কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় জন্ম শতবার্ষিকী – ১৩
আমরা ছুটে চলেছি নির্দিষ্ট একটা গন্তব্যে। সুভাষের যে কান ঠোসা আমি বসেছি সেই পাশে তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও কথা বলা হচ্ছে না। সুভাষও চুপ সম্ভবত গীতার ভয়ে, দেরী করে বাড়ী ফেরার জন্য। ট্যাক্সির জানালা দিয়ে রাতের কোলকাতা বলে তেমন কিছুই চোখে পড়ছেনা। রাত আর কালো মেঘ যেন এক সঙ্গে কোলকাতাকে জাপটে ধরেছে। এত বড় নামী শহরে নেই কোন রাতের ঝলমল। হরেক রকম গতিতে ছুটছে সবাই। মনে হচ্ছে এই বুঝি একটা আরেকটাকে সজোরে ধাক্কা মেরে দেবে। তবে ধাক্কা দিলে কি হবে, যে ট্যাক্সির মধ্যে বসে আছি সেটায় ধাক্কা দিলেও কিছু হবে না সেটা নিশ্চিত। ভাবলাম ইন্ডিয়ানরা সম্ভবত পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য ট্যাঙ্কের বদলে ট্যাক্সি বানিয়েছে।
সুভাষদা নিরবতা ভেঙে বললো, সোহেল আমরা এখন দক্ষিণ কোলকাতা যাচ্ছি। ভাবখানা যেন উনি আমার ট্যুরিস্ট গাইড। এতক্ষণ ঝিমুচ্ছিলেন হঠাৎ মনে হয়েছে তার পেশাদারিত্ব। আমি কোন উত্তর দিলাম না, ভাবলাম কোলকাতার উত্তর দক্ষিণ দিয়ে আমি কি কচুঘন্ট করবো? এখানে কি আমি জমির প্লট কিনবো? আমি তো এখানে এসেছি শুধু কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সাথে দেখা করতে। কিন্তু বুড়োটা আমাকে গীতার লোভ দেখিয়ে ঝুলিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। আরে বুড়োভাম, তুই গীতা সম্পর্কে কিছু বল। গীতা কি তোর বউ না কন্যা সেটাও তো বলছিস না। আমি যেচে যেচে জিজ্ঞাসা করতে পারি? আচ্ছা কেমন দেখতে হবে গীতা! সকালে যে নারীকন্ঠ শুনেছিলাম টেলিফোনে সেই কি গীতা? আমি সেই কন্ঠ দিয়ে একটা নারীমূর্তি আঁকছি আর নিজের আচরণ কি হওয়া উচিৎ সেটার রিহার্সাল করছি মনে মনে।
এমন সময় আমাদের ট্যাক্সিটা কড়া ব্রেক কষে থেমে গেল। অন্যরাও দেখলাম থেমে আছে। ডং ডং করে একটা শব্দ এগিয়ে আসছে। ভাবলাম হয়তো কোথাও আগুণ ধরেছে। দমকলের গাড়ি যাচ্ছে, কিন্তু না ঘটমট করে একটা ময়লা ট্রেন রাস্তাকে দুভাগ করে হেলতে দুলতে বেড়িয়ে গেল। রেল লাইনটা দেখতে মাথা উঁচু করেও যুদ্ধযান ট্যাক্সি প্রযুক্তি থেকে সেটা দেখা গেল না। আঁতকে উঠলাম এখানে একটা রেলগেট নেই কেন! আমার নড়েচড়ে ওঠার জন্য সুভাষদা ঘাড় বাঁকা করে আমার দিকে তাকালেন। আমি বললাম এখানে একটা রেলগেট নেই কেন? এক্সিডেন্ট হয় না? সুভাষদা অবাক হয়ে বললেন রেলগেট কেন? এখানে তো কোন রেললাইন নেই। আমি বললাম, কেন ঐ যে ট্রেন চলে গেল ! সুভাষদা হেঁ হেঁ হেঁ করে হেসে হেসে বললেন সোহেল, তুমি বুঝি ট্রাম দেখনি কখনো! সেই যে ট্রামের চাকায় পৃষ্ঠ হয়ে জীবনান্দের মৃত্য হয়েছিল, সেটা শোননি কখনো? আসলে তখনো যে সব শহর দিয়ে আমি ছুটোছুটি করছিলাম সে সব জায়গায় ট্রাম সার্ভিস ছিলোনা। প্রাণ ভরে ট্রাম দেখেছিলাম আর চড়েছিলাম ইতালির মিলান শহরে সেটা কোলকাতা ভ্রমণের অনেক পরে। লজ্জিত হয়ে বললাম, না সুভাষদা ট্রাম দেখিনি এর আগে। সুভাষ কোলকাতার ট্রাম কোম্পানী নিয়ে একটা ইতিহাসের আসর খুলে বসলেন আর সেই আসর শেষ না হতেই ট্যাক্সির ড্রাইভারকে বললেন, এবার ডান দিকে হ্যাঁ হ্যাঁ এবার সোজা। ঐ ঠ্যালাগাড়িটার পাশে রাখুন, আমরা এসে গেছি। ট্যাক্সির ভাড়া দিতে দিতে ভাবছিলাম, কি করে ট্রাম আর গাড়ি-ঘোড়ার সহযাত্রা চলে এই কোলকাতায়, সেটা স্বচক্ষে দিনের বেলায় দেখতে হবে।
আমরা একটা সরু গলিতে ঢুকলাম। কয়েক পা এগোতেই খোলা একটা জানালার শিক ধরে নৃত্যরত দু’টো শিশু ছন্দে ছন্দে চিৎকার করে উঠলো, দাদু এচেচে, দাদু এচেচে। অপেক্ষাকৃত বড়টা তার শীর্ণকায় লম্বা পা দুটো জানালার গারদের ফাঁকে বের করে দিচ্ছে কিন্তু ফুটফুটে ছোট শিশুটা সেটা করার আপ্রাণ চেষ্টা করেও পারছেনা। আমরা কাছে আসতেই দরজা খুলে গেল। সুভাষদার হাত থেকে সবকিছু বুঝে নিয়ে বকবক শুরু করলো এক অল্প বয়সী মহিলা। এত দেরি করে ফিরলে? তোমার আর কান্ডজ্ঞান হবে না। বাড়ীতে একটা ফোন করে জানাতে পারতে না? মা ক্ষেপে আছে। বুঝলাম মাথায় সিঁদুর মাখা ইনি কবিকন্যা। সুভাষদা মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলেন প্রদ্যুত আসেনি? বাবা আমাদের রেখে গেছে আবার নিতে আসবে, বড় শিশুটি দাদুকে উত্তর দিলো। শিশুর কথার ওভার ল্যাপিং করে কবি কন্যা বললেন, সিটানকে নিয়ে আর পারা গেল বাপু! এত করে বললাম বাবা এখনো ফেরেনি তুমি একটু অপেক্ষা করো, তা শুনলো না। ততক্ষণে শিশু দুটো প্রতিক্ষণের টিফিনের প্যাকেটে হামলা চালালো। কবি কন্যা বাঁধা দিয়ে বললো, না তোদের নিয়ে আর পারা গেল না ছাড় না বাবা। কবি মেয়েকে বললেন দে না ওদেরকে দে ; ওদের জন্যই এনেছি। আমি ভাবলাম কবি বিড়ালদের জন্য প্যাকেট দুটো এনে নাতনিদের দিচ্ছে। দারুণ দুষ্ট তো বুড়োটা।
ততক্ষণে দরজার মুখে ভেতর থেকে অভিজাত এক ফর্সা রমনি এসে হাজির। চশমা চোখে সেজেগুজে সিঁদুর বিহীন কপাল নিয়ে বোকা বোকা ভাবে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, সুভাষ ঝড়ের গতিতে গীতা শোন শোন বলে তাকে প্রায় টেনে হিচড়ে সরু করিডোরটায় নিয়ে গেল। পকেট থেকে সেই ছোকরাদের দেয়া টাকাটা হাতে গুঁজে দিয়ে চাপাস্বরে বললো মাত্র দু’শো টাকা দিয়েছে। কিন্তু সেই চাপা কন্ঠের শব্দ তরঙ্গ আমার কর্ণ স্পর্শ করলো। আমি সুভাষকে অনুসরণ করছিলাম বলে গীতার সঙ্গে আমার চোখাচোখি হলো। সুভাষের কান্ডে গীতা বিরক্তি প্রকাশ করলো। আমিও আর না এগিয়ে পিছিয়ে এলাম, গীতা লজ্জা পাবে ভেবে। মদের থলেটা বসার ঘরের বিছানায় রেখে দিলাম। বোতলে বোতলে একটা ঠোকাঠুকির আওয়াজ হলো। বাচ্চা দুটো টিফিন প্যাকেটগুলো নিয়ে করিডোর দিয়ে দৌড় মারলো। কোথা থেকে যেন দুটো বিড়াল লাফ দিয়ে এসে মিউ মিউ করতে করতে লেজ উঁচিয়ে ওদের পিছু নিলো। এবার ছোট্ট ঘরখানি ফাঁকা হয়ে গেল। কবি কন্যা আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি বুঝি বাংলাদেশ থেকে এসেচো? তোমার নাম সোহেল? আমি বললাম, নমস্কার! জ্বী আমি সোহেল। বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বাবার সঙ্গে সারাদিন কি করলে ? মা বললেন তোমাদের নাকি দুপুরে এখানে খাবার কথা, তোমাদের জন্য রান্না করে বসে আচে। কবি কন্যার এসব উত্তর না দিয়ে সেই ছোট্ট ঘরটার উত্তর দক্ষিণ খুঁজতে শুরু করলাম। তাকিয়ে তাকিয়ে সবকিছু দেখার ভান করছি যেন দেয়ালে মোনালিসার পেইন্টিং ঝোলানো আছে। আমাকে বসতে বলে কবিকন্যা ভেতরে চলে গেল। কবি কন্যার কন্ঠ শুনে মনে হলো মুখের মধ্যে একটা মার্বেল চুষতে চুষতে আমার সঙ্গে কথা বলছে। রহস্যময় আদুরে কন্ঠস্বর।
কোথায় বসবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। এমন সময় করিডোর দিয়ে এক অপূর্ব সুন্দরী কিশোরী এসে হাজির। বললো মা তোমাকে হাত-মুখ ধুয়ে নিতে বললো, এসো। আমি তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছি। দেখে মনে হচ্ছে, না খেয়ে খেয়ে ডায়েটিং করা এক অপূর্ব মডেল কন্যা। আমার দিকে মাত্রাবৃত্তের কয়েকটা হাসি ছুড়ে দিয়ে আবারো বললো এসো এসো। শুভ্র দন্ত বিকশিত সেই হাসি আমাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে রাখলো। ঘোর কাটিয়ে বললাম না, আমার হাত-মুখ ধুতে হবে না। হোটেল থেকে ধুয়ে এসেছি। কিশোরী তবুও ছাড়ার পাত্র না। বললো কোলকাতায় যা ধুলোবালি, আসো হাতমুখ ধুয়ে নাও। ঠান্ডা জল আছে, হাত-মুখ ধুয়ে নাও। আবার সেই হাসি। সুভাষ এসে আমাকে উদ্ধার করলো। ততক্ষণে সুভাষ স্নান সেরে ফেলেছে। চুল থেকে পানি ঝরে পড়ছে। একটা ফতুয়া পড়ে মাথা মুছতে মুছতে ইজি চেয়ারটায় বসে পড়লো। হাতের তোয়ালে কাম গামছাটা কিশোরীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো, যা তো পাপু এটা রেখে আয়। সোহেলকে জোড় করছিস কেন ওর হাত-মুখ ধোয়া লাগবে না, গীতাকে আসতে বল। পাপু নামের কিশোরীটি আবার দুটো হাসি উড়িয়ে ভেতরে চলে গেল।
সুভাষ একটা বিড়ি ধরালো, আমাকে জিজ্ঞাসা করলো চুরুট খাবে সোহেল? আমার কাছে আছে, এক সাহেব এসেছিলো দিয়ে গেছে। চুরুটের টিনের কৌটাটা আমার দিকে মেলে ধরলো। আমার অনাগ্রহে তিনি তা আবার গুটিয়ে রাখলেন আর বললেন ঠিক বলেছো, আমাদের আবহাওয়ায় চুরুট চলে না। ঠান্ডা দেশে ভালই লাগে, রাশিয়াতে চুরুট টানতাম। কিউবার চুরুট! জানো তো পৃথিবীর সেরা চুরুট। তুমি ফিদেল ক্যাস্ট্রোর নাম শুনেছো? আমি বললাম শুনবো না কেন? এমনভাবে বললাম যেন ফিদেল ক্যাস্ট্রো আমার চাচাতো ভাই। সুভাষ প্রসঙ্গ সরিয়ে আমাকে এবার একটা পাতার বিড়ি অফার করলো। এটা আমাদের দেশের চুরুট, টেন্ডুপাতার বিড়ি। তোমাদের ওখানে তো কাগজের বিড়ি। তুমি যখন আবার আসবে, বাংলাদেশ থেকে আমার জন্য কাগজের বিড়ি নিয়ে আসবে। আমি টেন্ডুপাতার বিড়িটা নিয়ে ধরানোর চেষ্টা করছি। সুভাষদা বললেন, এদিকে এসো আমি ধরিয়ে দিই। তিনি লাইটার জ্বেলে আমার বিড়িটা ধরিয়ে দিলেন আর বললেন বিড়ি খাওয়ার কায়দা লাগে। আমি শ্রমিক আন্দোলন করতাম একসময়। ওদেরকে খুশি রাখতে বিড়ি খাওয়া শিখতে হয়েছিল হেঁ হেঁ হেঁ….। ইতমধ্যে গীতার পুনঃআর্বিভাব ঘটেছে। ঘরে ঢুকেই গীতা রা রা করে উঠলো। সুভাষকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলো, তুমি আসতে না আসতেই ওকে বিড়ি ধরিলে দিলে! তোমার এই হ্যাংলামো আর গেলো না। আমি বিড়িটা এ্যাসট্রেটে রেখে গীতাকে নমস্কার জানিয়ে বিদেশি বোতলের প্যাকেটটা এগিয়ে দিলাম। গীতা অবাক হয়ে উপহারটা গ্রহন করে আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো। সুভাষ গীতাকে বললো, সোহেল ওটা তোমার জন্য এনেছে। ও এখনো ইন্ডিয়ান মদ খেতে পারছে না। তুমি আর সোহেল ওটা খাও, আমার জন্য রাম এনেছে। সুভাষের এসব কথায় গীতার কোন ভাবান্তর ঘটলো না। সব কিছু যেন গীতার মন মত হচ্ছে না। না বিরক্ত না খুশি এমন একটা ভাব নিয়ে পাপুকে ডেকে ফ্রিজ থেকে বরফ বের করতে বললেন।
পুঁপে বিনা আদেশেই তিনটে গ্লাস নিয়ে হাজির। গীতা পুঁপেকে তিনটে গ্লাস আনায় ফোড়ং কেটে বললো, তিনটে গ্লাস আনলে যে! তুমি খাবে না? মুখের মধ্যে সেই মার্বেল নিয়েই পুঁপে বললো সকালে স্কুল আছে আজ বেশি খেতে পারবো না। সিটানটা যে কি এখনো এলো না। কোথাও নিশ্চয় গিলছে, ওকে নিয়ে আর পারিনা, বলে আর একটা গ্লাস নিয়ে এলো ভেতর থেকে। গীতাদীও ভেতরে গেলেন। আমি পরিত্যক্ত বিড়িটা তুলে আবার টান দিলাম কিন্তু ততক্ষণে বিড়ির আগুণ নিভে গেছে। সুভাষদা হেঁ হেঁ করে হেসে বললেন সোহেল, সিগারেটের মত বিড়ি এ্যাস্ট্রেতে রেখে খাওয়া যায় না। শ্রমিকদের কোন এ্যাস্ট্রে থাকে না হেঁ হেঁ হেঁ……..
বাচ্চা দু’টো এর মধ্যে কয়েক পাক এঘর ওঘর ছুটে বেড়ালো। বিড়াল দু’টোও ওদের অনুসরণ করছে যথারীতি। ছুটোছুটির ফাঁকে ছোট শিশুটা সুভাষদার গায়ে গা ঘষে যাচ্ছে। সুভাষদাও ওর সঙ্গে আদর বিনিময় করছেন আর কি যেন লেখা শুরু করলেন তিনি।
বরফ, সালাদ, বাদাম, সবকিছু এসে ঘরের মধ্যে আদর্শ মদ্যপানের পরিবেশ তৈরি করে ফেললো। মনে হলো আমরা যেন কোন রাষ্ট্রদূতের বাসায় ফরমাল ড্রিঙ্কসের আসরে। পাপুর আসা যাওয়ার ছন্দে ছন্দে বিজ্ঞাপনের হাসিটা যেন শেষই হলো না।
Page top featured image by:
Abhijit Kar Gupta from Kolkata, India, CC BY 2.0 <https://creativecommons.org/licenses/by/2.0>, via Wikimedia Commons
![]()
2 Comments
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.
Drako Shajib
কলকাতার সুন্দর ঘরোয়া সন্ধ্যার আয়োজন। লেখা থেকে ছবি তৈরী করে নিতে বেশ সুবিধা হয়েছে। খুব সুন্দর।
Neel tripura
দারুণ অভিজ্ঞতা।