আম্মার ফুলের বাগান

আম্মার ফুলের বাগান

যে কোন ইউফোরিক ট‍্যাবলেটের সাথে নন-ট‍্যাবলেট বাট ফ্লাওয়ার, ফুল, ফ্লাওয়ারিং প্ল‍্যান্ট, ঘাস জাতীয় গোত্রের ক‍্যানাবিস স‍্যাটিভার ফুল হাল্কা ডোজে কম্বাইন করলে ডিসেম্বরের দীর্ঘ রজনী মনোটনি হারায়। আর মনোটনি হারালে ঝলমল হয়ে ওঠে আরেক পাশ। অন্ধকার, ঠিক পুরা না, পৌনে অন্ধকারে বৃষ্টির মতো মোটামোটা স্নো ঝরে পড়াকে মনে হয় ভ‍্যানগগের অ‍্যামন্ড ব্লসম। এসময় ফোলাফোলা, সাদাসাদা স্নো পড়ে। চিরহরিৎ পাইন গাছের পাতাঅলা ডালে রাশিরাশি স্নো পড়ে, মাছের কাঁটার মতো ডাল থেকে বিস্তৃত হওয়া পাতাগুলা সাদা পাপড়ি হয়ে যায়। আর তখন গাছের ওপরের অংশটা একটা আস্ত ফুল হয়ে যায়। পরের দিনের সূর্যের আলোয় সেই ফুলের জমে থাকা স্নো চিকচিক করে, আরেকটা লেয়ার যুক্ত হয়, কাঁচের জানালার বাইরে একটা শীতকালীন বসন্ত আসে।

এরকম দিনে চাকরি চলে গিয়ে বেকার থাকাটা আরো বোরিং। বাসা ভাড়া দিতে পারা না পারার অনিশ্চয়তায় আতঙ্ক যোগ হয়। সেই আতঙ্ক বেড ঘুচানো, ঘর পরিস্কার করা, রান্না, বইপড়া, জব অ‍্যাপ্লাইয়িং, ইনস্টাগ্রামিং, বাইরে হাঁটাহাঁটি সব কিছুর মধ‍্যে ধুপ করে ঢুকে পড়ে, প্রায়ই। খেয়াল করলাম, খাবার ঠিকমতো যোগাড় হবে কি-না এই আতঙ্কটা তীব্র হয় নাই; কারণ সম্ভবত: খাবার খরচ এপার্টমেন্ট ভাড়ার থেকে অনেক কম, তিনভাগের একভাগ বলা যায়।

দুনিয়াতে কি তাইলে খাবার যোগাড়ের কষ্ট মিটে গ‍্যালো!? কারণ ছোটবেলায় দেখসিলাম আম্মা এবং আম্মারা ভাইবোন, প্রতিবেশী আন্টি বর্গ, সবাই সপ্তাহজুড়ে তিন বেলা ভাত-মাছ-মাংস-সবজি মিলাইতে পারছে কি-না, সেইসব গল্প আনতোই একবার না একবার, আড্ডায়। কোন জিনিষ কেনা বন্ধ রেখে হাফিজের দোকানে দুই বস্তা চালের অর্ডার পাঠাইতে হৈসে – আম্মাকে এরকম বলতে শুনসি পাশের বাসার আন্টির সাথে আড্ডায়। তখন সময়টা ছিল, ভাত লাগবেই, আর কিছু হৌক বা না হৌক, চাল, মানে যেইটা দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রধান খাদ‍্য, স্টেপল ফুড, লাগবেই।

সমীকরণটা কী এইরকম: থাকতে পারলে না খাওন-দাওন! আগে তো থাকার জায়গা দরকার। থাকার জায়গা না থাকলে কী খাওয়ার ক্ষিধা থাকে না? ব‍্যাপারটা মনে হয়, থাকার জায়গা টাকার বিনিময়ে ভাড়া করার ন‍্যুনতম সঙ্গতি যাদের আছে, তাদের ফাইট এইটা। যাদের সেইটা নাই, রাস্তায় ঘুমায়, তাদের ফাইট খাবার যোগানো ফার্স্ট। আচ্ছা, দুনিয়াতে রাস্তাকে ঘর বানানো মানুষের সংখ‍্যা কতো? তারা কি ফুটপাত, মেট্রোরেলের খাম্বার নিচের দিকের চওড়া সিঁড়ি, ওয়াসার পাইপ, রেলস্টেশনের প্লাটফরম বা এই জাতীয় ছাদহীন, দেয়ালহীন শহুরে কোনাকে ঘর ভাবে? কী জানি! হয়তো হোমিভাবা জানে। হোমিভাবা ইন্টারভ‍্যুতে কী কী সব বলে বেড়ায় – ডায়াস্পোরা আর হোম নিয়ে – সেন্স অব বিলঙগিং, আনক‍্যানি, মিসফিট . . . ব্লা ব্লা ব্লা। তবে সেন্স অব বিলঙগিং ব‍্যাপারটা মাথায় ঢুকে থাকে আর মাঝে মাঝে বের হয়ে কিছু প্রশ্ন আর কিছু মেলানকোলিতে নিয়ে যায়।

এইরকম অন্ধকার সন্ধ‍্যায় আম্মা আসলো মাথায়। তিন দিন ধরে টানা আম্মার সঙ্গে কথা হয় না। আম্মা তার বাড়িতে গেছে। আম্মা সবশেষ হোয়াটসঅ‍্যাপ কলে বলছিলো, অনেক বছর পর বাড়িতে যাচ্ছে, অনেক পুরানা মানুষের সাথে দেখা হবে, কথা বার্তা হবে। আম্মা এই সময় বিদেেশে বা দেশে যারা আছে, কারো সাথে ফোনে কথা বলাবলি করবে না। তিনি ফোন থেকে দূরে থাকবেন।

বাইরে স্নো পড়া বন্ধ। ফকফকে আকাশ, টলটলে পূর্নিমা। আর রাস্তা ঘাট, ঘরের ছাদ, বারান্দার রেলিঙ, বাস-প্রাইভেট কার-অ‍্যাম্বুলেন্স-স্নো ক্লিনিং গাড়ির ছাদ – সবখানে স্থির এবং গতিশীল স্নো। আমি ঠিক করালাম বাইরে যাবো, নোম্মের উডসে গিয়ে হেঁটে আসবো। নোম্মের জঙ্গলে গেলে আমার ল‍্যান্ড অব লিলিকে মনে হয়। ল‍্যান্ড অব লিলির হাওরের রাশি রাশি পানির সীমাহীন ব‍্যাপকতা শরীরে যে অনুভূতি দেয়, সেইটা না, কিন্তু সেইরকম কাছাকাছি একটা ব‍্যাপার আছে নোম্মের উডসে। সাদা-সাদা বরফে ঢাকা নোম্মে উডসে পূর্ণিমার চাঁদ যেন গামলা-গামলা জোছনা ঢালতে থাকে, এইরকম  মাধূর্যময় সোনালী-রুপালি মিশ্রণের নরম আলো, আমি কোন ফিল্ম ফেস্টিভ‍্যাল বা নেটফ্লিক্সের স্ক্রিনে দেখি নাই কখনো। আর উত্তর মেরুর কাছাকাছি থাকা এই ল‍্যান্ড অব কর্ণফ্লাওয়ারে আকাশ য‍্যানো চওড়া হয়ে একটু কাছে-কাছের মতো কাছে লাগে। 

প্রায় রেডি হয়ে গেছি – হাঁটু পর্যন্ত হাইটের জুতা আর লং জ‍্যাকেট পরে ফোন পকেটে ঢুকাতে যাবো, তখনই ফোন আসছে। ভাবসিলাম আম্মার ফোন, দেখি ম‍্যাটির ফোন। ও বল্লো, ওরা এমএসএম নিয়ে একটা রিসার্চ গ্রান্ট পাইসে, ওইখানে একটা গিগ টাইপ কাজ আছে। আগের কয়েকটা রিসার্চ পেপার থেকে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ের ডেটা নিয়ে একটা রিভিয়‍্যু রিপোর্ট লিখতে হবে। আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার শব্দ। তিনশ’ ইউরো।

আমি জ‍্যাকেট খুলতে থাকি। জুতার এক পাশে থাকা বটম-টু-নি-হাই চেইন খুলতে থাকলাম। আমার বাইরে যাওয়ার দরকার নাই। আমি ম‍্যাটিকে বল্লাম, গ্রেট! ডেডলাইন কয় দিনের?

তিন দিন। তুমি এইটিন ডিসেম্বরের মধ‍্যে সাবমিট করবা। ডেডলাইন বাড়ানো যাবে না। ক্রিসমাস আসতেসে। বিশ তারিখ থেকেই উইকএন্ড শুরু হয়ে যাবে।

আমি বলি, শ‍্যুট। ডিল ডান। তুমি ১৮ তারিখের মধ‍্যেই রিপোর্ট পায়া যাবা। কিন্তু তুমি আমাকে এখনই ম‍্যাটেরিয়াল পাঠাও। এবং দিন কাউন্ট হবে কালকে থেকে।

ম‍্যাটি বল্লো, এইটা এলটন জন ফাউন্ডেশনের ফান্ডিংয়ে কাজ হচ্ছে। আমি তোমাকে অফার লেটার আর ম‍্যাটেরিয়ালস ইমেইল করতেসি। তুমি অফার লেটার সাইন করে আজকেই পাঠায়া দাও।

ম‍্যাটি কোরহোনেন, ফিনিশ। ফিনল‍্যান্ড থেকে ল‍্যান্ড অব কর্ণফ্লাওয়ারে আসছে এক দশকের বেশি। ল‍্যান্ড অব কর্নফ্লাওয়ার এক সময় সোভিয়েত ছিল। ইউনিয়নের একটা ইউনিট। ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পর রাজধানী শহরের লেলিন ব‍্যুলেভার্ড পাল্টে হয়ে যায় রাভালা পুয়েস্তে বা রাভালা সড়ক। সোভিয়েত সরকারের ইন্টিলিজেন্স আর সিকিউরিটি বাহিনী কেজিবি’র হেড কোয়ার্টার হয়ে যায় কেজিবি মিউজিয়াম যার রুফটপে একটা ছিমছাম বার, মিউজিয়াম দর্শনার্থীদের জন‍্য। জাদুঘর বেড়াতে আসারা সোভিয়েত সময়কার ভয়াবহতা ভেবে, কেঁপে ২২ তলা বিল্ডিংয়ের ছাদে বসে বিয়ার আর বাল্টিক সমুদ্রের বাতাস খায়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলার সোভিয়েত ইমপিরিয়ালিস্ট চাপ শক্তভাবে ঠেকায়া ফিনল‍্যান্ড দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই মন বসায় কর্ণফ্লাওয়ারের দেশে সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারের। আর যুদ্ধের সময়ই সোভিয়েত দখলে নিয়ে নেয় স্বাধীন থাকা কর্ণফ্লাওয়ার ল‍্যান্ড । সোভিয়েত ভেঙ্গে যাবার পর যারা আগে পরাক্রমশীল ছিল, রাশানভাষী, তারা এইখানে পরিনত হয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীতে। কী আশ্চর্য! আমার ভাবতেই আজব লাগে, রাশানরাও কোন দেশে ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা হতে পারে! এরাও মাইনরিটি!

কর্ণফ্লাওয়ারের সাথে ফিনল‍্যান্ডের ভাষায় মিল থাকায় রেডিওতে ফিনিশ ল‍্যাংগুয়েজ বেইজড প্রোগ্রাম খুব জনপ্রিয়তা পেতে থাকে, সোভিয়েত সময় থেকেই। ভেঙ্গে যাওয়া ইউনিয়নের পোস্ট-সোভিয়েত যাত্রার মাঝামাঝির দিকে ম‍্যাটি ফিনিশ ল‍্যাংগুয়েজ রেডিও চ‍্যানেলের প্রোগ্রাম প্রোডিউসার হিসাবে আসে।  তারপর থেকে যায়।

রেডিও চ‍্যানেলের প্রোডিউসার চাকরির পাশাপাশি এখানকার ছোট, মাঝারি লেভেলের একটা আন্ডারগ্রাউন্ড গ্রুপের সাথে কাজ করে। এলজিবিটিআই কমিউনিটির একটা নির্দিষ্ট অংশের সঙ্গে। পুরুষের সাথে পুরুষের প্রেম-ভালোবাসা, সেক্স করা গ্রুপ নিয়ে, মানে গে, ট্রান্সজেন্ডার এবং বাইসেকচুয়ালদের ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার, এইচআইভি পজেটিভের  ঝুঁকি তাড়ানো নিয়ে। মূলত: গবেষণার কাজ।

শুরুর দিনেই, মানে, ম‍্যাটির সাথে পরিচয়ের দিনে, অনেক কিছু মনে নাই, কিন্তু এইরকম মনে আছে যে আমারা অনেক গল্পের মধ‍্যে ঢুকে গেসিলাম। আমার দেশ ল‍্যান্ড অব লিলি, ওর দেশ —  দূর একটা প্রান্ত থেকে আমি আর কাছাকাছি  একটা প্রান্ত থেকে সে আসছে। আমরা ইমিগ্রান্ট। কিন্তু ইমিগ্রান্ট হিসাবে আমরা দুই ধরনের ট্রিটমেন্ট পাই, কারণ সে গ্লোবাল নর্থ আর আমি গ্লোবাল সাউথ। ল‍্যান্ড অব কর্ণফ্লাওয়ার বড়লোকদের আরো বেশি বড়লোকি সুবিধা আর গরীব দেশের ইমিগ্রান্টদের এই আইন পাল্টে যাচ্ছে, ওই আইন পাল্টে যাচ্ছে — এরকম অস্থিরতায়, মানসিক অসুবিধার মধ‍্যে রাখে। এসব কড়া বাস্তবতা হাল্কা চালে-তালে সাইডে চলে যায় যখন ম‍্যাটি ফ্রেডি মার্কারিকে নিয়ে গল্পে ঢুকে। কেন ফ্রেডি তার গার্ল ফ্রেন্ডকে বিবাহ করার আগে বুঝতে পারে নাই যে সে একজন গে, এইসব আলাপের ডাল পাতায় ম‍্যাটি আমাকে বুঝতে দেয় সে একজন গে এবং সে কোন ধরনের সাবস্টেন্স ব‍্যবহার করে না।  কিন্তু সে ডেটিং অ‍্যাপ ব‍্যবহার করে কারণ তার কোন লংটার্ম কমিটমেন্টের পার্টনার নাই।

ম‍্যাটি বলে, ‘তোমার কী মনে হয়, লংটার্ম সম্পর্ক হেলথি রাখে? একটা মানুষকে কত জানা যায়! লম্বা সম্পর্ক একটা রিপিটেটিভ চক্র হয় যায় একসময়, তাই না? তুমি ঘুম থেকে উঠেই জানো তোমাকে আজকে সারাদিন কী কী সব আচরণ, ঘ‍্যানা-ঘ‍্যানা সহ‍্য করতে হবে। হা হা হা . . . তোমার ক‍্যামন লাগে এইরকম?

আমার বোন আছে, ফ্রেন্ডরা আছে, আছে তো এইরকম লম্বা টানা সম্পর্কে। ওরা তো সফলও। ওরা সম্পর্কও লম্বা সময় ধরে করতেসে, আবার চাকরিও করতেসে। কিন্তু আমার হয় নাই। আমি দেখসি আমি লম্বা সময় থাকতে পারি নাই। আই থিংক, আই অ‍্যাম নট অ‍্যা লংটাইম পার্টনার ম‍্যাটেরিয়াল। দূ:খ!

তখন ম‍্যাটি হাত উঁচায়া হাইফাইভ ইনভাইট করে। আমি হো হো হো করে হাসি। আমরা ফাইভ দেই। এরকম আড্ডা দিতে দিতে একদিন তার ক্ষেপ-ভিত্তিক কাজে যোগ দেই। কখনো ঐতিহাসিক ডেটা রিসার্চ-ক্রস রিসার্চ করে বের করে দেই, কখনো ভার্চুয়াল এসিস‍ট‍্যান্টের মতো ইমেইল লিখে ক্লায়েন্টদের সাথে যোগাযোগ করি, আউটলুক ক‍্যালেন্ডার মেইনটেইন করি। এইসব কাজে ঘন্টা হিসাবে পেমেন্ট পাই। যখন ডেভিড গ্রেবারের “বুলশীট জব”র মতো ফুলটাইম চাকরি চলে যায়, তখন ম‍্যাটির ক্ষেপ শিল্প কোনমতে বাসা ভাড়া দেয়ার উপায় হয়ে আসে।

ম‍্যাটি আমাকে অফার লেটার এবং রিভিয়‍্যু রিপোর্টের জন‍্য ম‍্যাটেরিয়ালস পাঠালো। আমি অফার লেটার ডিজিটালি সাইন করে পাঠালাম। কয়টা ম‍্যাটেরিয়াল, সংখ‍্যাগুনে, একটু একটু করে চোখ বুলায়া একটা ফোল্ডারে সেইভ করে রাখলাম। তারপর অনেক ঘুম আসলো।

ঘুম ভাঙ্গে আমার বড় বোনের হোয়াটসঅ‍্যাপ কলে। কল ধরবো কি ধরবো না দোনোমনায় ধরেই ফেল্লাম। সে বলে,

: আম্মার সাথে কথা হৈসে তোর? ওই দিকে তো কান্ড ঘটে যাইতেসে!

: কী কান্ড!? আম্মা আমারে ফোন দিতে মানা করসে, আর তোর কল রিসিভ করসে?

: না, আম্মার ফোন অফ। আমি ছোটখালার ফোনে আম্মার সাথে কথা বলসি, কিন্তু সেইটা মূল বিষয় না। ওই দিকে তো ব‍্যাপক ঘটনা ঘইটা যাইতেসে।

: ক‍্যান কী হৈসে?

: তারা তো মূল বাড়ি, উঠান, কাঁচারি ঘর, পুকুর, বাড়ির পেছনের অনেক সুপারি, বেতগাছঅলা জায়গা, মানে পুরাটা কে কোনভাগ নিবে সেইসব নিয়াতো তাদের কোন দ্বন্দ হয় নাই। এখন সমস‍্যা একটাই, সেইটা হৈল ফুলবাগান। বাড়ির সামনের যেই ফুলবাগানটা আছে না, ওই যে তুই আর আমি যে কাঠগোলাপ গাছের ডালে চড়ে খেলতাম না, ওই ফুলবাগানটা সবাই নিতে চায়। এই ফুলবাগান কেউই ছাড়তে চায় না। এইখানে জায়গা আছে তো প্রায় ৭/৮ কাঠার মতো। আমি আসলে ঠিক জানি না। ওদের জিজ্ঞাস করলে ওরা বলে শতাংশ হিসাবে। আমি ওই হিসাবে আয়তন আন্দাজ করতে পারি না। কিন্তু বড় জায়গাই।

আমার বোনের কাছ থেকে জানলাম, আমার ছোটখালা, মিতু খালা ল‍্যান্ড অব লর্ড অব রিংস থেকে গ্রামের বাড়িতে ল‍্যান্ড করসে এই জন‍্য যে সেও এই ফুলবাগান চায়।

আম্মারা পাঁচ ভাই-বোন। একজন বিদেশে থাকে। এখন অবশ‍্য সবাই বিদেশ অথবা দূরের শহর থেকে বাড়িতে পৌঁছে গেছেন।

বিরাট উত্তেজনা। আমি উত্তেজনার মধ‍্যে একটু পড়ে গেলাম। একবার ফোন হাতে নিয়ে ভাবলাম ছোটখালাকে ফোন দেই, তারপর মনে হৈল আমার বোনের সাথে ছোটখালার যে সম্পর্ক সেই সম্পর্কের কারণে উনি অতোগুলা ইনফরমেশন দিছেন। আমারে তো এত ডিটেইল কথা বলবে না। আমি সম্ভাব‍্য সহজ সোর্স হিসাবে আমার মামাতো বোনকে ফোন দিলাম। মামাতো, খালাতো ভাইবোন যারা আছে, সবাই এখন ওই ছোটপাই গ্রামে।

আমার মামাতো বোন কল রিসিভ করে বলে, “আপনি যে কী মিস করতেসেন, আপনি নিজেই জানেন না। এইখানে বিশাল বিশাল রান্না বান্না হৈতেসে, ডাব খাইতেসি, পিঠা খাইতেসি, শীতের পিঠা কয় বছর খান্না, কন তো!

আমি বলি, জমি ভাগাভাগি শেষ হৈসে? কে জিতসে, কে হারসে?

: এখনো তো ফলাফল হয় নাই। প্রচুর উত্তেজনা কিন্তু এই খানে। লটারির মতো একটা ব‍্যাপার হবে। সবার নাম আলাদা আলাদা করে আলাদা আলাদা এ ফোর সাইজ কাগজে লিখে নিঁখুত ভাঁজ দেয়া হবে। আমি আছি এই কাগজ-ভাঁজ টিমে। কিন্তু পাঁচ জনের নামের বাইরে একটা এক্সট্রা ভাঁজ-কাগজ থাকবে। ওইটাতে লেখা থাকবে “ফুলবাগান কারো না”। এরপর একটা দুই/আড়াই বছরের বাচ্চাকে দিয়ে কাগজ তোলানো হবে।

: আড়াই বছরের বাচ্চাকে দিয়ে তোলানো হবে ক‍্যান?

: আড়াই বছরের বাচ্চা তো পক্ষ/বিপক্ষ বুঝবে না, ও তো নিরপেক্ষই থাকবে। সেইফ, ফাট করে একটা কাগজ তুলে ফেলবে, কারো কিছু করার নাই, লবিং-টবিং। হা হা হা . . . জানেন না তো কালকে রাতে ব‍্যাপক নাচ-গান হৈসে উঠানে। মেঝোকাকাকে এত নাচতে দেখি নাই আগে কখনো।

ফোন রাখার পর আমি মনেমনে “এই ফুলবাগান কারো না” ভাঁজ কাগজটার পক্ষে ক‍্যাম্পেইন চালাইতে থাকি। কোন জিনিষ মন থেকে বার বার উচ্চারণ করলে বা চাইলে তা নাকি সত‍্যি সত‍্যি হয়। এইটাকে বলে মাইন্ড পাওয়ার। এইটা স্টেফেন কিং’র ফিকশনে আছে, কিন্তু সেইটা কৈশর বয়সিদের হয়। আমার অস্থির লাগে।

মন শান্ত করার চেষ্টা করি এই ক‍্যালকুলেশন থেকে, যে, দুইদিন খিচ দিয়া কাজের মধ‍্যে ঢুকে থাকলে ৩০০ ইউরো আসবে ঘরে। আমি মেটারিয়ালসের পিডিএফ ঝাঁপি খুলে বসি।

একটা রিপোর্ট বলতেসে, এমএসএমদের এইচআইভি পজেটিভ ঝুঁকির  বড় কারণ তাদের সেকচুয়াল বিহেভিয়র। গত বছরে পাবলিশ হওয়া একটা রিপোর্টে দেখি, দূর সম্পর্ক বা ডিসটেন্স রিলেশনশীপ, সম্পর্কের দুইজনের মধ‍্যে একজন বহুগামি হওয়ায় বা সম্পর্কের কোন ভবিষ‍্যত নাই ইত‍্যাদি নানা কারণে বিভিন্ন ক‍েমিক‍্যাল সাবস্টেন্স এবং অ‍্যালকোহল নেয় এবং কনডম ছাড়া সেক্স করে গে, ট্রান্স, বাই সেকচুয়ালরা।

এইটা মেন্টাল বিহেভিয়র না? আমি পিডিএফ ফাইল থেকে টেক্সট কপি করে ওয়ার্ডে পেস্ট করার পর এই প্রশ্ন লিখে হাইলাইটার দিয়ে মার্কড করে রাখি, আমার নোটস হিসাবে।

আরেকটা রিপোর্টে দেখলাম এমএসএম ডেটিং অ‍্যাপসের বিস্তারিত, আরেকটা রিপোর্ট শুধু স্টিগমা নিয়ে। যেইখানে বলা হচ্ছে, স্থানীয় এবং ইংরেজি ভাষীদের চাইতে রাশানভাষী কর্ণফ্লাওয়ার ল‍্যান্ডের বাসিন্দারা বেশি স্টিগমায় ভোগে। লোকালরা রাশানদেরকে মনে করে এরাই সিরিঞ্জ দিয়ে ব্লাডে শ‍্যুট করে, এরাই পাছা লাগায়, এদেরই এইচআইভি হয় — এরকম।

আমি ম‍্যাটিকে ফোন করে, কিছু জায়গা আমি যা বুঝছি তা ঠিকঠাক বুঝছি কি-না, এইরকম নিশ্চিত হওয়ার আলাপ দিলাম। ম‍্যাটি বল্লো, তুমি পরিস্কার বুঝ নাই। বার এক্সে আসো বিকাল ৩টায়। একটা এক ঘন্টার মিটিং করি।

ওই ফুলের বাগানের সাথে আমার তো অনেক স্মৃতি। বাড়ি বলতে ছোটবেলা থেকে নানাবাড়িই বুঝতাম। আমাদের বছরে একবার বা দুইবার গিয়ে নিয়মিত বেড়াবার জায়গা। বাড়ি তো আসলে এমনই হয়, আমার মনে হয়। প্রচুর গাছ — আম, জাম, তেঁতুল, বেত, সুপারি, নারকেল, চালতা, জলপাই, আমড়া, তেজপাতা, কাঁঠাল, গাব, কাঠবাদাম এরকম কত কত রকমের গাছ। একটা পুকুর ভেতরে, একটা পুকুর বাইরে, বাহারবাড়িতে। আম্মাদের ছোটবেলায় কেরোসিন তেল ছাড়া আর কিছুই বাজার থেকে কেনা হৈতো না। সবই ছিল স্বউৎপাদিত। কী স্বয়ংসম্পূর্ণ একটা ব‍্যাপার! তারপর সময় পাল্টায়, তারা ঘরে সুইচ চেপে বাতি জ্বালায় আর ফ‍্যান চালায়, টিভি দেখে। আর তার জন‍্য যে মাসে মাসে বিদ‍্যুৎ বিল বাবদ এক তোড়া টাকা দেয়, ওদের খারাপ লাগে না। ওদের মনে হয় ওরা আধুনিক হয়ে উঠতেসে দিন দিন। আস্তে আস্তে চাল, সবজি, নারকেল তেল, মুরগি, মাছ সবই অন‍্যদের উৎপাদন টাকা দিয়ে কিনে আনা শুরু হয়। ঘরের ভেতর টয়লেটে কমোড যুক্ত হয়। আগে ঘর থেকে টয়লেট ছিল অনেক দূরে। কোন সপ্লাই ওয়াটার ছিল না তখন। বদনায় পানি ভরে যাইতে হৈত। এইসব পরিবর্তন কিন্তু ফুল বাগানে লাগে নাই।

সেইটা সময়ে সময়ে সেইরকমই ছিল। একটা বড় বকুল ফুল গাছ, দুইটা বড় কাঠগোলাপ, একটা কাঁঠালিচাপা, একটা শিউলি, রক্তজবা, লাল ঝুমকা মাইক জবা, যেইটা বোঁটা থেকে ছিঁড়ে মুখে দিলে কয়েক ফোটা মিষ্টি রস লাগে জিব্বায়। তারপর বেলি, গন্ধরাজ, হাসনাহেনা, লতানো মধুমঞ্জুরী, রঙ্গন, লিলি, নয়নতারা, মানে কত যে কত নামের ফুল, আমার সব মনে নাই।

আমি কাতর হয়ে পড়ি। আমার মন ছুটাছুটির মধ‍্যে ঢুকে পড়ে। ঘড়ি দেখি, বাসের টাইম-টেবিল চেক করি অ‍্যাপসে। রেডি হৈতে থাকি বার এক্সের জন‍্য।

একদিন আম্মা বলতেসিল, উনার বয়স যখন ১০ বছর তখন উনার বাবা এই বাড়িটা মানে, যেই বাড়িটা এখন ভাগাভাগি হচ্ছে, এই বাড়িটা বানানো শেষ করে ফুল বাগানটা তৈরি করেন। তখন উনিশশ ষাট সাল। নানা ওরফে মাইনুদ্দিন চৌধুরী তার নিজের বাবার বাড়ি থেকে আলাদা হয়ে একটু দূরে নিজের টাকায় কেনা জমিতে নতুন বাড়ি, পুকুর, গোয়াল ঘর, কাঁচারি ঘর, ফুল বাগান ইত‍্যাদি করেন, তার ডিজাইনে। প্রথমে বাড়িটা ছিল বেড়ার, তারপর টিনের, তারপর ইট-সিমেন্ট-বালুর পাকা ঘর। কিন্তু ফুলের বাগান বাঁশের বেড়া দিয়েই ঘেরা ছিল সবসময়। ওখানে ইট-সিমেন্টের হাফ ওয়াল উঠে নাই কখনোই। 

আম্মা তার হাইব্রিড ভাষায় বলতেসিল এইরকম, আমাদের সবার অবশ‍্য আলাদা-আলাদা হাইব্রিড ভাষা:

এই ফুলবাগানের কত গাছ কত জায়গা থেকে আনছিলো বাবায়। কোন কোনটা দেশের বিভিন্ন বিভিন্ন ডিস্ট্রিক থেকে আনা, কোনটা এন্ডিয়া থেকে আনা। বাবা তো কোলকাতা-কুষ্টিয়া ব‍্যাবসা কইত্তো। তারপর ওই কোলকাতাতেই, ক‍্যামনে ক‍্যামনে শিখি আসলো গাছ থেকে কীভাবে ওষুধ বানাইতে হয়। বাবা কোনখান থেকে সাদা লিলি গাছটা আইনছিলো আমার মনে নাই। ওইটার এতো সুন্দর গন্ধ! আমাদের গ্রামের কেউ আগে এই ফুল গাছ দেখে নাই। ছিলও না এই দিকে। তারপর একদিন দেখি বাবায় এই গাছের গোড়া মানে শিকড় তুলি নিয়া আসলো। এইটার শিকড় তো পেঁয়াজের মতো। তারপর সেইটা থেকে রস বাইর কইরলো। আরো কী কী জানি মিশাইলো ওই রসের সাথে। সেইটা একটা কাঁচের বোতলে ভরলো, তারপর আমারে বল্লো এইটা ওষুধ। ওই সময় তোর মেঝোমামার অনেক শ্বাস কষ্ট ছিলো। বাচ্চা মানুষ। কিন্তু এই ওষুধ খেয়ে সে ভালো হয়ে গেছে। গাছের যে কত রকমের ওষুধি গুন আছে!

আম্মাকে অবশ‍্য কখনোই গাছের শেকড় বা পাতা বা ডাল থেকে বানানো ওষুধ খাইতে দেখি নাই। সব সময়ই উনার ভরসা হচ্ছে ফার্মেসিতে বিক্রি হওয়া ওষুধের পাতা। আম্মার ফুল বাগানের প্রতি মায়া আমাকে একটু কাতর করে ফেলসিলো কিন্তু গড় গড় করে তার মুঠাভর্তি ওষুধ খাওয়ার দৃশ‍্য মনে আসায় মনটা বিরক্তিতে ভরে গেল।

 ইস! কতদিন আম্মার সাথে ঝগড়া হয় না!

আমি মিটিং করতে গে কমিউনিটির স্পেশালাইজড বার, বার এক্সে আসি, একদম অনটাইম। তিনটা বাজে।

ম‍্যাটিও ঠিক ঠিক তিনটায় চলে আসছে। আমি জুতা থেকে স্নো ঝেড়ে জ‍্যাকেট হ‍্যাঙ্গারে ঝুলায় রেখে ল‍্যাপটপ খুলে বসি। ও বল্লো, তুমি যেটাকে প্রিকশন বলতেস, সেইটা খুব জেনারেল টার্ম। এইটাকে প্রি-এক্সপোজার প্রোফিলাক্সিস বা প্রেপই রাখবা। জেনারালাইজ করার দরকার নাই। এমএসএম একটা ক্লিনিক‍্যাল টার্ম, প্রেপ এক্সপ্লেনেশনে সেই টোনটা রাখতে হবে।

কেন জানি আমার নাকে একটা ক্লিনিক-রোগি-হাসপাতাল গন্ধ আসতে থাকলো। আমি ম‍্যাটিকে বল্লাম, আমার মাথায় একটা জিনিষ ঘুরঘুর করতেসে, আমি এইটা থেকে বাইর হৈতে পারতেসি না। কনসেনট্রেট করতে ঝামেলা হচ্ছে লেখায়।

ম‍্যাটি বল্লো, এমএসএম রিলেটেড কিছু?

: না। কিন্তু ধরো, তুমি যদি ইমোশন ড্রিভেন সমস‍্যায় পড়ো, তাইলে তুমি সেইটা সলভ করো ক‍্যামনে? আবেগ ফিক্স কর ক‍্যামনে?

: কী হৈসে?

: আমি আসলে একটা গেইজিং গেইমের মধ‍্যে ঢুকে গেছি। এইটা একটা ফুলবাগান নিয়ে। আমরা ভাইবোনরা ওইটাকে আম্মার ফুলের বাগান বলি, কারণ উনি এইটা নিয়ে প্রচুর গল্প করছেন আমাদের সাথে। এখন এইটা কার মালিকানায় থাকবে, সেইটা আদৌ ফুল বাগান হিসাবে থাকবে কি-না, এই নিয়ে আম্মারা এখন তাদের বাড়িতে। এইখানে সবারই অডস ওয়ান বাই সিক্স, যেহেতু ভাঁজ করা ৬টা কাগজ থেকে একটা শিশুর একটা বেছে নেয়ার মাধ‍্যমে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে, আমি এখন এই ভাবনা থেকে বাইর হৈতে পারতেসি না। বুঝতেছ তো ওই বাগানের সাথে আমার ছোটবেলা থেকে বড়বেলা হওয়া পর্যন্ত ১৫/১৬ বছরের নিয়মিত সম্পর্কের সম্পর্ক আছে।

: প্রবাবিলিটিস গুলা কি কি?

: প্রত‍্যেকের নামে একটা করে ভাঁজ করা কাগজ আর একটা ভাঁজ-কাগজ হচ্ছে “ফুলবাগান কারো না” লেখা। মানে আমি মনে মনে চাচ্ছি এইটাই যেন উঠে আড়াই বছরের শিশুর হাতে। মানে এইটা একটা লটারি খেলা।

: “ফুলবাগান কারো না” তো একটা অসম্পূর্ণ স্টেটমেন্ট। এইটা যদি উঠে তাইলে কে দায়িত্ব নেবে বাগানটার?

: সেই আলাপটা মনে হয় পরে হবে। আগে সিলেকশন হবে কে পাবে। পরের স্টেপ মনে হয় কেউ কি একা দায়িত্ব নিবে, নাকি একটা অ‍্যারেঞ্জমেন্ট করা হবে সেখানে। আমি জানি না আসলে এই পার্টটা এখনো।

: আমার মনে হয় তুমি বাসায় গিয়া মেডিটেশন করো। তুমি এইখান থেকে বাইর হয়ে আসবা। তুমি ফোকাস করো, তোমাকে লেখাটা শেষ করতে হবে দুই দিনের মধ‍্যে।

: আমি তো মেডিটেশন করি না।

: তাইলে শুধু ব্রিথিং ইন আউট করো চেয়ারে বসে পাঁচ মিনিট, ল‍্যাপটপ ওপেন করার আগে। আর যদি মনে করো চেয়ারেই বসতে যাইতে ইচ্ছা করতেসে না, হা হা হা . . . শুধু শুয়ে শুয়ে ইমাজিন করতে ইচ্ছা করতেসে, তাইলে মোবাইলের ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে রাইখো। কিন্তু হাফ এন আওয়ারের বেশি না। আমি খেয়াল করসি ইউটোপিয়ান ইমাজিনেশন আর ইনফ‍্যাচুয়েশনের মধ‍্যে একটা মিল আছে। দুইটাই ঘোরের মধ‍্যে রাখে আর কখন যে সময় চলে যায় টেরই পাওয়া যায় না, হা হা হা . . .।

আমি ট্রলি বাসে করে বাসায় ফিরি। রিপোর্টটা যেয়েই লিখতে বসবো এরকম দৃঢ়মন/দৃঢ়মন করতে করতে সুপার শপে ঢুকলাম। রেডি টু ইট খাবার কিনবো এক ঝাঁক। আম্মার ফোন আসলো।

আমি আজব হয়ে আম্মার ফোন ধরলাম। বলি: হ‍্যা আম্মা, খেলার ফলাফল কি?

আম্মা বলে, তুই ক‍্যামন আছছ? আমরা কালকে সকাল বেলায়ই বাসার উদ্দেশ‍্যে রওনা দিমু। সবাই।

: কিন্তু ফুলবাগানের কি হৈল? কে ভাগে পাইলো ওইটা?

: শুনোছ না, এই বাড়িতে তো মিতুর মেয়ে এবারই প্রথম আসলো। কী সুন্দর সে সবার সাথে মিশে, হাসে, কথা বলে। বুঝাই যায় না যে, ও বিদেশেই জন্মাইছে, ওইখানে বড় হৈছে! মনটা সুন্দর আছে এখনো।

: লটারিতে কার নাম উঠলো আম্মা? নাকি “ফুলবাগান কারো না” এইটা উঠসে?

: শুন, কালকে বাসায় পৌঁছাইতে পৌঁছাইতে সন্ধ‍্যা লাগি যাইবো, তোরে রাতে ফোন দিয়ুম। আর বাড়ির সবাই ভালো আছে। ভালো থাক, হ‍্যা। রাখি।

আমি বুঝলাম না, তাইলে কী ফলাফল খারাপ কিছু!?

ল‍্যান্ড অব লোটাসে এখন গ্রীস্মকালিন ভোরবেলা। আমি আমার বোনকে ফোন দেই এই বিবেচনায়, ঘুম ভাইঙ্গা গেলে যাবে, কিন্তু ঘটনাটা তো ক্লিয়ার হৈতে হবে।

আমার বোনের টাটকা সতেজ গলা।

আমি বলি, ঘুমাস নাই?

: আর ঘুম! তোর মামা/খালাদের জন‍্য ঘুমাইতে পারি? এদের তো কথার শেষ নাই। বড় মামা তো ফুলবাগান নিয়া নিছে।

: কী? লটারিতে কি বড়মামার নাম উঠসে?

: না, লটারিতে ওই “ফুলবাগান কারো না পেপারটাই উঠসিলো, কিন্তু এরপর বড়মামা বলছে, কারো নাম উঠে নাই মানে, ওইটা তো আমারেই দেখা শুনা করতে হবে। মামাদের বলছে, তোমরা তো কেউই এখানে থাকো না। এইটা তো আমার চোখের সামনেই থাকবে। আমারেই এর দিকে তাকাইতে হবে, যত্ন নিতে হবে। তারপর উনি বলছেন, আমি জানি না আমি কতদিন এইটা যত্ন নিতে পারবো, বা যত্ন নিবো বল্লে মিথ‍্যা কথাই বলা হবে বেশি। তারপর উনি বলছেন, উনি ওইখানে ইট-সিমেন্ট বালুর দোকান দেয়ার প্ল‍্যান করে রাখসিলেন আগে থেকেই। বিকাশ সার্ভিস রাখবে আবার। এলাকায় এসবের অনেক চাহিদা আছে বইলা উনি বুঝাইসেন উনার প্রচুর লোন আছে। উনি লোন থেকে বাঁচতে চান। উনার ওই লেকচারের পর কেউ কিছু বলতে পারে নাই। খালি ছোট মামা নাকি বলসিলো, ফুলবাগানের দেখাশোনা করতে তো আপনার টাকা-পয়সা খরচ হইতো না, টাকা তো আমরাই দিমু। তখন বড় মামা বলসে, তাইলে তুমি এইখানেই থাইকা যাও। ফুলবাগান পালো। তো কিছুক্ষণ ঘেঁচাঘেঁচি হৈসে। মিতু খালার কথা, সবাই সকালবেলায় বাড়ি ছেড়ে রওনা দিবে, মানে এইটা বড় মামারই হৈসে শেষ পর্যন্ত।

: বড় মামা কি ইট-সিমেন্ট বালুর দোকান দিবে সত‍্যিই?

: তা জানি না। তবে বাগানের গাছগুলা বেইচা দিবে। তারপর লোকজন আইসা কাইটা ফেলবে, এইটা আমি নিশ্চিত।

Loading

3 Comments

  1. গল্পটা বেশ সুন্দর

  2. অনেকদিন পর শামীমার গল্প পড়লাম।
    খুব ভালো লাগলো, গল্পে এইসময়ের অনেক অনুসঙ্গ দারুণ মুন্সিয়ানায়।

    এক লাইনের বিষয়, কতোনা পরিপার্শ্ব!
    ঘুরে এলাম ‘ল‍্যান্ড অব কর্ণফ্লাওয়ারে’। সমকালের ইউরোপের জব, জেন্ডারমন্থন – দূর থেকে পূরাতন বাংলা পারিবারিক গল্প।

    আরো আরো গল্প চাই লেখকের কাছে – এই আমার চাওয়া!

  3. ফুলবাগান কারো নয়, সবার —এই সহজ সুন্দর স্মৃতিগুলি ফাইট দেয়, এবং শেষমেশ হারতে বাধ্য হয় ইট বালুর চমকের কাছে। ভাল লাগসে লেখা।

Leave a Reply

Skip to toolbar