ টাকা ধরাইয়া তাওহীদ দুই পটু নিল, ফলে তাওহীদের নাক ফোলা ঐ লোকের মাঝে সংক্রমিত হইল।
তাওহীদ কয়” রাখো”, ঐ লোকে কয়, “তোর টাকা লইয়া যা, তোরে দিমু না,”
তাওহীদ নগদে নিজের গায়ের গুচ্চির নকল গেন্জি খুইলা ফালাইল, গেন্জি দিল লোকটারে, কইল “এই গেন্জি রাখো,
আরেকটা কথাও কইয়ো না।”
এসব পাগলামির সামনে আর কথা চলে না,
তাওহীদ খালি গায়ে হাতে দুই পটু নিয়া হাঁটা শুরু করল, আমরা ওর পিছে হাঁটা দিলাম।
আমরা কইলাম ‘এডি কী করলি? এসবের মানে হয়? এহন যদি একটা গেঞ্জাম হইত! এইটা তো ওর এলাকা!’
তাওহীদ কয়, “কীয়ের ওর এলাকা, মাজার সবার, এক পটু তে কী হয়? বাল হয়। তোরা ভোক্চোদ। তোরা এডি বুঝবি
না।”
তাওহীদের মাথায় গন্ডগোল, ওর মাথা ঠিকমতো কাজ করে না।

ওরশ
মাজারে উরুশ হইতেসে,
আজকে বিশুদবার,
তাই মাওড়া ভাই বেরাদার মিলা যাইতেসি উরুশে,
রিকশা মামারা খুব খুশি, সারাদিনে কয়েকবার ঢুকসে, মাঝ রাতে আবার ঢুকব,
আমরা হই হই করতে করতে ঢুকলাম,
এক রাস্তা বামে, এক রাস্তা ডানে,
ডানে সবাই দোয়া পড়তেসে, যিকির করতেসে, লাখ লাখ মানুষ, পুরুষ, মহিলা, মুরুব্বি, জোয়ান,
যিকির চলতেসে, এক হুজুর কী বয়ান করতেসে, উপরে কিছু দাড়ি টুপি পরা মানুষ মসজিদে আনাগোনা করতেসে,
মাঝখানে কিছু লোক নাচতেসে,
আলি আলি, শাহ আলি।
আলি আলি, শাহ আলি।
আমরা বামে গেলাম, বামে তেরপল দিয়া অনেকেই ডেরা বানাইসে, তারা বিভিন্ন জায়গা থেইকা আসছে,
কিছু মহিলা মাইকে মমতাজের গান গাইতেসে, কেউ গাইতেসে হিন্দি, কেউ বা উর্দু, কোন বাছ বিচার নাই, অনেক মানুষ
তাদেরকে ঘিরা দাড়াইয়া গান শুনতেসে, মহিলাদেরকে দেখতেসে, কেউ কেউ টাকা ছিটাইতাসে, কেউ পানি বা ফল দিতেসে,
ভান্ডারি, কাঙালি, ও আমার রসিয়া বন্ধু রে, বাদ্যযন্ত্র বাজাইতেসে তাদের সাথে বাউল, কারও বয়স পঁচাত্তর, কারও বয়স
তেরো,
কয়েকজন বুজুরগ এমনেই বইসা আছে, এ দলগুলায় মহিলা নাই, থাকলেও একজন দুইজন, এরা মোমবাতি জ্বালাইয়া
চুপচাপ বইসা থাকে,
কিছু বলে না, মানুষ তাদেরকে ফল, পানি, খাবার, দিতেসে, তারা সব মাঝখানে রাখতেসে, যার যেইটা মন চায়
রাখতেসে, যার যেটা মন চায় খাইতেসে,
অনেক জায়গায় আগুন জ্বলতেসে মুখে, সাফি, কাটনি, মাটির জিনিস, তামাক সাধতেসে,
এর মধ্যে কিছু লোক প্যাকেটে বিরানি খিচুড়ি বিলাইতেসে,
কারও কোন তাড়াহুড়া নাই, ধৈর্য ধরলে সবাই পাবে যদি থাকে নসিবে,
যে পাইসে, যে পায় নাই, সবাই সমান,
কে কোথেকে আসছে, আল্লাহ মালুম, পুরা মিরপুরেও এতো লোক নাই, একেকজনের একেক রকম ভাষা, সবাই খুশি, ওরশে
আসতে পাইরা, সবার উৎসব, কেউ কারও শত্রু না, সবাই সবার, সবাই আলিরে কইতেসে আমার আলি,
সবাই আলির কাঙাল,
শাহ আলির কাঙালি।

ল্যাংটা
পালপাড়ার ঘাটের মাঝিরে জিগাইলাম,
‘মামা তুমি হায়েস্ট কতদূর গেসো এই নৌকা লইয়া?’
কয়, ‘বাবা মেলাদূর গেসি, মেঘনা নদী ফালাইয়া,
চরের মধ্যে গেসি’
‘কি কও? এতদূর? খ্যাপ লইয়া গেসিলা? নাকি এমনেই?’
‘এমনেই গেসি। ল্যাংটার মেলায়।’
‘ল্যাংটার মেলা!! এইটা কী কইলা, এইটা কেমনে মেলা?’
‘বাপজান না গেলে বুঝোন যাইব না, এই নদী দিয়া লাখ লাখ মানুষ যায়, সদরঘাটের লঞ্চে তো জায়গা পাওয়া ই মুশকিল।
কেউ ছাগল লইয়া, কেউ মুরগি লইয়া, গরুও লয় অনেকে, সাপ্তাহব্যাপী ওইহানে থাকে, গরিব ধনী সব সমান, ল্যাংটা মানে
বোঝো না, ওর গায়ে কিচ্ছু নাই, তাও ওর সব আছে, মানে এ দুনিয়ার কিছুই তো আমগো না বাজান, আমগোর শইলডাও
তো আমগো না, মাটিই খাইয়া ফালাইব, তাই অহংকারের কিচ্ছু নাই, সব দিয়া দাও, একজন আরেকজনের লাইগা করলে,
সবাই সবার লাইগা করলে, দুনিয়া কত সুন্দর, তখন এটা আমার, এটা ওর, এসব ধান্দা থাকে না, এডাই তো লোভ
লালসা, আমার আবার কী, সবার লাইগা সবাই, ল্যাংটার মেলাও এমন এক জিনিস, না গেলে বুঝোন যাইব না।’
‘মামা ঐহানে কী সবাই ল্যাংটা থাকে?’
‘হ মামা, সবাই কাপড় পইরা থাকে, মাগার ল্যাংটা থাকে, আর পাগল তো এহানেও ল্যাংটা, পাগলাগারদেও ল্যাংটা, ঐহানেও
ল্যাংটা।’
‘কী কও মামা, কাপড় পইরা ল্যাংটা থাকে কেমনে?’
‘আহা মামা! কইলাম না, না গেলে বুঝোন যাইব না। যাইতে হইব।’

ক্লিনটন
[ইল বাবা ইল, ইল বাবা মতিঝিল
একশ টাকার বান্ডিল, আস্তে আস্তে গিল]
ক্লিনটন ভাই একজন নাস্তিক ছিল,
সে ধর্ম মানত না,
দরবারে যাইত গান বাজনা করতে, ছুবা পুড়াইতে,
একবার কী ভাইবা শাহ পরাণের মাজারে খাড়াইয়া কইল ‘বাবা আমি তো এক নাস্তিক, আমার মনের একটা ইচ্ছা আছে,
যদি এই ইচ্ছা পূরণ হয়, তাইলে আমি আস্তিক হমু।’
ক্লিনটন ভাইয়ের ইচ্ছা পূরণ হইল।
এরপর থেইকা ক্লিনটন ভাই আর ঘরে থাকতে পারে না, উনারে বাবায় ডাকে, বাবার ডাক পাইলে আর ঘরে থাকা যায়
না।
ক্লিনটন সেই থেইকা মাজারে মাজারে রাত কাটায়, গান গায়, মাজারেই থাকে,
শাহ আলী, কুমির শাহ, হায়দার বাবা কোন মাজার বাদ নাই, ক্লিনটন ঘোরে সব জায়গায়,
ক্লিনটন জানে উপরে কেউ একজন আছে।
ক্লিনটনের ইচ্ছা মাজারের সবচেয়ে বড় পাগল সে হইব,
ওরশের রাত শেষে ভোর হইলে, মাজার অনেকটা খালি হয়, সকাল হইতেই পাগল, ফকির বাদে সবাই চইলা যায়, ক্লিনটন
যায় না।
প্যান্ডেল খোলা শেষ হয়, বাঁশ খুইলা নেওয়া হয়, ক্লিনটন যায় না।
কারণ ওরশে তো সবাই আসতে পারে, থাকতে পারে, কিন্তু সবকিছু শেষের পরেও যে থাকে সেই প্রকৃত আশেক।
ক্লিনটন আশেক হইতে চায়।
আশেক ক্লিনটন।

আমি, তুমি, আমরা
আমি আর আমার ছোট ভাই গেসি হক মাওলায় চা খাইতে, কবি আগের থেইকাই ওই জায়গায়,
হঠাৎ কোত্থেকে চিনি বাহাদুরের লগে দেখা,
চিনি বাহাদুররে চা অফার করলাম, চিনি বাহাদুর দুধ চিনি বাড়াইয়া চা দিতে কইল,
এমন সময় ক্লিনটন হাজির হইল কোত্থেইকা জানি না।
কয়’ আয় হায়, তোমরা এহানে কী করো, আজকে তো ওরশ।
চলো চলো।’
এইটা কইয়াই বাইকে পিকআপ দিতে লাগল, ক্লিনটনের লগে আরও দুইজন মানুষ, আরেক বাইকে, তাদের কাধে গিটার।
আমি আর আমার ছোটভাইও কবির বাইকে উইঠা পড়লাম।
চৌদ্দ পার কইরা ভাষানটেকে যাওয়ার সময় এক মাজার।
গিয়া দেখি মাজারে শুধু দুইজন মানুষ ছাড়া কেউ নাই।
আশাপাশের সবাই ঘুমাইতেসে, আমি তো অবাক, কই ওরশ,? কই মজমা? কই মজলিশ?
ক্লিনটন গিয়া দুইজনের থেইকা মোমবাতি নিয়া লাইটার দিয়া মোম জ্বালাইল।
কইল, ‘এই যে বাত্তি জ্বলসে, ওরশ শুরু। ‘
অথচ ঐখানে সবাই ঘুম, নাই কোন কামরা।
ঐ মজলিশে শুধু আমি তুমি আর আমরা।

বাঘ
বাঘের যম গাজী কালু, চিনেন আপনি, সুন্দরবনের পাশেই তো ওগো কবর, গাজী, কালু, চম্পাবতি, গিয়া দেখা আসেন,
গাজী কালুরে দেখলে বাঘ সালাম দিত,
টাউনের মানুষ এসব বুঝবেন না,
জমিদারের পোলা ছিল, রাজার পোলা, কিন্তু ওয় রাজত্ব চায় নাই, ঘুরে বনে জঙ্গলে, চম্পাবতিরে ভালোবাসছে,
এই মিয়া আপনার ভালোবাসায় কোন মাইয়া জঙ্গলে থাকব?
থাকব না। গাজী কালুর লাইগা ছিল। এগুলাই মহব্বত, এ মহব্বতের টানেই যুগে যুগে অলি আউলিয়া আইসে,
মহব্বত জিনিসটাই এমন।
ভান্ডারি, ভান্ডারি করেন মাইজভান্ডারের মুরগি লাউ দিয়া ভাত খাইয়েন, গরম ভাতের মহব্বত,
মহব্বতই অলি আউলিয়া,
অলি আউলিয়া মহব্বত।
আশিকি, আশিকি মহব্বত।

জিন্দা কবর
হুজুর কইসে বাবা তুই যা, তোর রক্তে তোর দেশ স্বাধীন হবে,
সেই কথা শুনে সোলেমান শাহী নৌকা নিয়া ভারত থেকে কুষ্টিয়ায় ঢোকে,
যুদ্ধ করে, যুদ্ধে মারা যায়, শহীদ, দেশ স্বাধীন হয় তার রক্তে,
তার কবর এখনও পদ্মার পারে, জিন্দা কবর,
কারণ পাগল মরলে বাত্তি জলে, লাল বাত্তি জলতেসে, কেউ সেখানে চা খাইতেসে, কেউ ক্যারাম খেলে, কেউ টুপি মাথায়
তসবিহ পড়ে, কেউ আযান দিলে উঠিয়া যায়, কেউ বসিয়া থাকে, তারা সবাই জিন্দা, সোলেমানের চেতনা তারা বুঝতে
পারে, অনুভব করে, দাদী মারা গেলে যেমন বাপ নাতিরে দাদীর গল্প শোনায়, ঠিক তেমনি, তারাও এই পরিবারের গল্প
জিন্দা রাখে দিনের পর দিন।
সোলেমান মরসে ঠিকই, কিন্তু তারে মারতে পারে নাই। তার কবর জিন্দা।

ভেঙে দাও, ভেঙে দাও
ভন্ডামিয়ের আস্তানা ভেঙে দাও, ভেঙে দাও। বলতে বলতে আগাইতেসে কিছু সাদা আলখাল্লা পরা, মানুষ, তাদের পেছনে অনেক কিশোর,
এরা কী ভাঙতেসে জানে না, জানতে চায় ও না, ভাঙতে পারলেই খুশি,
মানুষের মিছিলে পিছে পইড়া গেসে শক্তিশালী যান্ত্রিক ক্রেন,
সবাই মিলা গেইট ভাইঙা মাজারে ঢুইকা পড়ল, রড দিয়া তারা সব দেওয়াল ভাঙতেসে, কয়েকজন শাবল দিয়া বাড়ি মারতেসে দান বক্সে,
দান বক্সের ওপর তাদের যেন ব্যক্তিগত খিচ,
এক পিচ্চি মা যার নাই,
যে মাজারে প্লাস্টিকের খেলনা দিয়া খেলতাসিল তার বুকে লাথি মারল একজন জারজ বইলা, পিচ্চি উইঠা হাসতে শুরু করল, কিছু বলল না,
সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য এক হইসে সবাই,
আজকে বিকাল বেলা,
পিছে চলতেসে, ভেঙে দাও, ভেঙে দাও স্লোগান,
সবাই দৌড়াইতেসে,
একজনের পকেট থেইকা টাচ স্ক্রিন ফোন পইরা যাইতেসে, সাথে সাথে সে আবার ঐটা পকেটে ঢুকাইয়া দৌড়ানো শুরু করতেসে।
রডের দাম বেশি হওয়ায় সবার হাতে তা নাই, অনেকে ইট দিয়া বাইড়াইতাসে, অনেকে লাঠি।
জোরে জোরে, একটা তালের মধ্যে,
এ যেন এক ওর্কেস্ট্রা চলতেসে,
সবাই ভাঙতেসে,
কয়েকজন মানুষ উপরের মসজিদ থেইকা কেবল বাইর হইসে।
তাকাইয়া কী হইতেসে বোঝার চেষ্টা করতেসে।
তারা মাত্র আসরের নামাজ শেষ কইরা বাইর হইসে।
মোনাজাতও সারে নাই।

Loading

মীর অনাবিল— কবি। মিরপুর ১ এর বাসিন্দা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র।

Leave a Reply

Skip to toolbar