রোমে বসবাস
ইতালিতে বসবাসের গত কুড়ি বছরে আমি আমার যেসব লেখা প্রকাশ করছি তার প্রায় সবই ফেসবুকে। এইসব ফেসবুকীয় লেখা থিকা তুলট ব্লগজিন কিছু লেখা নির্বাচন কইরা ঐসব প্রকাশের অভিপ্রায় ব্যক্ত করলে আমি তাতে সামান্য যোজন বিয়োজন করি ও লেখাগুলার বানান পরিমার্জন করি। এই লেখাগুলা ২০১২ থিকা বর্তমান-তক কালে লেখা।
১. পর্তাফর্তুনা
কাজে যাব বইলা সকালে ঘর থিকা বাইর অইয়া হাঁইটা মেট্রো রেলের দিকে রওনা দিলাম। সুবাগুস্তা মেট্রো স্টেশনে পৌঁছাইয়া মেট্রোর মুখে দেখি পথে পইড়া আছে ১ সেন্তিজিমোর (সেন্ট) একটা তামার পয়সা। কয়েকদিন বৃষ্টির পর মেঘলা আকাশে ওঠা লাজুক সূর্যের রোদে চিক চিক করতাছে চারদিক।
পয়সাটা নিব কি নিব না দোন-মনয় পয়সাটা হাতে তুইলা নিলাম। পয়সাটা হাতে নিয়া মন আরও অনিশ্চিত অইয়া পড়ল। ইতালিয়ানদের মধ্যে এটা একটা প্রচলিত জনপ্রিয় ধারণা যে, এ ধরণের প্রাপ্তি সৌভাগ্য বইয়া আনে। পইড়া পাওয়া পয়সা তারা সযতনে মানিব্যাগে রাইখা দেয়। ওরা কয় পর্তাফর্তুনা (portafortuna), বাংলায় কইলে কইতে অয় ‘সৌভাগ্য সূচনা’।
মেট্রোতে পর্তাফর্তুনা হাতে বইসা বইসা ভাবি, কী আমার সৌভাগ্য সূচনা?
‘কী আমার সৌভাগ্য সূচনা?’-র ভাবনা সারাদিন মাথার চারদিকে ভন্ ভন্ করে। তামার পয়সা পইড়া থাকে পকেটের এক কোণে। বিকালের দিকে পইড়া পাওয়া বস্তু বিষয়ে আমাগোর শৈশবের সামাজিক শিক্ষার কথা মনে পড়ে। আমাগো শৈশবে আমরা জানছিলাম, পইড়া পাওয়া বস্তু নিতে নাই, অমঙ্গল অয়। যার হারানো বস্তু সে মুন্নি দেয়, তার হাহাকার আইসা বিঁধতে পারে। তাই পথে পইড়া পাওয়া বস্তুর মালিককে খুঁইজা তাকে তার হারানো ধন ফিরায়া দিতে অয়। আর পইড়া পাওয়া পয়সা খরচ করলে তার দ্বি-গুণ অনাথকে দান করতে অয়।
সকালে পইড়া পাওয়া পয়সা নিয়ে আজিজ ভাইকে কইছিলাম, আজিজ ভাই প্রায় ২০ বছর যাবত ইতালিতে আছেন। সন্ধ্যায় আজিজ ভাই টেলিফোনে কয়, আইচ্ছা, ‘কী আমার সৌভাগ্য সূচনা?’-র কোন সমাধান খুঁইজা পাইলেন?
আর আমার একটা গল্পের কথা মনে আইল; মানে, এটা একটা প্রচলিত পরিচিত গল্প, ইতালিয়ানরা এই ধরণের গল্পরে কয় ফাবোলে, বাংলায়ও আছে এধরণের অসংখ্য প্রবাদ গল্প। যাই অইক, গল্পটা আজিজ ভাইরে কইলাম। গল্পটা অইল, একদা এক সৌভাগ্য প্রত্যাশী শুনে যে অতি দূরের এক পাহাড়ে, মানে, অনেক অনেক দিন লাগে সেখানে যাইতে, সেখানে লুকানো আছে অসংখ্য মণি-মুক্তা। সেই অনেক দিনের পথ পারি দিয়া সে সেখানে যায়, তারপর সে পাহাড় খোঁড়া শুরু করে। এইদিকে অইছে কি, সেখানে মনি-মুক্তা আর কাঁকর-কাদায় মাখামাখি অইয়া আছিল। আর আছিল অসংখ্য রঙিন ভাঙা কাঁচের টুকরা, আর সে আগে কোনো আসল মণি-মুক্তা দেখে নাই। তারপর সারা দিনের খোঁড়াখুঁড়ির ক্লান্তি আর আশাহীনতার অবসাদে তার মাথাটা একপাশে ঢইলা পড়ল।
রোম, ১৭/৪/২০১২
২. ফেয়ার প্লে
স্থান, ধরেন গিয়া, রোমের একটা মেস্ বাড়ি। কাল, ছুটির দিনের প্রায়-দুপুর।
পাঁচ বন্ধু পয়সা দিয়া নাইন কার্ড খেলতেছে। এর মধ্যে নুরুর দেশের বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ। খেলা মাত্র এক দেড় ঘণ্টা হইছে, এর মধ্যেই নুরু তিন রোজের কামাই লস কইরা ফালাইছে, একজন ভালই লাভে আছে, বাকিরা প্রায় সমান সমান।
যে লাভে আছে সে খেলা ভণ্ডুল করার তালে আছে। ছুটির দিনের বিরিয়ানি পাক প্রায় শেষ অইয়া আইছে, যারা সমান সমান আছে তারা লাভের জনের সাথে তাল দিতাছে; কিন্তু নুরুর ঘারে জিদের জিগির ভাইঙ্গা পড়ছে। নুরুর চোখমুখ লাল, অসহায় নুরু কয়, ‘আইউক চোকের হানি, কাইনতামনো, টিয়া যাক, তয় খেলা সুন্দর হক’।
রোম, ১৫/১০/২০১২
৩. এক বৈশাখের স্মৃতি
সে বৈশাখ ছিল আমার কেবল কৈশোর পার হওয়া কালের। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের দ্বিতীয় বছর কেবল। আমার তখন উত্তুঙ্গ কাল, আমার জীবনের সবচেয়ে নির্ভাবনার বছর। আমার জীবনের সেকালে আমার এতটাই নির্ভাবনা ছিল যে যেকোনো ঘটনায় আমি হা হা, হা হা হসিতে নিস্তরঙ্গ পরিবেশকেও তরঙ্গাইত কইরা ফেলতাম। আমার ঐ হা হা হাসির জন্য আমাকে কেউ তেমন পাত্তা দিত না, কারণ আমার না ছিল কান্না, না দুঃখ, না বেদনা, শুধু হা হা।
আমি পড়ি পরিসংখ্যানে, কিন্তু আমার সখ্য ও চলাফেরা বেশি ইতিহাসের, বাংলার, ইংরেজির, সরকার ও রাজনীতির, অর্থনীতির সহপাঠীদের সাথে। আমি যে কারো সাথে খুব গভীর সখ্যে ছিলাম এমন না, তবে কালটা এমন ছিল যে তখন আমরা, মানে যাদের সঙ্গে যখন চলতাম তখন আমরা ছিলাম আপন, আত্মীয়।
সেবার সেই বৈশাখের প্রাক্কালে কি কইরা কি কইরা জানি একটা গোপন দল তৈরি হইল রাঙামাটিতে বিজু উৎসবে যাওয়ার। সেই গোপন দলের সদস্য মাত্র পাঁচ জন। আমি, অর্থনীতির বেবী, ইতিহাসের শামীম, ইতিহাসের পপি, আর সরকার ও রাজনীতি বিভাগের মিতা (আমাদের এক বছরের জুনিয়র)। প্ল্যান হইল আমরা পপির সাথে রাঙামাটিতে পপিদের বাড়ি যাব বিজু উৎসবে।
চৈত্রসংক্রান্তির আগের রাইতে আমারা কমলাপুর রেল ইস্টিশন থিকা চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা কইরা চৈত্রসংক্রান্তির দিন সকালে চট্টগ্রাম পৌঁছাইয়া পপির বাবার পাঠানো খোলা জীপ পাইলাম। সেখানে আমরা পপির ছোট বোন লাকির জন্য অপেক্ষা করলাম, লাকি তখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী।
চট্টগ্রাম থিকা খোলা জীপে সেদিনের আমার সেই রাঙামাটি যাওয়াটা আজকে মনে হয় একটা মিরাজ। আমার মনে হয় যেন জীপে না আমরা সেখানে গেছিলাম যাদুর জায়নামাজে মেঘের ভিতর ভাইসা। তারপর সবই ছিল মিরাজের ন্যায় জাদুবাস্তবতা, তারপর সবই ছিল ডিভিনা কমেডিয়ার নরক ও স্বর্গারোহণ, বন্ধু পপি মানে শ্রাবণী চাকমা সেখানে ভির্জিলিয়।
আমরা সেখানে পান করেছিলাম জগরা, দোচোয়ানি, তেচুয়ানি, খেয়েছিলাম বত্রিশ ব্যঞ্জনের নিরামিষ, অলৌকিক সন্ধ্যায় শুনেছিলাম পপির বাবার বাঁশি, লেকের বাতাসে আমাদের কপোলে গড়িয়েছিল অলৌকিক অশ্রু, খোলা রাস্তায় নেচেছিলাম অপার্থিব নাচ, ভোরের আলোয় পদব্রজে পার হয়েছিলাম নির্বাণ বোধির বিহার, বৈশাখী খড়দহে ভেসেছিলাম বিস্তীর্ণ লেকের জলে।
আমাদের সেই ভ্রমণ ছিল সাতদিন ব্যাপী, অথচ আজকে যখন স্মরণের সে দরজা খোলে তখন মনে হয় সে এক অনন্ত, সে এক চির অনন্ত, যা বাস্তবের জগতে নাই, অথচ তা স্বচ্ছ দেখা যায় বৈশাখী দিনের তপ্ত স্বচ্ছতায়।
রোম, পয়লা বৈশাখ, ১৪৩০ (১৪/৪/২০২৩)
৪. আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাথে আমার প্রথম ও শেষ দেখা
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখা, গল্প, উপন্যাস, ও প্রবন্ধ আমি পড়ছিলাম তার সাথে দেখা হওয়ার আগেই। সম্ভবত ইলিয়াসের গল্পের বই ‘মিলির হাতে স্টেনগান’ আমি প্রথম পড়ছিলাম, আর খুব দ্রুত গল্পগুলা পইড়া শেষ করতে পারছিলাম।
আমার যতদূর মনে পড়ে, গল্পের আকর্ষণ ও এর ভাষা এর প্রধান কারণ, আর এই গল্পের বই পইড়াই আমি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস নামের এক গল্পকারের নাম জানতে পাই। তখন আমি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইছি, বইটা কী কইরা আমার হাতে আইছিল তা এখন আর মনে করতে পারতেছিনা, হইতে পারে, ১/২ টাকার বইয়ের টাল থিকা বইটা পাইছিলাম, কারণ সেটা ছিল সেকেন্ড হ্যান্ড বই।
এরপর লেখক শিবিরের পত্রিকায় তার নাম দেখি ও কিছু মন্তব্য ধরনের লেখা পড়ি। তার উপন্যাস ‘চিলেকোঠার সেপাই’ যে বছর প্রথম ইউপিএল থিকা প্রথম প্রকাশিত অয় সেই বছরই বাংলা একাডেমির ফেব্রুয়ারির বই মেলায় থিকা উপন্যাসটা কিনি ও পড়ি। তারপর ‘খোঁয়াড়ি’ বইটা পড়া অয়।
ততদিনে তার পায়ের সমস্যা, ক্যান্সার ইত্যাদির খবর পত্রিকান্তরে দেখতে পাই। একদিন দূর থিকা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসরে আজিজ সুপার মার্কেটের নিচ তলায় বইয়ের বাজারের ভিতর দিয়া হাঁইটা যাইতে দেখলাম। তখনও তার পা কাটা অয় নাই।
আমার মায়ের ছিল স্পাইনাল কর্ডের সমস্যা, তারে রেফার করা অইছিল অর্থোপেডিক্স স্পেশালিষ্ট (সম্ভবত ডা. শামসুদ্দীন)-এর কাছে। তার চেম্বার আছিল ধানমণ্ডি ১ নম্বর সড়কে, কবি রফিক আজাদের বাসার সাথের বাসায়। এক বিকালে আম্মারে নিয়া (নির্ধারিত সাক্ষাৎ) সেখানে গেলে দেখি সেখানে বইসা আছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আর সাথে মিসেস ইলিয়াস। ডাক্তার তখনও আসে নাই। আমরা পরস্পরের দিকে তাকায়া হাসি বিনিময় করলাম। সেখানে আমি, আম্মা, ইলিয়াস ও মিসেস ইলিয়াস ছাড়া আর কেউ ছিলনা।
কতক্ষণ ইতস্তত অপেক্ষার পর আমি আগায়া গিয়া ইলিয়াস ভাইর সাথে পরিচিত হইলাম, ইলিয়াস ভাই আইছে ভাবিরে দেখাইতে। ভাবি আর আম্মার সমস্যা প্রায় একই। আরও জানলাম, ডাক্তার সাব তার বন্ধু মানুষ আর আসতে আরও দেরি হবে। ইলিয়াস ভাইর প্রস্তাবে আমরা বিড়ি টানতে বাইরে গেলাম, সড়কের এ মাথা ও মাথা দুইবার চক্কর খাইলাম, কয়েকটা সিগারেট ফুঁকলাম, আর দুই জনই অনেক কথা বললাম আর হা হা হো হো করলাম। সবই অদরকারি কথা।
তারপর আমরা যখন ডাক্তারের চেম্বারে ফিরা আসলাম ততক্ষণে ডাক্তার সাব ভাবিরে দেখা শেষ কইরা আম্মার রোগের হকিকত করতেছে, আম্মার পাশে বইসা ভাবি আম্মার রোগের লক্ষ্মণ বিষয়ে টুকটাক বলতেছে।
এর পরের সপ্তাহে ইলিয়াস ভাইর অপারেশন করাইতে কলিকাতা যাওয়ার কথা। ইলিয়াস ভাইর সাথে সেই আমার প্রথম ও শেষ দেখা।
রোম, ৪/১/২০২৪
৫. রেশমি পথে
রোমে চলতেছে ‘রেশমি পথে: প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মাঝে প্রাচীন চলাচল পথ গুলা’ শিরোনামের প্রদর্শনী। শুরু হইছে ২৭ অক্টোবর, চলবে ১০ মার্চ’ ১৩ পর্যন্ত। রোম কম্যুনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘আজিয়েন্দা স্পেচিয়ালে পালায়েক্সপো’-র সহযোগিতায় নিউ ইয়র্কস্থ ‘আমেরিকান প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘর’ প্রদর্শনীটার আয়োজক। সাতটা কামরা বিস্তৃত প্রদর্শনীতে স্থান পাইছে রেশমি পথ (silk road)-এর প্রাচীন নিদর্শন, চিন্তিত স্থাপনা কর্ম ও কতক নিদর্শনের নকল।
প্রদর্শনীটা দেখলাম ৩দিন ধইরা, এই ৩ দিনই দেখলাম ভীর লাইগাই আছে। ৭ টা কক্ষের প্রদর্শনী বিভাজনকে আবার ৭ উপশিরোনামে আলাদা করা হইছে: যেমন, শুরুর কামরাটাকে বলা যায় ভূমিকা মূলক, এতে ইতালীয় বনিক-পর্যটক ও রচয়িতাদের নিদর্শন ঠাই পাইছে। যেমন- মার্কো পোলোর ‘ভ্রমণ’ গ্রন্থের চৌদ্দ শ’ শতকের একটা হাতে লেখা অনুলিপি, মার্কো পোলোর মৃত্যুর কয়েকদিন আগে করা দানপত্র ও সাক্ষী(সেপ্টেম্বর, ১৩২৪), দানপত্র অনুযায়ী মার্কো কন্যা (মাত্র এক উত্তরাধিকার) ফান্তিনা পোলোর অনুকূলে দেয়া আদালতের উত্তরাধিকার রায় (১৩৬৬), মার্কোর চাচা মাত্তেয় পোলোর সর্বশেষ দানপত্র ও সাক্ষী (১৩১০), পিয়েত্রো ভিঞলিওনির সর্বশেষ দানপত্র ও সাক্ষী (তাবরিজ, ডিসেম্বর ১২৬৩), ফ্লোরেন্সের বিশেষজ্ঞ ব্যবসায়ী ফ্রান্সেসকো বালদুচ্চি পেগোলত্তির ‘মার্চেন্ট ম্যানুয়াল’ এর হাতে লেখা সচিত্র গ্রন্থ(১৩৩০-৪০), ১৪৫৭ সালের জেনোয়েজে পৃথিবীর মানচিত্র, বনিক কন্যা আন্তোনিও দি ইলিয়নের সমাধি ফলকের অনুলিপি, তানা শহরে নারী দাস বিক্রির একটা সচিত্র দলিল (সেপ্টেম্বর ১৩৫৯), চৌদ্দ শ’ শতকের আলেক্সান্দ্রিয়া বন্দরের একটা চিত্র, আর প্রাচীন রেশমি পথের একটা মানচিত্র (চীন থিকা ইউরোপ অবধি)। পেগোলেত্তির ‘মার্চেন্ট ম্যানুয়াল’ এ নাকি উল্লেখ আছে যে সে কালে ইতালি থিকা চীন যাত্রা ছিল মোটামুটি নিরাপদ! দাস কারবারের দলিল সাক্ষ্য দেয় যে দাস বাজারের দাসী-রা ছিল কিশোরী ও শিশু। আর উইল বা দানপত্র গুলা থিকা পাওয়া যায় রেশমি পথে বাণিজ্যকৃত মূল্যবান সামগ্রীর বিবরণ যার মধ্যে অন্যতম রেশমি কাপড়। প্রদর্শনীর এ কক্ষের বাইরে চীনা মনীষী ঝুয়াং হাং (খৃষ্টীয় ৭৮-১৩৯) এর নিম্নোক্ত বর্ণনা উদ্ধৃত হইছে-
“লম্বা কোরিডোর, প্রশস্ত বারান্দা,
পরম্পরাশিষ্ট প্রদর্শনশালা
প্রসারিত যেন মেঘমালা।
দেয়াল ঘেরা প্রাঙ্গণগুলা,
খুবই অদ্ভুত আর অপ্রচলিত,
এক সহস্র তোরণমালা,
দশ সহস্র দরজারাজি,
যুগল ফটকমালা, গুপ্ত প্রবেশপথগুলা
ধারাবাহিকভাবে আড়াআড়ি আর পরিচ্ছন্ন”।
২.
‘রেশমি পথে’ প্রদর্শনীর দ্বিতীয় কামরার প্রদর্শনীর নামকরণ করা হইছে ‘এক বিশ্বজনীন রাজধানী’। এতে প্রবেশ পথের দেয়ালে এই শিরোনামের বর্ণনায় লেখা হইছে, “রেশমি পথ ধইরা এইখানে তোমার অভিযাত্রা শুরু বিশাল জি’আন-এ, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নগরে। প্রায় দশ লাখ লোকের ঘর এই মহানগরে, আরও দশ লাখ বাস করে আরোপিত দেয়ালগুলার ওপারে। রাজকীয় প্রাসাদরাজি, উপাসনালয়সমূহ, রাস্তাগুলা বরাবর বাজারগুলা, কর্মচাঞ্চল্যের কোলাহলে মুখরিত নগরী, ভিনদেশী বণিকদল, দূতসকল, পণ্ডিতগণ আর গায়ক-বাদক সকল এই নগর কেন্দ্রের পানে ছুটতেছে,
নানা দেশ থিকা আগত চমকপ্রদ সব সামগ্রী
বাজারগুলাতে গুদামজাত হইতেছে আর পথঘাট ভইরা উঠতেছে দূর দেশি দৃশ্য আর শব্দে”।
জি’আন শব্দের অর্থ শান্তি নগর। তো, জি’ আন-এ সে আমলে, মানে, তাং রাজবংশীয় আমলে (খৃষ্টীয় ৬১৮-৯০৭), ভাত বা বার্লি থিকা তৈরি মদ ছিল খুব জনপ্রিয়, এখানে কাঁচঘরে তাং আমলের কিছু সিরামিক বা মৃৎ শিল্পের নিদর্শন রাখা হইছে। যেমন, একজন ভিনদেশী খুচরা মদ বিক্রেতার (সামান্য ভুঁড়িওয়ালা একজন সাধারণ লোক) মূর্তি, দুইটা মৃৎ পাত্র, গলায় উত্তরীয় ও পড়নে ধুতি এক ভারত বাসীর নৃত্যরত মূর্তি (এও সামান্য ভুঁড়িওয়ালা একজন সাধারণ লোক)। পাশের কাঁচঘরে আট শ’ শতকের দুইটা ঘোর-সোয়ার মূর্তি, এরা অভিজাত শ্রেণীর চীনা নাগরিক, একজন তীরন্দাজ শিকারি অপরজন নারী ঘোড়সওয়ার; তরুণী তার ঘোরার পিঠে প্রিয় কুকুরসহ বৈকালিক ভ্রমণে বাইর হইয়া থাকতে পারে। মৃৎ-মূর্তিগুলা সব রঙিন। উল্লেখ করা হইছে যে সে আমলে চীনা অভিজাতদের প্রিয় বিষয় আছিল শিকার করা, আর সে আমলে চীনা সমজে নারী ও পুরুষের ছিল সমান অধিকার। টোল গুলাতে তারা পাশাপাশি বিদ্যা অর্জন করত, উত্তীর্ণ হইলে পুরুষদের অনুরূপ নারীগণও সম পদে নিযুক্ত হইত।

এ কক্ষের আর এক কাঁচ ঘরে প্রদর্শিত হইতেছে আড় বাঁশী, কিম্বালস, সেং, মুন লুলে, ঢোল, পিপা, এরহু, ইত্যাদি বাদ্য যন্ত্র। ব্যবস্থা করা হইছে এসব বাদ্যের বাদন শোনার, একক বা মিশ্র উভয়ই। এইখানে রাখা হইছে আট শ’ শতকের দুইজন বাদিকার মৃৎ-মূর্তি; এদের একজন বাজাইতেছে মাউথ অর্গান; ধারণা করা হয়, সেং নামক মাউথ অর্গানটি কম কইরা হইলেও ৩,০০০ বছর যাবত প্রচলিত আছে। এইখানে ‘পথ সঙ্গীত’ শিরোনামে উল্লেখ হইছে, ‘যেহেতু প্রাচীন রেশমি পথের পর্যটকগণ প্রায়ই অপরের ভাষা বুঝত না, তাই সঙ্গীত ছিল তাদের পারস্পারিক যোগাযোগ ও ভাব-বিনিময়ের অনুষঙ্গ। এছাড়াও সঙ্গীত ধর্ম বিশ্বাস প্রচারেরও মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হইত, যেমন- জনপ্রিয় বৌদ্ধ স্তব এবং ইসলামী মূল্যবোধ প্রচারমূলক গীতি-কাহিনী’। এ কক্ষে আরও প্রদর্শিত হইছে ৫৫০-৫৫৭ খৃষ্টাব্দের এক অবলোকেতশ্বর বুদ্ধ মূর্তি ও এক খৃষ্টান মিশনারির সমাধি ফলকের অনুলিপি।
এখানে স্থাপন করা হইছে চরকা ও রেশমি কাপড় তৈরির সে আমলের আদলে নির্মিত তাঁত, আর ভিডিও প্রামাণ্য চিত্রে দেখানো হইতেছে সে আমলের চীনা রেশম শিল্পীদের রেশম সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি। নিদেন পক্ষে পাঁচ হাজার বছর আগে চীন দেশীরা রেশমি বস্ত্র বয়ন শুরু করে। এসব রেশমি বস্ত্র ছিল প্রাকৃতিক রঙে রাঙান, প্রথমে রেশম সুতা প্রাকৃতিক নির্জাসে রাঙান হইত তারপর নানা রঙের রেশমি সুতায় বোনা হইত রেশমি কাপড়, আর এসব রেশমি কাপড় এতই মূল্যবান ছিল যে শুধুমাত্র ধনাঢ্যদের পক্ষেই সম্ভব ছিল সে সব কেনা। এই রেশম প্রযুক্তি সংরক্ষণে ছিল কড়াকড়ি আইন, বাইরের লোকদের কাছ থিকা তা গোপন রাখা হইত, কেউ তা বাইরে নিয়া যাওয়ার অপরাধে অপরাধী হইলে তার শাস্তি হইত মৃত্যুদণ্ড।
কালে কালে এই প্রযুক্তি মুসলমানদের হাতে আসে, তারপর তা ভারতবর্ষ ও ইউরোপে বিস্তৃতি পায়। বিশেষত ইতালিতে রেশম শিল্প এতটাই উৎকর্ষ পায় যে বিশ্বব্যাপী তার খ্যাতি ছড়ায়। যদিও ইতালিতে ইদানীং অধিকাংশ রেশম কারখানা বন্ধ হইয়া গেছে, তবুও একেবারে অবলুপ্ত নয় তা।
৩.
জি’ আন থিকা উত্তর পথে পশ্চিম অভিযাত্রী পর্যটক যখন তাকলামাকান মরুপথ পার হইয়া ক্লান্ত তখন তাকে ও তার বাহককে (যেমন- উট, ঘোড়া, গাধা, ইত্যাদি) ছায়া-পানি-অন্ন-আশ্রয় দেয় যে মরূদ্যান নাম তার তুরফান। তুরফান এক সমৃদ্ধ মরূদ্যানের নাম। সেখানে বয়ে চলে পর্বত থিকা নাইমা আসা নদী কিংলিং, তুরফুন গইড়া তুলছিল সুপ্রযুক্ত সেচ ব্যবস্থা। এই সেচের জল নগর বাসির তৃষ্ণা মিটাইত আর সিক্ত করত মরূদ্যান ঘিরা থাকা পর্যাপ্ত উর্বর জমি। সেখানে কৃষকেরা ফলায় নানাধরনের শস্য দানা, ফল-ফলান্তি, আর শাক-সবজি যা নগর বাসিদের নিজেদের ও নগরে আগত রেশমি পথের ক্যারাভানের প্রয়োজন মিটায় আর উদ্বৃত্তও থাকে কিছু, সেসব উদ্বৃত্ত ফসল রেশমি পথ ধইরা চইলা যায় দূর দূরান্তের রান্না ঘরে, আর খ্যাতি ছাড়ায়ে যাইতে থাকে তাকালমান মরুভূমির মরূদ্যান নগরী তুরফানের। রেশমি পথে তুরফান নগর প্রতিষ্ঠা পায় রেশমি পথের কারবারিদের আশ্রয় আর কার্বার কেন্দ্র হিসাবে। আর এই সবই সম্ভব হইছিল তুরফানের উন্নত সেই সেচ ব্যবস্থার বদৌলতে, ‘কারেজ (karez)’ নামে যা ইতিহাস প্রসিদ্ধ। কারেজ হইল এক ভূগর্ভস্থ সেচ ব্যবস্থা যা ছিল তুরফান বাসীর তৃষ্ণা ও চাষ জলের আধার, পার্শ্ববর্তী পর্বতমালা থিকা কারেজ বাহিত জল তুরফান নগর সিক্ত করত। তো ‘রেশমি পথে’ প্রদর্শনী পরিক্রমায় তৃতীয় কক্ষ তুরফুনে কারেজের এক বিশ্বাসযোগ্য পুননির্মাণ উপস্থাপন করা হইছে।
এই ছাড়াও, তৃতীয় কক্ষে উপস্থাপিত হইছে ষোল শতকের অজ্ঞাত লেখকের হাতে লেখা ও রঙিন চিত্র সহ একটা রান্নার বই; সিরিয়ার দামেস্ক থিকা সংগ্রহীত চৌদ্দ শ’ শতকের একটা সুগন্ধ-দানী; আনুমানিক দশম থিকা চৌদ্দ শতক কালের একটা চায়না ভাস যা মর্কো পোলো ভাস নামে খ্যাত, অবশ্য এইরূপ নামকরণে মার্কো পোলোর সরাসরি কোন সংশ্লিষ্টতা নাই বইলা উল্লেখ করা হইছে; আর সঙ রাজবংশ আমলের (খৃষ্টীয় ৯৬০-১১২৭) একটা কোনাকার বাটি।
‘বয়ন বিশ্ব’ শিরোনামে উপস্থাপন করা হইছে উল বা পশম ও রেশম নিদর্শন; ‘ভিনদেশী বিলাস-সামগ্রী’ শিরোনামে উপস্থাপন করা হইছে শিকারকৃত পশু চামড়া ও মূল্যবান পাথর, এইখানে সাউন্ড ইফেক্টে ভাইসা আসে হরেক রকম পশু-পাখি আর নানা দেশী মানুষের ভাষা। ‘সুগন্ধ ও পুষ্টি’ শিরোনামে উপস্থাপিত হরেক পদের নিরাময়ী ও রঞ্জন গাছান্তের নিদর্শন, সেখানে ঠাই পাইছে অতি পরিচিত ভেরেণ্ডা গোটা, নয়ন তাঁরা ফুল ইত্যাদি। রেশমি পথের বনিকেরা যে সব সামগ্রী কেনাবেচা করত সুগন্ধ তার মধ্যে অন্যতম। এখানে আয়োজন করা হইছে পাঁচ পদের প্রাকৃতিক সুগন্ধ, যথা: গোলাপ তেল, জেসমিন তেল, মৃগনাভি তেল, ইত্যাদি প্রদর্শন।
৪.
সমরখন্দ – ব্যবসায়ীদের শহর। আজকের দিনের উজবেকিস্থানে অবস্থিত সমরখন্দ ছিল সে কালে সোগদিয়ান সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র। সোগদিয়ান বণিকেরা পারস্য, ভারতবর্ষ আর চীনে বাণিজ্য-যাত্রা করত। এই মহানগর আয়োজন করছিল সকল প্রকার বিলাসিতা আর বিনোদন সম্ভারের। শুধু তাই না, সমরখন্দ হইয়া উঠেছিল দূর সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ মিলন-কেন্দ্র। “আপনি কি সবচেয়ে উন্নত মানের রেশমি কিংখাব খুঁজতেছেন? একটা স্টাবল কোট, এক পোটলা মৃগনাভি সুবাস, অথবা এক রোল মসৃণ মাখন রঙা কাগজ? আপনি যা কিছু আকাঙ্ক্ষা করতে পারেন, সমরখন্দের একজন সোগদিয়ান বণিকের পক্ষে তা সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল। এই সব চৌকশ বণিকেরা দূর দূর দেশে কেনা-বেচার কারবারে তাদের সৌভাগ্য গইড়া তুলছিল। সোগদানেরা ছিল উচ্চাভিলাসী মধ্যস্থতাকারী, তারা চীন, ভারতবর্ষ ও পারস্যে বিস্তৃত বাণিজ্যিক যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করত – আর তাদের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল এই এখানে।” প্রদর্শনীর চতুর্থ কক্ষের প্রবেশপথের দেয়ালে এইভাবেই উপস্থাপিত হইছে ব্যবসায়ীদের নগরী সমরখন্দের পরিচয়। রূপকথা নগর সমরখন্দের সমীপে কোন ক্যারাভান আইসা পৌঁছা মাত্র তার দুয়ার খুইলা যাইত। সমরখন্দের আশপাশে আপনি এমন কোন শহর বা বিরতিস্থান, এমনকি মরুভূমিতেও, খুঁইজা পাইবেন না যেইখানে পথচারীর প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা সহ সুবিধাজনক পান্থশালা বা সরাইখানা ছিলনা। এই কক্ষে প্রবেশ পথের অপর দেয়ালে শোভিত হইছে আরব ভূগোলবিদ মুহাম্মদ ইবন হৌকল (৯২০-৯৮০)-এর বর্ণনা, “সমরখন্দের আশপাশে আপনি এমন কোন শহর বা বিরতিস্থান, এমনকি মরুভূমিতেও, খুঁইজা পাবেন না যেখানে পথচারীর প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা সহ সুবিধাজনক পান্থশালা বা সরাইখানা খুঁইজা পাওয়া যাবে না। আমি শুনছি যে সেখানে দুই হাজারেরও অধিক ক্যারাভানসেরাইস অথবা সরাই আছে, সে সব স্থানে যে কোন সময় যতজন লোকই আসুক না কেন তারা পর্যাপ্ত ভাবে পায় তাদের পশুদের জন্য খড় ও তাদের নিজেদের জন্য মাংস”।
তুরফান থিকা সমরখন্দের পথের বর্ণনায় বলা হইছে, “তাকলিমাকান মরুভূমির উত্তর প্রান্তপথ অনুসরণ কর। সূর্যের দাবদাহ এড়াইতে রাতের পথে চল, তিয়ান সান রেঞ্জের পাথুরে পার্বত্য পথে তোমাকে উঠতে হবে। সাবধান! স্তেপের কর্দমাক্ত পথে আর বরফগলা জলের নহরের আশপাশে লুকায়ে আছে ডাকাত দল। অতঃপর তুমি সবুজ ফেরঘানা উপত্যকায় পদার্পণ করবে। সুমিষ্ট ফলরাজি আর তাজা রুটি উপভোগ কর আর তোমার উটের ভোজনের জন্য আছে আলফালফা”।
এই কক্ষের মুখ্য উপস্থাপন চীনাদের কাগজ তৈরির পদ্ধতি, আমি যখন এখানে দাঁড়ায়ে চীনাদের কাগজ প্রস্তুত প্রণালীর উপস্থাপিত ধারাক্রম পর্যবেক্ষণ করতেছি এক ইতিহাস বা আর্টের মায়েস্ত্রা (শিক্ষিকা) তার এক দঙ্গল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী নিয়া ঐখানে হাজির হইল, পোলাপানের এক ধাক্কায় আমি ছিটকা পরলাম আমার পর্যবেক্ষণ মানস থিকা, বদলে মাস্টারনি আর তার এক দঙ্গল ছাত্রছাত্রীর পিছনে দাঁড়াইয়া মায়েস্ত্রার কথা অনুসরণের প্রয়াস পাইলাম, মায়েস্ত্রা সহজ সাবলীল ভাষায় কাগজ প্রস্তুত পরম্পরা ও চীন দেশে উদ্ভাবিত কাগজ প্রস্তুত পদ্ধতি কি কইরা সমরখন্দ হইয়া আলেক্সান্দ্রিয়া বন্দর পথে ইতালিতে আইসা পৌঁছাইল তার স্কেচি বর্ণনা দিল; মায়েস্ত্রার ২০/২২ জন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে মাত্র ৪/৫ জন তার কথা মনোযোগে শুনলা আর বাকিরা ছুটাছুটি চেঁচামেচিতে পরিবেশখানা গুলজার কইরা তুলল, মায়েস্ত্রা তার কথার ফাকে মাত্র ২/৩ বার ঠোঁটে আঙ্গুল তুইলা তার অনুসারীদের নিবৃত করার চেষ্টা করল বটে কিন্তু যাদের উদ্দেশ্যে করা তারা সে দিকে ভ্রূক্ষেপ করছে বইলা মনে হইল না। মায়েস্ত্রা চইলা গেলে দেখলাম, কাগজ প্রস্তুত প্রণালী উপস্থাপনের ভূমিকায় ‘কাগজ, কলম ও কালি’ শিরোনামে উল্লেখ করা হইছে, ‘রেশমি পথ ধইরা পূর্ব থিকা পশ্চিমে কাগজ ছড়ায়ে পড়ার সাথে সাথে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় পুস্তকাদি অনেক বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হইতে থাকল। চীনা শিল্পীরা বাঁকানো কাঠের তৈরি ব্লক ব্যবহারে কালি ছড়ানোর রীতি আয়ত্ত করছিল যা ব্যবহারে তারা দ্রুততম সময়ে সহস্র পৃষ্ঠা ছাপায়ে দিতে পারত। কাগজ যখন ইসলামী দুনিয়ায় আসল, সেখানে তখন পড়া ও লেখার প্রবল অনুরাগ বিকশিত হইল, আর ইসলামী মনীষা সংস্কৃতি, ভাষা ও বিজ্ঞান পাঠে অগ্রগামী হইল”।
৫.
চতুর্থ কক্ষে আরও প্রদর্শিত হইতেছে পাঁচশ থিকা ছয়শ শতকের নিদর্শন বহনকারী ইরান থিকা সংগ্রহ করা বিশেষ আকৃতির এক ধাতু নির্মিত বোতল, ধাতু নির্মিত উপবৃত্তাকার পেয়ালা, চৌদ্দ শ শতকীয় সিরিয় বা মিশরিয় তামার তৈরি তশতরি, এক খণ্ড রূপার আকর, সোগদিয়ান রূপার মুদ্রা, পার্সিয়ান রৌপ্য দিরহাম, বার শ শতকের হাতে লেখা কোরানের একটা পৃষ্ঠা, ‘গৌরব গাথা’ শিরোনামে উপস্থাপিত হইছে সোগদিয়ান বাড়ির দেয়াল চিত্রের অনুকৃতি যাতে রুস্তম গাথা বর্ণিত হইছে, এবং সোগদিয়ান নাচ সূইর্ল নাচের আসরের একটা চিত্র। সূইর্ল নাচ বিষয়ে সাতশ শতকের এক লেখক লিখছেন, “এই নাচের নড়াচড়া হাওয়া-কলের গতি সমতুল্য দ্রুতধি”। এই কক্ষে প্রদর্শিত হইতেছে দুইটা অতি পরিচিত গল্পের কার্টুন সিনেমা, একটা গল্প হইল সোনার ডিম দেয়া রাজহাঁস থিকা সব ডিম একসাথে পাইতে রাজহাঁসের পেট কর্তন, অপরটি সিংহকে খরগোশের বুদ্ধু বানিয়ে কুয়ায় ফালায়া দেওনের গল্প। গল্প দুইটা জানতাম এসপের গল্প হিসাবে, এখানে উল্লেখ করা হইছে রেশমি পথের গল্প বইলা। এ কক্ষে সর্বশেষ উপস্থাপন একটা স্থাপনা কর্ম যাতে উপস্থাপিত রেশমি পথের মানুষ, তাদের পোশাক-আশাক, ধর্ম-সংস্কৃতি ইত্যাদি। এটা একটা ইলেকট্রনিক মানচৈত্রিক উপস্থাপন।
২২/১২/২০১২
৬. রোমে আকবরনামা, বাবুরনামা, ও হামজানামা
রোমে এখন লা ফন্দাৎজিয়নে রোমা (রোম ফাউন্ডেশন)-র উদ্যোগে তাদের যাদুঘরে চলতেছে ‘আকবর: ভারতের সবচেয়ে মহৎ সম্রাট’ (Akbar: Il grande imperatore dell’India) শিরোনামে এক চিত্র প্রদর্শনী।
শুরু হইছে ২৩ অক্টোবর, চলবে ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ পর্যন্ত। প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য আকবরের জীবন ও সে সময়ের ভারতকে তুইলা ধরা। আয়োজকদের মতে ১৩০ টারও বেশী চিত্রকর্ম প্রদর্শনের মাধ্যমে সে চেষ্টা করা হইছে।
প্রদর্শনীর ক্যাটালগে আকবর(উমরকোট, ১৫৪২-আগ্রা, ১৬০৫)-কে উল্লেখ করা হইছে ‘one of the greatest sovereign in history’ হিসাবে। ফাউন্ডেশনের ভাষ্য মতে আকবর-কে নিয়া ইতালিতে এ ধরণের আয়োজন এই প্রথম।
প্রদর্শনীর অধিকাংশ চিত্রই আকবরনামা, বাবুরনামা ও হামজানামা-র। এছাড়াও সমসাময়িক অন্যান্য সংগ্রহের কিছু ছবিও আছে। আছ, মোগল মিনিয়েচার ও মিনিয়েচার স্টাইলে বিভিন্ন সাইজের জল রঙে আঁকা ছবি।
প্রদর্শনীতে ঋত্বিক রোশন ও ঐশ্বরিয়া রাই অভিনীত একটা সিনেমার অংশবিশেষও প্রদর্শন করা হয়। প্রতিটি কামরায় প্রদর্শিত চিত্রকলার সাথে সামঞ্জস্য বিধায়ক আকবর গাঁথা বর্ণিত হইছে ইতালীয় ও ইংরাজি ভাষায়।
প্রদর্শনীতে বাংলা প্রসঙ্গ আসছে কয়েকবার। আকবরনামার একটা ছবি ‘বাংলা বিজয়ের পর’ শিরোনামে প্রদর্শিত হইছে, ছবিটাতে দেখা যায় আকবর ও তার পরিষদবর্গ খোলা আকাশের নিচে এক অনাড়ম্বর পরিবেশে মোনাজাত করতেছে।
প্রদর্শিত হামজানামার ইলাসট্রেশন গুলা, জীব-জন্তু ও যুদ্ধের দৃশ্যে ঠাসা, আর অনেকক্ষণ ধইরা তাকায়া থাকার মত। অবশ্য এ কথা প্রদর্শিত প্রায় সকল ছবি প্রসঙ্গেই প্রাসঙ্গিক। এসব ছবি আঁকা হইছে গল্প বা গল্প-পুঞ্জি উপস্থাপন মানসে।
আমির হামজা-র কল্প-বীরত্ব গাঁথা নিয়া রচিত ‘হামজানামা’-র শেষ চিত্রটার উল্টা দিকে হামজানামার ত্রয়োদশ খণ্ডের ভূমিকা থিকা ইতালীয় ও ইংরাজি ভাষায় নিম্নোক্ত কবিতাংশ প্রদর্শিত হইছে:
“কবিতা হইল ভালবাসার অস্থাবর সম্পত্তির এক ভূমিকা;
কবিতা হইল ভালবাসার ভালবাসার ফল বাগানের প্রাণোদ্দীপ্ত চারা।
তুমি তোমার হৃদয় মাঝারে যে দ্যুতি খোঁজ তা কবিতা ছাড়া আর কিছু নয়;
আমি কি বলতেছি? আমি যাই বলি না কেন, এ আর কিছু নয় কিন্তু কবিতা”।
রোম, ২/১২/২০১৩
৭. হোয়াট ইজ ভদ্রলোক?
বাংলা উইকিপিডিয়া কইতাছে, ভদ্রলোক একটা শ্রেণী আর মানে ‘ভালো মানুষ’, ‘ভদ্র আচরণের ব্যক্তি’। এখন এই ‘ভালো মানুষ’, ‘ভদ্র আচরণ’ এসব প্রায় বায়বীয় ধারণা, আর পিছলা ব্যাপার। তাই ‘ভালো মানুষ’, ‘ভদ্র আচরণ’ দিয়া ভদ্রলোক ধরা যাবেনা, ভদ্রলোক ধরতে হাতে ছাই লাগাইতে হবে। এই ছাই অইল এইখানে সহায়ক নথিপত্র। আপাতত নথি হিসাবে উইকিপিডিয়া, এনসাইক্লোপিডিয়া, ইত্যাদির উপর ভরসা করলাম।
উইকিপিডিয়া আরও কইতাছে, ব্রিটিশ উপনিবেশ কালে গইড়া ওঠা ‘ভদ্র সম্প্রদায়’ অইল, ‘নতুন শ্রেণির বাঙালি’। সবই ইনভার্টেড কমার ভিতর। সবই প্রায় ধইরা নেয়ার বিষয়, এখনও ইনভার্টেড কমা মুক্ত না হইতে পারা এক জন সম্প্রদায়। প্রভু ব্রিটিশগর ‘জেন্টলম্যান’-এর সমার্থক উপহার এই ‘ভদ্রলোক’।
উইকিপিডিয়া আমগরে আরও কইতেছে যে, “ভদ্রলোক শ্রেণীর সদস্যরা সব্বাই না-হলেও বেশির ভাগই উচ্চবর্ণের হয় যেমন বৈদ্য, ব্রাহ্মণ, কায়স্থ এবং মাহিষ্য”।” “মোটের উপর উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণি গুলোর মধ্যে একজন জমিদার অথবা ভূস্বামী যারা সাধারণভাবে নামের শুরুতে বাবু ধারণ করতেন তাদের ভদ্রলোক হিসাবে মনে করা হত।” “আগেকার বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, মূলত বাংলা ও বিহারে ভূস্বামীদের মধ্যে একজন বাবু ছিলেন সাধারণভাবে ঠাকুর বা মির্জার সমপর্যায়ভুক্ত ও অত্যন্ত সম্পদশালী জমিদার এবং একজন রাজার নিচে তার অবস্থান ছিল।” “প্রথম শনাক্ত-যোগ্য ভদ্রলোকের প্রতীক নিঃসন্দেহে (রাজা) রামমোহন রায়, যিনি বাংলায় সুলতানি যুগের পারস্য আভিজাত্য এবং নতুন, পাশ্চাত্য-শিক্ষিত, নব্য ধনী সমৃদ্ধ শ্রেনীর মধ্যে ব্যবধান ঘুচিয়েছিলেন।”!
কালীপ্রসন্ন সিংহের “হুতোম প্যাঁচার নকশায়” উনিশ শতকী ভদ্রলোকদের পরিচয় বিস্তৃত আকারে বলা আছে। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, ইত্যাদি লেখকের লেখাতেও “হোয়াইট ইজ ইন্ডিয়ান ভদ্রলোক?” আছে।
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় প্রভু ব্রিটিশদের দেশে বাংলাদেশের ভৃত্য ভদ্রলোকদের পূর্বজ ‘জেন্টলম্যান’ বিষয়ে কওয়া অইছে যে এরা অভিজাতদের তুলনায় নিচু কিন্তু উৎপাদনশীল সাধারণ জনতার তুলনায় সামান্য উচ্চ পদমর্যাদা বা তকমা-ধারী, অনুগ্রহপ্রাপ্তদের, জেন্টলম্যান কওয়া অয়। এরা সরাসরি উৎপাদনের সাথে যুক্ত নয়। এরা মধ্য-স্বত্বভোগী দালাল ও উমেদার। বাংলা উইকিপিডিয়া মতে ‘ভদ্রলোক’-ও তাই।
ইংরাজি উইকিপিডিয়া ‘জেন্টলম্যান’ বা ‘ভদ্রলোক’ দের একটা ডেফিনেশন কইতাছে, যে পুরুষেরা প্রকাশ্যে নারীদের সাথে জেন্টলি বা ভদ্র আচরণ করে তাগরে জেন্টলম্যান কওয়া অয়!
তো বাংলাদেশের ভদ্রলোকদের খবর কী?
দেখলাম বাংলা উইকিপিডিয়াতে বাংলাদেশের ‘ভদ্রলোক’-দের বিষয়ে কিছু লেখে নাই। তাইলে কী বাংলাদেশে ভদ্রলোক বা ভদ্রলোক সমাজ নাই! ঘাবড়ানোর কিছু নাই, অবশ্যই বাংলাদেশে ভদ্রলোক ও ভদ্রলোক সমাজ আছে। বাংলাদেশ যেহেতু কখনোই ব্রিটিশ হেরিটেজ ও ব্যবস্থাকে অসম্মান বা অস্বীকার করে নাই তাই এখানে ভদ্রলোক ও ভদ্রলোক সমাজ বহাল তবিয়তেই আছে। কিন্তু প্রশ্ন অইল, বাংলাদেশের ভদ্রলোকরা তবিয়ত বহাল রাখতে বা ভদ্রলোকী সমাজে নতুন তবিয়ত পাইতে কার তাঁবেদারি, উমেদারি ও দালালি করে!
নাও, ইট ইজ এ বিগ কোশ্চেন দ্যাট বাংলাদেশের ভদ্রলোকেরা এখন কাগর গোলামী চাটামি করে!
রোম, ১৯/৪/২০২৪
![]()
1 Comment
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.
Drako Shajib
রোম নিয়ে বেশ রোমাঞ্চ অনুভব করছি ! বিশেষ করে রেশমি পথের অভিজ্ঞতা পড়ে খুব ভালো লাগলো !