Profile Photo

ঠিকানাহীন অরণ্যOffline

  • Vobertale.aranna
  • জোছনা
    -‘আজ জোছনাটা কেন জোর করে জানালা ফুরে ভেতরে আসতে চাইছে জানো?’
    অন্তিকা জানে অরন্য কি বলবে, কি আর বলবে, অভিধানে পাওয়া যায়না এমন শব্দ আবিস্কার করে তা দিয়ে প্রশংসা মালা গাঁথবে যেমন ফুলের মালা গাঁথে বাছা ফুল দিয়ে একটা একটা করে। বেলীর মালা, উহুঁ! গাঁদা ফুলের মালা অন্তিকার দারুন পছন্দ।

    কমলা শাড়িতে সেদিন এলিফেন্ট রোডের কোন এক অচেনা দোকান থেকে কেনা গাঁদা ফুলের খোপা কিনলো, অন্তিকা বলে এটা নাকি চুলের মালা, একবার বলে ফেলেছিলো মালা ব্যাস হয়েছে এখন সে আর খোপা বলবেইনা,উলটো ভাষাবিদদের এখন মালা বলতে হবে, খোপা বলা যাবেনা। ও খুব জেদী, অরন্য ছাড়া ওর আছেই বা কে!

    গাঁদা ফুলের খোপা মাথায় দিয়ে কমলা শাড়ি পড়ে যখন ও হাটছিলো তখন অরণ্য ওর দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিলো। অরণ্যের জন্যই ওর সাজুগুজু করা। সমস্ত ভালো লাগাটুকু ও অরন্যকেই দিতে চায়।
    আকাশের বিশালতায় উড়তে থাকা নীলাভ ভাসমান মেঘমালার মতো সুন্দর করে অরন্য অন্তিকার দিকে তাকিয়ে থাকে। আসলে ওই মেঘমালাটা অন্তিকার মুখ ঠিকরেই যেন বের হয়!

    হাতটা বাংলা ছবির নায়কদের মতো দু পাশে মেলে দিয়ে অরন্য বলে ‘ফিদা হয়ে গেলাম!’
    মুখটায় লাস্যময়ী হাসি দিয়ে হুহ করে একটা বাঁকা চাহনী দেয় অন্তিকা। বয়েই গেছে ওর, এইতো কিছুলষন আগে একটা স্মার্ট ছেলে অন্তিকার দিকে তাকিয়ে ‘জোশ’ বলে মন্তব্য করলো। সে যাই বলো হোক সত্য বা মিথ্যে প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে!

    অন্তিকারও ভালো লাগছিলো। সূর্যাস্ত গড়িয়ে সন্ধে এলো। একফালি চাঁদ উঁকি দিয়ে নিজের আলোকে ঠেলে পাঠিয়ে দিলো বিস্ময়ের কাছে। অরন্য-অন্তিকা, দু’জনেই মত্ত নদীর জলে স্নান করা জোছনার ছন্দের দোলায়। অজান্তেই দোলে উঠলো আলিংগনে আবদ্ধ আলপনার ঢেউ, হাওয়ার তালে তালে সুরভী ছড়িয়ে দিলো খোলা চুলগুলো। চোখাচোখি। অনেকটা কাছে। ঠান্ডাটা এখন লাগছেনা।
    রাতের কুয়াশা সরে গিয়ে তারাগুলো জায়গা করে নিয়েছে। কাঠে-লোহায় গড়া লঞ্চের কেবিনটায় অদ্ভুত যান্ত্রিক শব্দ হচ্ছে। আকাশের নিস্তদ্ধতাকে বিদ্ধ করছে জলের স্রোত। ভাসছে জোছনা, ভাসছে অরন্য আর অন্তিকা।

    লঞ্চের তলায় আছড়ে পড়ছে উত্তাল ঢেউ, অরন্যের খোলা বুকে ঢেউ তুলেছে অন্তিকার এলোমেলো চুল, আছড়ে পড়েছে আকাশ থেকে সজোরে নেমে আসা চিলের মতো, উত্তাল, উম্মত্ত, বন্য, নির্লজ্জ।

    হঠাৎ করেই চুলে হাতের পরশে কেটে যায় ঘোর। অরন্য যখন প্রশংসায় ভাসায়, প্রেম নিবেদন করে, মেলে ধরে বাহুদ্বয় তখন অন্তিকা চোখ বন্ধ করে হারিয়ে যায় আত্মা মিলনে সাড়া দিতে। স্খলিত হয় বারেবার দুজনের জোছনাময় সংসার।

    ‘না জানিনা, কেন?’
    ‘কারন সে চায় তোমার রুপের আলোতে আলোকিত হয়ে অপার সৌন্দর্য লাভ করতে।’
    ‘তাই বুঝি তুমি ইর্ষান্বিত হচ্ছো?’
    ন্যাকামো করে বললো অন্তিকা।
    অন্য সময় হলে ন্যাকামো করতোনা, ও এমন মেয়ে নয়, হৃদয়টা বিশাল হলেও মুখটা চাছাছোলা, সবসময় না আবার, যখন সে রেগে যায় তখন তার গান, কন্ঠ আর চেহারার সাথে ভাষা ও শব্দচয়নের আকাশ-পাতাল ব্যবধান। যাকগে, গোলাপ ফুল ছুঁতে গেলে কাঁটার আঁচর খেতেই হবে। অন্তিকাকে অরন্য বোঝে। ও জানে অন্তিকার বিশালতায় বিচরন করতে হলে ওর এই সামান্য আহ্লাদ, জেদ ও রাগকে প্রাধান্য দিতে হবে। তবু তর্ক লাগেনা যে একদম তা নয়।

    ওদের রসায়নটা অন্তত এমন একটা বিশালতা অতিক্রম করেছে যে ওদের বিশ্বাস আর যাই হোক, ওরা একে অপরের জন্যই জন্মেছে।

    ‘এই যে এতো স্মৃতি, এতো খুনসুটি, এতো স্বপ্ন, এতো ভালোবাসা, এগুলো কি পরিণতি পায়?
    নিয়তি, সময়, পরিণতি, এ সবকিছুই আপেক্ষিক
    হয়তো খুব বেশী কাছে থাকা দুরত্বই সৃষ্টি করে আবার মাঝে সাঝে কষ্ট করে দেখা, সামান্য মুহুর্ত বিনিময়, ভালো লাগা বিনিময়, অনুভুতি বিনিময় হয়তো আজীবন ভালো বাসিয়েই যায়। এটাই ভালবাসা। এর ভালোবাসা পরিণতির উপর নির্ভর করেনা, কেবল ভালো বেসে যায়’

    অন্তিকা কথাগুলো আপনমনে ভাবছিলো।
    -কি বললাম উত্তর দিলেনা যে! হিংসা করছো?
    – হিংসা তো জোছনা করছে, আমি কেন করবো? তুমিতো আমার কোলেই রয়েছো।

    অস্ফুট স্বরে গলা দিয়ে অন্তিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
    ‘এই যে আমরা আর এই যে ক্ষণ জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি- এই! তুমি আমাকে ভুলে যাবেনা তো?’

    -‘না ভুলবোনা, কথা দিচ্ছি’
    -‘কথা সবাই দেয়, সময় সবকিছুই ছিনিয়ে নেয়, তবু জেনে রেখো আমি মন-মননে তোমারই ছিলাম, তোমারই থাকবো।’
    – ভরসা রেখো অন্তিকা!
    -ভরসা তোমায় করি, তুমি কি বলতে পারো অনেক ভালোবাসা বুকে নিয়ে ঘর বাঁধা জুটিগুলো কেন বিচ্ছেদের অনলে শেষ হয়ে যায়?

    বলতে পারেনা অরন্য, উত্তর জানা নাই অন্তিকারও
    তবু অরন্য বুকের কাছে অন্তিকাকে চেপে ধরে বললো
    ‘শুনতে পাচ্ছো? ভালবাসি ঠিক এখান থেকেই, তোমাকে তোমার জন্যই ভালবাসি, তুমিই আমার নারী, হয়তো আমাদের রসায়নটাই অন্যরকম।’
    ‘হয়তো! ভাল লাগছে অরন্য, আমাকে আরো জড়িয়ে নাও!’
    ‘এসো!’
    ‘ভালো লাগছে অরন্য, অনেক ভালো লাগছে
    কলিজা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে- অরন্য! অরন্য!’
    অরন্যের চোখ দিয়ে জল বেয়ে অন্তিকার ঠোঁটে পড়লো।
    ‘অন্তিকা, তোমার ভালবাসায় আমি জীবন ফিরে পেয়েছি, আমি সবুজ হয়েছি, সতেজ হয়েছি, তোমাকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ, আমি নিস্তেজ, আমি মৃত।
    ভালবাসি তোমাকে!

    দু’জন দুজনকে যখন পরম পুলকে জড়িয়ে ধরলো ঠিক তখনই কোথা হতে মেঘ এসে ঢাকিয়ে দিলো চাঁদকে।

    9
    4 Comments

ঠিকানাহীন অরণ্য -

লেখক

আমি স্বত্মা সম্বলিত আত্মাবাহক মানুষ

কষ্ট চাষ করে শব্দ ভেদ করে সাহিত্য রস বের করা আমার কাজ

প্রেম আমার ধর্ম,  ন্যায়বিচারের কথা আমার যুদ্ধ

আমি চোখের ভেতর সাগর চষি উম্মাদ উম্মত্য হয়ে

জাগতিকতার যান্ত্রিকতা কি করবে আমায় নিয়ে?

আমি ভবঘুরে, আনমনে, বণ্য এক অরণ্য---

Skip to toolbar