Profile Photo

আবির হাসান সায়েমOffline

  • Abir-Hassan-Sayem
  • একমুঠো জোনাকি (পর্ব-১৬)
    ~ আবির হাসান সায়েম

    #ধারাবাহিক

    গাড়ি থেকে নামলাম। সাদা দু’তলা ডুপ্লেক্স বাড়ি। বাংলোবাড়িও বলা যায়। ঢাকা শহরে এইরকম বাড়ি আরেকটা আছে নাকি কে জানে। শিলা এসে আমাকে ভিতরে নিয়ে গেলো। আমি বললাম,
    “আমার মাথাটা ঝিমঝিম করছে। আমি একটু শোব। ”
    শিলা চঞ্চল চোখে বলল,
    “হ্যা তোর জন্যে ঘর রেডি করা আছে। দু’তলায়। নিড়িবিলি একদম। ”
    শিলা আমাকে দোতোলায় নিয়ে গেলো৷ রুমটা আলোতে গিজগিজ করছে৷ বাইরের আকাশে তেমন আলো নেই। তবে ঘরে এতো আলো এলো কত্থেকে? ঘরে তো কোনো বাত্বিও জ্বলছে না। আমি বিছানায় শুয়ে পরলাম।
    “শিলা ঘরে এতো আলো কেন?”
    ” বাবা জাপান থেকে অটো স্মার্ট হোম নামের কি যেনো এনেছেন। ঘরের আনাচে কানাচে লাইট লাগানো চোখে পরে না। কিন্তু ঘরের আলো কমে গেলে অটমেটিক লাইট জ্বলে উঠে। ”
    “ওহ আচ্ছা। আলো কি কমিয়ে দেয়া যায়? আমার চোখে লাগছে। আর জানালাটা খুলে দে। ”
    ” জানালা খুলে দিলে তো বৃষ্টির ছিটা তোর গায়ে এসে লাগবে। ”
    “লাগুক। তুই খুলে দে। ”
    ” আচ্ছা৷ তুমি ঘুমো। ”
    ঘরের পশ্চিম দিকে বিশাল একটা জানালা। কি দারুণ একটা ব্যাপার! দেখলেই মনটা ভালো হয়ে যায়। জানালা খুলে দেয়ার সাথে সাথে এক সমুদ্র ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢুকে পরল। শিলা ঘরের আলো কমিয়ে দিয়ে চলে গেলো। হালকা বৃষ্টির ছাট এসে পরছে চোখে। কি ঠান্ডা৷ কি ঠান্ডা।
    অতি মিষ্টি মৃদু একটা ডাকে ঘুম ভেঙে গেলো। আমি চোখ মেললাম না৷ কন্ঠটা আমার বেশ পরিচিত। শিলার কন্ঠ। আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আবার বলল,
    “আবীর ওঠ। কিছু খাবি না? আবীর। ”
    আমি চোখ মেললাম। জানালার শিক গলে জোছনা এসে পরেছে আমার বিছানার অর্ধেকটা জুড়ে। বিকালে কি বৃষ্টি ছিলো,এখন কি সুন্দর চাঁদ উঠেছে আকাশে। জোছনা ঘরের অর্ধেকটা আলোকিত আর বাকি অংশটুকুতে নিকোষ কালো আধার।
    শুয়ে থেকেই আমি বললাম,
    “কয়টা বাজে শিলা?”
    ” আড়াইটা বাজে। ”
    “এতো রাত হয়ে গেছে। তুই এতো রাতে এখানে বসে আছিস কেনো?”
    ” তুই রাতে কিছু খাস নি। আর ঘুম আসছিলো না তাই..”
    ” তোর সামনে বিয়ে এসব করলে খালা -খালু কি মনে করবে?”
    “কেও কিছুই মনে করবে না। তারা একটু আগেই ঘুমাতে গিয়েছে। ফরিদ তাদেরকে বসিয়ে ছড়া, নামতা,গল্প সব শুনিয়েছে। ফরিদ তো তোর ভক্ত হয়ে গেছে ৷ ”
    আমি হালকা হেসে বললাম,
    “হ্যা বেশ ভালো ছেলে ব্রেনও বেশ ভালো। ”
    “হ্যা। ”
    “অনেক্ষন ঘুমিয়েছি। শরীরটা লড়তে চাচ্ছে না। ”
    ” হ্যা,বিশাল একটা ঘুম দিয়েছিস। ওঠ স্যুপ খেয়ে নে। ”
    আমি হালকা একটু উঠে বসলাম। শিলা গরম স্যুপ চামচে নিয়ে ফু দিচ্ছে৷ আমি বললাম,
    “বাটি আমাকে দে। আমি নিজেই খেতে পারব। ”
    ” আমি খাইয়্যে দিলে খুব সমস্যা? ”
    ” না মানে….।”
    শিলা মুচকি হেসে বলল,
    “ওহ আচ্ছা,আমার ফু এর সাথে অনেকগুলো জীবাণু যাচ্ছে তাই না?”
    “ঠিক, তুই তো নাগীন। তোর ফু এর সাথে বিষ বেড়ুবে। ”
    আমি আর শিলা দু’জনই হাসছি। শিলা স্যুপ মুখে তুলে খাইয়্যে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর আমি বললাম,
    ” কালকে সকালে আমি বাসায় চলে যাবো। ”
    “কেনো? ”
    “এইখানে থাকলে তুই বারবার আসবি। সারাদিন আমার কাছে বসে থাকবি। মায়ার হাত বারবার বাড়িয়ে দিবি। মেয়েদের এই মায়াকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা এই পৃথিবী’র কারোর নেই। ”
    “তুই বাসায় গেলে খাবি কি? রাধবে কে? সময়মতো ঔষধ এগিয়ে দিবে কে?”
    “জানি না। ”
    “তুই এখানেই থাকবি। আমি দিনে দু’বার দুইঘন্টা’র জন্য আসব৷ তাহলে চলবে?”
    একটু হাসলাম আমি কিছু বললাম না। শিলা স্যুপের খালি বাটি নিয়ে উঠে গেলো। চাঁদ আস্তে আস্তে পুরো ঘরটাকেই জোছনা দিয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে।
    শিলা আমার পাশে এসে বসল। আমি মুখে কিছুটা গাম্ভীর্য আনার ব্যার্থ চেষ্টা করে বললাম,
    ” তোকে একটা কথা বলা খুব দরকার। ”
    “কি বল৷ ”
    ” মানুষ সবার মধ্যেই তার পছন্দের মানুষের ছায়া খুজে ফিরে। বারোদিন পরে তোর নিলয়ের সাথে বিয়ে হবে৷ বিয়ের পর তুই নিলয়ের মধ্যে আমার ছায়া খুজে বেড়াবি এবং একটা সময় পর হতাশ হয়ে পরবি কারণ ওর মধ্যে আমার ছায়া অনুপস্থিত। কারো মধ্যেই কারো ছায়া পাওয়া সম্ভব না৷ আমরা সবাই আলাদা আলাদা মানুষ। এইসব আমরা জানি। জেনেও কেনো জানি ভুলগুলো করে ফেলি। আমি চাই তুই যাতে এই ভুলটা না করিস। ”
    “ওহ আচ্ছা ঠিক আছে। ”
    কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর শিলা কেদে উঠল। বিয়ের আগে মেয়েরা কারণে-অকারণে কাঁদে। শিলা মাথা নীচু করে কাদছে,আলগোছে চুলগুলো মুখের সামনে এলিয়ে পরেছে। জোছনার ছায়া ঠিক পরেছে শিলার মুখের উপর। চোখের জলও জোছনার আলোতে হীরে’র মতো চকচক করছে৷ এতো রূপবতী দৃশ্য আমি আমার জীবনে দেখেছি কিনা জানি না৷ আমি শিল্পী হলে একটা পোর্ট্রেট একে ফেলতাম। আমি শিলাকে টেনে এনে পাশে বসালাম। শিলা মাথাটা আমার কাধে নুইয়ে দিলো। পৃথিবী জুড়ে এতো মায়া। এতো মায়া!

    চলবে..

    3
    2 Comments
Skip to toolbar