সাদা টাইপরাইটার

সাদা টাইপরাইটার

ছায়া যুদ্ধ

বাজি ধরেছি শরীরের কোন অঙ্গটা তোমার
সর্বাগ্রে বিকল হবে চির শত্রু আমার।
হৃদপিণ্ডে হবে কি প্রথম আক্রমণ
নাকি আচমকা আঘাত মস্তিষ্কে,
দিব্যি দেখতে পাচ্ছি
বিছানায় পরে আছো অব্যর্থ পক্ষাঘাত।
বেয়াড়া কিডনি করবে কি ধর্মঘট
ছোটলোক লিভার পচে মুখ দিয়ে ছড়াবে দুর্গন্ধ
নাকি দুরারোগ্য চর্মরোগে চামড়া পড়বে খসে
সাপের মতন।
হাসপাতালের বেডে যখন সংগ্রামরত আমি
নিতে দুর্লভ শ্বাস
মনে পরে,ছায়ার সাথে ছায়ার যুদ্ধে
কেটে গেছে একটা জীবন
নিয়তির এই পরিহাস!

সাদা টাইপরাইটার

বাবার একটা সাদা টাইপরাইটার ছিল
আব্বার পক্ষাঘাতের কিছুদিন পর টাইপরাইটারটা
আম্মা ল্যাবরেটরির নির্ভরশীল টেকনিশিয়ান
সাত্তার মিয়াকে দিয়ে দেন।
ভীষণ আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও মুদ্রণ যন্ত্রটার
অমায়িক সাত্তার মিয়ার প্রাপ্তি
শান্ত ভাবে মেনে নিয়েছিলাম।
রক্ত,মল,মূত্র অণুবীক্ষণ যন্ত্রে নির্ভুল পর্যবেক্ষণের পর
আমার প্যাথলজিস্ট আব্বা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে,দৃঢ় আঙ্গুলে
টাইপরাইটারে খটাখট শব্দ তুলে মুদ্রণ করতেন
কোনো কোনো রুগীর জন্য সুবার্তা,
কারো কারো ভাগ্যে থাকতো কর্কট রোগের মত দুঃসংবাদ।
আমি বিস্ময় নিয়ে মুগ্ধ চোখে দেখতাম
লোহার অক্ষরগুলোর তীব্র গতিতে সাদা কাগজে
ছাপ ফেলে যাওয়া!
এখনো কোনো কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে দেখতে পাই
ডিজিটাল বিপ্লবেও টিকে আছে
কিছু বুজুর্গ টাইপরাইটার,
মোটা লেন্সের ভেতর থেকে কাগজে সতর্ক দৃষ্টি রেখে
নির্ভুল মুদ্রণে ব্যস্ত মুরুব্বি।
ধাতব ছন্দে মুখরিত দপ্তরে বসে ভাবি
মুদ্রণে দক্ষ মুরুব্বিদের জন্যই কি বেঁচে আছে
বিলুপ্তপ্রায় টাইপরাইটার
নাকি টাইপরাইটারগুলো বহাল রেখেছে
কিছু বিষণ্ণ কেরানির কুর্সি!

চুল-দাড়ি আমার সাদা হয়ে যাচ্ছে
কলকব্জায় জমেছে কালের ধুলা
অমোঘ শব্দ,একটা নিখুঁত বাক্য
পাখির মত গাছের পত্র পল্লবে খেলে লুকোচুরি!
জংধরা একরোখা চাবিতে চাপ দিয়েই যাচ্ছি
গোয়ার অক্ষরগুলোর কোনো নড়াচড়া নাই,
গ্যাট হয়ে বসে আছে।
মধ্যবয়সে পক্ষাঘাত আমাদের বংশেরই গতি!

আমি ও শাশুড়ি-আম্মা

ডাঃ লায়লা আফরোজকে যখন পালিয়ে বিয়ে করেছিলাম
ডাক্তারনির মা তাঁর বিদ্বান,রূপসী মেয়ের নিষ্ঠুরতায় আর
আন্ডার গ্র্যাজুয়েট মানে অকাট মূর্খ জামাইয়ের চতুরতায়
বিদীর্ণ হয়ে মানসিক ভাবে প্রায় ভারসাম্যহীন
হয়ে পড়েছিলেন।
সারাদিন শুয়ে থাকতেন আর সারারাত জেগে
বসে থাকতেন, ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল
মার কাছ থেকে মেয়েকে ছিনিয়ে আনার অপরাধ বোধে আমার চোখের ঘুমও হয়েছিলো নিরুদ্দেশ।

বর্তমানে আমাদের সাথে শাশুড়ি-আম্মার
অত্যন্ত সৌহৃদ্য পূর্ণ সম্পর্ক।
আমার ছেলে মেয়ে তাঁর দুই চোখের মনি
তাঁর স্নেহ আমাদের পরিবারে অমূল্য আশীর্বাদ
উনার উপস্থিতি অভেদ্য রক্ষাকবচ।
এখন প্রতি রাতে একই পাতা থেকে
আমি আর আমার শাশুড়ি-আম্মা ঘুমের বড়ি খেয়ে
নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের অতলে তলিয়ে যাই।

বিষাদ

শরীরের নাম মহাশয়
সহিতে পারে সে সবই
পেশির কারুকাজ আর বীরত্বের
গৌরবগাঁথায় ধোঁকা খেয়ো না,
বেদনার পরম্পরা কাঁধে
ভুলে যাবার অপার ক্ষমতা
নিয়ে সে জন্মায়।
বয়সের সাথে সঙ্গ নেয় নাছোড় বিষাদ,
কর্ম উদ্দীপনায় আর সাফল্যের চাকচিক্যে
মেডেলের মত ঝুলে খোঁড়া সৈনিকের উর্দিতে।
বার্থ সঙ্গমের গ্লানির মত অভ্যাসে
কাঁপা হাতে জ্বালাই ম্লান আগুন,
তারুণ্যের প্রিয় সিগারেটের স্বাদ
মধ্য বয়সে প্রশ্বাসে ধোঁয়া তিতকুটে।
যত দুর্গমেই মাটি খুঁড়ে হয় ফসলের আবাদ
গন্ধ শুঁকে ঠিকই হাযির ফের বেহায়া বিষাদ!

উনুন

ছোটকাল থেকেই
গৃহস্থের রান্নাঘরে,পালবাড়ির উঠোনে
কিংবা তন্দুররুটি আর বাকরখনির কারিগরের উনুনে
জ্বলা দাও দাও লাল আগুনের সৌন্দর্য
আমাকে মুগ্ধ করে।
মাটির উনুন করে বিস্মিত!
অবাক হই বাষ্পীয় ইঞ্জিনে,
পলকহীন দেখি নিরিবিলি গ্রাম
প্রশান্তির হরিৎ ভেদ করে ছুটে চলা রেলগাড়ি
ভালো লাগে ম্যাচবাক্স,বাক্সভরা দেশলাইকাঠি
হুঁকো সিগারেট বিড়ি
প্রিয় বারুদ আর থ্রি নট থ্রি!

যুদ্ধ অবধারিত, সংঘাত অবশ্যম্ভাবী
কামানের মাটি কাঁপা গর্জনেও
ঋতা..ঋতা তোমাকেই আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি।
রণক্ষেত্রে লক্ষ্যভ্রষ্ট আমি তোমার ছবি আঁকি,
বিজয়ী বেশে পরাজিত
তোমার পাকঘরে ফিরি মরণপণ
গরম ভাতের ধোঁয়ায় নিঃস্ব সৈনিকের আত্মসমর্পণ!

ঈর্ষা আমার

ঈর্ষা আমার নয় প্রতিহিংসাপরায়ন।
ভালোবেসে গলায় পরেছি এই কাঁটার হার
তোমার দেয়া অমূল্য উপহার

কোন চায়ের টেবিলে এখন কার সাথে
তুমি আলাপে মত্ত
কথার পেছনের আবেগগুলো কি সুন্দর
ফুটে উঠছে মুখের অভিব্যক্তিতে!
অনুভূতি এত নিখুঁত ফোঁটাতে সক্ষম
এমন মানবিক মুখ আমি আর কোথাও দেখি নাই !
কার চোখে রেখে তোমার মোহনীয় চোখ
তুমি এখন নিঃশব্দে চালাচ্ছো কথোপকথন?
তোমার চিন্তায় ইদানীং প্রাত্যহিক কাজে আমার শুধু
ভুল হয়ে যায় –

দাড়ি কামাবার সময়
গাল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পরে
গ্লাসে ঢালতে গিয়ে উপচে পরে পানি
প্রায়ই ভুল ঘরে ঢোকাই শার্টের বোতাম
সিগারেট উল্টো ধরিয়ে বড় বিব্রত বোধ করি।

“প্রতি সাক্ষাত এর পরিণতি বিচ্ছেদ কেন?”

আজকাল আমার দিন রাত কাটে
একটি উর্দু কবিতায় লিপিবদ্ধ এই প্রশ্নটির
উত্তর খুঁজে ফিরে!

Loading

Leave a Reply

Skip to toolbar