Profile Photo

অভিমানী মনOffline

  • ovimanimon
  • Profile picture of অভিমানী মন

    অভিমানী মন

    3 years, 11 months ago

    বৃষ্টিকে মনে হয় হানাদার

    যুদ্ধ কোনো সহজ ঘটনা না। অস্ত্রকারবারিদের নির্মম খেলা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিলো আমাদের উপর।
    কর্ণফুলি পেপার ও রেওয়ান মিল অবাঙালী দাউদ কোম্পানির সম্পত্তি হওয়ায় যুদ্ধের শুরুতে সেনাবাহিনী চন্দ্রঘোনায় ঘাঁটি গাড়ে।
    মিলগেটের তল্লাশি এড়ানোর জন্য মা আমাদের নিয়ে স্কুলের পিছনের পাহাড় ডিঙিয়ে নিস্তব্ধ বনপথে দোভাষী বাজারের দিকে এগোয়।
    স্বচ্ছ জলের ছড়ির ভেজা বালুকায় পা ফেলে আমরা হাটতে থাকি। বসন্তের বাতাসে বুনোগন্ধ বহে আর হাজারো প্রজাপতি ওড়ে, ফড়িং লাফঝাপ দেয়।
    মিশন হাসপাতালের পিছন দিয়ে যখন নার্সদের কোয়ার্টার অতিক্রম করি তখন দেখি, চারপা বেঁধে বাঁশের ভাড়ে ঝুলিয়ে কয়েকজন পাহাড়ি একটা বুনো শুয়োর নিয়ে যাচ্ছে। আর প্রানিটা বিকট শব্দ তুলে চরাচরের স্তব্ধতা এমন করুনভাবে ভেঙে দেয়, বুক কেঁপে ওঠে।
    আমাদের দেখে সাদা পোশাক পরা পরীদের মতন কয়েকজন এ্যংলো নার্স এগিয়ে এসে জানতে চায়–তোমরা কোথায় চলিয়াছ?
    মা বলে–জানিনা। দেশের বাড়ি যাবো বলে বের হইছি।
    নার্সরা বলে–ঈশ্বর তোমাদের সহায় হোক।
    একজন আমার মাথায় হাত বুলিয়ে যীশুর নামজপ করে।
    পাহাড়ঘেরা চন্দ্রঘোনা এক আশ্চর্য ছোট্ট শহর। শুধু ছবির মতন দেখতে নয়; এখানে ইংরেজ, এ্যংলো, চাকমা, মার্মা, নানান জেলার বাঙালি; ধর্ম-বর্ন নির্বিশেষে অভেদ-জ্ঞানে আপনজনের মতো বসবাস করছিলাম।
    যুদ্ধ এসে আমাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
    যেপথ দিয়ে আমরা স্কুলে যেতাম; সাইরেণ শুনে শ্রমিক কর্মচারীরা মিলের দিকে ছুটতো; সেইসব পথঘাট দখলে নেয় পাঞ্জাবি হানাদার বাহিনী।
    যুদ্ধের শুরুতে ওরা মিলের অনেক কর্মী ধরে নিয়ে যায়। শুনি, লিচুবাগানের দোকানপাট পুড়িয়ে দিয়েছে।
    যুদ্ধের ভিতর জনজীবনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া ছিলো হানাদারদের মোক্ষম কৌশল। এই ভয় থেকে আমরা যখন হাসপাতালের মাঠ পেরিয়ে দোভাষী বাজারে প্রবেশ করি, তখন চৈত্রের আকাশ কালোমেঘে ঢেকে গিয়ে ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়।
    বড়বড় ফোটার এমন তুমুল বর্ষণ! বৃষ্টিকেই মনে হয় হানাদার।
    পাঞ্জাবিদের ভয়ে শুনশান নির্জন বাজার বৃষ্টির তোড়ে আরো বিষন্ন হয়ে যায়।
    ইলেকট্রিক তারে কয়েকটি কাক ভিজে চুপসে থাকে।
    জনহীন কাঁচা বাজারের আটচালালায় কয়েকটি কুকুর বৃষ্টির মধ্যে হুহু বিলাপ জুড়ে দেয়।
    আমরা একটু এগিয়ে বাবার এক বন্ধুর কাপড়ের দোকানে ঢুকে পড়ি।
    কর্ণফুলির তীরঘেঁষে বড়বড় খুঁটির উপর একসারি দোকান। পেছনের ঘরে হিন্দু কাকুটার বাসতঘর। ওনার একটা ছেলে আমার বয়সি। কাকীটা মিষ্টি দেখতে। কপালে লেপ্টানো সিঁদুর।
    কাকী আমাদের পেছনের ঘরে নিয়ে গিয়ে গুড়মুড়ি খেতে দেয়।
    স্মৃতি এতো প্রতারক, আজ আর কারো নামধাম মনে পড়ে না।
    পেছনের জানালায় উঁকি দিয়ে দেখি, বৃষ্টি থেমে গিয়ে কর্ণফুলির বুকে রোদ চিকচিক করছে।
    ওপারে রায়খালি বাজার।
    *চলবে…

    25
    15 Comments
Skip to toolbar