মেট্রোর জানালায়

মেট্রোর জানালায়

মেট্রোর জানালায়

তোমাকে প্রথম দেখি মেট্রোর জানালায়
দুর্বিনীত চোখে , শ্যাওলা রঙের পোশাকে
টি.এস.সির স্টেশনে নেমে গেলে
এক ঝাঁক শ্বেত পায়রা
গোলাপী বোতাম পকেটে
এখানে সেখানে ধুতরা ফুল
রাজনীতির অন্ধ অলি গলি
নাগরিক ত্রিভুজ আয়নায়
শেলবিদ্ধ তরুণ যুবক
হাতে মেনিফেস্টো
চিন্তাগুলো সব গোলমাল হয়ে গেল
উপরে থেকে চাপানো আচকান
ভেতর থেকে নিষিদ্ধ বুলেট
এমন অস্থির সময়ে
একটা পাথর এসে ভেঙে দিল
সবুজ কাচে ঢাকা মসৃন পথ ।

মন খারাপ

তোমার মন খারাপের কি শেষ আছে ?
দরজা-জানালায় লেহার কপাট
একটা গুলি এসে ফ্রিজ হয়ে গেল
মেট্রোর জানালায়
বিহারি পল্লীর গলি-খুপচিতে
আশুরার মাতম
তেহারির ঝাঁঝালো গন্ধ
সরিষার তেলে ভাজা মুরগীর ঠ্যাং
সারি সারি স্ট্রিট ফুড
বিচ্ছিন্ন গুলির শব্দ
জানালায় দূরবীন চোখ
তোমার মন খারাপের কি শেষ আছে ?
ঝুল বারান্দায় মধুমঞ্জুরি
ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ভোরের আকাশ
বিষণ্ণ সবুজ পত্র
তোমার মন খারাপের কি শেষ আছে ?
একটা ভো চিৎকার দিয়ে
কোন পাতালে ?
তোমার মন খারাপের কি শেষ আছে?
ম্যাজেন্টা দুপুর
ধূসর বিকাল

পিত রঙের হুক

তোমার ছায়া ঝুলে আছে
পিত রঙের হুকে
ভেতরের কল-কব্জা,সুতোয় বাঁধা নাটাই
জল-তরঙ্গে উড্ডীয়মান
একালে সিনথেটিক গৃহসজ্জা
জানালায় উড়ছে রেশমি ঝালর
রেস্তোরাঁর প্রবেশপথে ডিজিটাল অভ্যর্থনা
সারা ঘরজুড়ে মেঘের আনাগোনা
আয়রন করা চুলের খোপায়
একগুচ্ছ রঙ্গন
বাতাসের গতি এখানে দ্বন্দ্ব মুখর
মানুষের মনে অবিশ্বাস-সন্দেহের দোলাচল
স্রোত কেটে কেটে মাঝ-দরিয়ায়
এপারে নীল আসমান
ওপারে কাঁটাঝোপ পাতাঝাজি
সাঁতরে পার হও পুলসিরাত
রাত তবু কাটেনাতো
বাদবাকি শখের গোসল
কফিনে গাঁথা গোলাপের ঝাড়
চোখে নির্ঘুম রাত্রি

অভিশাপ

হৃদয়ের একূল -ওকূল দুকূল ভেসে যায়
কারফিউর দমবন্ধ ঘরে
একদিন , দু-দিন , তিনদিন
বারান্দায় মানি প্ল্যান্ট , পুদিনা পাতা
টেলিবার্তায় অগ্নিদগ্ধ গাড়ির সারি
পতাকায় ঢাকা তরুণের লাশ
আমরা পুড়িয়ে দিয়েছি আদিপুস্তক
গীতা রামায়ণ,ওল্ড টেস্টামেন্ট
সকল আসমানি কিতাব
নমরুদের অভিশাপে লণ্ডভণ্ড বদ্ধভূমি
কোন পাতালে চলেছে স্বদেশ ?
মরুভূমির আভায় ঢেকে গেছে
লাল-সবুজ মানচিত্র
কোন কুটিল অঙ্কে
আঁকা হলো আজকের সকাল
অগ্নি-নির্বাপণ গাড়ি পুড়ছে
শহরে পানির আকাল
কোথাও কি কোনো ভুল রয়ে গেল ?
শুরুতেই নষ্টবীজ
সাত রাস্তার মাথায় টাঙ্গানো মনুষ্য-কঙ্কাল
শ্রাবণ সন্ধ্যায়
নিজেরাই খুঁড়ছি নিজের কবর

স্বপ্নের মীনজাতক

আমাদের কালে চাঁদপুর ছিল
রুপালি ইলিশ জলের তরঙ্গ
বর্ষার মেরুন সকালে
শত শত মীনজাতক ভেসে যেত ত্রিমোহনায়
তখনো বায়স্কোপের বাকশে দেখা যেত কারবালার প্রান্তর
হায় হাসান, হায় হোসেন
শাপলার বিলে নীল পদ্ম
ব্যাঙমা-ব্যাঙমীর গোপন কোটর
আমাদের কালে কাজল রেখা ছিল
সুঁই রাজপুত্রের মধুর ভুল
আকাশে তেত্রিশ কোটি দেবতা
দুর্গার বাহন সোনালী সিংহ
একটা টানা রাস্তা ধরে হেঁটে চলা
একটা কাঠের সেতু পেরিয়ে স্বপ্নের বাড়ি
আমাদের কালে স্বপ্ন ছিল ছত্রিশ রকম
গোলাপী আভা মেশানো বাদামের সরবত
পরী, বেহুলার লোহার ঘর
আমাদের কালে অগাধ জল ছিল ডুব সাঁতারের

নীল সাগর ছিল ভেসে যাবার
স্বপ্নের মেঘদূত ফিরে আসার

Loading

জন্ম ২০ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫, মাদারীপুর শহরে নানাবাড়িতে। শৈশব হতেই ঢাকায় বেড়ে ওঠা। তিনি নৃবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা হতে। লিটল ম্যাগাজিনে লেখা শুরু করেছেন ২০০০ সালের পর থেকে। বিশেষত কবিতা, গল্প ও নৃবৈজ্ঞানিক লেখালেখি করেন। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: হারানো দোকান এল দরাদো (জনান্তিক, ফেব্রুয়ারি, ২০০৯), একজন আঙুল শুধু হেঁটে বেড়ায় (সংবেদ, ফেব্রুয়ারি, ২০১০) আর কারনেশন ফুটলো থরে থরে ( শুদ্ধস্বর ২০১৩), একটু একটু করে বোবা হয়ে যাচ্ছ তুমি (অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ফেব্রুয়ারী, ২০১৫), বারুদ লোবানের গন্ধ (চৈতন্য, ফেব্রুয়ারি ২০১৭), জলে ডোবা চাঁদ (ঐহিক প্রকাশনী, কলকাতা, জানুয়ারী ২০২০)। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ :পেন্ডুলাম ও শিশুর দোলনা (শুদ্ধস্বর, ফেব্রুয়ারি ২০১১), জৌলুসী বেওয়া (দেশ পাবলিকেশন্স, ২০১৬) উপন্যাস : অন্তর্গত করবী (দেশ পাবলিকেশন্স, ফেব্রুয়ারী ২০২১), কেউ জানতে চায় নি (দেশ পাবলিকেশন্স, ফেব্রুয়ারী ২০২২ )। । এছাড়া পিয়াস মজিদের সাথে যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন নির্বাচিত কবিতা: শামীম কবীর (অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ফেব্রুয়ারি, ২০১০)। তিনি কিছুদিন নৃবিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে গবেষণা কাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। লিটল ম্যাগাজিন, ওয়েব ম্যাগাজিন, জার্নাল ও দৈনিক পত্রিকায় লেখেন।

1 Comment

  1. পাঁকা কবিতা গুলো এই জন্যই ভাললাগে বেশি। সংগতি পূর্ণ আর পড়ে আরাম, রূপকের আকাশ কুসুম আধিক্য থাকেনা, অনুপ্রেরণা দেয় আরো পড়তে আর লিখতে।

Leave a Reply

Skip to toolbar