Profile Photo

Abu Taher AbdullahOffline

  • abutaher
  • Profile picture of Abu Taher Abdullah

    Abu Taher Abdullah

    4 years ago

    পাহাড়ের উপর সেই বাড়িটা
    ————————————————–
    দূর থেকে বাড়িটা দেখে কিন্তু মনে হয়নি সেটি পরিত্যাক্ত। বেশ উঁচু একটা টিলার উপর দোতলা বাড়িটা অনেকখানি জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরো খানিকটা কাছে যাওয়ার পর দেখা গেল একতলা দোতলার বেশ কয়েকটি জানালার কোন কপাট নেই। আশে পাশের পাহাড়গুলোর উপরে আর কোন বাড়ি কিন্তু চোখে পড়লো না। আমার সাথে ছিল বাবার এক কলিগের ছেলে, আমার দু-তিন বছরের বড়, তবে বন্ধুর মতই সম্পর্ক। আমরা দুজন মিলে পাহাড়ে পাহাড়ে অনেক ঘুরেছি। আমাদের ভাষায় পাহাড় পরিক্রমা। চট্টগ্রাম শহরের আশে পাশের পাহাড় পরিবেষ্ঠিত অজানা জায়গাগুলো দেখতে সুযোগ পেলেই বেড়িয়ে পড়তাম। বাবার রেলওয়ের চাকুরীর সুবাদে আমরা থাকতাম সিআরবি অর্থাৎ সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং সংলগ্ন অফিসার্স কোয়াটার্স বা বাংলোগুলোর একটাতে। সিআরবি সংলগ্ন বলতে আবার বিল্ডিং ঘেষা না। বাংলোগুলো ছিলো বেশ অনেকটা দূরে দূরে, একেকটা পাহাড়ের উপরে। বাড়িগুলোতে ওঠার জন্য সিড়ি বা ঘোরানো পাকা রাস্তা রয়েছে। পাহাড় আর টিলায় ঘেরা রেলওয়ের এই বিশাল এলাকাটাও দেখার মত সুন্দর।

    যাক, যেটা বলছিলাম, আমি আর আমার ওই সিনিয়র বন্ধুটির পাহাড়ে পাহাড়ে ঘোরাটা একরকম নেশার মত পেয়ে বসেছিল। আমাদের একটা প্রিয় বিচরন ভুমি ছিল ফয়েজ লেক আর তার আশে পাশের পাহাড়গুলি। যখনকার কথা বলছি তখন খুব অল্প কিছু লোকই সেখানে বেড়াতে আসতো। ফয়েজ লেকই রেলওয়ের বিস্তীর্ণ এলাকার বাড়িগুলোর পানির উৎস। পাহাড়ের ভেতরে ভেতরে বিস্তৃত লেকটা সত্যিই দেখার মতো সুন্দর। সেখানে কয়েক জন মাত্র কর্মচারীকে দেখতাম। এখন তো সেখানে রীতিমত এম্যুজমেন্ট পার্ক তৈরি হয়েছে শুনি। আগের সেই নির্জন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যটা আর নাই নিশ্চয়। আমাদের সেই কিশোর কালে বেড়ানোর কোন বাধানিষেধ ছিলো না। এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে এয়ার গান ঘাড়ে করে চলে যেতাম যত দূর যাওয়া যায়। বলতে ভুলে গেছি, আমার একটা এয়ার গান ছিলো, যেটা প্রায়ই আমাদের সঙ্গী হোত। সেই বয়সে নিজেকে বেশ শিকারী শিকারী মনে হোত। অনেক পাখীও শিকার করেছি সেই সময়, এখন মনে হলে সেই নির্বোধ পাখীগুলোকে মারার জন্য খুব খারাপ লাগে।

    এই রকম পাহাড় পরিক্রমার সময় আমরা দুজনই একটা অদ্ভুত ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলাম। অদ্ভুত না বলে অবিশ্বাস্য বললেই বোধ হয় ঠিক হবে। আমাদের সিআরবি থেকে মাইল দেড়েক দূরে বাটালী হিলের কথা হয়তো অনেকেই শুনেছে, যারা চট্টগ্রামে থেকেছে তারা তো অবশ্যই একবার হলেও সেখানে বেড়াতে গেছে। বাটালী হিলটা এক সময়ে চট্টগ্রাম শহরের মধ্যে সব চেয়ে উঁচু পাহাড় ছিলো। পাহাড়ে ওঠার রাস্তা থাকায় অনেকেই সেখানে উঠতো। সামনে নেভাল ব্যারাক তার পাশে টাইগার পাস রেলওয়ে কলোনী আর বাটালী হিলের পেছনে ঢেউ খেলানো একের পর এক পাহাড়। পাহাড়গুলোর ফাঁকে ফাঁকে কিছু সরু সরু রাস্তা এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে। মাঝে মাঝে বাড়ি ঘর চোখে পরে। একদিন দুজন মিলে এই এলাকার পাহাড় পরিদর্শনে বেরিয়ে পড়লাম। এখন ভাবলে অবাক লাগে আমাদের কাছে কিন্তু তেমন কোন টাকা পয়সা থাকতো না। দোকান থেকে কিছু কিনে খেতাম বলেও মনে পড়ে না, অথচ ঘন্টার পর ঘন্টা পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরেছি। সেই দিন এভাবেই বেশ অনেক দূর কখনো রাস্তা ধরে আবার কখনো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে একটা উঁচু মতো পাহাড়ে এসে বাড়িটাকে দেখতে পেলাম।

    তখন বিকেল হয়ে রোদ পরে আসছে। আমি বন্ধুকে বললাম কাছাকাছি এসেছি যখন চলো বাড়িটা দেখে আসি। ও কিন্তু রাজী হচ্ছিল না, বললো কি দরকার, কার না কার বাড়ি। হুট করে যাওয়া উচিৎ হবে না। বাড়িটা দেখতে সত্যিই রাজকীয় মনে হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল কোন বিরাট বড়লোকের বাড়ি। তবে কপাটহীন জানালা দেখে মনে হোল না সেখানে কেউ থাকে, বা থাকলেও বাড়ির আসল মালিক নিশ্চয় থাকে না। দেখেই বোঝা যায় বহু বছর বাড়িটার কোন পরিচর্যা হয়নি। অনেক বলে বন্ধুকে রাজী করিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে বাড়িটার দিকে এগোতে লাগলাম। দেখলাম বাড়িটাতে ওঠার জন্য পাহাড়টার চারদিক দিয়ে ঘোরানো রীতিমত বাঁধানো রাস্তা রয়েছে। রাস্তার ধার ঘেষে যে এক সময় ফুলগাছ লাগানো হয়েছিলো তার চিহ্ন এখনো বোঝা যায়। দেখে অবাক হয়ে গেলাম, এমন একটা বাড়ির এই অবস্থা কিভাবে হয়। অবাক হবার তখনো অনেক বাকি ছিলো। রাস্তা ধরে এগোতে থাকলাম। বাড়িতে ঢুকবার পথে বিশাল গেটের ধ্বংসাবশেষ, তার দুই পাশে ১২/১৩ ফুট উঁচু সিমেন্টের সুদৃশ্য স্থাপনা। বাড়ির কম্পাউন্ডটা মনে হলো বেশ কয়েক বিঘা জমি নিয়ে। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে চোখে পড়লো কম্পাউন্ডের শেষ মাথায় একটা বড় টিনে র চালা। বহুদিন আগে সেটা হয়তো গাড়ীর গ্যারাজ ছিলো। সেখানে যে কেউ থাকে প্রথমে বুঝতে পারিনি। একতলার চওড়া বারান্দায় উঠে মুক্ত দ্বারপথে ভেতরে প্রবেশ করে এসে পড়লাম এক মুক্তাঙ্গনে। বিরাট হলরুমটা হা হা খালি। বড় বড় দরজা জানালাগুলোর কোন কপাট নাই। এক পাশে চওড়া সিড়ি দোতলায় উঠে গেছে। সিড়ির রেলিংএ আশ্চর্য্য সুন্দর কাজ করা। রেলিংএর কাঠের অংশ কিছু কিছু এখনো রয়ে গেছে। মার্বেলের মত মোজাইক করা মেঝে আর সিড়ি বহুদিনের ধুলো ময়লার আস্তরনে ঢেকে আছে। তবে দেখলেই বোঝা যায় অনেক যত্ন নিয়ে আর অনেক খরচ করেই এক সময় বাড়িটা তৈরি করা হয়েছিল। কয়েক যায়গায় পলেস্তরা খসে গিয়ে ইট দেখা যাচ্ছিল। ইটগুলো সাধারণ ইটের মতো না। সময় বেশি নাই, তাই চট করে দোতলাটা ঘুরে আসলাম দুইজনে। দোতলার বড় বড় ঘরগুলো আর বিরাট চওড়া খোলা বারান্দাগুলিও দেখার মতো সুন্দর।

    সিড়ি দিয়ে নামতে যাব এমন সময় সিড়ির নিচে একটা মহিলাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভুত দেখার মত চমকে উঠলাম। সর সর করে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল। কাউকে দেখবো বলে একদমই আশা করিনি। না ভূত টুত কিছু না, নিতান্তই দরিদ্র শ্রেণীর একজন মহিলা।

    মহিলাটাও মনে হলো ভয় পেয়েছে, কাঁপা গলায় চাঁটগাইয়া ভাষায় জিজ্ঞেস করলো, আপনারা কে, এইখানে কেন আসছেন। ততক্ষণে একটা বুড়ো লোক এসে মহিলার পাশে দাড়িয়েছে। আমার বন্ধু বুঝিয়ে বললো আমরা বেড়াতে বেড়াতে এদিকে চলেএসেছি। লোকটা বললো আপনারা কাজটা ভালো করেন নাই। এই বাড়িতে নাকি অনেকেই ভয় পেয়েছে। পরে তার মুখে এই বাড়ির ইতিহাস শুনলাম। এক ধনী জাহাজ ব্যবসায়ী নাকি সখ করে এই বাড়িটা বানায়। এই পাহাড়টায় নাকি এক দরবেশের কবর ছিলো, বাড়ি বানানোর সময় নাকি কবরটা ওই ব্যবসায়ীর হুকুমে ভেঙ্গে ফেলা হয়। পরে নাকি সেই দরবেশ স্বপ্নে দেখা দিয়ে তাকে বলে আমি এখানেই থাকবো কিন্তু তুই বা তোর পরিবারের কেউ এই বাড়িতে বাস করতে পারবি না। আরো কত কি সব বলে গেল। লোকটার গল্প শুনে আমার হাঁসি পাচ্ছিল ভিষন। এই কবর ভেঙ্গে ফেলে, বাড়ি বানানো আর ফকির দরবেশের অভিশাপ, এই একই কাহিনী কতবার যে শুনতে হয়েছে। বন্ধুকে তাড়া দিলাম। অন্ধকার হয়ে আসছে, যেতে হবে অনেকটা পথ। ফিরতি পথ ধরার আগে বাড়িটার চারদিকটা একবার ঘুরে দেখবার জন্য বাড়ির পেছন দিকটায় গেলাম। লোকটা বলছিলো বাড়িটার পেছন দিকে নাকি মাটির নিচে একটা ঘর আছে। আবছা আলোয় দেখলাম সত্যি বাড়ির পেছনের দেয়ালে চার ফুট মত উঁচু একটা লোহার পাল্লা দেয়া দরজা দেখা যাচ্ছে। কেন এই রকম একটা ঘর তৈরি করা হলো? একটু ভয় ভয় করছিলো। এই রকম নির্জন পাহাড়ে এমন একটা বাড়ি, তার আবার মাটির নিচে ঘর। বুড়ো লোকটাকে সেই কথা জিজ্ঞেস করতে গিয়ে দেখি সে চলে গেছে। আশেপাশে ওই বুড়ো আর তার সাথের মহিলাটা ছাড়া আর কোন মানুষ জন নেই। সন্ধ্যাও হয়ে আসছে। ভয় করছিলো আবার মাটির নিচের ঘরটা একবার দেখার খুব ইচ্ছাও হচ্ছিলো। আলো খুবই কম। দরজাটা আধখোলা হয়েই ছিলো। ঠেলা দিয়ে আর একটু খুলে ভেতরে উঁকি দিলাম দুইজন। দেখলাম একটা সিড়ি নেমে গেছে নিচ পর্যন্ত।

    এরপর যেটা দেখলাম সেরকম কিছু দেখার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। আবছা আলোয় দেখলাম পাঁচ-ছয় ফিট নিচে মেঝের উপর মনুষ্যাকৃতির কিছু একটা হেঁটে বেড়াচ্ছে। হু হু করে একটা শব্দ হচ্ছিলো। আমরা উঁকি দিতেই খ্যাক করে একটা শব্দ শুনলাম। মনে হলো ওই জিনিষটা আমাদের দেখতে পেয়েছে। প্রচন্ড আতঙ্কে মাথার চুল দাঁড়িয়ে গিয়েছিল মনে হয়। দুইজন ছিটকে সরে আসলাম। কোন রকমে বাড়ির সীমানা পার হয়ে হোচট খেতে খেতে রাস্তা ধরে নেমে এলাম। পিছন ফিরে আর তাকানোর সাহস হচ্ছিল না। ওই বয়সে ভয় পাবার অনেক অভিজ্ঞতাই হয়েছে, কিন্তু এমন সাংঘাতিক ভয় আর কোন সময় পাইনি।

    পরে এটা নিয়ে অনেক চিন্তা করেছি। ওইটা আসলে কি ছিলো? আসলেই কি মানুষের মত কিছু? নাকি বড় কোন কুকুর বা শেয়াল। কিন্তু কুকুর শেয়াল কি দু-পায়ে হাঁটতে পারে? আর সেই বাড়িটায় যাই নি। ওই মহিলা আর বুড়ো লোকটা কিভাবে সেখানে থাকে? ওরা আসলে কারা। সেটা আর কোন দিন জানা হয়নি।

    7
    4 Comments
Skip to toolbar