-
এমন হত্যাকান্ড ভোলা যায় না
যুদ্ধের মধ্যে আমরা চন্দ্রঘোনা ছেড়ে রাঙ্গুনিয়া কলেজের পিছনে তৈয়ব চাচার বাড়িতে আশ্রয় নিই।
বনেদি তালুকদার বাড়ি। বড়ো উঠানের দুইপাশে দুইটা মাটির ঘর। পেছনে পুকুর আর সামনে টিনের কাচারী।
পুরুষরা কাচারীতে থাকে। মহিলারা বড় বড় ঢেগে ভাত-সালুন রাঁধে।
পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য বোঝাতে বাড়ির মাথায় চাঁনতারা পতাকা উড়িয়ে দেওেয়া হয়। কাচারীর সামনে বেঁধে রাখা হয় ইয়া বড় বলদ; যদি পাঞ্জাবিরা আসে, জবাই করে খাওয়াবে।
কিন্তু যুদ্ধ কোনো আতিথ্য বোঝে না।
খবর পাই, পাঞ্জাবিরা রোয়াজার হাট পুড়িয়ে দিয়েছে। শ্রমিককের অভাবে আংশিক বন্ধ হয়ে গেছে কর্ণফুলি পেপার মিল। গুজবের মতন খবর আসে, ফোরম্যানদের আটকে রেখে মিল চালু রাখার চেষ্টা করছে কতৃপক্ষ।
তালুকদার বাড়ির মাঠে খেলাধুলা করতে করতে আমরা কাপ্তাই রোডে মিলিটারি কনভয়ের আসা-যাওয়া দেখি। কল্পণাও করি না, এই দূরগ্রামে ওরা আসতে পারে।
কিন্তু কবি বলেছেন, যুদ্ধ মানে শত্রু শত্রু খেলা/ আমার প্রতি তোমার অবহেলা। এই চরণযুগল আমাদের শৈশবে বাস্তবরূপে দেখা দিয়েছিল।
সেদিন ছিল শুক্রবার। খরতপ্ত দুপুরে পুরুষরা জুমার নামাজ পরে বাড়ি ফেরে কেবল। শিশুরা মাত্র খেয়ে উঠেছি। এরপর পুরুষদের খাবার দেওেয়া হবে।
এমন সময় কাপ্তাই রোড থেকে মুখ ঘুরিয়ে মিলিটারির সাজোয়া গাড়িটা চৈত্রের বাতাসে ধূলো উড়িয়ে গ্রামের দিকে ছুটে আসে।
লোকজনের সঙ্গে মাঠের গরু-ছাগলও ভয়ে ছুটতে শুরু করে।
ওরা গ্রামের মুখে এসে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়লে গাছের পাখপাখালি; চড়ে বেড়ানো হাঁস-মুরগিও ভয়ে আর্তনাদ করে ওড়াউড়ি জুড়ে দেয়।
এ আমাদের দুচোখে দেখা। সবার মুখে একটাই আওয়াজ–পালাও, পালাও…।
বাড়ির লোকজন ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। মায়া আপা একটা মুরগির খোয়াড়ে ঢুকে পড়ে। শহীদকে কোলে নিয়ে আম্মা জলশূন্য পুকুরের ঘাটলার নিচে লুকায়।
আমি আর ছায়া বড়ঘরের মাঝখানে কিংকর্তব্যবিমূঢ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। ঘরের দুকোনায় বড়দুটি মটকায় ধান-চাল রাখা। উঠানে বুটের শব্দ আর উর্দু কথাবার্তা শুনতে পেয়ে দুজনে দুই মটকার আড়ালে লুকিয়ে পড়ি।
গুলির শব্দের সময় আব্বাকে দেখি, উঠান থেকে লাফিয়ে উঠে ‘সবায় পালাও, পালাও…বলে ঘরের মাঝদিয়ে পিছনের দিকে ছুটে গেল যেন।
এরপর তৈয়ব চাচা ভিতর-ঘর থেকে সামনে এসে কয়েক মূহুর্তের স্তব্ধতা ভেঙ্গে বলে–আইয়ে সাহেব, হাম তৈয়ব তালুকদার হায়…।
কথা শেষ না হতে কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ শুনি। একদম ঘরের মধ্যে। আমাদের কনের সামনে।
তৈয়ব চাচা ছিটকে গিয়ে মাটির দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে মেঝের উপর মুখ থুবড়ে পড়ে গোঙাতে থাকে।
পুরো ঘর রক্তে ভেসে যায়।
আমি আর ছায়া, দুইশিশু মটকার আড়াল থেকে এই অসম্ভব দৃশ্য দেখে ভয়ে শক্ত হয়ে যাই। #
*চলবে…11 Comments
Friends
পিপীলিকা
@abujubair
আজহারুল ইসলাম তালহা
@ajharul
Rashed Rahman Abir
@rashed-rahman-abir
নতুন করে শুরু
@amrin-shimu
Md.hazrat belal
@md-hazratbelal
Kd Rezaul Karim Hira
@kdrkh2005
Md. Nur Alam (এইচ. এম নুর আলম)
@nuralam
এম এ খায়ের
@dmpcttc
আহমেদ হানিফ
@hanif




শুভকামনা