গল্পটা মূলত আমারই
নতুন কোনও মেয়ের সাথে আমার পরিচয় হলে এবং সেই পরিচয় ঘন হতে থাকলে আমি প্রতিবারই ঐ মেয়েটির সঙ্গে কিছুটা ঘটা করেই আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু টিটির সাথে তার পরিচয় করিয়ে দেই; টিটি তার, অর্থাৎ আমার বন্ধুটির নামের সংক্ষিপ্ত-রূপ; আমরা নিকটজনরাই ওকে টিটি বলে ডেকে থাকি; এবং আজও আমি এই শহরের একটি ছোট কিন্তু ছিমছাম নামি রেস্তোরাঁয় আমার সর্বশেষ বান্ধবী রুমিকে নিয়ে এসেছি টিটির সাথে পরিচয় করিয়ে দেব বলে; আর এই রেস্তোরাঁটিই আমাদের বরাবরের পছন্দ কেননা এর নীরবতা আর নান্দনিক পরিবেশ আমাদের আকৃষ্ট করে থাকে; আর যেদিন প্রথম এইরকম পরিচয়পর্ব থাকে সেদিন আমি বেশ স্বচ্ছন্দে উৎফুল্লতার সাথে ওয়েটারকে একেরপর এক নানান মুখরোচক খাবারের অর্ডার দিয়ে থাকি কেননা আমি জানি যে ঐ দিনের সমুদয় বিল আমার বন্ধু টিটি স্বেচ্ছায় বহন করবে যা সে করে থাকে প্রতিবারই; এবং আমি, আমার যে এরকম একজন বেশ ধনী আর সুদর্শন বন্ধু আছে তা মেয়েটিকে জানাতে পেরে গর্বিত হই; এবং প্রতিবারই পরিচয়পর্বে একটু নাটকীয়তা রাখতাম যেটার সাথে আমার বন্ধু টিটি অভ্যস্ত ছিল এবং প্রতিবারই অভ্যাগত মেয়েটি যে কিছুই বুঝতে পারেনি তার জন্য এবং আমাদের নিপুণ অভিনয়ে আমরা নিজেরা মুগ্ধ হয়ে আরেকটি অধ্যায় সাফল্যের সাথে করতে পেরে আমরা দুই বন্ধু পরস্পরকে নীরবে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতাম;
আমি জানতাম, যতবারই আমি নতুন কাউকে টিটির সাথে পরিচয় করিয়ে দেব ততবারই সে নতুন বান্ধবীটিকে আমার কাছ থেকে ভাগিয়ে নেবে; এবং ঠিক ততবারই আমার বান্ধবীরা স্বেচ্ছায় তার নিকট হেলে পড়বে এবং ক্রমশ আমাকে দূরের কেউ বলে তাদের মনে হতে থাকবে; আর আমি সবকিছু জেনেও কেন এই ঘটনা বারবার পুনর্বার জন্ম দিতে থাকলাম তার একটি জোরালো কারণ আছে; কারণ আমার প্রথম এবং হয়তো প্রথম বলেই এক অর্থে তুলনারহিত; সে প্রেমিকার নাম ছিল আলেয়া; ওর সাথে দিনদিন আমার সম্পর্ক যখন ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করল এবং আমাদের সম্পর্ক একটি পরিণত রূপ নিল এবং তা বিয়ে পর্যন্ত গড়ানোর সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার উপক্রম হলো এবং এইরকম এক দিনে আমরা যখন হাঁটছিলাম নগরের একমাত্র হ্রদের পার ধরে ঠিক তখন তখনই হঠাৎ করেই অনেকদিন পর, বলতে হয় কয়েক বছর পর টিটির সাথে আমাদের দুজনের দেখা; এবং আমাকে আমার প্রেমিকাসহ দেখতে পেয়ে কি না জানি না সে বেশ আন্তরিকতা দেখিয়ে একটা রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়ে আমাদের সাথে নিজেও আয়েশ করে বসলো; এবং বেশ মূল্যবান খাবারসমূহের অর্ডার দিতে থাকলো; আমি এবং আমার প্রেমিকা আলেয়া তখন তার আন্তরিকতায় সত্যিই মুগ্ধ হয়ে পড়ি; এবং সেদিন আমার এমন একজন ধনী আর সুদর্শন বন্ধু আছে জেনে আলেয়া খুশি হয় আর আমিও গর্বিত হই; এবং এটা আমার প্রেমিকার কাছে প্রমাণ করতে পেরে পুলকিত হই এবং আলেয়াও বিষয়টা উপভোগ করে বলে আমার ধারণা জোরালো হয়; এবং তখন তৃতীয় বিশ্বের এই দেশে সবেমাত্র সেলুলার ফোনের প্রচলন হয়েছে মাত্র; এবং সে তার সেল নাম্বার দেবার সূত্রে আমাকে এবং নিশ্চয়ই ম্যানার রক্ষার্থে, অন্তত তখন আমি তাই ভেবেছিলাম আলেয়াকেও সে তার একটি ভিজিটিং কার্ড যেচে দেয়; এবং অনেক পরে আমি নিশ্চিত হই; মানে আমি এই সিদ্ধান্তে আসি যে, মূলত আলেয়াকে নাম্বার আর ঠিকানা দেয়ার উদ্দেশেই আমাকেও সেদিন কার্ড দেয়া হয়েছিল; এবং এটা সত্যি যে, সেদিন টিটির আশাতিরিক্ত বন্ধুত্ব ও মার্জিত ও সৌহার্দ্য-ব্যঞ্জক আচরণ আমাদেরকে মুগ্ধ করেছিল যদিও আমি ভেতরে ভেতরে অবাক হচ্ছিলাম কিন্তু আলেয়ার কাছে আমার গুরুত্বটা হঠাৎ করেই বেড়ে যাওয়ায় যা আমি আলেয়ার মুখচ্ছবি দেখেই তখন বুঝতে পারছিলাম তাই খুশি হওয়ার ভাবটা আমিও তখন মুখে ধরে রেখেছিলাম বৈকি; কেননা টিটি আমার সরাসরি বন্ধু ছিল না, ছিল বন্ধুর বন্ধু, সেই সূত্রে যদিও পরে ঘনিষ্ঠতা শুরু এবং এখন অন্য এক মাত্রায় তা বিরাজ করছে তারপরেও বলতে হয় এইরকম ক্ষেত্রে আমি নিজেও সত্যি টিটির মতো এইরকম আন্তরিকতা দেখাতে পারতাম কি-না জানি না।
টিটি যে প্রতিবারই আমার সাথে গাদ্দারি করছে তা যেন আমার গায়ে লাগছে না; কিন্তু আলেয়ার ব্যাপারে আমি তাকে খুন করতে উদ্যত হয়েছিলাম; এবং ঠিকঠাক প্ল্যানও করেছিলাম ঠিকঠিক কোথায় কীভাবে টিটিকে খুন করবো এবং আমি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে পারবো; এবং ঘটনাটির যাতে কেউ সাক্ষী না-থাকে তাই খুনটা আমি নিজের হাতেই করতাম এবং এ-ও আমি ভাল করে জানতাম যে শারীরিক ভাবে আমি তার সাথে পরাস্ত হব তাই কৌশলে তাকে হত্যা করব বলে স্থির করি এবং সেটাকে যাতে পুরোপুরি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া যায় তার জন্য টিটির বাড়িতে টিটির ঘরেই তাকে হত্যা করার মতো দুঃসাহসিক পরিকল্পনা গ্রহণ করি; এবং অপেক্ষায় থাকি ওর বাবা-মা ঐ বছর কখন তাদের সন্তানসম্ভবা ছোট-কন্যার প্রসবকালে আমেরিকায় যাবেন; এবং এ নিয়ে প্রতিনিয়ত যুক্তি-বিশেষের ফলাফল নিয়ে আমি ভাবতে থাকি; যেমনটা প্রেমে পড়লে প্রেমিক সতত ভাবতে থাকে প্রেমিকাকে নিয়ে আমিও টিটিকে খুন করা নিয়ে অমনটা ভেবে চলি; এবং সম্ভবত আমি তখন টিটির প্রেমে পড়েছিলাম; এবং এই প্রেমটা হয়ত কেবলই তাকে খুন করার জন্যই হতে পারে;
আলেয়া পর্বের অব্যবহিত পরে আমি যেসব মেয়েদেরকে পটিয়েছি এবং যথারীতি টিটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি তা মনে হয় এই জন্যে যে মেয়েদের ব্যাপারে আমার সাফল্য টিটির চেয়ে কম নয় এবং তা ওকে বোঝানোর জন্যই; অথবা আমার ঐ ধরনের আচরণের কারণ এই ছিল বলে মনে হয় যে অনেক চেষ্টা করেও টিটির সম্পর্কে আমি কোনো খারাপ ধারণা মনে স্থান দিতে পারিনি; এবং ততদিনে আমরা পরস্পর পরিপূরক বন্ধু হিশেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম এবং তা ক্রমশ গাঢ় হচ্ছিল বলে উভয়ে টের পাচ্ছিলাম; যদিও ওকে খুন করার ব্যাপারটা মাথা থেকে নামাতে পারছিলাম না তখনও;
নতুন বান্ধবী সহযোগে যেদিন প্রথম পরিচয় হত সেদিন টিটি আমাকে বেশ সমীহ করত যা আমার নতুন বান্ধবীকে মুগ্ধ করত; এবং সেদিনকার ঐ শ্রদ্ধাটুকুও আমাকে পুলকিত করত এবং সেদিনকার মতো বান্ধবীটি চলে যাওয়ার পর, আর আমি জানতাম টিটি তখন ফুরফুরে মেজাজে তখন তখনই আমি ইনিয়েবিনিয়ে আমার সা¤প্রতীক কালের অর্থাভাবের কথা এমনভাবে তুলতাম যেন ওটা বাতাসকে বলছি, আর আমার বিচক্ষণ অথবা ধুরন্ধর বন্ধু টিটি বিদায় নেবার সময় মানিব্যাগ খুলে যতটা পারতো নিয়ে আমার পকেটে গুঁজে দিতে গেলে আমি ততবারই ‘আরে কী করিস, কী করিস’ বলে শুধু মুখে মুখেই ঠেকাতে চাইতাম; যদিও ওর পকেটে সমসময়ই অতগুলো টাকা থাকত, না-কি এইসব পরিচয়পর্ব-দিনগুলোতেই এমনটা হত তা আমি ভাবতাম; আর টাকাটা পকেটে গুঁজে দিয়েই আমার নতুন কি কবিতা কোথায় ছাপা হলো তার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে উত্তরের অপেক্ষায় না থেকেই গাড়ি স্টার্ট দিত এবং এইসব দিনগুলোতে আমি লক্ষ করতাম সে ড্রাইভারও সঙ্গে আনতো না এবং আমাকে লিফটও দিত না; যদিও অন্যান্য দিনে হঠাৎ, তা খুবই কম বৈকি, পথে দেখা হলে আমাকে লিফট দিতে সে বেশ আগ্রহ দেখাত; এবং আমরা দুইজনেই যেন কোনো গুরুতর অপরাধ করেছি এই ভেবে পরস্পরের নিকট হতে সেদিন দ্রুত তই বিদায় নিতে চাইতাম; কিন্তু আমি জানতাম না টিটির সাথে আমার বান্ধবীদের পরবর্তীতে কীভাবে এত দ্রুত যোগাযোগ হত; কিন্তু আমি জানতাম টিটির সাথে আমার বান্ধবীর পরিচয় হওয়া মানেই ঐ বান্ধবীটির সাথে আমার সম্পর্ক ক্রমশ ক্ষীণ হতে থাকা এবং আমার অলক্ষ্যে টিটির সাথে তার সম্পর্ক গাঢ় হতে থাকা; এবং আমি জানি টিটির ঐ নতুন সম্পর্ক সাকুল্যে ৯০ দিন স্থায়িত্ব পেতে পারে এবং আমি ঐ সময়ান্তরে নতুন আরেক বান্ধবী খোঁজার ধান্দা করতে থাকি;
আমি দেখেছি প্রতিটা নতুন সম্পর্কের বেলায়ই টিটি বেশ শালীনতার সাথে এগুতো এবং তার অভীষ্ট লক্ষের দিকে ধাবিত হতে থাকত; আর টিটির সাথে হেলে পড়া মেয়েরা পরবর্তীতে আর আমার সাথে যোগাযোগ কেন যে রাখতো না তার ২/১টি ব্যাখ্যা আমি বের করেছিলামÑ হতে পারে প্রতিটি মেয়েই নিজেকে অপরাধী ভেবেছে আমাকে দূরে ঠেলে দেবার জন্য অথবা আমি জেনেশুনে তাদেরকে টিটির মতো একজন ধুরন্ধর সুদর্শন লম্পটের হাতে তুলে দিয়েছি এই ভেবে; যদিও আমার প্রথম প্রেমিকা আলেয়ার বেলায় তার ব্যতিক্রম ছিল; কেননা আলেয়া ঠিকই ফিরে এসেছিল এবং অনুতপ্ত হয়েছিল, কিন্তু আমাকে সে ঠকাতে চায়নি বলেই আমার হাত ছুঁয়ে বিদায় নিয়েছিল এবং পরিবারের সিদ্ধান্তে বিদেশ-ফেরত একজনকে বিয়ে করে আমার গোটা জীবন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল; যদিও তখনও তাকে আমি বিয়ে করতে সম্মতি জানিয়েছিলাম এবং বিদায়লগ্নে আমরা সেই হ্রদের পাশে ঘাসের গালিচায় বসে হাতে হাত রেখে উভয়ে সম্ভ্রান্তভাবে ক্ষানিকক্ষণ কেঁদেছিলাম; এবং তখন তখনই আমার ভেতর যেন কী হলো; আর আমি যেন কেমন কেমন বদলে যেতে থাকলাম;
আমার চেহারায় তেমন বিশেষত্ব ছিল না; বাম গালে একটা বড় তিল ছাড়া কোনো বৈশিষ্ট্য নেই; তবে এটা ঠিক চেহারায় দরিদ্রতাটা অতোটা ফুটে ওটতো না যতটা বাস্তবিকই আমার ছিল; আর আমার কণ্ঠ ছিল ভরাট, উদাত্ত; আর এই বিশেষত্বতে¡র জন্যেই ঈশ্বরকে আমার অযুত-নিযুত ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে হয় এবং বাস্তবেই তা আমি করি বৈকি; কেননা অসংখ্য আবৃত্তি-যোগ্য কবিতা আমার মুখস্থ ছিল, আর পরে বুঝেছি আমার কণ্ঠনিঃসৃত আবৃত্তিই আমার প্রেমিকাদের আকৃষ্ট করত, এবং এই গুণটির জন্যেই আমার প্রেমিকার সংখ্যা মন্দ ছিল না; এবং এই সুযোগটি এই কারণে আমার হত যে আমি ছিলাম নগরের একটি নামকরা আবৃত্তি-সংগঠনের অন্যতম কর্মী এবং সময়বিশেষ প্রশিক্ষকও; তাই আবৃত্তি-যোগ্য কবিতার মতোই নমনীয় আর ছন্দময় কবিতাপ্রেমি বালিকাদের হাত করতে; এখানে ‘হাত করতেই’ বলবো আমি; কোনও কষ্ট হতো না; আমি বরং তুলনামূলক যাচাই করে সেইসব জ্যান্ত ‘কবিতা’দের ভেতর থেকে এমন একজনকে নির্বাচন করে সাবধানে এগুতাম যেন শিকার ফসকে না যায়, আর এ ব্যাপারে আমার কৌশল ছিল বরাবরের মতো নিজ উদ্ভাবিত পন্থা, আর যে উচ্চাকাঙ্খী সতেজ ‘কবিতা’টিকে সুযোগ-মতো অন্যের পাতে পরিবেশন করা যাবে স্বল্প চেষ্টায়; আর এই লক্ষেই আমি অমন বান্ধবী নির্বাচন করে ঘনিষ্ঠ হতে থাকতাম এবং যখন বুঝতাম আমার বান্ধবী হস্তান্তরের সময় এসেছে এবং আমার অর্থ-চাহিদাও তুঙ্গে আর তখন তখনই আমি টিটির সাথে দেখা করার দিনক্ষণ ঠিক করার প্রস্তুতি নিতাম; আর আমি যদিও জানতাম আমার প্রেমিকা, প্রেমিকাই বলি কি করে – যদিও তাদের সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক ছিল বটে তবে তা ছিল নিছক অভিনয়-মাত্র; কেননা আমার প্রেমিকাদের নিয়ে টিটি কোথায় কোথায় অভিসারে যায় তা আমি জানতাম যদিও তাতে আমার কোনো ভাবান্তর হতো না এবং এমনটাই ঘটবে বলে আমি মানতাম; এবং তথাপিও আমার মধ্যে যেহেতু আমিও অন্য কবিদের মতো সংবেদনশীল তাই মাঝে মাঝে রেগে উঠতাম বৈকি, কিন্তু সেই রাগ কেবলই নিজের কাছে ভীরু খরগোশের মতো; এবং তা লুকানোর জন্য সম্ভবত আমি অনভ্যস্ত-ভাবে ধূমপান করতাম কিংবা আকাশের দিকে চেয়ে থাকতাম অথবা দুটোই একসাথে করতাম, নয়তো শেষপর্যন্ত কবিতার কাছেই আশ্রয় নিতাম;
আমার নবম প্রেমিকা, যদিও আমার দিকটা অভিনয় মাত্র আমি জানি, কিন্তু তারা তা জানে না; হয়তো বা জানে তা আমি জানি না, কিন্তু ওরা যে আমাকে সত্যিকারই ভালবেসে এগিয়েছিল এমত সুখ-কল্পনা আমি ভাবি আর আমার বর্তমান নবম প্রেমিকা রুমিকে আজ টিটির সাথ পরিচয় করিয়ে দেবার প্রস্তুতি নিতে থাকি; আর আমি জানি যে এই কাজে আমি এখন একজন অভিজ্ঞ-পুরুষ, কিন্তু আজ টিটি কেন যে এখনও এসে পৌঁছুলো না তা আমাকে ভাবিত করছে এবং বিন্দু বিন্দু ঘাম এসে আমার গ্রীবায় জড়ো হচ্ছে; আর আমি এই ফাঁকে টিটি অবশ্যই এসে পড়বে এই আত্মবিশ্বাসে যেমনটা ২/১ বার ঘটেছিল এর আগেও যেসব খাবারের অর্ডার দিয়ে ফেলে মারাত্মক ভুল করেছি বলে এখন অনুতপ্ত; আর পকেটে যা আছে তা দিয়ে মাত্র দুটো জুসের বিল দেয়া যাবে বলে উদ্বিগ্ন হচ্ছি; আর এদিকে ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলছে এবং আমার প্রেমিকার কাছে আমি ছোট হয়ে যাচ্ছি; আর আমার অন্যমনস্কতা দেখে আমার প্রেমিকা প্রশ্ন করছে এবং আমি তা পাশ কাটানোর চেষ্টা করছি আর ভাবছি কী করে আজকের রেস্তোরাঁ-বিল শোধ করা যায় তা নিয়ে, যদিও এখানে আসতে যেতে কাউন্টারে বসা লোকটির সাথে আমার সামান্য পরিচয় থাকলেও কীভাবে বিলের ব্যাপারটা ম্যানেজ করবো তা ভেবে পাচ্ছি না; কেননা কখনও আমাকে এর আগে বিল দিতে হয়নি তা সে জানতো ভালো করেই; আর আমি নিজের অস্থিরতা আর কালক্ষেপণের জন্য কাউন্টারে বসা লোকটির সামনে দিয়ে ইতোমধ্যে একবার ইচ্ছে করেই বাথরুমে গেলাম আর তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলাম, এবং চোখে চোখ পড়ার জন্য কাতর হলাম, এবং অবশেষে চোখে চোখ রাখতে পেরে আনন্দিত হলাম, এবং আন্তরিকভাবে হাসি বিনিময় করলাম যা আমি এর আগে কখনো কোনদিন করি নি, এবং সত্যি বলতে কি তাদের সাথে এক ধরনের সামন্তবাদী মনোভাব নিয়ে রেস্তোরাঁয় আসতাম যেতাম; কিন্তু আজ ওয়েটার এবং পত্রিকা পাঠরত ম্যানেজার লোকটির চাহনি আমার কেমন কেমন যেন সন্দেহগ্রস্থ মনে হলো; এবং বাথরুম থেকে ফিরে এসে টিটির জন্য ফাঁকা রাখা চেয়ারটিতে একজন বেশ সুদর্শনা আধুনিক মেয়েকে বসে থাকতে দেখে আশ্চর্যের বদলে বরং স্বস্তি পেলাম, কিন্তু তখন তখন কেন তা পেলাম তা বুঝতে পারিনি; এবং ফিরে আসতেই রুমিকে উচ্ছল দেখাচ্ছিল আর আমার সাথে তার বেশ ঘনিষ্ঠ কিন্তু অনেকদিন পর দেখা বান্ধবী মানে ঐ মেয়েটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেই আমি দ্রুত অন্তরঙ্গ হওয়ার চেষ্টা করি, এবং পকেটের হাল জানা থাকা সত্বে¡ও এবং মেয়েটির বারবার নিষেধ সত্তে¡ও আমি নতুন এই মেয়েটির জন্য আরও বেশ দামি খাবারের অর্ডার দিয়ে ফেলি এবং ‘যা আছে কপালে’ এই ভেবে মেয়েটিকেই আশ্রয় ভাবতে থাকি; আর পরিবেশিত খাবারের দিকে দৃষ্টি-আকর্ষণের তাড়া দেই, কিন্তু আমার নিজের কাছে আজ খাবারগুলো কিছুতেই অন্যান্যদিনের মতো লাগছে না বরং কেমন যেন বিস্বাদ ঠেকছে, যদিও আমার সামনে বসা দুই বান্ধবী বেশ মজা করেই খাচ্ছে বলে বুঝতে পারি, কেননা তারা খাবারের ফাঁকে ফাঁকে অহেতুকই হেসে উঠছিল বারবার; আর আমার গলা দিয়ে খাবার প্রায় নামছিলই না, আর আমি আমার নির্ধারিত জুসের গ্লাস শেষ করে বরং আরেকটি জুসের অর্ডার দিলাম, কেননা আমার গলা বারবার শুকিয়ে আসছিল; আর আমার এই অবস্থা রুমি হয়ত লক্ষ করে থাকবে, কেননা আমিও যেমন আড়চোখে ওকে দেখছি সেও তেমনটাই; কিন্তু ইতোমধ্যে আমার আবৃত্তির সুখ্যাতি জানতে পেরে সদ্য পরিচিতা প্রিসিলা নামের মেয়েটিকে বেশ আহ্লাদিত বলে মনে হলো; এবং খাবার শেষে সে সকলের জন্য তাই ইতালিয়ান আইসক্রিমের অর্ডার দিয়ে বসলে আমার অস্বস্তি আরও নিযুতগুণ বেড়ে গেল; তবে তা গোপন করার চেষ্টা করলাম; এবং তা খাওয়া শেষ হওয়ার পরও আমরা যখন অহেতুক গালগল্পে অনেকক্ষণ টেবিল দখল করে রেখেছিলাম; এবং আমার অস্বস্তি বেড়ে চলছিল; এবং মূলত কী হয় তাই ভাবছিলাম এবং সে যখন আমার কবিতা স্বকণ্ঠে শোনার আগ্রহ প্রকাশ করে বারবার তা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল এবং আমার সদ্য নেয়া সেল ফোনের সাথে তার নাম্বার বিনিময় হচ্ছিল তখন তখনই রুমি আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত একটি চাঞ্চল্যকর ও রহস্যজনক মৃত্যু সংবাদের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমাদের লক্ষ করি আমি আর উপস্থিত মেয়েটি একই সাথে রুমির দিকে তাকাই; এবং আমাকে এবং প্রিসিলাকে অবাক করে দিয়ে রুমি জানায় আমাদের সাথে টিটির পরিচয় থাকার কথাটি; এবং আমি এবং আমার মনে হয় আজকের পরিচিত হওয়া প্রিসিলা মেয়েটিও ভাবছে টিটির সাথে রুমির কি কোনও প্রকার যোগাযোগ ছিল! রুমি জানায়: এটি হত্যা না আত্মহত্যা সেই ব্যাপারে পুলিশ এখনও নিশ্চিত নয়; টিটিকে তার শোবার ঘরেই মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ, এবং তাদের বাড়িতে তিনজন ভৃত্য ছাড়া আর কেউ ছিল না, কেননা টিটির মা-বাবা তখন ছোট মেয়ের প্রথম-সন্তানের প্রথম জন্মদিন পালনের উদ্দেশে আমেরিকায়; কেননা সন্তান-প্রসবকালে তারা যে তখন যেতে পারেননি তার দুঃখ ভুলতে গিয়ে এবার তাই তারা আগেভাগেই সেখানে উপস্থিত হয়েছেন; রুমির কথা বলার ধরনে আমার কোনো কথা আসছিল না, এবং কেন জানি প্রিসিলারও না; বরং আমি এবং প্রিসিলা আমরা দুজনই একই সাথে রুমির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি এবং রুমির প্রতিক্রিয়া লক্ষ করি; ঐ-মুখে যেন হাজারো প্রশ্ন প্রতিযোগিতা করে চলছে কে কার আগে ঠিকরে বেরিয়ে আসবে; কেন হত্যা করা হলো টিটিকে? কে বা কারা হত্যা করলো টিটিকে? এবং যখন আমাদের তিনজনের চেহারাতেই পরস্পরের প্রতি সন্দেহের একটা তীব্র ছাপ স্পষ্ট ক্রমশ হতে দেখা যাচ্ছিল; এবং আমরা গভীরভাবে এই ভাবছিলাম যে এমন কে বা কারা আছে যে বা যারা তার বা তাদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এমন বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারে; এবং এইরকম একটা অস্বস্তিকর মুহূর্ত যখন কেবলই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হতে হচ্ছিল ঠিক তখন তখনই ওয়েটারের বাড়িয়ে দেওয়া বিলের হোল্ডারটি আমাদের মধ্যে একটা পরম স্বস্তি নিয়ে আসে এবং ওয়েটার তখন তখনই বিনয় সহকারে জানায় যে, আজকের সমুদয় বিল ইতোমধ্যে একজন ভদ্রলোক এসে পরিশোধ করে দিয়ে গেছে; এবং আমরা তিনজন এই কথা শোনামাত্র তখন তখনই যারপরনাই একই সাথে আশ্চর্য এবং বিস্মিত এবং ভীত হই এবং আমাদের কারো একজনের হাত লেগে টেবিল থেকে একটি গ্লাস মেঝেতে ভেঙে পড়ার শব্দ হয় এবং ঐ শব্দ আমাদের গভীরে মহাকাশ পানে উত্থিত কোনো শকটের শব্দের মতো তীব্র তীক্ষ্ম হতে থাকে;
![]()