আঁধারে একা
তানভির ভাবছে এবার সাহস করে বেরিয়েই পড়বে। দেখা যাক কী হয়। যদিও রিস্ক নিতে দ্বিধা হচ্ছে। কিন্তু কতদিন আর এভাবে ঘরে বন্দী থাকা যায়? থেকে থেকে সময়-অসময়ে ঘর থেকে বের হয়ে যাবার ইচ্ছেটা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। নিঃশ্বাস নেওয়াও একঘেয়েমি হয়ে পড়েছে। বিছানায় কাটে দিন-রাতের বেশির ভাগ সময়। ঘুম ভাঙার পরও ঘাপটি মেরে উটের মতো মাথা গুঁজে বিছানায় পড়ে থাকে। আজ বের হবে ভেবে উঠে বসল। রাত থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি।
ক্যালেন্ডারের হিসাব কেমন গোলমাল হয়ে পড়েছে মার্চ মাস থেকে। লাল কালি দিয়ে ক্যালেন্ডারে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল মার্ক করে রেখেছিল। সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর তানভির যে গার্মেন্টসে কাজ করছিল সেখানেও ছুটি হয়ে যায়। অনেকেই এই ছুটিতে বাড়ি চলে গেল। তানভিরও একবার গ্রামে যাবার কথা ভেবেছিল। কিন্তু এখনও বেতন পায়নি। বেতন সমস্যা নয় আসলে, সে ভেবে রেখেছে ঈদের সময় বাড়ি যাবে। চার তারিখ রাতে কাজে যাবার দরকারি কাগজপত্র গুছিয়ে রাখল। সাতসকালে যেন তাড়াহুড়া করতে না হয়। এই ক’দিন একনাগাড়ে কর্মহীন ঘরে বসে থাকতে থাকতে মনে হল একবার বাড়ি থেকে ঘুরে এলেই হয়তো ভালো করত। এই দমবন্ধ অস্বস্তিকর অবস্থায় সময় কাটাতে হতো না। আবার কবে ছুটি পাবে কে জানে! গার্মেন্টসে ছুটি খুব কম পাওয়া যায়। আট ঘণ্টার বাইরেও ওভারটাইম করতে হয়। অনেক সময় শুক্র-শনিতেও কাজ থাকে। অবশ্য ছুটি নিয়ে ভাবতে হল না তানভিরকে। ‘কোভিড-১৯’ পরিস্থিতি দিনে দিনে ভয়াবহ হচ্ছে। সরকার বলছে সাধারণ ছুটি অথচ জরুরি পণ্য পরিবহন, চিকিৎসা ছাড়া গণপরিবহনও বন্ধ রাখা হয়েছে।
এগার তারিখ পর্যন্ত ছুটি বাড়ানো হয়েছে, এরপর চৌদ্দ এপ্রিল পরবর্তীতে ২৫ এপ্রিল… ৫ মে… ১৬ মে… ৩০ মে পর্যন্ত ছুটি। আর নিতে পারছে না তানভির। ১১ এপ্রিল থেকে গাজীপুর জেলাকে লকডাউন ঘোষণা করা হল। তানভিরের কর্মস্থল গাজীপুর। লকডাউনের কথা শুনে মনে হল এবার তার একাকীত্ব ও বন্দিজীবন যেন চিরস্থায়ী হয়ে গেল।
লকডাউনের আগে খাবার সামগ্রী কেনা ছিল প্রায় শেষ। এর মাঝেও সপ্তাহে দুবার পাড়ার মুদি দোকান থেকে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করেছে। সে সবও প্রায় শেষ। এখন শুধু চাল আর ডাল পড়ে আছে। এই সপ্তাহে এক ডজন ডিম খেয়েছে। চুল-দাড়ি বড় হয়ে গেল, কাটা হয় না কয়েকদিন। কেউ আসে না। কোথাও যাচ্ছে না। এমনকি রান্না করে যে পরীবিবি, সেও আসছে না। তানভির খোঁচা খোঁচা দাড়িতে হাতের তালু ঘষে। শরীর কত কিছু চায়! খাবার চায়! সুখ চায়। আরাম চায়। সঙ্গ চায়। তানভির ভাবল, একটা ‘মুভমেন্ট পাস’ জোগাড় করতে পারলে সামনের বাসার মেয়েটিকে নিয়ে লকডাউন শহরের চেহারা দেখতে বেরিয়ে পড়ত। হেঁটে হেঁটে শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। রোদে, বৃষ্টিতে, রাতের জ্যোৎস্নায় ভিজে ভিজে দু’জনে হাত ধরে হাঁটত। মেয়েটির কথা ভাবতেই মন ভালো হয়ে গেল।
পাউরুটির শেষাংশ চিবোতে চিবোতে তানভির ঢোলা পাজামা বদলে প্যান্ট পরল। পছন্দের একটা সার্ট পরল।
রুটিও শেষ। গতকাল তিনবেলা খিচুড়ি খেয়েছে। পরীবিবির অনুপস্থিতিতে ভাত রান্না করার চেষ্টা করেছিল। একবারও ঠিকঠাক হয় নাই। ভাত রান্না করা যে এত কষ্ট আগে বুঝতে পারেনি। হয় শক্ত থাকে নইলে নরম হয়ে যায়। একবেলা জাউভাত খেয়ে আর খেতে ইচ্ছে করে নাই। ভাতগুলো দাঁত বের করে তাকিয়ে তাকিয়ে বলে, কী আমাকে আর জুঁই ফুলের মতো সুবাসিত মনে হচ্ছে না?
আকাশ এখনও মেঘলা৷ থমথমে। গোমড়ামুখো। জানালা খুলে দিলে সামনে দক্ষিণমুখো বাড়ির ছাদবাগান। নিঝুম বাড়িটার কোল ঘেঁষে বাগানবিলাস ছাদে উঠে গেছে। পাতার ফাঁকে উঁকি দেয় দু-চারটে লালফুল। বৃষ্টিতে নুইয়ে পড়েছে। গাছে কামরাঙায় রং দেখে ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়া পাখি নেমে আসে। আজকেই কামরাঙাগুলোর বিনাশ হবে মনে হচ্ছে! তানভির এ সব ঘটনা পুরোটা দেখতে পায় না। কিছু দেখে, কিছু ভেবে নেয়। পাখিগুলো নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি শুরু করেছে। শুনতে পায় তাদের চিৎকার। শব্দ শুনে ছুটে আসে টিয়ারং শাড়ি পরা মেয়েটি। আঁচল সামলে টিয়াগুলোর পিছনে ছুটতে থাকে। এদিক সেদিক উড়তে উড়তে শাড়ির আঁচল খুলে পড়ে। পাখির ঠোঁট থেকে কামরাঙা খসে পড়ে। তানভিরের ইচ্ছে করে টিয়ার ঠোঁটের লাল ছটা নিয়ে মেয়েটির কপালে টিপ পরিয়ে দিতে! ইচ্ছে করে মেয়েটির দু-হাতে বেলোয়ারি চুড়ি পরিয়ে দিতে। ইচ্ছে করে জড়িয়ে ধরে ওর শরীরের সুবাসিত ঘ্রাণ পান করতে!
মেয়েটির সঙ্গে মাঝে সাঁঝে দেখা হতো রাস্তার মোড়ে, কখনো ওদের সদর দরজায়। তখন তার পরনে টিয়ারং শাড়ি থাকত না৷ ওকে কখনোই হাসতে দেখে নাই তানভির। কিন্তু ওর চোখ হাসে। ওর গালের কালো তিলটাও হাসে! ঘরে ফিরে সেই হাসি মনে করে মেয়েটির মসৃণ গ্রীবায় ঠোঁট ছুঁইয়ে দেউলিয়া হয়ে যেতে ইচ্ছে হয়।
মেয়েটি মাঝে মাঝে ছাদ থেকে নামতে গিয়ে সিঁড়ির দরজায় একটু দাঁড়ায়। নির্লিপ্ত হয়ে আকাশ দেখে। তারপর অন্যমনস্ক হয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে তানভিরের জানালার দিকে তাকায়। কখনো চোখাচোখি হয়। তখন দ্রুত সরে যায়। সে চলে যাবার পর অনেকক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তানভিরের ভিতরের আড়াল সরে যায়। সে অন্য এক মানুষ হয়ে যায়। মেয়েটিকে টিয়া বলে ডাকে। তার নাম জানে না। জানতে চায়ও না। টিয়া ছাড়া আর কোনো নাম ওকে শোভা পায় না! লম্বা দীর্ঘশ্বাসের মতো টিয়া শব্দটি যখন দাঁতের পাশ কাটিয়ে জিভ ছুঁয়ে বেরিয়ে আসে, টিয়া বলতে বলতে একটা ঘোরের ভিতর চলে যায়। ঘরের দরজায় টিয়া এসে দাঁড়ায়। নিঃশব্দে ধীরে ধীরে নেমে আসে টিয়ার অবয়ব, কপালে লাল টিপ। ঘাড় ঈষৎ হেলানো! চুল খোলা। শাড়ির আঁচল আঙুলে জড়িয়ে টিয়া বলে, –ডেকেছ?
এমন সব ভাবনা নিয়ে তানভিরের সময় কাটে। ঘড়ির কাঁটা এখন একটার কাছাকাছি। আর মাত্র তিন মিনিট বাকি। এখন টিয়া আসবে স্নান করে ছাদে কাপড় মেলতে। এই মুহূর্তে রুটি আনতে যাওয়া ঠিক হবে না।
আশপাশে বাড়ির জানালা দরজা কেউ খুলছে না লকডাউনের পর থেকে। দ্বিতীয় ঢেউ নাকি বাতাসে ছড়াচ্ছে! এই পর্যন্ত তিনটি বাড়িতে লাল পতাকা ঝুলানো হয়েছে। কারো করোনা হয়েছে খবর পেলেই সরকারি কর্মচারী এসে বাড়িটিকে একঘরে করে দিয়ে যায়! গলির দুমাথায় বাঁশ বেঁধে আটকে দেয়া হয়েছে। গাড়ি ঢুকবে না, বেরও হবে না। অবশ্য বাঁশের তলা দিয়ে কোমর বেঁকিয়ে, মাথা গলিয়ে দিব্যি মানুষ যাচ্ছে আসছে। মুখে মাস্কও নেই। এই মানুষগুলো বেশ নির্বিকার! তাদের জন্য কোনো প্রতিবন্ধকতাই সচেতনতা সৃষ্টি করে না। ওদেরকে দেখে বেশ সুখী মনে হয়। তানভির চেষ্টা করেও ওদের মতো নির্লিপ্ত হতে পারে না। সুখীও হতে পারে না।
বৃষ্টি থেমেছে। এক পশলা বৃষ্টির পর আকাশ আবার থমথমে। যে কোনো সময় আবার বৃষ্টি নামতে পারে৷ এখন বের হলে ভিজে যাবে। রাস্তার ভাঁজে ভাঁজে জল জমে আছে। নিজের বোকামির দায় মাথায় নিয়ে সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে ছাতা খুঁজল। লিকলিকে শরীর নিয়ে বাড়িতে কোথায় আর লুকিয়ে থাকতে পারে ছাতা। নিজেই হয়তো কোথাও ভুলে ফেলে এসেছে। এই বাড়িতে আসার পর এই দুই বছরে চারটা ছাতা হারিয়েছে। এই ছাতাটা কেনার সময় প্রতিজ্ঞা করেছিল এবার হারালে আর কিনবে না।
পরীবিবি কয়েকদিন ধরে আসছে না। বলছে, লকডাউনে বের হলে পুলিশ খুব হেনস্তা করে। বাড়তি পয়সা খরচ হয়ে যায়। কষ্টের টাকা পুলিশকে দিতে আরও কষ্ট হয়। তার মস্ত একটা গুণ, সে যেকোনো বিষয়ে অনেক কথা বলতে পারে। আর বড় এক দোষ, বিষয়টিকে নিয়ে বকবক করেই চলে। থামতে চায় না। ভুলেও না। তানভির মাঝে মাঝে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে অনুভব করে ওর ভিতরে একটা শব্দ ভাণ্ডার রয়েছে। মশলার সুগন্ধে সে ভাণ্ডারের দরজা খুলে যায়। পরীবিবির রান্নার হাতও চমৎকার! সে যখন রান্না করে এক একটা মশলা তেলে-জলে ছন্দ তোলে। সেই রান্নার স্বাদ মুখে লেগে থাকে। তার রান্নার স্বাদ মায়ের হাতের রান্নার মতো। সব মায়েরা বোধ হয় এমন স্বাদের রান্না করেন। পরীবিবি তানভিরকে বুঝিয়েছে, স্বাদ আর মজা এক নয়। মাথা নেড়েছে তানভির। কিন্ত বিষয়টা ঠিক বোঝে নাই।
সারারাত জেগে থাকার অভ্যাস তানভিরের। এটা ওর ইনসমনিয়া নয়। রাত জাগা তার কাছে একটা সুখ। কলেজে ভর্তি হবার পর থেকে রাত জাগার অভ্যাস করেছে। প্রথমে খুব ঘুম পেলে বার বার চা খেত। কাজ হত না। ঘুমে চোখের পাতা জড়িয়ে আসত। সিগারেট টানার অভ্যাসও করেছিল। ভালো লাগে নাই। সিগারেটে টান দিলেই কাশি হতো। মা-বাবা জেগে যেতেন। মা বাবাকে বলতেন, খোকার আবার অ্যাজমা বেড়েছে। বাবা বুঝতে পারতেন ছেলে সিগারেট খাচ্ছে। মাকে বলতেন, তুমি ঘুমাও। ঠিক হয়ে যাবে। তানভিরকে এই নিয়ে কখনো কিছু বলেননি বাবা। কয়েকদিন চেষ্টা চালিয়ে নিজেই ছেড়ে দিল সিগারেট। ততদিনে মোটামুটি রাত জাগার অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। রাতের বেলা সময়কে একান্তে কাছে পায় তানভির। এমন শব্দহীন সময় দিনের বেলা কোথায় পাবে! লোকজনের হুল্লোড়বাজি নেই। অকারণে গাড়ির হর্ন বাজে না। কলিংবেলের ডাকাডাকি নেই।
তানভির অপেক্ষায় আছে লকডাউন উঠে গেলে পরীবিবি আসবে। বৃষ্টি থেমে গেলে টিয়া মেয়েটি দীর্ঘ সময় ছাদে হাঁটবে। আর তার চারপাশে নানান রঙের প্রজাপতি উড়ে উড়ে গাছের বাকলে মিছিল করবে। তানভির টিয়া মেয়েটির ভাবনায় মগ্ন থাকে।
পরীবিবি এসে কোমরে আঁচল জড়িয়ে রাঁধতে শুরু করে। তানভির অনুভব করে কিছুক্ষণ পর রান্নাঘর সর্ষেফুলে ভরে যায়। হাঁড়ি, খুন্তির সঙ্গে সে অনর্গল কথা বলে। মাঝে মাঝে তানভিরকে নানারকমের উপদেশ দেয়। সেদিন রেগেমেগে বলল, শাক-সবজি খাওয়াও ছেড়ে দাও।
এমনিতেই পরীবিবি তানভিরকে নব্বই ভাগ নিরামিষভোজী করে তুলেছে। মাছ, মাংসের গন্ধ ওর এখন আর খুব একটা ভালো লাগে না। আজ বলছে শাক-সবজি খাওয়া ছেড়ে দিতে! তাহলে কি বাতাস খেয়ে বাঁচতে হবে? তানভির বলল, তাহলে খাব কী?
পরীবিবি বলে–বাজার চড়া, প্রতিদিন শাক-সবজির দাম বাড়ছে! পেঁয়াজ, বেগুন, কাঁচামরিচের দামও বাড়তি! ডাল আর আলুভর্তা খাবে।
পরীবিবির হাতের ডাল, আলুভর্তার স্বাদও অমৃত! রান্না শেষ করে নিপাট-নিখুঁত গুছিয়ে খাবার দেয়। তার কুঁচকানো শাড়ির ভাঁজ থেকে হলুদের ঘ্রাণ ছড়ায়।
আমেজ, আলস্য আর পড়ন্ত রোদ যখন পশ্চিমের আকাশ থেকে ছাদের আলসে ধরে ঝোলে, তানভির অপেক্ষায় থাকে টিয়া মেয়েটি ছাদে আসবে। বাতাস চঞ্চল হয়ে পড়ে। আকাশের রং ঘন হয়ে যায়। যেন একসাথে বেজে ওঠে পৃথিবীর সব ক’টা সেতার। চলমান ছবির মতো টিয়া খোলা চুল বাতাসে শুকোয়। হাত দু’টি মাথার পিছনে নিয়ে আঙুলের ভাঁজে এলোখোঁপা বাঁধে। টিয়ার গায়ের রং ধীরে ধীরে আকাশের মতো হয়ে যায়। আর তার টিয়ারং শাড়িটায় ক্রমাগত গভীর অরণ্যের ছায়া পড়ে!
রান্নাঘরে পরীবিবি নিরামিষ সবজি রাঁধছে। গুনগুন করে গান করছে। তার সুখ দেখে তানভির ভাবে কোনো একদিন টিয়া এসে তার ঘরে এমন গুনগুন করবে। তার চোখে চোখ রাখবে। সেদিন এক অনন্ত সুখের বৃষ্টিধারায় ভেসে যাবে এ শহর, তানভির আর টিয়া।
তানভির লকডাউনের কনুই ঠেলে মেইন রোডে এলো। পাড়ার দোকানে পাউরুটি শেষ। দোকানদার বলল, একজন নাকি দশটা রুটি নিয়ে গেছে। তানভির ভাবছে এই শহরে সবাই কি মজুতদার হতে চলেছে! এরপর পাউরুটির দাম বেড়ে যাবে। দশটা পাউরুটির জায়গায় নয়টা নিলেও তো পারত! আপাতত তানভিরের একটা পাউরুটি হলেই চলবে। ভরদুপুর। এখন খেয়েদেয়ে লোকজন ভাতঘুম দিচ্ছে। আর সে একটা পাউরুটির খোঁজে পাড়া ছেড়ে মেইন রোডে এসে এদিক সেদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছে। হাঁটার গতি শ্লথ করে ফেলল। ভাবল আমার আবার কীসের তাড়া! আমার এখন অখণ্ড অবসর। চাকরিটা নাও থাকতে পারে। শুনেছে গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাবে। অনেক অর্ডার বাতিল হয়ে গেছে। শিপমেন্ট বন্ধ হয়ে আছে। এই দুবছর ম্যানেজার পোস্টে সে বেশ নিশ্চিন্ত ছিল। কিন্তু কাজ না থাকলে গার্মেন্টস চলবে না। আশঙ্কা করছে এই দুঃসংবাদ সে যেকোনো মুহূর্তে পেতে পারে। চাকরি ছাড়া এ শহরে তার থাকা হবে না। টিয়াকে না দেখে অন্য কোথাও যাবার কথা ভাবতেও পারে না। চাকরি একটা পেয়ে যাবে হয়তো। বেশ কিছুদিন বেকার থাকার অভিজ্ঞতা আরও দু’বার হয়েছিল। আরেকটা কাজ পাবার আগ পর্যন্ত কষ্ট সহ্য করে থাকতে হবে। টিয়ার জন্য সে সব কিছু করতে পারে। টিয়াকে দেখার ইচ্ছেটা যখন মাথার ভিতর প্রবল হয়ে ওঠে তখন পরীবিবির আশপাশে ঘুরঘুর করে। পরীবিবি হাতের খুন্তি নাচিয়ে, চোখ গোলগোল করে জিজ্ঞেস করে– কিছু লাগবে?
তানভিরের বলতে ইচ্ছে করে,
– হ্যাঁ লাগবে। টিয়াকে আমার বুকে এনে দাও।
মুখে বলে–না কিছু লাগবে না।
তানভিরের মাঝে মাঝে ইচ্ছে জাগে টিয়াদের ছাদে গিয়ে ওর সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে। মন চায় ওর বাড়ির ভিতরে ঢুকে খুব খুব কাছ থেকে টিয়াকে দেখতে। ওকে ছুঁয়ে অনুভব করতে। আজ তিনদিন টিয়া ছাদে আসছে না। একটা সংকেত ভাসছে বাতাসে। ধরতে পারছে না তানভির।
সন্ধ্যায় একটি অ্যাম্বুলেন্স এসে টিয়াদের বাড়ির দোরগোড়ায় থামতেই আশপাশের বাড়ির জানালাগুলো খুলে গেল।
অনুভবে টিয়া তিনদিন ছাদে না আসার সংকেত স্পষ্ট নয়। ভেতরটা ভেঙে কেমন চুরচুর হয়ে যাচ্ছে। কে যাচ্ছে অ্যাম্বুলেন্সে এটা দেখার (সাহস নাই)। এক সূচিভেদ্য অন্ধকার তাকে ঘিরে রেখেছে । ধীরে ধীরে সেই গহ্বরে ডুবে যাচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্স চলে যাবার পর পথঘাট আরও নিঝুম হয়ে পড়ে। আশপাশের জানালাগুলো আবার বন্ধ হতে সন্ধ্যার মৃদু আলোয় বাড়িগুলোকে সব ভূতুড়ে বাড়ির মতো দেখায়। টিয়াকে অনুভব না করার দূরত্ব তানভিরকে অবশ করে দিল। কে যেন ওর মগজের ভিতর থেকে টিয়াকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। তানভির বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছে না। একটি অতল কান্নার স্রোত বয়ে যাচ্ছিল ভিতরে ভিতরে! ঝিমুনিতে কাটে রাত-দিন। রাত গভীর হলেই কোনো এক টিয়া পাখি ডাকতে থাকে। তানভির এই ডাক চিনতে পারে না। বড় বেশি একা লাগে। অন্ধকারে নিজেকেই হাতড়ে বেড়ায়।
শেষরাতের দিকে টিয়া ফিরে এলো। তানভির ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙল অ্যাম্বুলেন্সের বিকট একটানা শব্দে। গাড়িটা পাড়ার অন্ধকার গলিপথ পেরিয়ে টিয়াদের বাড়ির সামনে এসে থামল। বিছানার চাদর আঁকড়ে থাকল তানভির। অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে শরীর শিথিল হয়ে এলো। মনে হল তার হাত থেকে আঙুলগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আঙুলগুলোকে ধরে রাখার চেষ্টায় তানভির আরও শক্ত করে চাদর আঁকড়ে শুয়ে থাকল অবশিষ্ট রাত। আর ভাবতে থাকল যা ঘটছে সেটাই কি জীবন?
বাইরে ঝোড়ো বাতাস। অন্ধকারে বিদ্যুতের এক ঝলক আলোতে দেখে টিয়া পরীবিবির সঙ্গে রান্না ঘরে হাসাহাসি করছে।
আজ আবার খুব বৃষ্টি হচ্ছে। টিয়াদের বাড়ির বাগানবিলাস গাছটি ভেঙে পড়েছে। ভোরের পাখিরা ডানা গুটিয়ে ভাঙা গাছের ডালে বসে ভিজছে। তানভির শুনতে পেল চারপাশে ভোরের নির্জনতায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে–টিয়া টিয়া।
রান্নাঘরে চায়ের কাপের ঠুনঠুন শব্দ। কে চা বানাচ্ছে! তানভির বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে দেখতে চায় কে চা বানাচ্ছে।পরীবিবি না টিয়া। দেহে শক্তি পাচ্ছে না। বুঝতে পারছে রান্না হচ্ছে। তেল মশলার ঘ্রাণ বাতাসে। খুব চেনা ঘ্রাণ।
ধীরে ধীরে রান্না ঘরে এসে দাঁড়ায়। তানভিরকে দেখে পরীবিবি বলল, -এত ঘুমাও কী করে? নাস্তা রেডি করে কতবার ডাকলাম। তোমার দেখি ঘুমই ভাঙে না। চা করেছি নিয়ে যাও।
তানভির জিজ্ঞেস করে, তুমি কার সঙ্গে এতক্ষণ হাসাহাসি করছিলে? পরীবিবি মুচকি হেসে বলল, নিজের সঙ্গে!
তানভির জানতে চাইল, তোমার সঙ্গে কি টিয়া ছিল?
পরীবিবি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, টিয়া কে?
–কেউ না।
তানভির আবার বিছানায় এসে টিয়াদের বাড়ির দিকে মুখ করে শুয়ে থাকে। ও বাড়ি থেকে সমবেত কোরআন তিলাওয়াতের শব্দ ভেসে আসছে। দু-একজন প্রতিবেশী বাড়িটাতে এলো। একে একে ওরা আবার বেরিয়েও গেল। অন্ধকার কেটে গিয়ে আশে-পাশের গাছগুলোর পাতায় মৃদু নরম রোদের ঝলক দেখা যাচ্ছে। তানভির টিয়ার অপেক্ষায় রইল। কিছুক্ষণ পর টিয়া সূর্যের আভা গায়ে মেখে নীরবে চলে গেল রাজসিক ভঙ্গিতে!
![]()
1 Comment
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.
Drako Shajib
অনবদ্য গল্প!
লকডাউন সময়কার অনেক স্মৃতি মনে করিয়ে দিল। একি সাথে অনুভূতি আর শব্দের দারুণ কম্বিনেশন খুব ভালো লাগলো।