এসে হীরক দেশে (পর্ব ১ থেকে ৪)
ভূমিকা: ২০০৩-০৫ মেলবোর্ন ছিলাম পড়াশুনার উদ্দেশ্য। পরে দেশে ফিরে আসি। নানারকমের বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই যেগুলা অন্তত লিখে রাখলেও খারাপ হবে না – এই ভাবনা থেকে এই ঘটনাগুলা লেখা। নিজেকে মনে হতো গুপী গাইন বাঘা বাইনের গুপী গায়েনের মত। সাথে বাঘা না থাকলেও একা একা এক বিচিত্র দেশে সহজ-সরল (?) বাঙালি মানুষ … অবাক হয়ে ঘুরে-দেখে বেড়াচ্ছি … “এসে হীরক দেশে, দেখে হীরের চমক, এত খাতির পেয়ে, দেখে রাজার জমক, মোদের মন ভরে গেছে খুশিতে – মোরা সেই কথা জানাই।” এখানে কেবলই নিজের সীমিত পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করা হয়েছে। কোনো গোষ্ঠী বা জাতি সম্পর্কে ধারণাগুলো জেনেরালাইজ করা ঠিক হবে না।
১
ভাষা – ১
মেলবোর্নে পৌঁছানোর পর থেকে ইংরেজি তো বটেই – অন্য নানা ভাষা নিয়েও বিভিন্নরকম বিচিত্র ঘটনার মধ্যে পড়তে হয়।
প্রথম অভিজ্ঞতা হয় প্রথম তিন চার দিনের মধ্যেই। আমি যেই মোটামুটি সস্তা মোটেলে গিয়ে উঠি – সেখানে সাধারণত নানা দেশের স্টুডেন্টরা এসে উঠে প্রথমে অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা হবার আগ পর্যন্ত। মোটেলটা একেবারে মেলবোর্ন মূল সিটির উত্তর সীমানা ঘেঁষে হক (hawk) স্ট্রিটে। আমার ঠিক পাশের ঘরে কিংবা একই কোরিডোরে ইন্ডিয়া থেকে আগত দুই ছাত্রকে পাই – একজন দক্ষিণ ভারতের – উঁচা, লম্বা, মোটাসোটা, স্বাস্থ্য ভালো – কালো করে , কোঁকড়া মতন চুলের দক্ষিণ ভারতীয়। বেশ গম্ভীর আর রাগী টাইপের, আর আমার ঠিক পাশের ঘরে উত্তর প্রদেশের একজন অমায়িক, দেখতে ছোটোখাটো, অবাঙালি, চশমা পড়া ছাত্র – নাম অমিত।
তো এই অমিতকে খুব সহজেই আপন মনে হয়। কিছু মানুষ আছে – যে দেশেরই হোক না কেন – প্রথম দর্শনেই খুব আপন মনে হয় – কী কারণে আমি জানি না – তো এই অমিত সেইরকমের। মুখ থেকে এক্সপ্রেশন লুকাতে পারে না। রেগে গেলে রাগী – অলমোস্ট তোতলাতে থাকে, বিরক্ত হলে বিরক্তি – কোনো বিষয়ে সন্দেহ হলে চোখ মুখ সরু হয়ে উঠবে – তো যাই হোক, প্রথম দিনেই আমাদের তিনজনের ক্লিক করে গেল। খেতে গেলে এক সাথে বের হই। রেস্টুরেন্ট খুঁজে বের করি। ট্রেনের স্টেশন খুঁজে বের করি। কিভাবে ইউনিভার্সিটি যেতে হবে, যাত্রাপথ কিরকম – সেগুলা প্ল্যান করি। সব কথাবার্তা, স্বাভাবিকভাবে, ইংরেজিতেই হয়।
এর মধ্যে অমিত একদিন আমাকে পাশে ডেকে নিয়ে দক্ষিণ ভারতীয় সম্পর্কে বলে – ওই যে দেখো, দক্ষিণ ভারত থেকে এসেছে – ওরা হিন্দি ভাষা জানলেও কখনও বলবে না। আমি বললাম, কেন? ও বলে জানি না এসব, কিন্তু মারাত্মক মাইন্ড করে এসব বিষয়ে।
তো এর কিছুদিন পরেই দেখি ওই ছেলেটি আমাদের দুজনকে একেবারে এড়িয়ে চলা শুরু করে। সম্ভবত, যতদূর মনে পড়ে – আমি একদিন হাসতে হাসতে বলছিলাম, কি, তোমরা নাকি হিন্দি জানলেও বলো না? এর পরে থেকে – সে রীতিমতো আমাকে আর অমিতকে শত্রুপক্ষ বানিয়ে ছাড়ল। চোখের পলকে আলাদা, সে তার মতো নিজের মতো করে সব সামাল দিতে থাকে। আমাদের দেখলে গট গট করে অন্যদিকে চলে যায়। তো, উত্তর ভারত আর দক্ষিণ ভারতের হিন্দি ভাষা নিয়ে এই টেনশন-টা আমি জানতাম না।
যাই হোক, দু একমাস যেতে না যেতেই আরেকটা মজার ব্যাপার লক্ষ্য করি। ধরা যাক, আমি, ভারতীয় আর পাকিস্তানি তিনজন ছাত্র ট্রামে করে মেলবোর্ন শহরের মধ্যে যাতায়াত করছি – এখন আমাদের একমাত্র কমন ভাষা তো ইংরেজি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ইংরেজিতে কথা বলতে থাকি আমরা। একটু পরে খেয়াল করে দেখি আশেপাশের সব লোকাল ককেশিয়ান সাদা অস্ট্রেলিয়ান বা অন্যদেশের লোকেরা খুব কৌতূহল নিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মিটি মিটি অবাক-ভাবে তাকিয়ে থাকে – কি যেন জিজ্ঞাসা ওদের চোখেমুখে, যেন বেশ পাজলড।
এরকম ঘটনা একবার না – মিনিমাম তিন চারবার হয়েছে। অন্য সময় কোনো সমস্যা নাই, সব স্বাভাবিক, নিজের ভাষায় কথা বললে কেউ ফিরেও তাকায় না, এমনকি বিদেশীদের সাথে ইংরেজিতে বললেও কেউ তাকায় না, কিন্তু আমরা উপমহাদেশীয়রা ইংরেজিতে কথা বললেই – আশেপাশে অনেকেই অবাক কৌতূহল নিয়ে বার বার তাকায়।
পরে অনেক ভেবে এটা আবিষ্কার করলাম – সম্ভবত আমাদের চেহারা যেহেতু একরকম, সবাই খয়েরি চামড়া, হাবভাব, আচরণেও মোটামুটি একরকম – তাই ওরা ধরেই নেয় যে আমরা নিজেদের মধ্যে নিজস্ব কোনো এক ভাষায় কথা বলব। ইংরেজিতে বলছি কেন – এটাই ওদের কাছে একটা চরম গোপন কৌতূহল। আমাদের মধ্যে যে তিন, চার বা আরও অধিক রকমের ভাষা থাকতে পারে – একজনের ভাষা যে অন্যজন না-ও জানতে পারি – এটা ওদের কল্পনাতেও আসে না।
অনেকটা যেমন আমাদের মতো – সাদা চামড়ার কেউ দেশে বেড়াতে আসলে আমরা প্রথমেই ধরে নেই – ইনি ইংরেজি জানেন। অথচ কত শত শত সাদা মানুষ ইংরেজি না জেনেই যে ভালোভাবে জীবন পার করে দিচ্ছে – সেটা আমরা ধারণা করতে পারি না।
দশ কি বারো দিনের মাথায় ট্রামের মধ্যে দূর থেকে ভেসে আসা বাংলা ভাষা কানে মধুর মতো ছুঁয়ে গেছিল সেবার।
*** *** ***
এরও আরও বেশ কিছুদিন পরের ঘটনা। আমি তখন নিয়মিত ক্রাউড কন্ট্রোলার, বা বাউন্সার হিসাবে বিভিন্ন স্থানে কাজ করি। যেসব স্থানে হার্ড ড্রিঙ্কস সার্ভ হয় সেসব স্থানে ওদের (ভিক্টোরিয়া স্টেটের) সরকারী নিয়ম অনুসারে প্রতি প্রথম একশ জন অতিথির জন্যে একজন বা দু’জন ট্রেইনিং প্রাপ্ত ক্রাউড-কন্ট্রোলার রাখতে হবে। নইলে ওই রেস্টুরেন্ট বা প্রতিষ্ঠানের হবে বড় রকমের জরিমানা।
তো একটা বিশাল সুপারমার্কেটের সবচেয়ে উপরের তলায় একটা ছোটো পাবের মত জায়গায় – পেস্ট্রি আর নানা রকমের হালকা খাবারের সাথে ড্রিঙ্কস সার্ভ হয় – তাই আমাকে নিয়ম অনুসারে ডিউটি দিতে হয় – কারো বয়েস আঠারোর কম – এটা সন্দেহ হলেই আমি তাদের আইডি চেক করতে পারি। তো ওখানে যারা যায় সবাই নিরীহ গোছের মানুষ, তাও কারও বয়স আঠারোর কম হলে নিয়ম অনুসারে আমাকে তাদের আইডি চেক করা লাগে।
কিছু সময় পরেই আমি আবিষ্কার করলাম – মেয়েরা এটাতে দারুণ খুশি হয়। আমি হয়ত সিনসিয়ার দায়িত্ববোধ থেকে সন্দেহ বশত: কোনো মেয়ের কাছে ভদ্রভাবে আইডি দেখতে চাইলাম – সে আইডি দেখিয়ে পরেই খুশিতে ঝলমল করে উঠে। মানে, তাকে দেখতে আঠারোর চেয়ে কম মনে হয় – এটাতে সে দারুণ খুশি। একেবারে বন্ধু বান্ধবীদের বলতে থাকে – এই দেখো ও আমাকে আঠারোর চেয়ে কম ভাবছে …কী সুন্দর! … এইসব। বুঝলাম, মেয়েদের সাথে আলাপ জমানোর জন্য এটা খুব ভালো একটা কায়দা। অবশ্য এই জ্ঞান আর প্রয়োগ করা হয়নাই কখনও পরে।
তো এরকমভাবে ঐখানেই আরেকদিন এক মহিলাকে দেখে কি মনে করে যেন আইডি দেখতে চাই । সাথে তার স্বামী বা বন্ধু-বান্ধবীরা ছিল। তো ইনি খুব সুন্দরভাবে মিষ্টি হেসে আইডি দেখিয়ে বলল – ওহ, তোমার ইংরেজি উচ্চারণ একেবারে ফ্রেঞ্চ-দের মতো। আমি তার মিষ্টি হাসিতে একেবারে আপ্লুত হয়ে গেলাম । অনেকক্ষণ রীতিমতো হাই স্পিরিটে থাকলাম। সব কিছুই ভালো লাগে … যা দেখি নতুন লাগে।
তো অনেক পরে দেশে ফিরে আমাদের এক বন্ধু (ব্র্যাকে সাময়িক সহকর্মী) তার ফ্রেঞ্চ বান্ধবীকে নিয়ে দেশে বেড়াতে আসলে পরে – কথাবার্তা, পানাহারের পর খুব সাবলীল আড্ডা শুরু হলে আমি সেই ঘটনাটা বলি – সাথে এটাও বলি – আসলে ঐ মহিলার কথাটা কি এপ্রেসিয়েশন ছিল – নাকি ঠাট্টা – এটা আমি এতদিনেও বুঝতে পারিনাই (না বুঝলেও ক্ষতি নেই অবশ্য – মিষ্টি হাসিটাই মূল)
সাথে সাথে আমাদের সেই বন্ধু আর তার সহধর্মিণী চোখ-মুখ সিরিয়াস করে উত্তর দেয় – এটা অবশ্যই একটা ঠাট্টা ছিল। তোমার অন্যরকম কিছু ভাবার কোনো অবকাশ নাই।
যাই হোক। এরকম নানা উপলব্ধির মধ্যে আরেকটা বিষয় ভালোভাবে বুঝি – যখন নিজ দেশীয় নানা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের দেখি। অনেকে হয়ত অভিজাত এলাকার সন্তান, স্কুল কলেজে, নানারকমের ইংরেজি ছবি দেখে খুব যত্ন নিয়ে রপ্ত করা উচ্চারণে ইংরেজি কথা বলে – বাংলায় কথা যেন বলতেই পারে না (দেশে থাকতেও) – সাথে সাথে এরকম দেখি যে একেবারে গ্রাম থেকে আসা কোনো কৃষকের ঘরের সন্তান – হয়ত স্কলারশিপে অথবা টাকা ধার করে পড়তে এসেছে – সেই তার ভাঙ্গা ভাঙ্গা ভুল উচ্চারণে ভুল ইংরেজি – এ দুটার মধ্যে বিদেশীরা পার্থক্য করতে পারে না বা করে না। অভিজাতের বলা ইংরেজিও তাদের কাছে বিজাতীয় ইংরেজি – আবার ঐ কৃষকের ছেলের ইংরেজিও বিজাতীয় ইংরেজি। দু’জনে একেবারে ঠিক একই ধরণের সম্মান পায়। এটা দেখে চরম আশাহত অভিজাত ছেলেমেয়েদের চেহারা মনে পড়ে। বেচারা-রা, আমি নিজেও দুঃখিত। হানিমুন ইজ ওভার। বরং দেশে থাকতে ভালোভাবে বাংলা বলাটা রপ্ত করলে কিছু লাভ হতো হয়ত …
২
ওরিয়েন্টেশন
সম্পূর্ণ অচেনা শহরে একা একা চলাচলে একটা অন্যরকমের নাই-নাই, খালি-খালি, অসহায় অনুভূতি আছে (প্রথম প্রথম) যেটা এড়ানো অসম্ভব। একটা তলাহীন কুয়ার মধ্যে যেন পড়তেই আছি পড়তেই আছি।
ইউনিভার্সিটির যেদিন ওরিয়েন্টেশনের দিন – সেদিন মেলবোর্ন সিটি থেকে মেট্রো রেলে উঠি। ট্রেনে উঠতে কোনো সমস্যা হলো না, কিন্তু, এরপরে নামব কখন, কিভাবে (ফুটস্ক্রে তে নামতে হবে ) – এটা নিয়ে দুশ্চিন্তা। প্রতি স্টেশন আসার আগেই এনাউন্স করছে স্টেশনের নাম – তবে – ওই যে ভয় থেকে যায় – স্টেশনের নামের উচ্চারণ বুঝতে পারব তো? স্টেশনের ঠিক আগে আগে যদি এদের লাউড স্পিকার নষ্ট হয়ে যায় তাইলে কি করা যাবে, কাকে জিজ্ঞাসা করব। যদি ভুল করে গন্তব্য পার হয়ে যাই – তাইলে ফেরত আসব কিভাবে – এসব সংশয়ের মধ্যে কোনোমতে এসে নামি ফুটস্ক্রে স্টেশনে।
নামার পরে আরেক প্রবলেম। কোনদিকে এবার পথ? তিন চারটা রাস্তা স্টেশন থেকে নানা দিকে গেছে। কোনটা ধরে আগাতে হবে। দু একজন কে জিজ্ঞাসা করে কিভাবে যেন একদিকে রওয়ানা দিলাম – তারপরে চিন্তা – কতক্ষণ হাঁটলে পরে ইউনি পৌঁছাব। লক্ষ্য না জানা থাকলে, পরিবেশ না চেনা থাকলে একটা অন্যরকমের চরম অসহায় অনুভূতি – পানিতে হাবুডুবু খাওয়ার অনুভব হয়।
কিছুদূর হাঁটার পর দেখি – একটা নিরিবিলি পাড়ার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি – যেখানে ফুটপাথে কোনো লোকজন নাই। দুই পাড়ে সুন্দর সুন্দর ছোটো গাছ-গাছালি ওয়ালা কাঠের, বা হালকা ইটের তৈরি বাড়ি – সীমানা ঘেরা – কিন্তু ফুটপাথে একটা মানুষও নাই। যতগুলো মোড় পার হচ্ছি – একেবারে আন্দাজে। ডানে যাব না বামে – কোনো নিশ্চয়তা নাই। মেলবোর্নে পৌঁছানোর এই দুই একদিনের মধ্যে তাড়াহুড়ার কারণে কোনো ম্যাপ যোগাড় করতে পারিনাই। তখন তো আর ফেবুর যুগ নয়। গুগল ম্যাপও সম্ভবত শুধু স্যাটেলাইট ভিউ দেখাতো। রাস্তাঘাটের নাম ধাম সম্পূর্ণ ভাবে ইনডেক্স করেছে বা করেনাই ওরা সেই সময়কার কথা। মোট কথা, গুগল ম্যাপ , জিপিএস – এগুলা মোটেই পপুলার হয়নাই।
একটা দুইটা গাড়ি বা বাস দুই চার মিনিট পর পর পাশ দিয়ে চলে যায় – কিন্তু একটাও মানুষ নাই কোনোকিছু জিজ্ঞাসা করার মতো। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পরে দূর থেকে আমার মতোই উদ্ভ্রান্ত আরেক মানুষকে দেখতে পাই – উসকো খুসকো চুল – এদিক ওদিক তাকাচ্ছে – কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই বুঝতে পারি ঘটনা একই। সে-ও ওই একই ওরিয়েন্টেশনের অনুষ্ঠানে যাবে। এক সাথে আগাতে থাকি। আরও কিছুদূর গিয়ে তৃতীয় আরেকজনকে পেয়ে বুকে আরও বল পাওয়া যায়। অগতির গতি। তিনজন মিলে নানা রকম বুদ্ধি করে শেষপর্যন্ত ইউনিভার্সিটি পৌঁছানো যায় ৪০ / ৫০ মিনিটের মাথায়।
ইউনিভার্সিটির এই ক্যাম্পাসটা খারাপ নয়। খুব অল্প, ছোটো পরিসরের মধ্যেই উঁচু নিচু জায়গার মধ্যে প্ল্যান করে নানা উচ্চতার একাধিক বিল্ডিং। সেগুলা আবার মাটিতে তো বটেই – উপরের ফ্লোর গুলাতেও মাঝে মাঝে ঝুলন্ত কোরিডোর দিয়ে কানেক্ট করা, ওর মধ্যেই জিমনেশিয়াম, ক্যাফেটেরিয়া, ক্লাসরুম, মাঝখানে ছোটো চত্বর। ক্যাম্পাসের সীমানার দুই পাড়ে রাস্তা চলাচলের গাড়ি – অন্য দুই পাড়ে নিচু ভূমি – সবুজ ঘাসে ছাওয়া বহুদূর গিয়ে গাছ গাছালি শুরু হয়েছে। ওরিয়েন্টেশন শুরু হলো মাঠ ঘেঁষা একটা বড় হল রুমে। কাচের জানালা ভেদ করে রোদ এসে পড়ে – ওর মধ্যে প্রায় দেড় শ থেকে আড়াই শ-র মতো নানা দেশের ছাত্রছাত্রী।
আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীদের জন্য আয়োজিত ওরিয়েন্টেশনের মূল বক্তা ছিলেন ইউনিভার্সিটির একজন ফ্যাকাল্টি মেম্বার – বড় আপা গোছের বলা যায় হয়ত – সুন্দর হালকা গোলাপি সোয়েটার, সাথে সাদা জামা। গোলগাল মুখ, সোনালি চুল ঝুঁটি করে বাঁধা। বিদেশী ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে উনার নানা রকমের নির্দেশনা শুরু হলো:
১) কফি বা কোক কখনও পানির বিকল্প হতে পারে না। তৃষ্ণা পেলে পানি-ই খেতে হবে। কোক, কফি বা অন্য কিছু নয়। ওগুলা শরীরকে আরও ডিহাইড্রেট করে।
২) এই শহর হচ্ছে একই দিনে চার ঋতুর শহর। শীত, গ্রীষ্ম, বৃষ্টি আবার বসন্ত। সেই মতো জামা কাপড়ের কথা মাথায় রেখে বের হতে হবে। (এই জিনিসটা আমি নিজেও পরে দেখি। এর সাথে আরেকটা মজার বিষয় ছিল প্রচণ্ড একধরণের বাতাস বা গেইল উইন্ড। ঝড় না, তবে হঠাৎ হঠাৎ আচমকা এমন তীব্র একটানা বাতাস শুরু হয় যে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না – হাঁটু ভেঙে যায়। আবার পাঁচ মিনিট পর সব ঠিক। আধাঘণ্টা পরে একবারে শুকনো খসখসে গরম – হালকা বৃষ্টি – আবার পরক্ষণেই শীত।)
৩) উনি বলে যেতে থাকেন …মূল মেলবোর্ন শহরের পশ্চিম পাড়ের পাড়া-গুলা থাকার জন্য সবচেয়ে সস্তা। এই মতো দামের ভিত্তিতে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব দিকের এলাকাগুলা ভাগ করা যায়। ছাত্রছাত্রীদের জন্য সস্তায় পশ্চিমাঞ্চলীয় সাবার্ব (suburb)-গুলাই শ্রেষ্ঠ। সুতরাং কেউ যদি নিজে নিজে থাকার ব্যবস্থা করতে চাও – তাইলে এই পশ্চিম দিকের সাবার্বগুলায় খোঁজ করো।
(মূল মেলবোর্ন শহর – মেলবোর্ন সি বি ডি বা সেন্ট্রাল বিজনেস ডিসট্রিক্ট – অত্যন্ত ছোটো আর চৌকোণা একটা এলাকা। হয়ত আমাদের সংসদ ভবন এলাকার অল্প কয়েক গুণ বড়ো। ইয়ারা নদীর তীরে। ওর মধ্যেই লম্বালম্বি আর আড়াআড়ি একটানা সরল রেখার পাঁচটা বাই সাতটার মতো স্ট্রিট। মাঝে বিশাল উঁচু উঁচু বিল্ডিং। মনে হয় তিন কি চার ঘণ্টা হাঁটলেই পুরা শহরটা চক্কর দিয়ে আসা যাবে। পুরোটাই কমার্শিয়াল এলাকা আর মানুষজন থাকে আসলে মেলবোর্নের চারপাশের সাবার্বগুলায়। মূল শহর পর্যন্ত যাতায়াত করে ট্রেনে বা গাড়িতে। পাড়া বা সাবার্ব-গুলোর ব্যাপ্তি উত্তর দক্ষিণে প্রায় সত্তর কিলোমিটার আর পুব -পশ্চিমে হয়ত ১৩০ কিলোমিটারের মতো (বা আরেকটু বেশি)। (পরে একটা লিটারেচারে পড়ছিলাম, এই মেলবোর্ন শহর ডিজাইন করেন একজন ব্রিটিশ আর্মি পারসোনেল। সম্ভবত ক্যাপ্টেন বা মেজর গোছের কেউ ছিলেন। যতদূর মনে পড়ে – (একেবারে শিওর না) – ১৮১০ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে। অস্ট্রেলিয়াতেও একটা ছোটোখাটো গোল্ড রাশের মতো ঘটনা ঘটে । তখন অনেক ইউরোপীয়দের আগমন ঘটে)
যাক। উনার নির্দেশনা চলতে থাকে…
৪) অনেকে ভাবতে পারো ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড দিয়ে নিয়মিত কেনাকাটা করা বেশি স্টাইলিশ কিংবা সম্মানজনক। কিন্তু আসলে তা না। নগদ টাকায় লেনদেন করাটা কার্ডে লেনদেন করার চাইতে অধিক সম্মানজনক। (এইটা কেন উনি বলছেন – আমি বুঝি নাই। পরে খুব একটা পার্থক্য পাইনাই কার্ডে বা ক্যাশে লেনদেনের মধ্যে)
৫) নতুন কারও সাথে পরিচিত হলে মিস্টার বা মিস অমুক বলে সম্বোধন করা ভালো। এখানে ‘অমুক’ উনার ফার্স্ট-নেইম নয়, বরং ফ্যামিলি নেম। অর্থাৎ, কারও নাম ভিন রিচার্ডস হলে মি: রিচার্ডস, অথবা ভেনেসা মনরো হলে মিস মনরো। উনারা যদি নিজে থেকে বলে যে উনাকে ফার্স্ট-নেইমে ডাকতে – কেবলমাত্র তখনই তোমরা ফার্স্ট-নেইমে যেতে পারো। ভিন বা ভেনেসা – ইত্যাদি।
(তবে আমার মতে এই নিয়ম খুব একটা কাজের হয়ত না, ফার্স্ট নেইমে প্রথম থেকে ডাকাটাই যেন আধুনিক রেওয়াজ। সেটাই আন্তরিক। তবে নিরাপদ থাকতে চাইলে, কাউকে না জেনে অসম্মান করতে না চাইলে – এই ‘মিস্টার’/’মিস’ ধরে ফ্যামিলি নেইমে ডাকাটা নিরাপদ।)
৬) হ্যাঁ অর্থে ইয়াহ, বা ইয়া (YEAH / YA) – না বলাটাই তোমাদের জন্য ভালো হবে। বরং বলবা তোমরা ‘ইয়েস’। এটা অনেক বেশি ভদ্র আর সমুচিত। একেবারে বন্ধু-স্থানীয় বা কাছের আত্মীয়দের ইয়া বা ইয়াহ বলা যায়। নতুন কাউকে বললে অসম্মানিত বোধ করতে পারে।
৭) মেয়েদের উদ্দেশ্য করে বললেন যে , তোমরা যদি একা এখানে এসে থাকো খুব সাবধানে চলবে। কারও সাথে কোনোরকমের ইমোশনাল সম্পর্কে সহজে জড়াবা না। যে দেশের ছেলেই হোক। অল্প সময়ের মধ্যেই দেখবে ঘটনা অতি ক্লিষ্টতায় রূপান্তরিত হতে পারে। ধৈর্য ধরো। কোনোরকমের সমস্যা হলেই আমার সাথে, আমাদের মতো স্টুডেন্ট কাউন্সিলরদের সাথে কথা বলো।
৮)ছেলেদের উদ্দেশ্য করে উনি বললেন, দেখো, তোমরা অনেকেই এই দেশে প্রথম আসছ। তোমরা নিজের দেশে থাকতে হলিউডি ছবি দেখে দেখে পশ্চিমা সংস্কৃতি নিয়ে অনেক কিছু ধারণা করে আসছ। তোমরা হয়ত ভাবো, শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন এখানে খুব সহজ ব্যাপার। কিন্তু জেনে রাখো, বাস্তবতা মোটেই হলিউডের ছবির মতো নয়। তুমি কারও সাথে পরিচিত হওয়ার সাথে সাথেই তাকে শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব দিয়ে বসতে পারো না ! এটা কোনো সহজ বিষয় নয়। এমন অপমানিত হতে পারো, আইনগত সমস্যায় পড়তে পারো, যেখান থেকে তোমাকে উদ্ধার করাটা কঠিন।
আমি মনে মনে ভাবলাম – বিদেশ থেকে আগত এরকমের স্টুডেন্টও তাইলে হর-হামেশা উনারা পেয়েছেন, যারা দুই এক কথার পরেই অচেনা মেয়েদের সেরকমের প্রস্তাব দিয়ে বসে !!? নইলে এইরকমের বিশেষ নির্দেশনা কেন?
দৃশ্যটা মনে মনে ভেবে আবার এরকমের হিউমারও পাওয়া গেল। একটা ছেলে এই কথা সেই কথার পরেই দুম করে অন্যরকমের একটা প্রস্তাব, একে তাকে দিয়ে বেড়াচ্ছে – জিনিসটা দেখতে কেমন লাগবে? হা: হা: হা:। যা বুঝলাম:
বেচারা স্টুডেন্টরা করবেটা কী। এখনও বিয়ে টিয়ে করেনাই। মাথার মধ্যে শুধু অবসেশনের মতো এক চিন্তা। সারাজীবন হলিউডি ছবি দেখে যাও একটু কিছু জ্ঞান অর্জন করেছে – সেটাও যদি প্রয়োগ করতে না পারে – তাইলে আর এত কষ্ট করে বিদেশে আসা কেন?
নাহ্। স্বর্গ অনেক দূর।
৩
ভাষা – ২ (গাড্ডাহায়াডাং)
অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব ঘেঁষা এই শহরে পৌঁছে পরপর কয়েক সপ্তাহ মেলবোর্ন সিটিতেই কাটাই। হোম সিকনেস কাটে না। বিমর্ষ মনে মাঝে মাঝে ইন্টারনেট ক্যাফেতে গিয়ে ইমেইল চেক করি। আমার এক স্কুল বন্ধু, আমার সাথে সাথেই বিদেশে পাড়ি দেয় – তবে সে যায় ইংল্যান্ডে, ইংরেজি আর ইংরেজি-ভাষীদের নিয়ে ওর জ্ঞান আমার চাইতে বেশি। সে দেখি একদিন মেইল করছে – কেমন চলছে আমার এখানে – জিজ্ঞাসা করছে। আমি বলি, সবই ঠিক আছে, তবে এখানকার মানুষজনেরা রাস্তাঘাটে একটু পর পর ‘মাইক’ ‘মাইক’ জাতীয় কি যেন একটা বলে – যেটা আমি ঠিক ধরতে পারছি না। ও বলে, আরে তুমি বুঝতে পারো নাই – ওটা হলো mate, বা বন্ধু। অস্ট্রেলিয়ান উচ্চারণে ওটা হয়ে যায় ‘মাইট’।
ও আচ্ছা মাইট। এই ‘মাইট’ শব্দের সূত্র ধরে ধীরে ধীরে অস্ট্রেলিয়ানদের উচ্চারণ বোঝা শুরু করি। একসময় খুব ভালো-ও লেগে যায়। “OK” – এটার উচ্চারণ “অইখেই”। খাবার কিনতে গেলে আমি কি “ঠেইক এওয়াই” চাই নাকি বসে খেতে চাই জিজ্ঞাসা করে। এই ঠেইক এওয়াই বুঝতেও সময় লাগে। মানে, দেশি ভাষায়, খাবারটা আমি ‘পারসেল’ করে প্যাকেটে নিয়ে যাব কিনা – সেটা জিজ্ঞাসা করছে।
যাবতীয় কথা – যে কারও সাথে – অন্তত ৯০ ভাগ সময় – শুরু হচ্ছে সৌজন্যমূলক সম্ভাষণ দ্বারা। শেষ হচ্ছে আন্তরিক বিদায় দ্বারা। “হাই মাইট হাউ আর ইউ ডুয়িং” – এই জাতীয় কিছু দিয়ে কথা শুরু, শেষ – “হ্যাভ এ নাইস ডে” বা এ ধরণের কিছু দিয়ে। সরকারী অফিসে যাই কিংবা দোকানে কিংবা গাড়ির মেকানিকের কাছে – একই ব্যাপার। জিনিসটা শুধু মেলবোর্নের স্থানীয় হতে পারে। কারণ মেলবোর্নের লোকাল মানুষেরাও একাধিক ক্ষেত্রে আমাকে বলছে – সিডনিতে গেলে – কথা বলার মতো মানুষ পাব না। ওরা নাকি আরও গম্ভীর, চুপচাপ, কাজে ব্যস্ত। ওই সময়টাতে পর পর কয় বছর মেলবোর্ন ছিল পৃথিবীর “মোস্ট লিভেবল সিটি অন আর্থ” লিস্টের এক নম্বরে। রাস্তাঘাটে একেবারে অপরিচিত মানুষদেরও সৌজন্য, ভদ্রতা, আন্তরিকতা, রসিকতা মুগ্ধ করার মতো। আমি একটা তুলনা করি মাঝে মাঝে – আমাদের দেশের শহরগুলার মানুষজন অপ্রয়োজনে করে অভদ্রতা – আর ওদের ওখানে দেখি অপ্রয়োজনে করে ভদ্রতা। দরকার নেই – তারপরেও একটা ভালো কিছু বলে দিল – বা করে দিল – ফলে মন-মানসিকতা সবসময় একটা পজিটিভ ভাব-ধারার মধ্যে থাকে । অন্যের জন্য কিছু করতে ইচ্ছা হয়।
এই প্রসঙ্গে এখন মনে পড়ছে শাহবাগ এলাকার এক বড়ো ভাইয়ের কথা। উনি বাংলা ব্যান্ডের একটা জনপ্রিয় গানের গীতিকার ও সুরকার বলে জানি। প্রিয় মানুষ, ভদ্রলোক। কিন্তু উনার হঠাৎ একদিনের একটা মন্তব্য গেঁথে আছে মাথায়। উনি চরম বিরক্ত হয়ে বলতেছেন, যেসব বাংলাদেশি বিদেশে কয়েকবছর কাটিয়ে দেশে ফিরে আসে – তাদের কিরকমের একটা যেন বুদ্ধিলোপ ঘটে। সবাই বোকা বোকা হয়ে যায়। কিছুই বুঝে না। এই বোকা ভাবটা সারা জীবনেও ওরা কাটাতে পারে না। এইটা উনার পর্যবেক্ষণ। তো – আমিও দেখলাম – মেলবোর্ন থেকে ফিরে – সবার সাথে আমি কথা বলা শুরু করি সম্ভাষণ দিয়ে । দোকানদার হোক – বা বাসের কন্ডাকটর, রিকশাওয়ালা কিংবা ইনফরমেশন ডেস্কের কেউ। স্লামালাইকুম দিয়ে কথা শুরু করি – কিংবা, ‘কি খবর কেমন আছেন’ – এই দিয়ে। ফলাফল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভালো। – তবে এইসব কারণেই কিনা জানি না – আমার মতো বিদেশ ফেরতা লোকদের বোকা বোকা লাগতে প[রে।
যাই হোক। অস্ট্রেলিয়ান উচ্চারণের ব্যাপারে আবার। রাস্তায় টোল আদায় করার বেশ বড়ো একটা কম্পানির কাস্টমার কেয়ার অফিসে নিয়মিত দিনের বেলা সিকিউরিটির কাজ করতাম প্রায়ই (রাতের বেলা বিভিন্ন ক্লাবে বাউন্সার)। আমি সহ আরও দুই তিনজন ইন্ডিয়ান আর পোলিশ একটা ছেলে মিলে পালাক্রমে ডিউটি। তো এদের এই অফিসে একজন ক্লায়েন্ট মাঝে মধ্যে আসত – কাচের দরজা খুলেই – বিশাল দেহ – দৈত্যের মতো অস্ট্রেলিয়ান – বয়স্ক – উনি দরজা খুলেই প্রচণ্ড হেঁড়ে গলায় হুঙ্কার দিয়ে উঠেন – দুরের কাউন্টারে বসা অপারেটরদের উদ্দেশ্য – “গাড্ডাহায়াডাং” । আচমকা এই আওয়াজের বিস্ফোরণে ঘরের কাচ, কাগজ কলম পেন্সিল সাথে আমরাও কেঁপে উঠি। দুই কি তিন বারের পরে বুঝি – এই শব্দের অর্থ হলো- “গুড ডেই, হাউ আর ইউ ডুইং?
এদিকে চৈনিক এক ছাত্রীকে পাই ইউনির ক্লাসগুলাতে। অন্য বিদেশীরা তাও একটা কিংবা দুইটা শব্দ অন্তত বলতে পারে ইংরেজিতে। নিজের মনোভাব কিংবা কথাটা বুঝাতে পারে। এই মেয়েটি সেটাও পারে না। মানুষের সাথে এইরকমের যোগাযোগহীনতার অভিজ্ঞতা কখনই হয়নাই। একবার স্টাডি গ্রুপে একই সাথে পড়ছি। ওকে কী বোঝাতে গিয়ে অনেক চেষ্টার পরেও কিছু না পেরে বেশ বিরক্ত টাইপের হয়ে যাই । গ্রুপে লোকাল অস্ট্রেলিয়ান মহিলারাও ছিল- ওরাও ওর কথা বুঝতে পারছে না । পরে আমার বিরক্তি দেখে আবার অস্ট্রেলিয়ান মহিলারা মনঃক্ষুণ্ণ হয় যে, আমি কেন বিরক্ত হলাম ওর উপরে।
ঐদিন বুঝতে পারলাম আমাদের উপরে ব্রিটিশ উপনিবেশের একটা প্রভাবের কথা। আমারও ইংরেজি জানার কথা ছিল না। ইংরেজি শেখার কথাও না। কেবল মাত্র দুই শ বছরের শাসনের প্রভাবে – এখনও উপমহাদেশে ছাত্রছাত্রীদের ইংরেজি শেখানো হয়। জিনিসটা খারাপ না। কিন্তু যেসব দেশ ব্রিটিশদের শাসনের অধীনে দৃঢ়ভাবে ছিল না – তাদেরকে দোষ দেয়া যায় না। (ব্রিটিশদের অধীনে চায়নার অল্প কিছু কিছু অংশ কিছু কিছু সময় হয়ত ছিল। কিন্তু সম্ভবত উপমহাদেশের মতো এত ব্যাপক আকারে না।)। চৈনিকদের পক্ষে ইংরেজি না জানাটাই স্বাভাবিক।
আরেকবার এক ভারতীয় অবাঙালি – আমার সাথে হিন্দিতে কথা বলা শুরু করল। আমি বাংলাদেশি জানার পরেও। আমি সুন্দরভাবে বললাম – আমি হিন্দি জানি না। সে দেখি হতবাক। বলে যে-কই বাংলাদেশিরা তো অবশ্যই হিন্দি জানে। আমি বলি যে না, আমাদের হিন্দি শেখার কোনো সুযোগ নেই। এর ব্যবহারও নেই। একমাত্র যারা নিজ উদ্যোগে বাসায় এন্টারটেইনমেন্টের কারণে হিন্দি ছবি দেখে তারা হিন্দি জানতে পারে। এর পরিমাণ খুব বেশি হলে সারাদেশে হয়ত দুই কি তিন পার্সেন্ট লোক। (আরেকটা ছোটো কমিউনিটি অবশ্য আছে। মোঘল আমলের রাজকর্মচারীদের বংশধর – তবে ওদের ঠেলতে ঠেলতে সম্ভবত বুড়িগঙ্গার ওই পাড়ে পাঠিয়ে দিছে পুরানো ঢাকার লোকজন। এদেরও মাতৃভাষা হিন্দি)
তো এই মানুষটি কোনোভাবেই বিশ্বাস করবে না আমার কথা। যত বলি যে আমি হিন্দি জানি না – তত সে অপমানিত বোধ করে। ভাবে যে তাকে নিয়ে ঠাট্টা করছি। রাগে তার মুখ হয়ে যায় লাল, চোখ বড়ো বড়ো। তো আমি কী আর করব। ওর আচরণ খুব অদ্ভুত লাগল। বাংলাদেশি মাত্রই হিন্দি জানে – উনার এই বিশ্বাস কেন হলো আমি জানি না।
আমি জীবনে একবার অবশ্য হিন্দি শিখে ফেলছিলাম। পরে অ-চর্চায় ভুলে যাই। এটা ওকে বলব বলব করেও আর বলা হয় নাই। ক্লাস থ্রি কি ফোরে থাকতে – এক কাজিনের বাসায় নিয়মিত যেতাম – ওরা ভিসিআর-এ খুব হিন্দি ছবি দেখত। দিন রাত। আমি ওদের ভিজিট করতে করতেই এক সময় দেখি সিনেমার সব হিন্দি কথা বুঝা শুরু করে দিয়েছি। এমনকি একটা ছবির এই ডায়ালগটাও মনে আছে – ভিলেন সর্দার শাড়ি পরা নায়িকাকে নিয়ে এসেছে নিজের ড্রয়িংরুমে । ধস্তাধস্তি চলছে । এই সময় নায়িকা বলে উঠল – ছেড়ে দাও আমাকে, ছেড়ে দাও, তুমি আমার বাবার বয়েসী ! তখন ভিলেন সর্দার বলে উঠে – আরে বেটি, পৃথিবীর সবাইকেই যদি তোমার বাবার মতো মনে হয় তাইলে তোমার মায়ের চরিত্র নিয়ে লোকে বলবে কি?
তো ওই ক্লাস থ্রি ফোরে পড়া অবস্থাতেও আমি এই ডায়ালগটি কিভাবে কিভাবে যেন বুঝে গেছিলাম – চমৎকৃত হয়েছিলাম এই ডায়ালগের, কি বলব – ব্রিলিয়ান্সি দেখে। (নাকি ছবিটা বাংলাতেই ছিল? এতদিন পরে মনে নাই।)। এখনও দৃশ্যটা মাথার মধ্যে গেঁথে আছে। তো এটা আর তাকে বলা হয়ে উঠে নাই সেইদিন।
৪
চুলকাটা
কোথাও দীর্ঘস্থায়ী থাকতে গেলে চুল না কেটে উপায় থাকে না – আমাকেও অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নাপিতের সন্ধানে বের হতে হলো । ফুটস্ক্রে, যেটার কাছাকাছি থাকতাম, সেটাকে মেলবোর্নের পশ্চিম পাড়ের একটা পাড়া-কেন্দ্র বলা যায় । নানারকমের দোকানপাট, স্টেশন, বড় কাঁচাবাজার – সুপারমার্কেট এসবের একটা হাব। আফ্রিকান, এশিয়ান (মঙ্গোলিয়ান রেইস অর্থে), আরব, উপমহাদেশীয় আর ককেশীয় সাদা-রা তো আছেই – এদের সম্মিলনে মোটামুটি জমজমাট একটা এলাকা । দুই পাড়ে সারি সারি দোকানপাটের মধ্যে প্রশস্ত সাদা হাঁটার রাস্তা – বড় চত্বর – ওইখানেই একজন অস্ট্রেলিয়ান বয়স্ক (এ্যালকোহলিক সম্ভবত) টাকা চাচ্ছে, ঝাঁকে ঝাঁকে কবুতর এসে দানা পানি খেয়ে যাচ্ছে – আর এদের সবার মধ্যে দেখা যায় ভিয়েতনামিজদের প্রাধান্য বেশি। ওদের মালিকানাধীন কিংবা পরিচালিত দোকানপাটও বেশি। অনেক ধরণের জামাকাপড়, গৃহস্থালি দ্রব্যাদি সস্তায় এই এলাকায় পাওয়া যায়। আর এতসবের মধ্যে ঘুরে ঘুরে চুলকাটার একটা দোকানও একসময় পেয়ে যাই।
ঢুকতে গিয়েই দেখি নাপিত হলো দুই তিনজন ভিয়েতনামিজ মেয়ে। জন্ম হয়তবা অস্ট্রেলিয়াতেই, সম্ভবত স্টুডেন্ট, – কিন্তু সাথে সাথে চুল কেটেও কিছু উপার্জন করছে। তো আমি ভাবলাম হয়ত মেয়েদের পার্লার জাতীয় কিছু – তো ঘুরে বের হয়ে আসার সময় ওরা আমাকে থামায় আর বলে যে ছেলেদেরও চুল এইখানে কাটা হয়। তো আমিও আর অন্য কোনো উপায় না পেয়ে ওখানেই চুল কাটতে বসে যাই।
বিষয়টা কিছুটা অস্বস্তিকরও বটে । কারণ, দেশে চুলকাটার জন্য এই পর্যন্ত সর্বদা ছেলে নাপিতদের হাতেই মাথা সঁপে দিছি। দোকানপাটে, সেলুনে, মেয়েদের হাতে চুল কাটা হয়নাই কখনও আর সেইরকম কোনো সিস্টেমও এদিকে নাই। তবে মেয়েটা বুদ্ধিমান। চুল কাটার ফাঁকে ফাঁকে নানারকম গল্পগুজবের মাধ্যমে একটা সাবলীলতা বজায় রাখল। এদিকে আবার চুলকাটার সময়কার সান্নিধ্য কিংবা নৈকট্য- সেটাও এড়ানো যাচ্ছে না। মাঝে মধ্যেই নিঃশ্বাস বন্ধ করে থাকি, ধ্যানস্থের মতো বসে থাকি সরাসরি আয়নার দিকে তাকিয়ে। বেশ অস্বস্তিকর – তবে সুবিধা হলো, এখানে চুলকাটার রেইট অনেক কম।
ওই ফুটস্ক্রে-র কাছেই আরেকটা সেলুনে আরেক অস্ট্রেলীয় ভদ্রলোক চুল কাটেন – সেইখানে চল্লিশ ডলার, আর এই ভিয়েতনামিজ এখানে মাত্র সাড়ে সাত কি আট ডলার। সাধারণত ওই অন্য সেলুনেই যাই – কারণ ওই লোকের চুলকাটা-টা ভালো – কিন্তু মাঝে মাঝে টাকাপয়সা শর্ট থাকলে এই ভিয়েতনামিজ সেলুনে।
এখানে আসলেই কিরকম একটা দৃশ্য বারবার মনে পড়ে – ছোটকালে – ক্লাস টু তে ছিলাম হয়তবা – পাড়াতুতো বড় ভাই (সেও স্কুল ছাত্র) – সে একবার নিয়ে গেল এক ম্যাসেজ পার্লারে। এই ম্যাসেজ-পার্লার বিষয়টি হয়ত অনেকের মনে আছে। প্রেসিডেন্ট এরশাদের শাসনামলে একটা সময় হঠাৎ ঢাকার পাড়ায় পাড়ায় রাস্তার ধারে ছোটো ছোটো ম্যাসেজ পার্লার গজিয়ে ওঠা শুরু করে – যেখানে পুরুষেরা গিয়ে সেলুনের মতো সিটে বসে নারী-কর্মীদের কাছ থেকে শারীরিক ম্যাসেজ নিয়ে আসতে পারত। খুব বেশি বে-আইনি কিছু না – আবার পর্দার আড়ালে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অন্য কিছুও যে হতো না – তা-ও না। তো আমাদের ভিজিট করা এই গুলশান এক নম্বরের (চৌরাস্তা, কিংবা তখন ছিল গোল-চত্বর – এই গোল-চত্বরের উত্তর-পূর্ব কোনায়) এই পার্লারে তেমন বেআইনি কিছু সম্ভবত হতো না । সেলুনের ছোটো পরিসরে সেরকম কোনো জায়গাও নাই। শুধু দেখি পাড়াতুতো বড় ভাই আয়েশ করে গলা পর্যন্ত চুলকাটার চাদর গায়ে জড়িয়ে মেসেজ নিতেছে – তার পাশের দুই তিনটা সিটে বিভিন্ন বয়েসের পুরুষ। তাদের শরীরও নাপিতের চাদরে ঢাকা আর চাদরের নিচে তাদের দলাই মলাই করে দিচ্ছে গম্ভীর মুখে ইউনিফর্ম পরা দুই তিনজন নারী। নামে সেলুন-কাম-ম্যাসেজ পার্লার হলেও চুলকাটার জন্য কোনো কাস্টমার নাই। সবাই ম্যাসেজ পিয়াসী। এই স্কুল পড়ুয়া বড় ভাইটি স্লট মেশিনে ভিডিও গেম খেলা জিনিসটার সাথেও পরিচয় করিয়ে দেয় – গুলশান একের ওই কোনাতেই আরেকটা দোকানে – মারাত্মক উত্তেজনাময় বড় বড় মেশিনে কয়েন ঢেলে ভিডিও গেম খেলা। বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের শিশু-কিশোরেরা আসতেছে। বস্তিবাসী, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, ছাত্র, অ-ছাত্র – নানা রকমের শিশুদের একটা মিলনমেলা। তবে গল্পগুজবের কোনো স্কোপ নেই। সবাই খেলায় ব্যস্ত।
যাই হোক, তো ফুটস্ক্রে-র এই ভিয়েতনামিজ সেলুনে দুই কি তিনবার যাওয়ার পর থেকে দেখি ওই মেয়েটির বাবা মা পিছনে সর্বদা দাঁড়িয়ে থাকেন। মেয়ে কি করছে -কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না সেদিকে কড়া নজর। আমি তাদের সাথে কথা বললেই হাসি হাসি মুখ – কিন্তু আবার চুল কাটতে বসলেই মুখ গম্ভীর। মেয়েটির নিজের এইসব বিষয়ে কোনো বিকার নেই, তবে এই বাবা আর মা কে দেখে বেশ ইন্টারেস্টিং লাগল। মা মোটাসোটা হাসিখুশি – বাঙালি টাইপের মহিলা – আর বাবা হলেন ইয়েস ইয়েস অমায়িক গোছের একজন। ইনিও মোটাসোটা। সম্ভবত দোকানের স্পেসটি ওনাদেরই – মেয়েকে চুল কাটাতে নিষেধও করতে পারছেন না – আবার সার্বক্ষণিক নজর না রেখেও পারতেছেন না। সমগ্র এশিয়ার মানুষদের আলাদা একরকমের একটা মনোভাব আছে মনে হলো। ইউরোপীয়দের মতো না। নারী-পুরুষ সম্পর্ক, বিয়ে, সংসার – সন্তান এসব নিয়ে চেতনা একটু আলাদা রকমের।
কিছুদিন পরে দেখলাম চুলকাটা শেখার জন্যেও ইউনিভার্সিটি বা অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শর্ট কোর্স আছে। ওটা শেষ করে সার্টিফায়েড হেয়ার ড্রেসার হলেই (সম্ভবত) চুল-কাটার পারমিশন পাওয়া যায়। সব কিছুতেই একটা স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখার নিয়ম আছে সরকারের পক্ষ থেকে। চাইলেই যে কেউ যেকোনো একটা প্রফেশন শুরু করে দিতে পারে না। এই লাইসেন্সিং, মনিটরিং – এসবের মাধ্যমেই সমাজে চাল চলনের মধ্যে একটা সুন্দর পরিচ্ছন্ন স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখা সম্ভব হয় সম্ভবত।
অন্যদিকে আবার মেলবোর্ন সিটিতে আরেক নামকরা নাপিতের সন্ধান পাই – যার কাছে একবার চুল কাটানোর রেইট হলো ২০০-৩০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার (এখনকার হিসাবে ১২০০০ – ১৮০০০ বাংলাদেশী টাকা)। উনার কাছে চুল কাটতে চাইলে তিন মাস আগে থেকে এপয়েন্টমেন্ট করে রাখতে হয়। এর আগে এপয়েন্টমেন্ট পাওয়া সম্ভব নয়। এমন ব্যস্ত মানুষ। বিদেশী কাউকে নিজের দেশ সম্পর্কে অবাক করে দিতে হলে এই একটা কথাই যথেষ্ট – আমাদের এখানে পঞ্চাশ সেন্টের মধ্যে সুন্দর হেয়ার কাট নেয়া সম্ভব। এই এক কথাতে ওদের বেশ কিছু মুহূর্ত আক্কেল গুড়ুম হয়ে থাকে। এইটা আমি একাধিক বার দেখছি।
![]()
2 Comments
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.
আনিস কবির
১৫ বছর একটানা মেলবোর্নে ছিলাম। টটেনহাম, সানশাইনে ছিলাম বেশিরভাগ সময়। অন্যের চোখে নিজের অভিজ্ঞতা দেখতে ভালই লাগে। কিছু বছর যাবত ঢাকায় চলে এসেছি। ভাল থাকবেন। লেখালেখি চালিয়ে যাবেন। শুভ কামনা
Saifuddin-Masuk
সুন্দর, ঝরঝরে, সাবলীল, সুখপাঠ্য লেখা। ভালো লাগল। শুভকামনা জানবেন রাদ আহমদ।