দুরারোগ্য মানুষ

দুরারোগ্য মানুষ

শেষ চুম্বন
উৎসর্গ: কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়

মৃত্যু কন্ঠ নালীতে আটকে আছে,
স্মৃতিতে হেন কোনো মারি নাই
যার দংশন থেকে ছাড় পেয়েছি।
ছেচল্লিশ বার সূর্য প্রদক্ষিণ করে এসেছি,
জীবনচক্রের দাগকাটা ধাপ গুলো পার করে
আসন্ন মৃত্যুর অপেক্ষায়।
আদি আচার সূর্য উদয় আর অস্ত
স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার পূর্বে ছিলো নিছক লোকমুখে গল্প।
অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধ অমোঘ সত্য-
কোনো কিছুই থেমে থাকেনা,
ট্রেন কোনো স্টেশনেই দাঁড়ায়না বেশিক্ষণ।
তাহলে ভালোবাসা জানাতে দ্বিধা কিসের,
বিদায় সম্ভাষণের পর ছুড়ে দিতে শেষ চুম্বন!

কৃষ্ণ গহ্বর
কত নক্ষত্র কৃষ্ণ গহ্বরে হারিয়ে গেল
নুর হোসেন, বিশ্বজিৎ, ফেলানি, অভিজিৎ, কল্পনা, দীপন, সাগর-রুনি, তকি, নুসরাত, তনু
আরো কত নামি-বেনামি, অছ্যুৎ, পতিত ……!
কৃষ্ণ গহ্বর কী পুরাণ ?
পৌরাণিক তাহলে নক্ষত্র গুলো!
পুরাণের আদলে পৃথিবীতে আমরা
হুবহু একটা বিস্মৃতির সাগর বানিয়েছি।
মানুষ, পশু, পাখি, বৃক্ষ, নদী-নালা, অরণ্য , দেশ, মহাদেশ, ইতিহাস
বিস্মৃতির সেই অতলে চিরতরে তলিয়ে যায়।

সন্ধ্যা রাতে কাব্যি করতে আর ভাল্লাগেনা
বৃষ্টি হইলে জ্যাক ডেনিয়াল, শুকনা দিনে ব্ল্যাক লেভেল
আর কিছু না পাইলে কেরুতে আপত্তি নাই।
কাঁচের গ্লাসে বরফের টুকরা যুবতির চুড়ির মত
মিহি শব্দ তোলে
মন থেকে তেজস্ক্রিয় মেঘ কেটে যায়।
রাত বাড়ে, বাড়ে দূরাগত মাদলের ধ্বনি !
একটা শেষ পাহাড় , প্রান্তিক দ্বীপ অথবা কল্পনার
কোনো জঙ্গল থেকে বিরামহীন বেজে যায়।
ঢাকের তালে তালে বিস্মৃতির অতল থেকে উঠে আসে
হাতি, ঘোড়া ,গণ্ডার ,মানুষ-মানুষ আর মানুষ।
পদ ভারে রোজহাসরের মত জমিন কাঁপে,
চীর ধরে, মাটি ফাঁক হয়!
পতনোন্মুখ পরাশক্তি প্রথম বিশ্ব,
প্রথম বিশ্বের বিষের ভাগার তৃতীয় বিশ্ব।

নেশায় পা লড়বড় করে, খাড়াইতে পারিনা।
কেয়ামতের এই দিনে এখন কি করি ? কই যাই?
মঙ্গল গ্রহেই যামুগা।
কিন্তু মঙ্গল গ্রহ, কুলাঙ্গারদের আগমনের আগাম বার্তায়
দুর্বার গতিতে ছুটছে কৃষ্ণ গহ্বরের দিকেই।

দুরারোগ্য মানুষ
আমি কি নির্ভুল জানি কোথায় অসুখ,
উপশম বা আছে কোন পথ্যে ৷
উৎকণ্ঠায় হয় যে নিত্য ক্ষয়
আদৌ কি আছে তার কোনো নিরাময়!
উপসর্গগুলো যথাযথ অনুবাদে ব্যর্থ জবান,
লিপিবদ্ধ করে দেখি দুর্বোধ্য তর্জমা৷
মানুষের মুখগুলোতে আমার একজোড়া
সমব্যথী চোখের সন্ধান,
কব্জিগুলোতে ঈসা নবীর শুশ্রূষার হাত৷
যদিও জানি মানুষ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে
ভেঙে দিতে মানুষেরই মন।
বন্ধু নাজুক এই সময়
প্রকৃতির মত নির্ভার প্রশ্রয়ে সাথে থাকো।
নীরবে থাকো পাশে,
যেমন থাকে দরদী সারমেয়!

আনসার গফুর ও তার থ্রি. নট. থ্রি
উৎসর্গ: মে দিবসে দেশের অবদমিত মানুষকে

চৈত্রের ঝিম মারা দুপুরে পাকুন্দিয়ার সুনসান স্টেশনের
বেঞ্চিতে বসে আছে আনসার গফুর।
হাড্ডিসার শরীরে তিন প্রজন্ম ক্ষেত মজুর গফুরের চাকরির মতই বেমানান ঢিলাঢালা খাকী উর্দি আর
মাথার ক্যাপ।
চুপসে যাওয়া গালের পাকাদাড়ি কণ্ঠের হাড়ে নেমে এসেছে,
গর্তে ঢুকে যাওয়া নিষ্প্রাণ দুই চোখের উপর সাদা ভুরু,
সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল সফেদ পাপড়ি,
মুখের বলিরেখা অন্তত কিছুক্ষণের জন্য ট্রেনের যাত্রীদের
ব্যস্ত রাখে বয়স অনুমানে।
গফুরের চাকরিগত বিশেষ যোগ্যতা থ্রি.নট.থ্রি কাঁধে
সারাদিন দাড়ায় থাকতে পারা
আর বসে থাকতে আমরণ!
বুজুর্গ এই থ্রি.নট.থ্রি’র ইতিহাস বেশিকিছু জানা যায়নাই,
জালিয়ানওয়ালাবাগে এক গোরা সৈনিকের হাতে নাকি
গর্জে উঠেছিল সে,
৭১রে কোনো পাক-হানাদাররে গুলিবিদ্ধ করতে না পারলেও
কালীগঞ্জের আলবদর আসগর খাঁর বুক ফুটা করে দিয়েছিল!
লাঙ্গল ছেড়ে ৩৫বছর আগে যেদিন গফুর থ্রি.নট.থ্রি’টা
প্রথম হাতে নেয় সেদিন থেকে বন্দুকটা অহিংস!
মৃধাবাড়ির মেট্রিকপাসরে যৌতুক না দিতে পারায় গফুরের
কলিজার টুকরা অছিমন যখন কীটনাশক খায়
তখন গান্ধিবাদি থ্রি.নট.থ্রি মিউচুয়ালে ব্যস্ত!
বিনা চিকিৎসায় আমেনা যেবার মরলো
ঠাণ্ডা নলে কপাল ঠেকানো গফুরের চোখ থেকে ৩দিন ২রাত পানি পরছিল,
হুশিয়ার আঙ্গুল তারপরও চেপে ধরে নাই ট্রিগার।
আসছে শ্রাবণে গফুরের চাকরীর মেয়াদ শেষ,
অস্ত্র জমা দেয়ার আগে তার খুব ইচ্ছা ৪-৫টা গুলি ছোড়ার, কিন্তু শ্যাওলা পরা মগজ আর ছানি পরা চোখে
শত্রু মিত্র চিন্তে পারেনা আর পাকুন্দিয়ার
গফুর আলি আনসার!

খালি বোতল
আমার শাশুড়িআম্মা কোনো পুরাণ জিনিষই
ত্যাগ করতে পারেননা
যতই অপ্রয়োজনীয় হোক পারেননা ফেলে দিতে,
স্মৃতি সত্তায় সবই তাঁর অমূল্য।
বারান্দা,খাটের নীচ,আলমারির উপর জিনিষপত্র বোঝাই
রান্নাঘরও বাড়তি হাড়ি-পাতিল মাটির সানকিতে ঠাসা,
কিন্তু কোনোটাই অপরিচ্ছন্ন না
ধুয়ে মুছে করে রাখেন ঝকঝকে তকতকে।
উনি আমাদের সাথে থাকতে শুরু করার পূর্বে
রসিক,ফুর্তিবাজ ইয়ার-দোস্তোদের বাসায়
সারাদিনই ছিলো আনাগোনা
রঙিন দিনরাতের সাক্ষী খালি বোতলে ভরে উঠতো ঘর।
আমার আর ডাক্তার লায়লা আফরোজের দুই নম্বর ছানাটা হওয়ার পর জীবন জীবিকায় হাবুডুবু খেয়ে
নাদান শিশুর যত্নআত্তিতে যখন নাস্তানাবুদ,
শাশুড়ি-আম্মা উদ্ধারের সংকল্পে এক সাথে থাকার
সিদ্ধান্ত নিলেন।
উনি বাড়িতে উঠার আগের দিন রাতে
বোতলবন্দি উল্লাসগুলো ভ্যানে চড়িয়ে বিদায় দিলাম
মহল্লায় টুংটাং শব্দ করতে করতে ওলি গলি পার হয়ে
বর্ণিল দিনরাতগুলি উধাও হয়ে গেল।
একদিন ঝাড়পোছ করার সময় শাশুড়ি-আম্মা
খাটের নীচে একটা জলপাই আরেকটা খয়েরী রঙের বোতল খুঁজে পান
আমি আর ডাক্তারনী বেদাতি অতীত উন্মোচিত
হওয়ার আশংকায় তটস্থ!
আম্মাজান বোতল দুইটা হাতে নিয়ে বল্লো
“প্লাস্টিকের জগে পানি খেয়ে তৃপ্তি নাই
আজকে থেকে কাঁচের বোতলে পানি খাবো”
অতঃপর কাঁচের ওই দুই বোতলেই এই সংসারের
তেষ্টা মেটে!

আমাদের সংগীত
স্বপনের সমুদ্রগুলোতে মরচে ধরেছে
আবর্জনায় ঢেকে যাচ্ছে শহর।
পর্যটকদের মনোরঞ্জনে ব্যর্থ
বালিয়াড়ির পরিত্যক্ত রুগ্ন ঘোড়ার মত
জেনে গেছি
অতি সুন্দরেও লেগে থাকে বিস্বাদ,
বেহালার সুরের মত বাতাসে
বিষণ্ণতার গন্ধ!
অবশিষ্ট যা কিছু
স্মৃতিতে ধরে রাখো।
বিস্মৃতির বিরুদ্ধে যাদের সংগ্রাম
স্বপ্নের বীজ বুনে হয়েছে শহীদ
তাদের জন্য নিবেদিত আমাদের সঙ্গীত!

নিঃসঙ্গ নির্জন
যেসব কারণে একজনকে ব্যর্থ বলা যায়
তার সবগুলোই শৈশবে ছিল ভরপুর।
পড়াশুনায় লবডঙ্কা,খেলাধুলায় তথৈবচ
স্কুলে,পাড়ায় সবখানেতেই দুধভাত।
ইউনিফর্ম ময়লা,চুল উসকোখুসকো,নোংরা জুতার
ফিতা খোলা,বড়ো বড়ো নখ,
দফায় দফায় শাস্তি।
একমাত্র সহপাঠী যাকে বন্ধু জানতাম সেও দেখি একদিন
আকাশ বাতাস দেখে,শ্রেণী কক্ষের জানালা দিয়ে মাঠে ছাগলকে খেতে দেখে ঘাস,
জীবনে প্রথমবার কঠিন মনোযোগে দেখে ব্লাকবোর্ড,
টিফিন পিরিয়ডে নির্লিপ্ত জানিয়ে দেয় বাবা মা নাকি
মিশতে মানা করে দিয়েছে।
স্বপ্নেও ব্যর্থ আমি প্রত্যাশা করি নাই কোনো নারীর হৃদয়।
বাইশ বছর বয়সে মহনীয় এক যাদুতে সব বদলে গেল
খবর পেলাম এক আকর্ষণীয় বিদুষী আমাকে ভালোবাসে।
জগৎসংসারের বিরুদ্ধে গিয়ে সেই মহীয়সী একদা
আমার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়,
বসন্ত বাতাসে ভরে উঠে ফুলে ফলে বাগান।
কিন্তু বাহারি ফুলও তো নয় নীরোগ
রসাল ফলেও থাকে গোপন কীট,
সংসারের আড়ালে প্রায়ই চোখ দিয়ে ঝরে পানি।
সন্তর্পণে মুছে ফেলি শক্ত হাতে
যেভাবে বারান্দা থেকে তারিয়ে দেই কর্কশ কাক।
জানি নিঃসঙ্গতা নির্মম অভিশাপ
একাকীত্বের দুঃখ অতুলনীয়।
আবার মধ্যবয়সে হাটে বাজারে গৃহকোণে
হারিয়ে ফেলা একান্ত নির্জনতার বেদনাটাও কম না!

মরূদ্যান
তোমার ঘরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাইশ ডিগ্রি
শীতল বাতাস চোরাগোপ্তা আমার টিন সেডের
একচল্লিশ ডিগ্রীতে প্রবেশ করে আমাকে ছুঁয়ে যায়।
জুড়োয় না শরীর, আগুন ধরিয়ে দেয়।
পারফিউম ভেসে এসে আঁশটে গন্ধের মিশ্রণে
অসহনীয় দুর্গন্ধ ছড়ায়।
আমার লেখা উগ্র বাম?
তোমার ডানে যাবার সুযোগ পেলাম কই?
বাঁ হাতে অবলীলায় ঠেলে দিলে ভাগাড়ে।
বাম-ডান বাম-ডান করে একসময় স্বপ্ন ছিল বটে
লেফটেন্যান্ট থেকে ক্যাপ্টেন,ক্যাপ্টেন থেকে কর্নেল হয়ে
ক্যান্টনমেন্টে একখণ্ড নির্ঝঞ্ঝাট অবসর জীবন।
তখন বে অফ বেঙ্গলের মাঝখানে হিজবুলবাহার,
তখন রাষ্ট্রপতি জেনারেল বলেছিলেন তেলের উপর নাকি
ভাসছে বাংলাদেশ,
মানচিত্রের সীমানা ছাড়িয়ে জাগছে নয়া জমিন!
আরবের তেলের খনির চেয়ে বেশি প্রাচুর্য
জানিনা আছে কিনা বাংলার ভূগর্ভস্থ গুদামে,
স্বপ্ন ভেঙে যায়
পরে থাকে মরু চরাচর।
জুতার ক্ষয়ে যাওয়া সুকতলা জিরোবে
কোথায় আর এমন অবাধ বাগান?
তোমার বাড়ি
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দুর্গম মরূদ্যান।

Loading

2 Comments

  1. আবেশটা ভালো লাগছে

  2. অন্যরকম সব অনুভূতি আর মুগ্ধতায় ভরা প্রতিটি কবিতা খুব উপভোগ করলাম!
    “আমাদের সংগীত” কবিতাটি সবথেকে বেশী মন কেড়েছে!
    অফুরান ভালোবাসা নেবেন!

Leave a Reply

Skip to toolbar