Profile Photo

পার্থসারথিOffline

  • kumarpartha
  • *চোরাস্রোত*

    পার্থসারথি

    শরতের মন পাগল করা পূ্র্ণিমা রাত। চাঁদের আলোয় আকাশের বুকের গভীরতা বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। উজ্জ্বল তারাগুলো জ্বলজ্বল করে মিটমিট করছে আকাশের অসীম বুকে। একটা স্নিগ্ধভাব চারদিক যেন মৌ মৌ করছে। হাসনা হেনার মন মাতানো সৌরভ বাতাসে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে পাখনা মেলে। এমন পূর্ণিমা রাতই শাদা ধবধবে অপরূপা আকাশ পরীদের কথা মনে করিয় দেয়। চারদিকে শুধু আনন্দের ছড়াছড়ি। কোথাও দুঃখের এতটুকু আঁচড় চোখে পড়ে না। মনটা সত্যিই কেমন যেন আনচান করে ওঠছে মনোরমার। রাত্রি দ্বি-প্রহর। শহরের ব্যস্ততা থেমে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। অবশ্য লেকের পাড়ে এই ধানমণ্ডি এলাকায় শহুরে ব্যস্ততা তেমন একটা থাকে না। বাসার সবাই ঘুমিয়ে আছে। মনোরমার ঘর থেকে লেকের পাড়ের গাছগুলো এবং পূ্র্ণিমার আকাশ অনায়াসে চোখের সীমানায় চলে আসে।

    শুয়েছিলেন অনেকক্ষণ আগেই। চোখের পাতায় ঘুমের রেশ মাত্র নেই। এপাশ-ওপাশ করে অবশেষে জানালার গায়ে হেলান দিয়ে বসলেন। পূর্ণিমার স্বচ্ছ আলোয় মন-প্রাণ ধুয়ে গিয়ে, হৃদয়ের গভীর থেকে অনেক দিনের হারানো কথা ফুটে ওঠছে মনের বাগানে। কিন্তু এই মন জুড়ানো রাতে দুঃখকে বুকের ভেতর বেশিক্ষণ লালন করা খুবই দুষ্কর। একাকীত্বের মাঝেও যেন অনেকজনের আনাগোনা চলে। মনে মনে কথা হয় জোছনার সাথে অতি সংগোপনে। জোছনার আধিপত্য আকাশে, বাতাসে সমান তালে। এই অপরূপ রাত ফেলে মনোরমা ঘুমের কোলে যেতে চান না। পূর্ণিমা রাতকে ভালোবেসেই বেঁচে আছেন। এখানে আসার পর থেকেই জীবনের পূর্ণতা কিছুটা হলেও পেয়েছেন। অনুপম বাবু ও প্রিয়লক্ষী দেবী কখনও অশোভন আচরণ করেন না। ওদের আচার-আচরণ মনোরমাকে কখনও ব্যথিত করে না। কাজের লোক হিসেবে যতটুকু ভালোবাসা পাবার কথা তার চেয়ে অধিকই পান সবসময়। কাজে-কর্মে কোন রকম ভুল হলে তা শুধরে দেন এবং কীভাবে করতে হবে সুন্দরভাবে বলে দেন। আজ পর্যন্ত কোনদিন কোন রকম বকাঝকা করেন নি। তাইতো ওদের প্রতিও মনোরমার মনের মধ্যে গভীর ভালোবাসা জমে গেছে। ওদের ভালোবাসায় ডুবে অতীতের সব দুঃখ-বেদনা ভুলে থাকেন। অনুপম বাবু পেশায় একজন চিকিৎসক।আর প্রিয়লক্ষী দেবী একটা কিন্ডারগার্ডেন স্কুলে পড়ান। দু’জনার ভীষণ ব্যস্ততার মাঝেও ওদের একমাত্র সন্তান তন্ময় ভালোবাসার পূর্ণতার মাঝেই বেড়ে ওঠছে। যতটুকু শূন্যতা থাকার কথা তা কানায় কানায় পূর্ণ করে দিচ্ছেন মনোরমা।

    মনোরমা তন্ময়কে নিজের সন্তানের মতো কোলে পিঠে করে মানুষ করছেন। হৃদয়ের অন্তহীন গহীনে যত ভালোবাসা আছে সবটুকই উজাড় করে দেন। তন্ময়কে ভালোবাসতে পারলে দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে যান মনোরমা। যদিও ক্ষণিকের জন্য কিন্তু শূন্য হৃদয়ে পূর্ণতার স্পর্শ পান। মনোরমার স্বপ্ন ছিল সাজানো ছোট্ট একটা সংসারের। যেখানে দুঃখের আনাগোনা থাকবে একেবারে নিষিদ্ধ। অল্প সুখের বেষ্ঠনীতে জীবন থাকবে আবদ্ধ। নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে বেঁচে থাকার ইচ্ছেগুলো প্রবল থেকে প্রবলতর হবে। জীবনটা হবে ভালবাসার ছন্দময় কবিতা। ফুল বাগানে বসন্তের আগমনে বাগান যেমন ফুল আর মৌমাছির কলরবে মত্ত থাকে, ঠিক তেমনি হবে। কিন্তু চাওয়া আর পাওয়ার হিসাব কখনও এক হয় না। এটা যে মানব জীবন, সুখ এবং দুঃখের অবস্থান খুবই সন্নিকটে।

    স্বামী হিসেবে শ্রীনিবাস ছিল অতি উত্তম। শ্রীনিবাসের মতো স্বামী পেয়ে অল্প বয়সের বিয়ের কষ্টটা ভুলে গিয়েছিলেন। স্বামীর ভালোবাসা নেশাগ্রস্ত করেছিল মনোরমাকে। দেহমনের সবটুকু মনের অজান্তে সমর্পণ করেছিলেন শ্রীনিবাসকে। কিন্তু সৌন্দর্যের উপমা উপমাতেই আটকে গেল। বাস্তবে এক গহীন অন্তরালে সব বিলীন হয়ে গেল। কাল বোশেখির ঝড়ে নব বসন্তের বাগানের সদ্য ফুটন্ত ভালোবাসার মানুষটি বৃন্তচ্যূত হয়ে গেল। পৃথিবীর বুক জুড়ে বসন্তের ছড়াছড়ি। মনোরমার দেহমনে বসন্তের তুমুল উপস্থিতি। কিন্তু সে বসন্তের বাগানে বিচরণ করতে পারেন না ; এটা তার জন্য এখন নিষিদ্ধ নগরী। বসন্তের সব মুহূর্ত ও আয়োজন যেন এক অসীম গহীন গহ্বরে আটকে আছে অনন্ত কালের জন্য। প্রতিবার বসন্ত আসে বসন্ত যায়। কানে কানে বাজে বসন্তের আনাগোনা। প্রতি বসন্ত হৃদয়ের গভীরে দাগ কেটে যায় অসীম মূর্ছনায় কষ্ট দিয়ে। ইচ্ছের বিরুদ্ধে শৃংখলিতএই জীবনকে মেনে নিয়েছেন। মনোরমা মেনে নিয়েছেন হিন্দু সমাজের এই অর্থহীন জীবন-যাপন। এক জীবনে বহু জীবনের দুঃখ কষ্টকে বুকের মধ্যে লালন করে বেঁচে আছেন। তন্ময়কে ভালোবেসে কাছে টানলে দুঃখ-কষ্টগুলো ভীষণ তোলপাড় করে ওঠে। এক অসীম শূন্যতা নিমেষে ঝেকে বসে মনের শাখা প্রশাখায়। একটি সন্তানের প্রত্যাশায় যে বুকে স্বপ্ন ছিল সেখানে কষ্টগুলো দৌঁড়াদৌড়ি করে এলোমেলো ভাবে। মাঝে-মধ্যে থেমে থাকা বসন্ত বৃক্ষ বিদ্রোহ করে ওঠে। কিন্তু কষ্টের কষ্টি পাথরে ইচ্ছেগুলোকে চাপা দিয়ে রাখেন। শাদা সূতোয় চাপা পড়ে আছে ভালোবাসার বীজ। আমিই আমার শেষ স্মৃতি। কথাটুকু ভাবনার মধ্যে এলেই কষ্টগুলো মনোরমাকে আঘাতে আঘাতে নীল করে ফেলে। শাদা সূতোর আবরণ ঝেড়ে ফেলে বিদ্রোহিনী হয়েছেন অনেক রাতে। কিন্তু সময়ের সন্ধিক্ষণে নিজেকে নিজের কাছে হার মানতে হয়েছে।

    ঢং ঢং ঢং করে ঘড়িটা বেজে ওঠল অসীম নীরবতাকে খানখান করে। মনোরমা সম্বিৎ ফিরে পেলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস নীরবতার বুকে ঢেলে দিয়ে স্বচ্ছ চাঁদে চোখ জোড়া মেলে দিলেন। শুভ্র মেঘের নরম বুক ফুঁড়ে সুখ কুড়িয়ে চাঁদ যেন হেঁটে বেড়াচ্ছে। প্রকৃতির সবটুকু সুখ ও সৌন্দর্য চাঁদকে ঘিরে ধন্য হচ্ছে।

    পাশের ঘর থেকে চুড়ির রুনুঝুনু শব্দ ভেসে আসতেই মনোরমার ভেতর চিত্ত উৎকর্ণ হয়ে ওঠল। শব্দটা বুকের গভীরে পৌঁছা মাত্রই একটা অশান্ত ঢেউ পুরো ভেতরটা এলোমেলো করে দিয়ে গেল। আবদ্ধ বসন্ত বাগানে হু হু করে বাতাস বইতে শুরু করল। বাতাসে বাতাসে পুরো মন-বাগান হেলে দোলে ওঠছে। নেশার বুদবুদ অস্বস্তিকর করে তুলছে স্থিতিময় মহূর্তের ইচ্ছেগুলোকে। অসহ্য সুখ বুকের ভেতর কাঁটা হয়ে বিঁধছে। বুকের গহীন অন্ধকার থেকে হারিয়ে যাওয়া কষ্টগুলো সজোরে হাতুরি পেটাচ্ছে। কষ্টগুলোর ভীষণ আধিপত্য এখন এই ক্ষুদ্র জীবনের পরিসীমায়। পাশের ঘরের সুখময় ধ্বনি চুম্বকের মতো টেনে নিল মনোরমাকে।

    অনুপম বাবু আর প্রিয়লক্ষী দেবী একই বৃন্তে দুটি সুখী-ফুলের উপমা। ওদের কাছে জীবন অর্থময়। এই পৃথিবীর বুকে ওদের পদচারণায় ক্ষণে ক্ষণে নতুন গানের জন্ম হয়। ওদের দেহ-মনের গভীরে ভালোবাসার বীজের ছড়াছড়ি। এই বীজ ছড়িয়ে স্বচ্ছ আলোয় ভালোবাসার বীজগুলো ধীরে ধীরে অংকুরিত হয়। ভালোবাসায় এই রাতগুলো মধুময় হয়ে ওঠে। সার্থক জোছনা ওদের মন-প্রাণ রাঙিয়ে তুলে মোলায়েম আলোয়ানে। ওরা এখন খুব কাছাকাছি। ঘরের ভেতর নতুন ঘরের বাসিন্দা। শরীরের উত্তাপে উত্তাপে জীবনের বোধ শিরা-উপশিরায় খেলা করছে। ঠোঁটে ঠোঁটে পৌঁছে যাচ্ছে পরস্পরের খুব কাছে। যেখানে থাকে না কখনও তিলসম ফাঁক। শরীরে শরীরে যুগন্তরের ভাষা ব্যক্ত হচ্ছে এই মুহূর্তে, এই ছোট্ট ঘরে। মহাকাব্যের সূচনা হতে পারে এই দু’জনার সুখ বলয় থেকে। ভালোবাসার সুখ বাতাসের পাখনায় ভর করে চারদিকে হেঁটে বেড়াচ্ছে।এইমাত্র যার খবর পৌঁছে দিল মনোরমাকে।

    শ্রীনিবাসের পদধ্বনি আচমকা বেজে ওঠল বুকের ভেতর। যার ভালোবাসায় কুমারী জীবনের প্রথম অবগাহন হয়েছিল। যার ছোঁয়ায় বসন্ত বৃক্ষ-কলিরা কলরব করে জেগে ওঠেছিল। বুকের মধ্যিখানে যে আঁচড় কেটেছিল ইচ্ছে মতো। সেই শ্রীনিবাস এখন চোখের সীমানায় জোছনার আলোয় হেসে বেড়াচ্ছে। যাকে নিয়ে মনোরমার একরাশ স্বপ্ন ছিল। কিন্তু স্বপ্নের বাগানে বেশি দিন আধিপত্য বজায় রাখতে পারেন নি। সূচনা লগ্নেই মহাকাব্যের মুখ থুবড়ে পড়ল। তারপরই মনোরমার হৃদয় বাগানে ঝরা ফুলের আধিপত্য দিনদিন বেড়েই চলছে। সুখের রাজ্যে এখন ভীষণ কল্পনা বিলাসী হয়ে ওঠেছেন। কল্পনার রাজ্যে চলে শ্রীনিবাসের সাথে গোপন প্রণয়। এই সুখ ক্ষণিকের হলেও মনোরমার কাছে দুঃষ্প্রাপ্য। প্রেম-ভালোবাসা মনোরমার জন্য এখন এক নিষিদ্ধ নগরী। সুখ-দুঃখের ডালি সাজিয়ে মনের আঙিনাতেই চলে শ্রীনিবাস-মনোরমার প্রণয় খেলা। মনোরমার কষ্টগুলো ক্ষণিকের জন্যে হলেও হা-হুতাশ করে ঘুরে বেড়ায় চারপাশে। শ্রীনিবাসের ঝাপসা প্রতিচ্ছবি নিয়ে নানান রঙের সুখের আলপনা আঁকেন স্বপ্নের রাজ্যে। আলপনায় সুখের উপস্থিতি নিমিষেই বিলীন হয়ে যায়। তবে বুকের মধ্যে যতটুকু সুখের অনুরণন ঘটে ততটুকুই আগলে ধরে রাখেন বুকের গহীনে। তা হোক ক্ষণিকের। যতটুকু পারেন সুখ নিংড়ে বাঁচতে চান। কিন্তু শ্রীনিবাসকে কখনও ধরে রাখতে পারেন না বুকের পাজরের খাঁচায়। স্বামীকে না পাবার কষ্টগুলো মনোরমাকে দিন দিন অতি সূক্ষ্ণভাবে ক্ষয়ে দিচ্ছে। শুভ্রবসনা মনোরমাকে শান্তির প্রতীক শ্বেত কবুতর মনে হয়। এই শভ্রবসনের ভেতরে রক্ত মাংসের যে আগ্নেয়গিরি অসীম যন্ত্রণায় দিনকে দিন নীল পাথর হয়ে যাচ্ছে তা’র খোঁজ কেউ রাখে না। হাসির ভেতর যে দুঃখ কষ্টের বসবাস তার কাহিনী কেউ কখনও জানতে চায় না। যার প্রতিটি রক্তবিন্দু মানব সভ্যতার আকাশে কষ্টের নীল ধ্রুবতারা। চোরাস্রোতের তাণ্ডবে শান্ত নদীর বুকের ভেতরটা যেমন প্রতিক্ষণ ওলট-পালট হয় ঠিক তেমনি মনোরমার বুকের ভেতর চলে তাণ্ডবলীলা।

    এই যে অনুপম-প্রিয়লক্ষীর সুখগুলো বাতাসে বাতাসে ভেসে আসছে এইগুলো মনোরমাকে দুঃখের গভীরে, অথৈ সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যেখান থেকে পরিত্রাণ মেলে না কখনও। এক সময় ক্লান্ত হতে হতে কষ্টগলো নির্জীব হয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। প্রিয়লক্ষী ঠোঁটের আঙিনায় ভালোবাসার রক্তবিন্দু ছড়িয়ে বিচরণ করবে। আর পাশাপাশি মনোরমার ক্লান্ত কষ্টগুলো দুঃস্বপ্নের আঙিনায় হাহাকার করবে। এই তো বিধবা রমণীর প্রতিদিন।

    সময়ের সিঁড়ি বেয়ে পূর্ণিমার চাঁদ পশ্চিমাকাশের দিকে মৃদু পায়ে হেঁটে চলছে। তারারা সব চাঁদের আঙিনায় থেকে থেকে সুখ নিংড়ে পৃথিবীকে সৌন্দর্যের আলোয় আলোকিত করছে। অনুপম-প্রিয়লক্ষী চাঁদের রূপালী আলোয় ভালোবাসার অবগাহনে নিমগ্ন। ওদের ভালোবাসার অনুকম্পনগুলো মাতাল করে তুলছে। চাঁদের আলোয় দেহ-মন রাঙিয়ে কষ্টগুলোকে ক্লান্ত করার আপ্রাণ চেষ্ঠা করছেন মনোরমা। দেখতে দেখতে গাঢ় শুভ্র মেঘ চাঁদের বুক জুড়ে বসল। আবছা আলোয় বুকের ভেতর ঘুমের নেশা জড়িয়ে এল।

    শেষ

    5
    4 Comments

Friends

Profile Photo
Ashaduzzaman-Khokon
@ashaduzzaman-khokon
Profile Photo
D K MAHANTA
@dkmahanta01718942602
Profile Photo
রাহুল চন্দ্র দাস
@rahulchandradas13011994gmail-com
Profile Photo
নন্দিনী
@nandini-chowdhuri
Profile Photo
Nilufar Ghani
@nilufar-ghani
Profile Photo
Israt Lamia
@israt-lamia
Profile Photo
Dhali Moin
@dhali-moin
Skip to toolbar