ঐ নূতনের কেতন ওড়ে
[২০১৮ সালে সংঘটিত সড়ক নিরাপত্তার দাবীতে স্কুল কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের প্রতিবাদের উত্তাল দিনগুলিতে এই লেখাটি লিখিত]
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়
তোরা সব জয়ধ্বনি কর।
রবীন্দ্র, নজরুল প্রমুখ সেই ওল্ড মাস্টাররা যে নূতনের তথা, নবীনের জয়গান গেয়ে গেছেন, সেই ধরনের জয়গান আমি লিখি না কেন, অথবা এতদিন কেন লিখি নাই— এইটা ভাবতেছি দুইদিন ধরে।
ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা,
ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,
আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।
ওই যে প্রবীণ, ওই যে পরম পাকা,
চক্ষু – কর্ণ দুইটি ডানায় ঢাকা,
ঝিমায় যেন চিত্রপটে আঁকা
অন্ধকারে বন্ধ করা খাঁচায়।
আয় জীবন্ত, আয় রে আমার কাঁচা।
কিয়ৎপরে দেখলাম, শুধু আমি কেন, শুধু আমি তো না— এখনকার নূতন যুগের কোনো কবিই সম্ভবত, আমার পড়া মতে, এই ধরনের বিষয় নিয়ে সরাসরি লিখে নাই অথবা লেখে না। এইটা যেন এখনকার ট্রেন্ড না। রবীন্দ্র নজরুলের পরের যুগের কবিরা এইরকমের মানবতাবাদী বচন উচ্চারণ করতেছেন ঠিকই, কিন্তু সেগুলা যেন ব্যক্তি-মানুষের অবস্থানে অবস্থান করে তার পরে করতেছেন। অর্থাৎ বড় ভাবনার, মানবতার বড় কল্যাণের কথা বলতেছেন ঠিকই, কিন্তু সেই বলার মধ্যে উনারা নিজে উপস্থিত থেকে, ব্যক্তি-মানুষের অবস্থান বজায় রেখে তারপরেই বলতেছেন।
ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করব
বন-বাদাড় ডিঙ্গিয়ে
কাঁটাতার, ব্যারিকেড পার হয়ে, অনেক রণাঙ্গনের স্মৃতি নিয়ে
আর্মার্ড-কারগুলো এসে দাঁড়াবে
ভায়োলিন বোঝাই করে
কেবল তোমার দোরগোড়ায় প্রিয়তমা।
(শহীদ কাদরী)
ব্যক্তি-কবি তার প্রিয়তমাকে বলা কথার ভণিতায় ব্যক্তি-মানুষকে ছাড়িয়ে যাইতেছেন। ওভার-অল পুরা মানবজাতির ভালো মন্দ নিয়ে কথা বললেন, কিন্তু, তারপরেও, কবিতা থেকে ব্যক্তি-কবি আর তার প্রিয়তমাকে এড়ানো যাচ্ছে না। অথবা—
একটা কথার ফুলকি উড়ে শুকনো ঘাসে পড়বে কবে
সারা শহর উথাল পাথাল, ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে।
(নবারুণ ভট্টাচার্য)
এখানেও কবিকে যেন, মনের চোখে, কবিতার মধ্যে দেখা যাইতেছে। শহরের রাস্তায় দাঁড়ানো একজন কবি, একজন মানুষ, শুকনা ঘাসের কথা ভাবতেছেন, জেলখানার কথা, বারুদ-গন্ধে ফোটা একটা ফুলের কথা। ব্যক্তি কথকের এই চিত্রকে কবিতা থেকে এড়ানো যাচ্ছে না। রবীন্দ্র-নজরুলে সেই ব্যক্তি-মানুষের প্রাবল্য কিন্তু এতখানি ছিল না। এই যে, সময়ের সাথে সাথে একটা ট্রেন্ড— অতীতে নিজের ব্যক্তি-অবস্থানকে বিলীন করে দিয়ে মানবতাবাদী বড় বড় কথা বলা হতো এক সময় (শুধু বাংলা ভাষায় না, অন্যান্য ভাষাতেও) মানব কল্যাণের কথা, অথবা মানব সমস্যার কথাও হতে পারে— সেটা যুগের অগ্রসরের সাথে সাথে সীমিত পর্যায় নেমে আসতেছে। কবিতায় কথকের অবস্থান আরও ছোটো, আরেকটু ব্যক্তিগত হয়ে আসতেছে। এটাই যেন ন্যাচারাল। চল্লিশ দশকের পরেকার অনেক বিখ্যাত কবির বচনগুলাই অনেকখানি ব্যক্তিগত বচনের আড়ালে বড় কথা বলা যেন।
সময় যত যাচ্ছে, যত ব্যক্তিগত হচ্ছি, ‘বড় কথা’ বলার প্রয়োজনটাও যেন ফুরিয়ে যাচ্ছে। এই ট্রেন্ডের উল্লেখ প্রথম আমি পাই যুক্তরাষ্ট্রের কোনো এক ইউনিভার্সিটির একজন ইংরেজি প্রভাষিকার ছোট্ট একটা প্রবন্ধে। উনি দেখাইতেছিলেন, ইংরেজি সাহিত্যের মডার্নিজম ধারণাটা যখন শেষ পর্যায় পার হয়ে পোস্ট মডার্নিজমের দিকে যাইতেছিল (সময়ের বিবেচনায়। অন্য বিবেচনায় না। অর্থাৎ, মোটামুটি গত শতকের ষাটের দশকের পরবর্তীকালের দিকে যাইতেছিল) তখন এইরকমভাবে কবিতায় কবিরা ‘বৃহত্তর মানব কল্যাণ’ প্রকাশের জন্য নিজেকে বিলীন করে দেয়া থেকে, ধীরে ধীরে কথা বলার অবস্থান গুটাইয়া ব্যক্তি অবস্থানে চলে আসতেছিলেন। ইংরেজি কবিতার ১৯২০/৩০ পূর্ববর্তী কবিতা আর ষাট সত্তর কিংবা তার পরের কালের কবিতা পাশাপাশি রাখলেই এই জিনিস চোখে পড়বে।
বাংলা ভাষায়, শহীদ কাদরী কিংবা নবারুণের জেনারেশনের পরে এইরকম `বড় কথা বলা` কবিতা খুঁজে পাওয়া তো আরও দুষ্কর। কবি যেন মানুষ হিসাবে আরও আরও ব্যক্তিগত হয়ে যাইতেছে। কী করা যায় ভাবতেছি। মনে হচ্ছে জীবনানন্দ আমাকে খুব বেশি করেই পেয়ে বসছেন। মনে হলো, খুব একটা শক্তি সাহস সফলতা বোধের, স্বপ্ন পূরণের আনন্দ পাইতেছি না কেন যেন। কেন পাইতেছি না? জীবনানন্দ আচ্ছন্ন করে ফেলছে যেন আমায়।
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন…
কিন্তু এটাতে তো হবে না। কিসে হবে, এখনকার যুগে এসে এইটা ভাবতেছি। তবে হ্যাঁ, আরও আরও করে নতুনে ভরে উঠুক কবিতার ভাষা এবং ভাবনা। মানুষের ভাষা। আবার বলতে হবে নূতনের ভাষায়—
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়
তোরা সব জয়ধ্বনি কর
তোরা সব জয়ধ্বনি কর
![]()
8 Comments
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.
হৈমন্তীকা
অসাধারণ&শুভকামনা প্রতিটি নব উত্থানের।
Sohel Khondokar
নতুনের কেতন উড়াতেই হবে।
Sohel Khondokar
ধন্যবাদ।
ঈশিতা ঈরু
অসাধারণ
তানভীর তীব্র
বেশ!!
রাদ আহমদ
ধন্যবাদ অনেক ।
নির্জন অঙ্কন
দারুণ ছিলো
রাদ আহমদ
ধন্যবাদ!