টাকা নিয়ে সরস আলাপ
অর্থ (Money) কি? অর্থ হলো অপরের কাছ থেকে কোন দ্রব্য বা সেবার পাওয়ার সক্ষমতা। এটা কেন যথার্থ সংজ্ঞায়ন তা আমি আমার বইয়ে প্রমাণ সহ প্রস্তাব করেছি। এই সংজ্ঞায়নের সুবিধা হলও যে এ সংজ্ঞাটি যেগুলোকে আমরা প্রচলিত ভাষায় অর্থ বলে চিহ্নিত করি যেমন, টাকা, ডলার, পাউন্ড, স্বর্ণ, স্বর্ণমুদ্রা, কড়ি ইত্যাদিকে বাতিল করে না। বরং এগুলোকে অর্থের নানা ফর্ম হিসাবে দেখে যা ইতিহাসের নানা পর্যায়ে আবির্ভূত হয়েছে। তাই আমরা যদি অর্থ শাস্ত্রের প্রচলিত বিদ্যা অনুসারে শুধু মাত্র টাকা, ডলার ইত্যাদিকে নিয়ে আলোচনা করতে চাই, তা করতে পারি। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে টাকা, ডলার ইত্যাদির বাইরেও অর্থ (Money) অস্তিত্বশীল। তাই শুধু টাকা, ডলার ইত্যাদিকে নিয়েকে আলোচনা একটি আংশিক ও অসম্পূর্ণ আলোচনা। এবার অর্থ পাচারের প্রসঙ্গে আসি, যা পত্র পত্রিকাতে প্রায়ই দেখতে পাওয়া যায়। আমি বণিকবার্তাতে এ নিয়ে প্রায় বছর তিনেক আগে লিখে ছিলাম যার লিঙ্ক পূর্বের পোস্টে শেয়ার করেছি। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে এর কোন প্রভাব অর্থনীতি বিষয়ক সংবাদ গুলোতে দেখিনি। পরের আলাপে যাওয়ার আগে নাসিরুদ্দিন হোজ্জার একটা গল্প শেয়ার করবো। হোজ্জা একবার এক কেজি (উদাহরণ সরূপ) ওজনের মাংস কিনে বাসায় এসে স্ত্রীকে বললেন রান্না করতে। বলে তিনি বাইরে কোথাও আবার চলে গেলেন। স্ত্রী রান্নার ফাকে ফাকে মাংস কেমন হয়েছে অল্প অল্প করে চেখে দেখতে লাগলেন। এরকম করতে করতে তিনি সবটুকু মাংস খেয়ে ফেললেন। হোজ্জা কিছুক্ষণ পরে বাসায় ফিরে আসলেন। খেতে বসলেন। কিন্তু বসে দেখলেন যে কোন মাংস নেই। স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করতে তিনি বললেন যে বিড়াল সব মাংস খেয়ে ফেলেছে। হোজ্জা তার বিড়ালকে ধরে ওজন করে দেখলেন। দেখলেন যে বিড়ালটার ওজন এক কেজি। এদিকে মাংসও ছিলো এক কেজি ওজনের। তাই হোজ্জা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন যদি এটা বিড়াল হয় তবে মাংস কই আর যদি এটা মাংস হয় তবে বিড়ালটা কই? হোজ্জার গল্পে নানা রকম ব্যাখ্যার উপাদান থাকে। আমার কাছে গল্পটা গোলমেলে যুক্তির একটা দুর্দান্ত উদাহরণ। যেহেতু মাংস ও বিড়াল উভয়ের ওজন এক কেজি, তাই মাংস ও বিড়াল দুইয়ে মিলে এক কেজি হতে পারে না। মানে মাংস ও বিড়াল এক জায়গাতে (মানে বিড়ালের পেটে) আছে, একটা গোলমেলে যুক্তি। অর্থ এবং অর্থনীতি বিষয়ক আলাপগুলো এরকম গোলমেলে যুক্তিতে ভরপুর। তাই অর্থ নিয়ে পরের পোস্টগুলো শুরু করার আগে পাঠককে নিজেদের গোলমেলে যুক্তি বা অবস্থান গুলো পরিহার করতে বলবো। যদি কোন বিপরীত যুক্তি বা উদাহরণ দিতে পারেন অবশ্যই আমি তা গ্রহণ করবো কিন্তু যদি না পারেন তবে আমি যা বলছি তা গ্রহণ করবেন অথবা নিজের মত সম্পর্কে সংশয় করবেন এমন প্রত্যাশা থাকবে।
২
‘টাকা’, মানে বাংলাদেশ যে মুদ্রা ক্রয় বিক্রয়ের জন্য ব্যবহার করা হয় তার উৎস মাত্র দুটি। একটা হলো বাংলাদেশ সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক। অপরটি হলো বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এর বাইরে কোন উৎস থেকে টাকার আগমন ঘটে না ও নতুন টাকার সৃষ্টি হয় না। টাকার দুই প্রকারের রূপ আছে। একটি হলো প্রকাশ্য রূপ। যেমন কাগজের নোট, ধাতব পয়সা। কিন্তু বেশির ভাগ টাকা আছে খাতা বা ইলেক্ট্রনিক হিসাবের রূপে ব্যাংক একাউন্টগুলোতে। ব্যাংক একাউন্টের বাইরের এই টাকার কোন অস্তিত্ব নেই। এবার ভেবে দেখুন যে টাকার ব্যবহার কোথায় হয়? একমাত্র বাংলাদেশে। তাহলে বাংলাদেশ থেকে কেন বাইরে টাকা নিয়ে যাওয়া হবে। পকেটে করে কেউ কিছু পরিমাণ এদিক সেদিক নিয়ে যেতে পারেন কিন্তু সে টাকার দেশের বাইরে কোন ক্রয় ক্ষমতা নেই। তাহলে কেন লোকে দেশের বাইরে টাকা নিয়ে যাবে? আর বিদেশের ব্যাংকগুলোতেও সে টাকা থাকবে কিভাবে? প্রত্যেক দেশের যে মুদ্রা সেই মুদ্রাতেই তো একাউন্টগুলো পরিচালিত হয়? কিছু ব্যাংক হয়তো ডলারে একাউন্ট করতে দেয় কিন্তু বিদেশী মুদ্রাতে একাউন্ট খোলার সুযোগ খুবই সীমিত। আর টাকার মতো একটা মুদ্রাতে বিদেশের কোন ব্যাংকে একাউন্ট খোলা যাবে? তাই পত্র পত্রিকাতে যখন বিদেশে ‘টাকা’ পাচারের কথা লেখা হয়, আমি একেবারেই যুক্তি মেলাতে পারি না। টাকা লুট হতে পারে, ঋণের খেলাপ হতে পারে, এক ব্যাংক থেকে আরেক ব্যাংকে টাকা সরানো হতে পারে। কিন্তু ‘টাকা’ কেন ও কিভাবে ‘পাচার’ হবে ? আমার সাংবাদিক বন্ধুরা হয়তো আলাদা কোন ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। তবে আমার অবস্থা হয় হোজ্জার মতো। কোনটা বিড়াল আর কোনটা মাংস বুঝে উঠতে পারি না।
৩
অর্থ যে আসলে কোন কিছু পাওয়ার সক্ষমতা (বাজারের ক্ষেত্রে ক্রয়ক্ষমতা) তা একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করবো। এই উদাহরণটা আমার বই (Money and Inflation) এবং বণিকবার্তাতে প্রকাশিত লেখাটাতে ব্যবহার করা হয়েছে। ধরা যাক আমি দেশে রেমিটেন্স পাঠাতে চাই। আমি যুক্তরাজ্যে থাকি, এখানে আয় করি পাউন্ডে। ধরা যাক, আমার ব্যাংক হিসাব থেকে ৫০০ পাউন্ড নিয়ে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নকে বললাম সমমূল্যের টাকা বাংলাদেশে পাঠাতে। লক্ষ করুন যে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নকে দিয়েছি পাউন্ড কিন্তু বাংলাদেশের প্রাপক পাচ্ছে টাকা। কাজেই আমার পাউন্ড কিন্তু বাংলাদেশে গেলো না। আসলে আমি ৫০০ পাউন্ডের সমতুল্য ক্রয়ক্ষমতা পরিত্যাগ করলাম ও তা বাংলাদেশে আমার প্রাপককে দিলাম। তাই আসলে হলো ক্রয়ক্ষমতা বা বাজার থেকে কোন কিছু পাওয়ার সক্ষমতা হস্তান্তর। মধ্য দিয়ে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন কিছু ফি পাবে যা আলাদা এক প্রসঙ্গ। লক্ষ করুন যে আমার ও প্রাপকের মধ্যে একটি মাত্র বিষয়ে মিল আছে। তা হলো ক্রয় ক্ষমতার পরিবর্তন। আমার যা কমেছে, প্রাপকের সেই পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এজন্য অর্থ বলতে যদি আমরা কোন কিছু পাওয়ার সক্ষমতা (বাজারের ক্ষেত্রে ক্রয়ক্ষমতা) না বুঝি তাহলে যুক্তির গোলমাল মেটানো যাবে না। তাই অর্থ বলতে কোন কিছু পাওয়ার সক্ষমতা একটা যথাযথ সংজ্ঞায়ন। এই বিশেষ উদাহরণে বাজার থেকে ক্রয় করার ক্ষমতা। ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, মধ্যস্থতাকারী ব্যাংক ইত্যাদির পর্যায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে, যুক্তরাজ্যে আমার পাউন্ডে কিছু কেনার ক্ষমতা বাংলাদেশে প্রাপকের কাছে টাকায় কিছু পাওয়ার ক্ষমতাতে রূপান্তরিত হয়। আমরা যে কথায় কথায় বলি পাউন্ড বা টাকা পাঠাচ্ছি তা প্রকৃত পক্ষে সঠিক নয়। আমরা পাউন্ড বা টাকা পাঠাচ্ছি না বরং হস্তান্তর করছি ক্রয়ক্ষমতা। তাই রেমিটেন্স পাঠানো হলো ক্রয়ক্ষমতার হস্তান্তর।
৪
বাংলাদেশের বাজার পরিস্থিতির দিকে সাংবাদিকদের আরেকটু নজর দেয়া দরকার। শুধু সবাই যে পণ্যের দাম বৃদ্ধি নিয়ে অভিযোগ করছে তা নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানও দেখাচ্ছে যে খাদ্য সহ ভোক্তারা যে সব পণ্য ক্রয় করেন, সেগুলোর দাম জানুয়ারি থেকে প্রতি মাসে প্রায় নয় শতাংশ ও গত দুই মাসে প্রায় দশ শতাংশ করে বেড়েছে। এই হার সত্যিই অনেক বেশী। কোভিডের পর থেকে সারা বিশ্বেই পণ্য মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের ঘটনাটা আলাদা না হলেও খুব স্বাভাবিকও নয়, কারণ মূল্য বৃদ্ধির হার অনেক দিন ধরেই অনেক বেশী। তাই অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা কিভাবে হচ্ছে তা আসলেই খতিয়ে দেখা উচিত। তবে গত দুই মাসের পণ্য মূল্য বৃদ্ধি হয়তো আরো কোন বড় সংকটের ইঙ্গিত দেয়। গত দুই মাসে অনুমান করি বিনিয়োগ তেমন হয়নি, তাই বিনিয়োগের কারণে মূল্য বৃদ্ধির ঘটেনি। তবুও মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে। পপুলিস্ট হবার জন্য আমরা সব কিছুর জন্য সিন্ডিকেটকে দায়ী করতে পারি কিন্তু আমি মনে করি খাদ্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে সিন্ডিকেটের ভূমিকা খুবই সীমিত। সামগ্রিক ভাবে বাজার দর বৃদ্ধিতেও তাই। আর সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে জিনিসের দাম তো কমবেই না বরং বাজারে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। তাহলে কি করণীয়? এতো কঠিন সংকটের তো কোন সহজ সমাধান নেই। তবে মনে করি যে এখন বিদেশ থেকে খুব তাড়াতাড়ি বিপুল পরিমাণ খাদ্য পণ্য ( চাল, মাছ, মাংস সহ) আমদানির অনুমতি দেয়া উচিত, যদি ইতিমধ্যেই তা না করা হয়ে থাকে। আমদানির দায়িত্ব সরকার নয় বরং ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দেয়া উচিত। তারাই সবচেয়ে সহজে ও কম দামে পণ্য আনতে পারবে। বাজার নিয়ন্ত্রণে যত কম হস্তক্ষেপ করা হবে ততই ভালো।
৫
অর্থকে আমার বইয়ে (Money and Inflation) অপরের কাছ থেকে কোন দ্রব্য বা সেবা পাওয়ার সক্ষমতা হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছি। একটি বাজার ব্যবস্থার অধীনে ক্রয় ক্ষমতাকেও অর্থ হিসাবে চিহ্নিত করা যাবে। আমার এই সংজ্ঞায়ন থেকে অর্থশাস্ত্রের প্রচলিত পাঠ্যপুস্তকের ব্যবধান আছে। অর্থ বলতে সেখানে বোঝা হয় বিনিময়ের মাধ্যমকে (Medium of Exchange) । বলা হয় যে প্রাচীন কালে মানুষ পরস্পরের সাথে পণ্যের বিনিময় করতো, যাকে Barter প্রথা বলা হয়। সেখানে নানা অসুবিধা হতো বিধায় তারা বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে স্বর্ণ ইত্যাদির ব্যবহার করা শুরু করে, যা হলো অর্থের আদি প্রকার। অ্যাডাম স্মিথের বইয়ের এর উল্লেখ আছে। কিন্তু প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় এরিস্টটলের বইয়ে। আধুনিককালে নৃবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে অর্থের বিনিময় মাধ্যম হিসাবে উৎপত্তি হতে পারে না কারণ এর কোন সত্যিকারের প্রমাণ পাওয়া যায় নি। David Greaber এর ‘Debt: The First 5,000 Year’ বইয়ের এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা আছে। এক মোক্ষম যুক্তি হিসাবে তিনি বলেছিলেন যে, ইকোনোমিস্কের বইগুলো Barter প্রথা থেকে অর্থের উৎপত্তির কথা বলতে গিয়ে এরকম উদাহরণ ‘কল্পনা’ করতে বলে, বড় সমস্যা হলো সেই ‘কাল্পনিক’ উদাহরণকে বাস্তবে পাওয়া যায় না। তাই Barter কে সহজ করার জন্য অর্থের উৎপত্তি হয়নি। এখন অনেকেই মনে করেন যে অর্থের উৎপত্তি ঘটেছে ঋণের হিসাব রাখার জন্য। তার মানে যখনই ঋণ দেওয়া হবে তখনই অর্থের সৃষ্টি হবে। বর্তমানে প্রচলিত মুদ্রাকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়। এই নিয়ে Bank of England এর দুটি চমৎকার বুকলেট আছে যা আগ্রহীরা দেখতে পারেন। আমার বইয়ের অর্থের সংজ্ঞায়ন এই দুই ধারণা থেকে ভিন্ন। আমি বলছি যে আমরা বাস্তব জগতে সব সময় বিনিময় করছি। যেমন ৫০০ টাকার বিনিময়ে পাচ্ছি ১ কেজি মাছ। তাই ১ কেজি মাছের সামর্থ্য আছে ৫০০ টাকা পাওয়ার আবার ৫০০ টাকার সামর্থ্য আছে ১ কেজিই মাছ পাওয়ার। তাই ৫০০ টাকা যেমন অর্থ তেমনি ১ কেজি মাছও অর্থ এই বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে। কিন্তু ১ কেজি মাছ আমাকে কোন বন্ধুও উপহার দিতে পারে। তাই আমার বন্ধুত্ব ১ কেজি মাছ পাওয়ার ক্ষেত্রে ৫০০ টাকার সমতুল্য, মানে আসলে তাও অর্থ (Money)। এই সংজ্ঞা অনুসারে ঋণ অর্থ কারণ তা ঋণীর ক্রয় ক্ষমতা সৃষ্টি করে। যা জগতে যত কিছু অপরের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার সক্ষমতা দেয় তাই অর্থ। আমরা যদি এই যুক্তিতে না আগাই অর্থ সম্পর্কে পাঠ্যপুস্তকে যে যুক্তির গোলমাল আছে তা মিটাতে পারবো না। অর্থের এই সংজ্ঞার একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব প্রয়োগ আছে। তা হলো অর্থনীতি (Economy) বলতে যা বোঝায় তার সম্প্রসারণ। এর কারণে অর্থের এই সংজ্ঞায়ন মূল্যস্ফীতিকে (Inflation) অনেক বেশী ভালো ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু অর্থ নির্ভর করে পরিপ্রেক্ষিতের উপরে। পরিপ্রেক্ষিত অর্থ সৃষ্টি করে ও বিনষ্ট করে। একজনের জন্য যা অর্থ অন্যের জন্য তা না। যেমন একজনের বন্ধুত্ব অপরের জন্য প্রযোজ্য নয় আবার বন্ধুত্ব আছে কিন্তু যদি সে বন্ধুর টাকা না থাকে দিয়ে ফ্রিতে মাছ পাওয়ার ক্ষমতা থাকবে না। অর্থ কিভাবে সৃষ্টি হয়। যখন ক্ষমতা সৃষ্টি হয় তখনই অর্থ সৃষ্টি হয়। মানব ইতিহাসে তা সব সময়ই ঘটেছে। মানুষ যেমন এখন একে পরের কাছে থেকে বিনিময় করছে আদিম যুগেও তা করেছে। তাই অর্থের বয়স আর মানব সমাজের বয়স এক। মানব বায়োলজি অর্থের অস্তিত্বের প্রধান কারণ। জৈবিক কারণ মা তার শিশুকে সেবা দেয় ও বিনিময়ে আনন্দ লাভ করে। তা যেমন এখন হচ্ছে আদিম যুগেও হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। তাই বিনিময় ও অর্থ মানব সমাজের সমবয়সী। কিন্তু নানাবিধ মুদ্রার উৎপত্তি সমাজের বিবর্তনের সাথে সাথে হয়েছে। এর সাথে ক্ষমতারও সম্পর্ক আছে। যেমন কুবলাই খান কাগজের মুদ্রা চালু করেছিলেন যা কথা Marco Polo অনেক বার উল্লেখ করেছেন। কুবলাই খান তার বিশাল সাম্রাজ্য থেকে যে কোন কিছু পাওয়ার ক্ষমতা রাখতেন। তার সেই ক্ষমতাই তার বানানো কাগজের মুদ্রাতে প্রতিফলিত হয়েছে। আধুনিক যে মুদ্রা আছে তার ভিত্তিও তাই। রাষ্ট্রের ক্ষমতাই ওই মুদ্রাগুলোকে প্রচলিত করে। রাষ্ট্র না থাকলেও ঐ মুদ্রাগুলো অস্তিত্বশীল হতে পারতো না। রাষ্ট্র বিলুপ্ত হলে সে মুদ্রাগুলোও বিলুপ্ত হবে। অর্থ নিয়ে আমার বইয়ের প্রচারিত ধারণা নতুন। তাই এর গ্রহণযোগ্যতা আসতে কিছুটা সময় লাগবে অনুমান করি। একজন পাঠক সম্প্রতি জানিয়েছেন যে বইটা যদিও সহজ ভাষায় লেখা হয়েছে, কিন্তু নিবিড় পাঠের জন্য অনেক পূর্ববর্তী জ্ঞান দরকার। আমি তার এই মতকে যথাযথ মনে করি। ফেসবুকের পাঠকদের কাছে তাও কিছুটা ব্যাখ্যা করলাম। কোন প্রশ্ন থাকলে বা কিছু জানতে চাইলে জানাতে পারেন।
৬
অর্থনীতির (Economy) মূল নিয়ামক জগতের নিয়ম। জগতের নিয়মের মধ্যে কোন ভালো মন্দ নেই। সেখানে যা হবার তাই হয়। সেখানে ধনী দরিদ্র সবার খিদা লাগে। রোগে-দুর্ঘটনায় শিশু বৃদ্ধ সবাই মারা যায়। কি হওয়া উচিত বা কি হওয়া উচিত নয়, তা জগত বিবেচনায় নেয় না। কিন্তু অর্থশাস্ত্র (Economics) ভালো মন্দ বিবেচনায় নেয়। মানে এই শাস্ত্র জগতের নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাতে চায়। মানুষের যৌথ কার্যক্রম মোটামুটি সে রকমই। লিখিত ভাষা, মুদ্রা, রাষ্ট্র ইত্যাদি মানুষের তৈরি নিয়ম। কিন্তু মানুষের তৈরি নিয়ম জগতের নিয়মকে কখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, পারবেও না। অর্থশাস্ত্র ও রাষ্ট্রবিদদের মধ্যে একটা দল ভেবেছিলো যে তারা মানুষের অর্থনৈতিক আচরণকে পুরাপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। এদের মতে সরকার বলে দেবে অর্থনৈতিক আচরণ কি হবে ও তা সকলে অনুসরণ করবে ও মানুষের মঙ্গল হবে। এই ব্যবস্থাকে আমরা বাম ধারা বলে জানি ও প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ কয়েকটি রাষ্ট্র এর উদাহরণ। আমি আগে একবার লিখেছিলাম যে রকম বাম ধারার রাষ্ট্র এখন না থাকলেও রাষ্ট্র ও অর্থনীতি পরিচালনার মতাদর্শ হিসাবে ও সামগ্রিক ভাবে আমাদের চিন্তা চেতনায় আদর্শিক বাম ধারার ব্যাপক প্রভাব আছে। অনেকে জানেন না যে বাম চিন্তার বিপরীতে যাকে বলা যায় ‘আদর্শিক ডান’, সে রকম এক চিন্তার প্রচলন হয়েছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এর ধারার পরিচিত দুই নাম মিল্টন ফ্রিডম্যান (Milton Friedman) ও ফ্রিডরিখ হায়েক (Friedrich Hayek)। আমি অনেককেই দেখেছি যে এই দুই নাম, বা এদের বইয়ের কথা উঠলে ঘৃণা চেপে রাখতে পারেন না। কিন্তু আসলে এরা ছিলো আদর্শিক বামের মতোই আদর্শবাদী। তারা মনে করতেন যে অর্থনীতিতে সরকার যত হস্তক্ষেপ করবে ততোই মানুষের ক্ষতি হবে। সে আদর্শের প্রচার তারা করেছেন। আশির দশক থেকে আদর্শিক বামের যে পতন তাতে এরা অনেক প্রভাব রেখেছেন। বাংলাদেশ আদর্শিক ডানের কোন প্রচার দেখিনি। সে রকম কোন লেখাপড়ার চল আছে দেখিনি। এর কিছু ঐতিহাসিক কারণ আছে, কিন্তু জ্ঞান ও চিন্তার চর্চায় বহুমুখিতা আনতে সব ধারায় লেখাপড়াই দরকার।
![]()
1 Comment
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.
Md Babul Hossain
বাস্তব ধর্মী লেখা ভালো লাগলো