-
দূর-বহুদূরে…
মানবহীন, ঠাণ্ডা, গ্যাসীয়, উষ্ণ, ধূলিকণাময়, অতিবেগুনী বিকিরণ, ধোঁয়াটে এবং নৈঃশব্দময় অজানা রহস্যেঘেরা অপার মহাকাশের গভীর থেকে NASA এর James Webb Space Telescope ধারণকৃত ছায়াপথগুচ্ছ বা ছায়াপথ স্তবকের (Galaxy cluster) অসাধারণ সুন্দর, সুস্পষ্ট, পূর্ণাঙ্গ রঙিন, উচ্চ নির্ণয়কর (High resolution), তীক্ষ্ণতম, অবলোহিত বিকিরণ (Infrared radiation), অবলোহিত তরঙ্গদৈর্ঘ্যের (Infrared wavelength) ঐতিহাসিক ছবিটি মানবজাতির ইতিহাসের এক বিস্ময়কর আবিষ্কার । আমি বিস্মিত! রোমাঞ্চিত । অভিভূত । অনুপ্রাণিত ।✨
বিশ্বের বৃহত্তম, ব্যয়বহুল, শক্তিশালী এবং সবচেয়ে জটিল প্রযুক্তির James Webb Space Telescope (JWST) হচ্ছে এ গ্রহের প্রধান মহাকাশ বিজ্ঞান মানমন্দির । এটিকে সংক্ষেপে Webb নামে ডাকা হয় ।জ্যোতির্বিদ্যার বিভিন্ন শাখার জন্য যেটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ৷ পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে বর্তমানে এটি মহাকাশে প্রায় ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরে একটি শূন্য বিন্দুকে প্রদক্ষিণ করছে (সূর্য-পৃথিবীর Second Lagrange Point / L2 এর কাছাকাছি) । ঐ বিন্দুতে পৃথিবী এবং সূর্যের মাধ্যাকর্ষণের (Gravity) মান সমান, ফলে এর প্রভাব যে কোনও বস্তুর উপর একই থাকে ও বস্তুটি স্থিতিশীল হয়ে যায় । এছাড়া জ্বালানি খরচও কম । Webb পৃথিবী কক্ষের বাইরে অবস্থিত হলেও একই কৌণিক গতিতে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে । তাই পৃথিবী থেকে কম দূরত্বের কারণে খুব সহজে ও দ্রুতগতিতে বৈজ্ঞানিক তথ্য সরবরাহ করছে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারী কর্মকর্তা এবং NASA তে নিযুক্ত দ্বিতীয় প্রশাসক James Edwin Webb (James E. Webb) এর নামানুসারে এই দূরবীক্ষণ যন্ত্রটির নামকরণ করা হয়েছে । এর নকশা ও নির্মাণ করতে সময় লেগেছে প্রায় ৩০ বছর এবং ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন (১০০০ কোটি) মার্কিন ডলার । জ্ঞান-বিজ্ঞান, জ্যোর্তিবিজ্ঞান, মহাকাশ অভিযাত্রা ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষতার মাধ্যমে এই নভোদুরবীন মানবজাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে ।
এই মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে প্রায় পৌণে চৌদ্দ শত কোটি বছর পূর্বেকার মহাবিশ্বে বিস্ফোরণের ফলে জ্বলে উঠা আদি নক্ষত্রগুলির ছবি তোলা, সৌরজগতের অজানা রহস্যের সমাধান করা, ছায়াপথ-নক্ষত্র-গ্রহসমূহের সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করা, নক্ষত্রের চারপাশে দূরবর্তী বিশাল মহাবিশ্বের বিরাজমান বস্তু ও সংঘটিত ঘটনাগুলি পর্যবেক্ষণ করা এবং মহাবিশ্বের রহস্যময় কাঠামো, উৎস ও দূর-দূরান্তে অবস্থিত গ্রহগুলি প্রাণ ধারণের উপযোগী কি-না তা পর্যবেক্ষণ বা অনুসন্ধান করা । Webb হচ্ছে একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক কার্যক্রম যার নেতৃত্বে NASA এবং এর অংশীদার ESA (European Space Agency) ও CSA (Canadian Space Agency) । Webb মহাকাশ দূরবীক্ষণ গবেষণা কার্যক্রমে বিশ্বের খ্যাতনামা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জ্যোতির্পদার্থবিদ (Astrophysicist) লামীয়া আশরাফ মওলা নিয়োজিত আছেন । কানাডাপ্রবাসী মেধাবী এই জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী University of Toronto এর Dunlap Institute for Astronomy & Astrophysics এ Post-doctoral fellow হিসেবে এবং বর্তমানে এখানে গবেষণাধর্মী কাজ করছেন । লামীয়া আশরাফ ২০২০ খ্রিস্টাব্দে Webb প্রকল্পে যোগ দেন এবং Canadian Space Agency এর হয়ে কাজ করছেন । লামীয়া আশরাফ বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা’র কাকরাইলে অবস্থিত Wills Little Flower School এর ছাত্রী । শান্তিনগরে বড় হয়েছেন । O-Level, A-Level শেষ করার পর যুক্তরাষ্ট্রের Wellesley University তে এবং এখান থেকে জ্যোতির্পদার্থবিদ্যায় (Astrophysics) স্নাতক অর্জন করেন । পরবর্তীতে পদার্থ বিজ্ঞানে Oxford University তে । এরপর গবেষণামূলক প্রবন্ধ (Thesis) সম্পন্ন করেন MIT এর Laser Interferometer Gravitational Wave Observatory (LIGO) এর উপর । Astronomy তে PhD করেন Yale University থেকে ।
সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে ৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড । অর্থাৎ সূর্যে ঘটে যাওয়া কোনো প্রকার ঘটনা পৃথিবীতে আসতে সময় নেয় ৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড । তার মানে পৃথিবী থেকে এই মুহুর্তে সূর্যের যে অবস্থা দেখছি তা ৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড আগে সূর্যে ঘটে গিয়েছে । পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব প্রায় ৮.৩১ মিনিট আলোক সময় । মহাশূণ্যে আলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে (প্রতি সেকেন্ডে আলোর গতিবেগ ১ লাখ ৮৬ হাজার মাইল) । এভাবে আলো এক বছর সময়ে যে পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করে সে পরিমাণ দূরত্বকে এক আলোকবর্ষ বলা হয় । ১ আলোকবর্ষ = ৯.৪৬১×১০^১২ কিলোমিটার (প্রায় ৬ লক্ষ কোটি মাইল) । সৌরজগতের সূর্য ব্যতীত পৃথিবীর নিকটতম নক্ষত্রের নাম Proxima Centauri । যেটি প্রায় ৪.২৩ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত । এই নক্ষত্র থেকে আমাদের কাছে আলো আসতে সময় নেয় প্রায় ৪.২৩ বছর । যখন রাতের আকাশে নক্ষত্রটির দিকে তাকাই, তখন আজ থেকে এর ৪.২৩ বছর পূর্বেকার চেহারা দেখি । ঠিক এই মুহূর্তের নক্ষত্রটির চেহারা দেখবো আগামী ৪.২৩ বছর পর ।
উল্লেখ্য যে, ১৩৮০ কোটি বছর পূর্বে এক বৃহৎ পরমাণুর শক্তিশালী মহাবিস্ফোরণের (Big Bang) ফলে মহাবিশ্ব বা ব্রহ্মাণ্ডের (The Universe) সৃষ্টি হয় । এই মহাবিস্ফোরণ এক ভয়ানক হিংস্রভাবে সম্প্রসারিত মহাবিশ্বের মধ্যে শক্তি বিকিরণকারী এক প্রচণ্ড অভিঘাত তরঙ্গ (Shockwave) পাঠায় বা সৃষ্টি করে । এক সেকেন্ডের এক মিলিয়নের এক মিলিয়ন ভাগে, অস্তিত্বের আদিম গঠন তিনটি স্বতন্ত্র পর্যায়গুলির মধ্য দিয়ে স্থানান্তরিত হয় । তড়িচ্চুম্বকীয় (Electromagnetism), মাধ্যাকর্ষণ (Gravity), দুর্বল এবং শক্তিশালী শক্তিগুলি চারটি মৌলিক শক্তি হিসেবে আকার ধারণ করে । প্রোটন এবং নিউট্রন গঠনের জন্য তাপমাত্রা ছিল অত্যাধিক । পরবর্তীতে তাদের অভ্যন্তরীণ অংশ থেকে তৈরি সুরুয়া বা স্যুপ (Soup), যা Quark এবং Gluon নামে পরিচিত সেটি মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে । চোখের পলকে Quark soup ঠান্ডা হয়ে যায়, যা সাধারণ বস্তু বা পদার্থের প্রথম লক্ষণগুলির জন্ম দেয় । বিজ্ঞানীদের ধারণা, Quark soup শুধুমাত্র প্রাকৃতিকভাবেই নিউট্রন তারার (Neutron star) কেন্দ্রস্থলে বিদ্যমান থাকতে পারে । মহাবিস্ফোরণের পর প্রায় ৩ লক্ষ ৮০ হাজার বছর থেকে শুরু করে কয়েক শত মিলিয়ন বছর পর্যন্ত Hydrogen এবং অতিসামান্য পরিমাণ আলফা কণা Helium Nucleus ছাড়া কোন গ্রহ, ছায়াপথ, নক্ষত্র ইত্যাদি বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের কোন অস্তিত্বই ছিল না । একে বলা হয় অন্ধকার যুগ (Dark Age) । এক সময় এই মহাবিশ্ব ধীরে ধীরে শীতল হয়েছে দীর্ঘ সময়ের মধ্য দিয়ে । মহাবিস্ফোরণের পরপরই মহাবিশ্বের উপর আধিপত্য বিস্তারকারী প্রচণ্ড গরম ও ঘন পদার্থ Plasma Soup (Quark-gluon plasma) থেকে আলো বেরিয়ে আসতে পারছিল না । পরবর্তীতে Hydrogen প্লাজমা (Plasma) এর সাথে ধাক্কা খেয়ে আলোককণা Photon বের হয় । নক্ষত্র জন্ম নেয় এবং সেটিই হয় আলোর উৎস । সেখান থেকেই আলো আসতে শুরু করে । তবে Dark Age ঠিক কখন শেষ হয়েছিল কিংবা কখনইবা প্রথম নক্ষত্র, ছায়াপথ, গ্রহ এবং জীবন শুরু হয়েছে- তা এখনও অজানা ।
মহাবিস্ফোরণের মাত্র ৮০ কোটি বছর পরের এই ছবিটি । কিন্তু এই ছবিতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এমন সকল কিছু অতিপ্রাচীন অস্তিত্ব ও পুরনো আলোকরশ্মি দৃশ্যমান, যা ১৩০০ কোটি (১৩ বিলিয়ন) বছরেরও আগের সময়কে আমাদের সামনে এনেছে! দূরবীক্ষণ যন্ত্রে ধারণকৃত এই মুহূর্তের ছবিটি আমাদের গ্রহের প্রামাণ্য প্রাচীনতম চিত্র, যা মহাজগতের প্রায় ১৩০০ কোটি বছর পূর্বেকার অবস্থা (বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের অস্তিত্ব) । তার মানে সুদূর অতীতের । এক অনিন্দ্যসুন্দর বিস্ময়কর দৃশ্য ।
ছায়াপথগুচ্ছটির নাম: Galaxy Cluster SMACS 0723 বা Webb’s First Deep Field । এটিকে পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধ বা দক্ষিণ আকাশে Volans নক্ষত্রমণ্ডলের কাছাকাছি দেখা যেতে পারে । আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এটি এতই বৃহৎ যে, আলো বেঁকে যায় এর আশেপাশে দিয়ে । দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি অসীম মহাবিশ্বের অত্যন্ত ক্ষুদ্রতম একটি অংশের চিত্র ধারণ করেছে, যা হাতের মুঠোয় থাকা একটি বালি কণার মতই এর আকার । ছায়াপথগুচ্ছের এই দুর্লভ চিত্রটির অবস্থান প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন (৪৬০ কোটি) আলোকবর্ষ দূরে । সেই হিসেবে ছায়াপথগুচ্ছ, ছায়াপথ ও নক্ষত্রমণ্ডলী থেকে আলোকরশ্মি আমাদের কাছে এসে পৌঁছতে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর সময় লেগেছে ।
এই ছায়াপথগুচ্ছের সম্মিলিত ভর একটি মহাকর্ষিক অক্ষিকাচ বা মহাকর্ষীয় পরকলা (Gravitational lens) হিসেবে কাজ করে এবং অনেক দূরবর্তী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলোকবিন্দুগুলিকে বিবর্ধিত করে । যেখানে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য লাল-নীল-সবুজ ছায়াপথ বা নক্ষত্রপুঞ্জ (Galaxy) । যার মাঝে রয়েছে সূর্যের মত অগণিত গোল-চ্যাপ্টা-লম্বাটে বিভিন্ন আকারের নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ । একটি ছায়াপথে গড়ে প্রায় ১০০ – ৫০০ বিলিয়ন নক্ষত্র বা তারকা থাকে । আমাদের Milky Way Galaxy এর ব্যাস প্রায় এক লক্ষ আলোকবর্ষ । এ রকম প্রায় অর্ধশতাধিক ছায়াপথের সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি ছায়াপথগুচ্ছ বা ছায়াপথ স্তবক (Galaxy cluster) । এ সকল ছায়াপথগুচ্ছে এক একটি ছায়াপথের মধ্যকার দূরত্ব থাকে প্রায় কয়েক লক্ষ আলোকবর্ষ । সুতরাং একটি ছায়াপথগুচ্ছের আকার কত বৃহৎ নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে?
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা NASA এর Webb’s Near-Infrared Camera (NIRCam) সেই দূরবর্তী ছায়াপথগুলিকে তীক্ষ্ণ কেন্দ্রবিন্দু বা উৎস বিন্দুতে (Focus) নিয়ে এসেছে । নক্ষত্রের স্তবক এবং ছড়িয়ে থাকা ছায়াপথের বৈশিষ্ট্যগুলিসহ তাদের রয়েছে ক্ষুদ্র, অস্পষ্ট বা ক্ষীণ কাঠামো যা আগে কখনও দেখা যায়নি । এছাড়া এই ক্ষেত্রটি NASA এর Webb’s Mid-Infrared Instrument (MIRI) দ্বারাও চিত্রিত হয়েছিল, যা মধ্য-ইনফ্রারেড আলো (Mid-infrared light) পর্যবেক্ষণ করে । এতে করে ইতিহাসবিদ, মহাবিশ্বতত্ত্ববিদ (Cosmologist), জ্যোতির্বিজ্ঞানী, মহাকাশ গবেষকরা শীঘ্রই নক্ষত্রের জীবনচক্র এবং ছায়াপথের ভর, বয়স, ইতিহাস ও ছায়াপথগুলি কিভাবে গঠন হয়, বৃদ্ধি পায়, একে অপরের সাথে মিশে যায়, কিছু ক্ষেত্রে কেনইবা তারা সম্পূর্ণভাবে নক্ষত্র তৈরি প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়- তা বুঝতে দূরবর্তী ছায়াপথ সম্পর্কে আরও বিশদভাবে জানতে শুরু করবেন ও সনাক্ত করতে সক্ষম হবেন । ফলে জ্যোতির্মন্ডলের আরও নানা রহস্যের উদঘাটন হবে । কারণ, NASA’s James Webb Space Telescope মহাবিশ্বের প্রাচীনতম ছায়াপথগুলিকে অনুসন্ধান বা তল্লাশ করছে ৷4 Comments
Friends
মোঃ মাহফুজুর রহমান
@nnxnsnmfkfkkgmail-com
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
Md Zaker Hayat Khan [ Zaker Aditya ] [ জাকের আদিত্য ]
@md-zaker-hayat-khan
শরীফ এমদাদ হোসেন
@sharif-emdad-hossain
শায়েরুল ইসলাম
@shaerulislam
সা দি য়া (নন্দিনী)
@nandini
Mahmuda Sultana
@mahmudamahi
Arshadul Khan Tuhin
@aktuhin
Muhammad Jabed
@jabed92



নাসা থেকে প্রকাশিত চমকপ্রদ ছবিটি দেখেছিলাম তবে এত বিশদভাবে জানা হয়ে ওঠেনি। কি অপার বিস্ময় ধারণ করে আছে মহাকাশ ভেবে ভেবে কোন কূল-কিনারা পাইনা। তবে এই বিস্ময় ও অজানাকে জানার ক্ষুধা আমাদের কত দূর নিয়ে যেতে পারে তা আরো একবার প্রমাণ করল পৃথিবীবাসী।