-
সমুদ্রের সান্নিধ্য
———————————————–
আশির দশকের মাঝামাঝি একটা সময়। সবে মাত্র ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে অখন্ড অবসরে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে ফিরছি। দেহ মনে তারুণ্যের উদ্দীপনা, দিনগুলো যেন হাওয়ায় ভেসে চলেছে। বন্ধুর যেন শেষ নেই। বন্ধুর বন্ধু, তার বন্ধু, সবাই তারা আপন। নিজের একটা সাইকেল থাকাতে আরো সুবিধা, ঢাকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলে যাওয়ায় কোন বাধাই নেই। কখনো পুরোনো ঢাকার কোন নড়বড়ে ভাঙ্গা বাড়ির ছাদে, কখনো পরিত্যক্ত কোনো অফিস ঘরে আবার কখনো খোলা মাঠে চলতো দিন ভর আড্ডা।মহাখালী ডিওএইচএস এর পাশে রেল লাইনের ধারে বসে দেখতাম রেল লাইন ঘেষা বস্তির খোলার ঘরে সাহেব আলির আড্ডায় গাজা খেয়ে চোখ মুখ লাল করে লোক জন বেরোচ্ছে। তাদের কাজ কারবার দেখে আমরা খুবই মজা পেতাম। সেই সাহেব আলির প্রসাদ আমরাও যে দু-এক বার পাইনি, সেটা বললে মিথ্যে বলা হবে। আবার মামার বাসার ছাদে সমবয়সী মামাতো ভাই আর পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে তাসের আড্ডাও চলতো। এর মধ্যে একজন আবার তিন তাসের খেলা আমদানি করলো, যেটা ছিল খাঁটি জুয়া। আমরাও চার আনা আট আনা কবুল করে খেলা শুরু করে দিলাম। অর্থাৎ ষোলো কলার কোনো কলাই আর বাকি থাকলো না। দেখলাম যে এই খেলাটা নেশার মত আমাদের পেয়ে বসেছে। কি ভাবে এর থেকে রেহাই পেলাম সে এক মজার কাহিনী। যখন দেখলাম খেলার নেশায় আমাদের নাওয়া-খাওয়া কাজ-কর্ম সব মাথায় উঠে যাচ্ছে, তখন বাধ্য হয়ে লাগাম টানতে হলো।
এক দিন খেলার সময় তাস ভাঁজ করার ছল করে সবার কাছে ভালো ভালো তাস বেঁটে দিলাম। কেউ বুঝতে পারলো না আমার জোচ্চুরি। আমি রাখলাম সবচেয়ে ভালো তাস, তিন টেক্কা। চার জনে খেলা হচ্ছিল। একজন পেল, তিন বিবি, একজন সাহেব, বিবি গোলামের রানিং আর একজন পেল একই রঙের রানিং তাস। মনে রাখতে হবে আমরা তখনো এই খেলায় অভ্যস্ত না। ভালো তাস পেয়ে নির্বিকার থাকা আমরা তখনো শিখিনি। সবার চোখ মুখ জ্বল জ্বল করে উঠলো তাস দেখে। আমি আঁড় চোখে দেখছিলাম তাদের অভিব্যাক্তি। ভীষন হাঁসি পাচ্ছিলো, কিন্তু হাঁসলেই তো সব পন্ড হবে, কোন রকমে হাঁসি চেপে খেলতে লাগলাম। আমরা মামা বাড়ির ছাদে খেলতে বসেছিলাম। বিকালের ঠান্ডা মিষ্টি রোদেও দেখি সবাই ভীষণ রকম ঘামছে। তাসগুলো যখের ধনের মত বুকে চেপে বোর্ডে টাকার অংক বাড়িয়ে চলেছে। চার আনা আট আনার খেলা হলেও বোর্ডে তখন ১০০ টাকা ছুই ছুই। কারো কাছেই আর টাকা নেই, কিন্তু কেউ তাস শো করছে না। সবার চোখ মুখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। শেষ পযন্ত আমি হো হো করে হেসে উঠে হাতের তাস দেখিয়ে দিলাম। সবার তো চোখ কপালে উঠলো, এটা কিভাবে সম্ভব। ততক্ষণে তারা আমার জোচ্চুরি ধরে ফেলেছে। সবাই মারমুখো হয়ে উঠে দাড়াতে আমি ছুটে ছাদের এক প্রান্তে গিয়ে দাড়ালাম। পরে অবশ্য পুরো ব্যপারটা ভীষণ হাঁসাহাসির মধ্যে শেষ হলো। ঠিক করলাম এই খেলা আর না, এইবার অন্য কিছুতে মন দেই।
সেখানে আমাদের সাথে ছিলো আমার এক মামাতো ভাই, আর দুই জন পাড়ার বন্ধু। তারা সবাই ছিলো খুব কাছের মানুষ, প্রাণের মানুষ। আমরা ঠিক করলাম একবার ঢাকা ছেড়ে বাইরে কোন যায়গায় যাওয়া দরকার। ঢাকাটা ভীষণ এক ঘেয়ে হয়ে গেছে। তখনি ঠিক করলাম সমুদ্র দেখতে যাবো। আমাদের মধ্যে দুই জনের তখনো সমুদ্র দেখার অভিজ্ঞতা হয়নি। আমি অবশ্য আব্বার চাকুরীর সুবাদে চট্টগ্রাম থাকার ফলে বেশ অনেকবারই সমুদ্রের কাছা কাছি হয়েছি। কক্সবাজার, পতাঙ্গা আর ফৌজদার হাট অনেক বার গিয়েছি। সমুদ্রের সান্নিধ্য আমাকে সবসময়ই আনন্দ দেয়। বন্ধুদের মধ্যে যারা সমুদ্র দেখেনি তাদের উৎসাহই ছিল বেশী। ঠিক হলো কক্সবাজার যেতে হবে। কিন্তু বললেই তো আর হলো না, ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়া, সেখানে থাকা আবার সেখান থেকে ফিরে আসা, সে এক বিরাট খরচের ধাক্কা। এই দিকে আমাদের পকেট তো সবসময় গড়ের মাঠ। বন্ধুদের মধ্যে একজন বললো তার কাছে জমানো দেড় হাজার টাকা আছে, সেটা সে খরচ করবে। আরেক জন বললো চেষ্টা করলে সেও কিছু জোগাড় করতে পারবে। আমার মামাতো ভাইটা বললো সে কয়েকশ টাকা তার মায়ের কাছ থেকে চেয়ে নিতে পারবে। বাকি থাকলাম আমি। বাসায় তুমুল হট্টোগোল করে আমিও কয়েকশ টাকা জোগাড় করে ফেললাম। এত চেষ্টা করেও সর্বসাকুল্যে আমাদের কাছে মোট আড়াই হাজার টাকাও জোগাড় হলো না। কিন্তু আমরা দমলাম না। মামাতো ভাইএর এক ফুফা তখন ছিলো কক্সবাজারে জেলের সুপারিনটেন্ডেন্ট। ঠিক হলো থাকার ব্যবস্থাটা ওখানেই করা যাবে। জেলেই থাকবো না হয়। সবচেয়ে সস্তা খাবার খাবো আর ঘোরাঘুরি সব পায়ে হেঁটে। এর মধ্যে আমার আরেক কলেজের বন্ধুও এসে যোগ দিলো, অবশ্য খালি পকেটে। তাকেও সাথে নেওয়া ঠিক হলো। পূর্ণ উদ্যমে লেগে গেলাম জোগাড় যন্ত্র করার কাজে। সবার বাড়িতেই অবশ্য এইটা নিয়ে বেশ হইচই হলো, তবে আমাদের দমাতে পারলো না। আব্বা রেলওয়েতে চাকরী করার জন্য রিটায়ারমেন্টের পরেও পরিবারের জন্য রেলভ্রমনের পাশ পেত। তবে তা ফ্যামিলি পাশ। তবে রেলওয়ের আরেকটা সুন্দর সিস্টেম ছিলো। চাকুরীরত অথবা পেনশনপ্রাপ্ত অফিসাররা আবেদন সাপেক্ষে পিটিও বা এক তৃতীয়াংশ খরচে টিকিট কিনতে পারতো। আমি সেটাই করলাম। আব্বাকে বলে কয়ে আমাদের পাঁচজনের জন্য পিটিও জোগাড় করলাম। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের তৃতীয় শ্রেণীর টিকিট। সাধারণ মূল্য ৪৫ টাকা, আমরা পেলাম ১৫টাকা করে প্রতিজনের জন্য। অর্থাৎ আমাদের পাঁচজনের ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যাবার খরচ মাত্র ৭৫টাকা। জিনিষপত্র বেশি নিলাম না। সবার সাথে একটা করে ছোট ব্যাগ। বাড়তি জিনিষের মধ্যে ছিলো দুইটা গিটার। আমার আর আমার কলেজের বন্ধুটির গিটার বাজিয়ে গান গাওয়ার বদভ্যাস ছিল যার জন্য এই গিটারের বাড়তি ঝামেলা। সমুদ্রের পারে বসে গিটার বাজিয়ে গান গাইবো, চিন্তা করতেই রোমাঞ্চ অনুভব করতাম। গিটারের আবার কোন কভার ছিলনা, হাতে হাতে নিতে হবে।
যাই হোক একদিন সকাল সকাল রওয়ানা হয়ে গেলাম কমলাপুরের উদ্দেশ্যে। তখনো আমাদের রেলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভ্রমনের কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। কর্ণফুলি এক্সপ্রেসের এক তৃতীয় শ্রেণীর কম্পার্টমেন্টে উঠতে গিয়ে দেখি, ও বাবা এ যে অসম্ভব ব্যাপার। গাড়ি ছাড়ার বেশি দেরি নেই, এদিকে আমরা কামরায় উঠতেই পারছি না ভিড়ের চাপে। সাথের গিটারগুলো সবথেকে বিপদ ডেকে আনলো। কোনক্রমে দুইজন মালপত্র নিয়ে ভিতরে ঢুকতে পারলেও আমি আর সাথের দুইজন গাড়ির দরজা পার হতে পারলাম না। গিটার সহ ঝুলতে লাগলাম প্রায় পুরো শরীর বাইরে রেখে। আশে পাশের যাত্রীরা গিটারসহ আমাদেরকে দেখে বেশ মজা পেয়ে গেছে। নানা রকম মন্তব্যের সাথে কয়েকজন অবশ্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলো। এক সময় গাড়ি তো ছাড়লো আর আমরাও ঝুলতে ঝুলতে চললাম। আমাদের সেই ঝুলনযাত্রা অবশ্য খুব খারাপ লাগছিলো না, কারণ দেখলাম পাশের ফার্স্টক্লাস কম্পার্টমেন্টে একটা ছোট মেয়ে জানালা দিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে কি যেন বলছে আর হাঁসছে। আমরাও হাঁসলাম। এর পর আমাদের অবাক করে দিয়ে আরো দুইজন খুব সম্ভব কলেজে পড়া সুন্দরী জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে আমাদের দেখতে লাগলো, মুখে মৃদু হাঁসি। আমাদের আর পায় কে। সেই ছোট মেয়েটার সাথে আমরা ইশারায় কথা শুরু করলাম। বড় মেয়েগুলো মনে হয় আমাদের সম্পর্কে তার বাবা মার সাথে কিছু বলে থাকবে। গাড়ি তখন নরসিংদী এসে থেমেছে। ছোট মেয়েটা আমাদের ডাক দিলো। আমরা তাড়াতাড়ি নেমে ওর কাছে গেলে সে বললো বাবা বলেছে তোমরা এই ভাবে দরজায় না ঝুলে আমাদের কম্পার্টমেন্টে চলে এসো। না চাইতে এইরকম আপ্যায়ন কোনদিন পেয়েছি বলে মনে করতে পারলাম না। তাড়াতাড়ি আমরা যারা ঝুলছিলাম, পাশের কামরার দরজা খুলে একদম ফাঁকা যায়গায় উঠে আসলাম। এতক্ষণ গিটার নিয়ে ঝোলার জন্য হাত টন টন করছিল। তখন উপলব্ধি করলাম এই রকম ঝুলে ঝুলে আর বেশিক্ষণ থাকা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমরা ফার্স্টক্লাস কম্পার্টমেন্টের দরজায় দাড়িয়ে ছিলাম। বড় মেয়েগুলো কিন্তু কাছে আসলো না, তবে ছোট মেয়েটার মাধ্যমে আমাদের খোজখবর নিতে লাগলো। আমরা কোথায় থাকি, কোথায় যাচ্ছি, চট্টগ্রামে কেউ আছে কিনা এইসব খবর তাদের জানা হয়ে গেল। আমরাও জানলাম তারা চট্টগ্রামেরই বাসীন্দা, ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। কি সুন্দর এই পথের পরিচয়। একসময় চট্টগ্রাম এসে পৌছালাম। তখন বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যা নেমে আসছে। স্টেশনে নেমে ছোট মেয়েটার মাধ্যমে ওদেরকে ধন্যবাদ জানালাম। বড় মেয়ে দুটোও ছোট্ট করে হেসে হাঁত নাড়লো। ঠিকানা দেয়া নেয়া হলো না। হারিয়ে গেল আমাদের ত্রাণকর্তারা জনারণ্যে। আমরাও জিনিষপত্র নিয়ে আমাদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম।
চট্টগ্রামে আমার বন্ধুর এক আত্মীয়র বাসায় কোন রকমে রাতটা কাটিয়ে পরদিন সকালে রওয়ানা দিলাম কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। আমরা একটা মোটামুটি ভালো বাস পেয়েছিলাম। রাস্তাও সুন্দর। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার মোটামুটি ৯০ কিলোমিটার। বাসে আর তেমন কিছু হলো না। শুধু আমরা সিগারেট খাচ্ছি দেখে দুয়েক জন মৃদু আপত্তি জানিয়েছিলো, আমরা বেশি পাত্তা দিলাম না। সাথে গিটার দেখে মনে হয় ওরা আর বেশি কিছু বললো না। হয়তো ভাবলো আমরা কোন শিল্পীগোষ্ঠীর সদস্য। কক্সবাজার পৌছে সেই জেল সুপারিনটেন্ডেন্টের বাসা খুঁজে মালপত্র রেখে বের হতে হতে সন্ধ্যা পার হয়ে রাত নেমে আসলো। আমরা তাড়াতাড়ি সমুদ্র দেখতে চললাম।
আমরা যখন বেলাভূমিতে এসে পৌছালাম ততক্ষণে অন্ধকারে দেখার আর বিশেষ কিছু ছিলো না। তখন সমুদ্রে জোয়ার এসেছে। আকাশটাও মেঘলা। ভয়ঙ্কর গর্জনে ফসফরাসের মালা পরে ঢেউগুলো অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের কয়েক ফুট দূরে আছড়ে পড়ছিলো। রীতিমত ভয় ধরানো অনুভুতি। আমরা দাড়িয়ে রইলাম সেই বিশালত্যের সামনে নির্বাক হয়ে। আমার মনে হচ্ছিলো ঢেউগুলো যেন আমাদের পা ছুঁয়ে যাবার জন্য আরো এগিয়ে আসছে। যেন বলছে কেউ কি এসেছো? দেখেছো আমাকে? কেউ কি আছো………
4 Comments
Friends
কবি মোঃ সামিদুল ইসলাম
@samidul
Santo Chowdhury
@santo-chowdhury
নাহিদ হাসান নয়ন
@nahid-hasan-noyon
মিথিলা কনক
@methila06
সৈয়দ তারেক শাহরিয়ার
@shahriar-protik
মোঃ আব্বাস উদ্দীন ধ্রুব।
@dhrubo-abbas
আব্দুল মজিদ মারুফ
@abdulmojid
Pritam Biswas
@pritam-biswas


মনে হল এই মাত্র ঢাকা থেকে ঘুরে আসলাম। চমৎকার লিখেছেন।