-
শৈশব থেকে অনন্তকাল
ছত্রাক
ভুত বা জিনে অনেকে বিশ্বাস করেনা, না দেখে অনেকে অনেক কিছু বিশ্বাস করেনা, কিন্তু বিজ্ঞানী যদি আকাশের উপর কিছু বলে তা না দেখেই বিশ্বাস করাটাই বৈজ্ঞানিক হয়ে যায়- এ নিয়ে কিছু বললেই সেকেলে।
করোনা ভাইরাস কেউ দেখেনা তবু মাস্ক পড়ে এমন বড় বড় চোখে তাকাতো যেন স্বয়ং যমদূত দেখতে পেয়ে গেছে। এই করোনা নিয়ে একটা মজার থিসিস আছে। নিজের মতো আর কি! অতি বৈজ্ঞানিক চোখে সাহিত্য, কবিতা বা গল্প চষতে যাওয়া ঠিক নয় তবে নির্মল জলে জোছনা কখনই দেখতে পাবেন না।
জ্বীনের বিষয়টাও তেমনি। খোদাই জানেন কি কি তিনি বানিয়েছেন। আমাদের সাধ্যি কোথায় আমরা অসীম হয়ে সসীমের কষ্টি উদ্ধার করবো? সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিবো? প্রথমে তো ভুত বা জ্বীন বলতে আলাদীনের চেরাগের ভুত বা মনের আশা পুরণ করার ভুত জানতাম। আমাদের ছোট্ট বাড়ি আর ওটাকেই আমরা বাসাই বলি। বাড়ি বা বাসা যাই হোক টিনে ঘেরা। উপরে চার চালা টিন। দুটি রুম। একটায় বাবা মা, অপরটিতে আমি আর পিঠাপিঠি ভাইটি। লেখালেখিতে ছদ্মনাম দিতে আমার বেশ লাগে এতে সহজেই বকাবাদ্য করা যায়, বিতর্কিত চরিত্রদের সত্যটা বলা যায় কেস না খেয়েই৷ তাই ওর একটা ছদ্মনাম দেয়া দরকার। তাবরিজ। এটাই চলুক।
এই নামটা আমার খুউব প্রিয়। মহামণিষী শামস তাবরিজীর নাম।বাড়ির পাশেই একটা জংগল। জংগল এর মাঝ দিয়ে গেছে খাল, তার দুপাশে বাঁশঝাড়। ভেতরে প্রবেশ করলে সুপারি গাছ, কড়ই গাছ, বটগাছ, নানা লতাপাতা চোখে পড়বে, তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও ভুতুড়ে করে তোলে খালের দু পাশে থাকা বাঁশঝাড়গুলো। বৃষ্টি খুউব হলে পাখিগুলো চুপসে কড়ই গাছ ও আশে পাশের গাছে আশ্রয় নেয়। আর বৃষ্টি থেমে গেলে পুরো ছবিই অন্যরকম।
খাল যেন খরস্রোতা নদীতে পরিণত হয়, গাছ গাছালীর নিম্নাংশ জলের নিচে। সব জলে একাকার। সেই সাথে যোগ দেয় বাঁশঝাড়ে বসে পেঁচার অদ্ভুত ডাক।
সেই সময় আমি হেটে হেটে কোমর পরিমান জলে বাঁশঝাড়ের ধারে যেতাম।ডালের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম যদি একটা জ্বীনের সাথে পরিচিত হতে পারতাম, বন্ধুত্ব করতে পারতাম, তাহলে কাড়ি কাড়ি টাকা চেয়ে নিতাম, বাড়ি চেয়ে নিতাম। ছোট থেকেই আমাদের শেখানো হয় এটাই তুমি যা-ই হও না কেন টাকা-কড়ি থাকলে তুমি সেলাম পাবে, আত্মীয় স্বজনের সোহাগ ভাজন হবে, সবাই তোমার জন্য ভাববে, একটা ভালো বউ পাবে আহ কত কি! এইজন্যই তো আজকের ছিচকে চোর মার খায়, বড় চোর সেলাম পায়। আজকের মধ্যবিত্ত লম্পট ইভ টিজার, বা গরীব দেহের বিনিময়ে ক্ষুধা নিবারনকারীকে বলে বেশ্যা আর রুপালী পর্দায় যখন কেউ টিজ করে, অশ্লীল কাজ করে, প্রেম দেখাতে গায়ে হাত দেয় বা কাপড়ে টান দেয়, বিছানায় যায় বা অভিনয় করে তাকে আমরা বলি হিরো বা হিরোইন, সোজা বাংলায় নায়ক-নায়িকা। ছোট থেকে একটাই জিনিষ শেখানো হয় জীবনের উদ্দেশ্য বড়লোক হওয়া।
রাজকুমার হওয়ার গল্প, রানীকে পাওয়ার গল্প, হঠাৎ অর্থ লাভে সারাজীবন সুখে বসবাস করার গল্প। মূল কথা অর্থ থাকলে সারা জীবন শান্তিতে থাকতে পারবে।সেই স্বপ্ন দেখা আমি ডালে ডালে জ্বিন খুজতাম। তো একদিন প্রাইভেট টিউটরের কাছে যাচ্ছি, ভাবলাম এই জংগলের ভেতর দিয়েই যাবো। দেখি কড়ই গাছের ডালে একটা অদ্ভুত মহিলা বসে বই পড়ছে। জট বাধা চুল ধূসর চেহারার। বাস্তবে আলিফ লায়লা বা ভূতের সিরিয়ালগুলোর সাথে কোন মিল ই নাই।
সে ভেবেছিলো আমি দৌড়ে পালাবো। কিন্তু একেতো বড়লোক হওয়ার ইচ্ছে। এই বয়সে টাকা পয়সা পেলে আর কিসের পড়া লেখা। উদ্দেশ্য তো মানুষ হওয়া নয়, শিক্ষিত হওয়া নয়৷
‘পড়ালেখা করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে’ – তা গাড়ি ঘোড়া যদি এখনই পেয়ে যাই পড়ে কি করবো?আমি সেই গাছের দিকে এগিয়ে যেতেই মহিলাটি নড়ে উঠলো। তারপর ডালের নিচে গিয়ে কিছু বলতে যাবো দেখি কেউ নেই ওখানে। হয়তো তার জীবনে আমিই প্রথম যে নাকি তাকে দেখে কোন প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। আসলে চোখে মুখে যে স্বপ্ন তার একটা কেরামতি তো ছিলোই। আজো সেই কেরামতিই আমাদের জীবনকে যান্ত্রিক করে ফেলছে। প্রতিদিন আমরা চামড়ার মানুষ হয়েও যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছি। ‘আধুনিকতা’ নাম দিয়ে মানবতার শ্রাদ্ধ করে ডুগডুগি বাজাচ্ছি।
আমি ঠিক তো জগৎ ঠিক, কোন ঝাপড়ার কোন মানুষের জমি হরণ করা হচ্ছে, কোন ছেলেটি মামু কাকু না থাকার জন্য চাকুরী না পেয়ে নেশাখোর হচ্ছে, সুরসুরি ভরা সমাজে সিনেমার নায়ক হতে গিয়ে আখিয়ো সে গোলি মেরে জেলে বসে ছক কষছে কিভাবে মেয়েটার প্রতিশোধ নেয়া যায়।
জড়বাদি বিশ্ব আমাদের সেই স্বপ্নীল ধাধায় মোহিত করে কিন্তু এর নেপথ্যে থাকা ধ্বংশের খবর দেয়না।একদিন এক অদ্ভুত লোক এলো পাতিলে একটা রুটি। ওটা রেখে দিলে নাকি আরেকটা রুটি হয়। সবাই উৎসুক। লোকটাকে খাওয়ালো, যত্ন করে একদিন রাখলো। পরেরদিন সবাই মিলে দেখতে এলো। কচি-কাচা থেকে শুরু করে মুরুব্বীরা পর্যন্ত ভীড় জমালো।
এর মাঝে সগীর সাহেব, এটাও ছদ্ম নাম, কোন না কোন ভাবে সম্পর্কে মামা হোন, নেতাগোছ টাইপের। তিনি সবসময় চাইতেন সবার নজর তার উপর থাকুক, একটু আধটু ইংরেজিতে কথা বলতেন তো সকলেই পন্ডিত ভাবতো। এখনও সবখানে পন্ডিতি বুঝাতে ইংরেজি বুলি দিয়ে সাহেবের কদর বুঝানো হয়। আসলে আমরা স্বাধীন হলেও মানসিকভাবে দাসই থেকে গেলাম। এই দাসত্ব নিয়ে কোন একদিন কথা হবে।
সগীর সাহেব পরীক্ষা করে দেখলেন ও দেখালেন। সবাই রীতিমতো বিস্মিত হলো। আমরা বলতে লাগলাম রুটির বাচ্চা। সগীর সাহেব উপস্থিত সকলের কাছে টাকা উঠিয়ে অদ্ভুত রুটি কিনে নিলেন এবং লোকটাকে যথাযথ সম্মান করে বিদায় দিলেন।
এরপর যে কেউ আসতো, দেখানোর জন্য তিনি একটা ফি নিতেন। সবাই দেখে ফি না দিয়েই চলে যেতো। তাই তিনি মনস্থির করলেন কাওকে দিয়ে দিবেন। আহমদ সাহেব, তিনিও সম্পর্কে কোন দিক থেকে মামা, যেহেতু সবাই একসাথে থাকা হতো তো কোন না কোন সম্বোধন তো করতেই হতো। তিনি বাসার আংগিনায় যেদিন থেকে তিনি রাখা শুরু করলেন কেরামতি দেখালো রুটি। প্রতিদিন খুললেই আরেকটা রুটি। কিন্তু ভয়েই কেউ নিতোনা। জলের মাঝে রুটি। অদ্ভুত বলে কথা।
পাড়ায় মহল্লায় ছড়িয়ে গেলে ভীড় আরো বাড়তে থাকলে সগীর সাহেবের মনে ধরলোনা। মানুষের ভীড় আহমদ সাহেবকে মনযোগের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে তুলছে তা কি সহ্য করা যায়। হঠাৎ তিনি কয়েকজন দিয়ে রটিয়ে দিলেন এটা জ্বীনের কাজ। তখন জ্বীনের দোহায় দিয়ে বহু পাপ করা হতো।
মেয়েকে জ্বীন ধরেছে আর কি না কি করেছে, জ্বীন নাকি ডোবায় মেরে পুতে দিয়েছে। এ কাহিনীগুলো ফের একবার করোনা ভাইরাস মনে করিয়ে দিলো।করোনা ভাইরাসের শুরুর দিকে হঠাৎই ইউরোপীয় অনুকরনে খালে বিলে মানুষ মরে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এর রহস্য কি? এর নেপথ্যে কি তা আজো জানা সম্ভব হয়নি কারন তখন পোষ্টমোরটেমটাও হয়নি ভয়ে। আমাদের এ দেশে ময়লা শ্রমিক থেকে নিয়ে হরিজন পর্যন্ত কেউ বিশেষ আক্রান্ত হয়নি। যারা ভাইরাস রোধে বড় বড় পদক্ষেপ নিয়েছে তারা নিজেরাই প্রতিষেধক বিষে আক্রান্ত হয়ে মরেছে। আজো এর সঠিক লক্ষণ বের হয়নি, কিন্তু বানিজ্য কম হয়নি এর প্রতিষেধক ও ভ্যক্সিন নিয়ে। আগামী শতকের হাতে এ রহস্য অর্পন করে যাওয়া যাক রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষদের কাছে।
কারো জায়গা নিয়ে সমস্যা, কেউ প্রবাসেই সংসার হারিয়ে ফেলেছিলো টের পায়নি, কেউ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ- বিশেষ করে মানুষ যখন কারো উপর বিশ্বাস করে ভালবেসে সে তখন এতোটাই অসহায় হয়ে যায় যে নিজের সবটুকু স্বত্মা অন্যের বিশ্বাসে সমর্পন করে দেয়। সেখানে কেউ পিঠে আঘাত করলে উহ বলার সময়টাও পায়না। এই জড়বাদি লোভী সমাজে আগেও জ্বীনের নামে অনেক কিছু হয়েছে, এখনও হচ্ছে। কেউ কালা জাদুর নামে বা কেউ করোনার সুযোগ নিয়ে।
বিষয়গুলোকে আমরা মেকী আধুনিকতার ন্যাকা রুপালী জোছনার আড়ালে ঢাকিয়ে ফোটোসেসানে উচ্চাবিলাসী সম্পর্কে দেখানো হাসি দিয়ে এড়িয়ে গেলেও অজান্তেই বাস্তবতা আমাদের কুড়ে কুড়ে খায়।
আমরা সত্যিই ভালো নেই, তাই ভালো না থাকাটাকেই সমাজের সফলতা বানিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছি।জ্বীনের রুটি কথাটা রটার সাথে সাথেই আশ পাশের লোকের চাপে রুটিগুলোকে পাতিল সমেত পুকুরে ফেলে দেয়া হয়।
ক বছর বাদে এক নানা, যিনি আবার আমার দিদার দুধ ভাই, তিনি একজন গণিতের প্রফেসার ছিলেন। তিনি শুনে বললেন যে ভয়ের কিছু নেই রুটিগুলো আসলে বড় ছত্রাক। এরা জলের মধ্যে বদ্ধ জায়গায় আরো ছত্রাকের জন্ম দেয়।
কিন্তু সবগুলোই একই ধরনের রুটির মতো কেন হতো তা তিনি বলেন নি।তিনি আসার আগ পর্যন্ত রাতে আমরা পুকুরের ধার দিয়ে সাবধানে যেতাম। অনেক পুকুরে নাকি রহস্য লুকিয়ে থাকে, প্রতিবছরই কেউ না কেউ ডুবে মরে।
এরই ফাঁকে এক দুজন কে এও দাবী করতে শুনেছি তারা প্রায় এমন ফাদে পড়েছিলো। যেই নাকি ডুব দিয়েছে তখন কোথা থেকে একটা শেকল পায়ে প্রায় জড়িয়েই ফেলছিলো। এগুলো শুনে আমরাও ভয় পেতাম। তবে এটা ঠিক যেগুলো পুকুরে প্রতিবছর মানুষ মরে বিশেষ করে বাচ্চারা সেসব পুকুরে আজো নাকি প্রতিবছর রহস্যজনক ভাবে মানুষ মারা যায়।(চলবে)
4 Comments

ঠিকানাহীন অরণ্য -
লেখক
আমি স্বত্মা সম্বলিত আত্মাবাহক মানুষ
কষ্ট চাষ করে শব্দ ভেদ করে সাহিত্য রস বের করা আমার কাজ
প্রেম আমার ধর্ম, ন্যায়বিচারের কথা আমার যুদ্ধ
আমি চোখের ভেতর সাগর চষি উম্মাদ উম্মত্য হয়ে
জাগতিকতার যান্ত্রিকতা কি করবে আমায় নিয়ে?
আমি ভবঘুরে, আনমনে, বণ্য এক অরণ্য---
Friends
Md.Khaladur Rahman (অনল)
@wanol
পরিমল রায়
@parimal-roy
Rejwana Khan
@rejwana-khan
Shovan Khan Sabuz
@methopath
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Reazul Kabir
@reazul-kabir


সুন্দর লেখা। সবাই পড়ুন।