-
শব্দদূষণ
শহরে খুব আন্দোলন চলতেছিলো; ককটেল ফুটতেছিলো থেকে থেকে। ক্লাস টিচার বললো—এবার সামরিক সরকার বিদায় হবেই হবে; যা, তোরা বাড়ি যা গিয়া…।
আমরা হৈচৈ করতে করতে স্কুল থেকে বেরিয়ে দেখি, গাড়িঘোড়া নাই; দোকান পাট বন্ধ। গাব্বু বলে—চল, এই সুযোগে মেইনরোডে ফুটবল খেলি।
কিন্তু বেশিক্ষণ খেলা হয় না। পুলিশের গাড়ি বাঁশি বাজিয়ে ফুঁ ফুঁ করে ছুটে আসে। মহল্লার বড়রা বলে—এই পোলাপান, গলির মধ্যে যা গিয়া; ককটেল ফুটবে…।
গলির মুখের চা দোকানে বসে বিলুফুপি গুলতানি মারতেছিলো; আঙ্গুলের ফাঁকে ব্যানসন সিগারেট। নিজে ইয়া মোটা, আর কিনা বলতেছে—ফার্মের মুর্গি খাইয়া এযুগের মাইয়াগুলা ক্যামন ধুমসী হয়া যাইতাছে! এগো কেডা বিয়া করবো!
বিলুফুপির কথা শুনে আমরা ফিক ফিক করে হাসি। রিপন বলে—বুঝছি, এর লাইগাই তোমার বিয়া হইতাছে না।
কী! কী কইলি! আমি মোটা! বিলুফুপি আমাদের দিকে তেড়ে আসে। আমরা বলি—না, ফুপি; তোমার স্বাস্থ্য ভালো; কি সুন্দর দেবীদের মত টানাটানা চোখ তোমার! টর্চ লাইটের মত জ্বলতে থাকে…।
পাম্প পেয়ে বিলুফুপি গলে যায়। সিগারেটে পাফ দিয়ে বলে—কি খাবি তোরা? রুটি, কলা?
আমরা যখন কলা, রুটি খাচ্ছিলাম, তখনি বিকট শব্দ তুলে গলির মুখে অনেকগুলো ককটেল ব্লাস্ট হয়। মনে হচ্ছিলো, বোমাগুল যেনো আমাদের গায়ে এসে পড়তেছে। আমরা নিলডাউন হয়ে দোকানের সামনে বসে পড়ি। শব্দ থেমে গেলেও আমাদের কানে ঝিঁঝিঁ ডাকতে থাকে। তাকিয়ে দেখি, বিলু ফুপি কাৎ হয়ে পড়ে থেকে খুব গোঙ্গাচ্ছে; আর নাক-মুখ দিয়ে গ্যাজা বেরুচ্ছে! আমরা হামলে পড়ি। বিলুফুপির মাথায় জল ঢেলে দিই। ফুপি তবু সহজ হয় না। অবস্থা বেগতিক দেখে এম্বুলেন্স ডেকে হাসপাতেলে নিয়ে যাই।
কিন্তু হায়, পরিক্ষা করে ডাক্তার বলে—শি ইজ নো মোর!
আমরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ি।
জ্বলজ্জ্যান্ত মানুষ ককটেলের শব্দে গোঙ্গাতে গোঙ্গাতে মরে গেলো—এ ছিলো আশ্চার্য ঘটনা আমাদের স্কুলজীবনের। আমরা মিনুমামাকে খুঁজি; কোথাও পাই না। বড়রা বলে—ওকে পাবি না; ও গেছে আন্দোলনে; এরশাদরে গদি থিকা নামাইয়া ছাড়বো; বোনটা যে মরছে, সেই খবর লওয়ার টাইম আছে ওর!
মিনু, ঝিনু, বিলু—তিন ভাইবোন। ওদের আরেক বোন আজিজ মহল্লার গাব্বুর মা। গাব্বু মামা ডাকে, তাই আমরাও বলি ‘মিনুমামা’—টারজানের মতো লম্বা ছিপছিপে, ঘাড় পর্যন্ত সিল্কি চুল; শহরের সেরা দৌঁড়বিদ; প্রেসিডেন্ট ম্যাডেল পাওয়া—বোন বলতে পাগল; কিন্তু সন্ধ্যায় যখন ফুপিকে কবরে নামিয়ে দিই, তখনো গুরুর দেখা পাই না। ইয়া মোটা দারোগা চাচা, যার নাম ঝিনু—বোনের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের মতো করে কেঁদে উঠলে আমরাও ডুকরে উঠি। বড়রা বলে—কান্দিস না, ঝিনু; কান্দলে মুর্দার আজাব হয়…।
দারোগা চাচা কান্না থামিয়ে চিৎকার করে ওঠে—এই শহরে কারা ককটেল ফুটায়! সবগুলার পুটকি দিয়া ককটেল ঢুকামু…। বলতে বলতে পেটমোটা দাপুটে লোকটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে!
এমন মৃত্যু দেখে রাতে আমাদের ঘুম হয় না।বিলু ফুপি রাগি ছিলো বটে, আমাদের কতোনা আদর করতো। পরদিন স্কুলে যাওয়ার পথে ফুল দিবো বলে কবরস্থানে গিয়ে দেখি, মিনুমামা দাঁড়িয়ে আছে। মাথার হ্যাটটা বোনের কবরের উপর রাখা। আমরা ওনার পিছে গিয়ে দাঁড়াই। প্রার্থনা শেষ করে আমাদেরকে বলে—এ শহর আর বাসযোগ্য নাই; আমি চলে যাচ্ছি; তোদের সঙ্গে আর দেখা হবে না…।
আমরা হৈচৈ করে উঠি—কোথায় যাবা তুমি?
যে শহরে বোন মরে যায়, সে শহরে কি করে থাকি!
মিনুমামা আমাদের দিকে একনজর তাকিয়ে রিক্সায় উঠে হ্যাটটা মাথায় দিয়ে সেই যে চলে যায়—তারপর আন্দলোন শেষ হয়ে গনতন্ত্র আসে; আমরা কলেজে উঠে যাই—গুরুর আর কোনো হদিস পাই না। দারোগা চাচা বাসায় ভাড়াটিয়া উঠিয়ে দিয়ে সরকারি কোয়ার্টারে চলে যায়। আমরাও ভুলে যাই বিলুফুপির আশ্চর্য মৃত্যুর ঘটনা।
জানালায় দাঁড়ালে কখনো চোখে পড়ে বিলুফুপির এলসেশিয়ান কুকুরটাকে; অনাদরে, বয়সের ভারে গলির কোথাও কুন্ডুলি পাঁকিয়ে শুয়ে আছে। কিন্ত বড় হয়ে গেছি বলে মনের মধ্যে আবেগ আসে না। এমন এক শ্রাবন দুপুরে দরজায় বেল বাজে। গিয়ে দেখি—কুরিয়ারের হাতে বিদেশি টিকেট লাগানো একখানা খাম। খুলে দেখি লেখা—‘তোরা সবাই ভালো আছিস? ঠিকঠাক কানে শুনিস তো? এদেশে শব্দ দুষণ নাই।‘—সুডিশ মিনু।4 Comments
Friends
পিপীলিকা
@abujubair
আজহারুল ইসলাম তালহা
@ajharul
Rashed Rahman Abir
@rashed-rahman-abir
নতুন করে শুরু
@amrin-shimu
Md.hazrat belal
@md-hazratbelal
Kd Rezaul Karim Hira
@kdrkh2005
Md. Nur Alam (এইচ. এম নুর আলম)
@nuralam
এম এ খায়ের
@dmpcttc
আহমেদ হানিফ
@hanif



গুরু ফাটিয়ে দিয়েছেন! তবে একটুও শব্দদূষণ হয়নি! ভালোবাসা নেবেন!