Profile Photo

মো. মিকাইল অাহমেদOffline

  • Mekail2
  • কুসংস্কার
    বর্ষাকাল। কিছুক্ষণের জন্য অাকাশ পরিষ্কার তো মূহুর্তেই অাবার অাকাশ তার রূপ পাল্টায়। অাষাঢ়ে দিনের কোন বিশ্বাস নাই। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে গরু গুলি কষ্টে দিনাতিপাত করছে। দুপুরের দিকে একবার বৃষ্টি থেমেছিল। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টির পর ঝকঝকে রোদ উঠেছে। সাজুর বাপ ভাবলো যাই একটু গরু গুলি মাঠে দিয়ে অাসি। পেট ভরে ঘাস খেয়ে অাসুক। যেই ভাবা সেই কাজ। গরু দুইটা ঘাস খেতে দিয়ে সাজুর বাপ গিয়েছিল গঞ্জে। বাড়ি থেকে চার মাইল দূরে অাশুগঞ্জের হাট। বুধবার সাপ্তাহিক হাটের দিন। গরুর জন্য খৈল, ভূষি অার ঘর গৃহস্থালির জন্য কিছু বাজার সদাই করাই হাটে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য। সাজুর বাপে গঞ্জ থেকে ফিরতে না ফিরতেই ঘটলো এক ঘটনা। রোদেলা অাকাশ দেখেই সাজুর বাপে গরু দুটারে দিয়া গেছিলো মাঠে। হঠাৎই অাকাশে মেঘের ঘনঘটা। মুহূর্তেই কালো হয়ে গেল অাকাশ। অাষাইঢ়া দিন কখন কি রূপ ধারণ করে কোন নিশ্চয়তা নাই। শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি অার সাথে দমকা হাওয়া। ঝড়, বজ্রপাত অার একপশলা শিলা বৃষ্টি ও হয়ে গেছে। ঘটনা যা হবার তা হয়ে গেছে ততক্ষণে। রীণার বাপে মাঠ থেকে দৌড়াইতে দৌড়াইতে এই দুঃসংবাদ টা নিয়ে অাইছে। রীণার বাপে সাজুর বাপের বাল্যবন্ধু। নামাজী। পরহেজগার মানুষ। এক সাথেই কৃষি কাজ করে তারা। দুই জনের ফসলি জমি পাশাপাশি। বাড়ির কিছুটা দূর থেকেই ডাক দেয় রীণার বাপে। সেই ডাক শুনতে পেয়ে সাজুর মা করিমন বিবি রীতিমতো ভয় পেয়ে গেছে।
    রীণার বাপ: বাইত অাছো নি সাজুর মা?
    করিমন: হ অাছি। কি অইছে রীণার বাপ? অমন কইরা হাঁপাইতাছো কিল্লিইগ্গা?
    রীণার বাপ: সর্বনাশ অই গেছে সাজুর মা। বলতে গিয়ে গলাটা ধরে এলো রীণার বাপের। একটা ঢুক গিললো। বাকিটা অার বলতে পারলো না। এমন একটা দুঃসংবাদ কি এত সহজে বলা যায়? স্বভাবতই কৌতূহল চেপে বসলো সাজুর মা’র মনে। অাতঙ্কে মুখ ঘেমে গেছে। এক গ্লাস পানি বাড়িয়ে দিলো রীণার বাপের দিকে।
    করিমন: রীণার বাপ। নেও। পানিডা হাইয়া লও। তারপরে কও কি অইছে।
    পানি পান শেষ করে দম ফিরে পেলো রীণার বাপে। এবার বলা শুরু করলো।
    রীণার বাপ: কথাডা কেমনে কই এইডা ভাবতাছিলাম। না বইল্লাই কি অইব অহন। সাজুর বাপে যে দুইডা গরু মাঠে দিছিলো। ঠাডা পইড়া দুইডা গরু ই মইরা গেছে।
    এমন কথা শুনার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলো না সাজুর মা। ঠাডা তো গরুর উপরে নয় রীতিমতো সাজুর মা’র মাথায় পড়লো যেন। কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো সাজুর মা’র চিন্তাজগত। কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না সে। চোখের কোণে জল এসে গেছে। পরক্ষণে সম্বিত ফিরে পেলো সাজুর মা।
    করিমন: কি হুনাইলা রীণার বাপ।
    বলেই এক গগণ বিদারী চিৎকার। অাশপাশের মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। বৃষ্টি পুরোপুরি থামে নাই এখনো। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই প্রতিবেশীরা এসেছে। কেউ ছাতা, কেউ পাতলা মাথায় দিয়ে, কেউ ভিজে ভিজেই এসেছে। এমন চিৎকার চেঁচামেচি শুনে কেউ কি ঘরে বসে থাকতে পারে। প্রতিবেশী বলে কথা। একটু খোঁজ খবর তো নেওয়া লাগে। বিল্লালের মা, মাজুর মা, ছমিরন বিবি, রহিমের বউ, গাজীর বউ, জাকিয়া অারও অনেকেই এসেছে। রহিমের বউ শুধায়।
    রহিমের বউ: কি অইছে লো সাজুর মা। এমন বৃষ্টির মইধ্যে তুই চিৎকার করতাছস কেরে?
    করিমন: সর্বনাশ অই গেছে অাফা।
    এটুকু বলেই অাবার চুপ হয়ে গেল সাজুর মা।
    রহিমের বউ: কি লো সাজুর মা। কি অইছে কইবি তো।
    করিমন: সাজুর মা বিলাপ শুরু করছে। অাল্লাহ গো। কি অইয়া গেলো গো।
    একটা ষাড়। অারেকটা বিয়াইবো মাস খানেক পর। এমন সময় দুইডা গরু ই বজ্রপাতে মরে গেছে। কিছু অাবাদী জমি অার দুইটা গরু ই ছিলো গৃহস্থের সম্বল। দুই ফসলি জমি। সারা বছর চাষ করা যায়না।
    এতক্ষণে ঘটনা বুঝতে অার বাকি নাই রহিমের বউয়ের। পাশ থেকে রীণার বাপে বললো সবকিছু।
    রহিমের বউ: কান্দিস না লো সাজুর না। কাইন্দা অার কি অইবো। অাল্লাহর মাল অাল্লাহ নিয়া গেছে। ধৈর্য্য ধর।
    করিমনের বিলাপ কমে না। সাজুর বাপেরে কিভাবে বলবে এই কথা। কত যত্ন করে পালে দুইটা গরু রে সাজুর বাপে। নিজ সন্তানের মতো অাদর করে।
    সবাই যে যার মতো সান্ত্বনা দিয়ে বাড়ি চলে গেলো। বিষণ্ণ মনে মাটিতেই পড়ে রইলো সাজুর মা। দুপুরে খায় নাই কিছু। খাওয়ার কথা মনেও পড়ে নাই। এমন দুঃসংবাদে পেটে যায় না কিছু। বৃষ্টি থেমেছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। সাজুর বাপ ফিরে এসেছে গঞ্জ থেকে। গরুর জন্য খৈল, ভূষি নিয়েই এসেছে। চটের বস্তা দিয়ে বাড়ির চারপাশ ঘেরা। পুরনো টিন দিয়ে একটা ছোট গেইট ও বানিয়েছে সাধ্যমতো। গরীব হতে পারে কিন্তু লজ্জা শরম অাছে। মুসলমানের বাড়ি একটু তো লাজ শরম থাকা চাই। বাড়ির গেইট থেকে হাঁক দেয় সাজুর বাপ।
    সাজুর বাপ: কেডা কই অাছো। বাজার সদাই লইয়া যাও বাড়ির ভিত্তে।
    কেউ কথা বলেনা। সবাই চুপ। নীরব, নিস্তব্ধ বাড়ি। অন্য সময় সাজুর মা জবাব দেয়। অাজ সাজুর মা ও চুপ হয়ে রয়েছে। সাজুর বাপ কিছু বুঝে উঠতে পারে না। কি ঘটে গেছে কিছুই জানেনা সে। এমন বৃষ্টির মধ্যে কিভাবে সংবাদ পাঠাবে তার কাছে। ঘর থেকে বের হবার জো নেই। সাজুর বাপ নিজেই এলো বাজার সদাই নিয়ে। ঘরের সবাই মাটিতে বসে রইছে গালে হাত দিয়ে।
    সাজুর বাপ: গালে হাত দেয়া তো ভালা কিছুর লক্ষণ না। মনে মনে ভাবে সে। কি অইছে খুইল্লা কও সাজুর মা। তোমরা হগলতে চুপ মাইরা অাছো কেন?
    সাজুর মা কোন কথা কয় না। মুখে কোন রা নাই। পাশে বসা যুবক সাজু কথা বলে।
    সাজু: বাজান। অামরার গরু দুইডা মইরা গেছে ঠাডা পইড়া। বলেই সাজু ও চুপ মেরে গেলো।
    ঠাডা যেন গরু দুইটার উপরে নয় সাজুর বাপের মাথায় পড়লো।
    সাজুর বাপ: অাল্লাহ গো। অামডার কি অইবো গো। কপালডাই বুঝি খারাপ অামার।
    বলেই দ্বিগুণ জোড়ে চিৎকার সাজুর বাপের। এমন চিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে এলো। সাজুর বাপেও বিলাপ শুরু করলো এখন। সাজুর বাপের বিলাপ শুনে মনু মোল্লা, জমির শেখ অার মসজিদের ইমাম সাহেব এসেছে। তারাও শুনতেছে সাজুর বাপের অার্তনাদ। সাজুর বাপের কথায় বাঁধ সাধলো ইমাম সাব হুজুর। অনেকটা প্রতিবাদী সুরে। তাকদীর এর ফয়সালা একমাত্র অাল্লাহ তাঅালার। কোন মানুষের ক্ষমতা নাই এতে। তাকদীরে যা লেখা অাছে তাই হবে। মানুষের জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, রিযিকের ফয়সালা সবকিছু তাকদীরে অাগে থেকেই লেখা থাকে। মানুষ যা জানেনা তা অাল্লাহ জানেন, মানুষ যা শুনে না তা অাল্লাহ শুনেন, মানুষ যা দেখেনা তা অাল্লাহ দেখেন। এজন্যই তিনি সর্বজ্ঞাতা, সর্বশ্রোতা। অাল্লাহর দৃষ্টির অগোচরে গাছের একটা পাতাও নড়ে না।
    ক্রমাগত ভাগ্যকে দুষেই চলেছে সাজুর বাপ। ইমাম সাহেব অার চুপ থাকতে পারলেন না। অনেক লেখাপড়া জানা মানুষ তিনি। এবার বলেই উঠলেন-
    ইমাম সাহেব: এমন কথা কইও না সাজুর বাপ। এমন কথা মুখে অানাও পাপ। যা কইয়া ফালাইছো তওবা করো অহনই। অাল্লাহর বিরাগভাজন হইও না। অাল্লাহ হয়তো অারো বড় কোনো বিপদ থেইকা তোমারে বাঁচাইয়া দিছে। তুমি যা জানো না তা অাল্লাহ জানে। শুকরিয়া অাদায় করো মিয়া।
    সাজুর বাপে তব্দা খেয়ে রইলো কিছুক্ষণ। ইমাম সাহেব কি বললো বুঝে উঠতে পারছিলো না সে। এমন একটা বিপদ গেছে তাও ইমাম সাহেব বলতাছে অাল্লাহর শুকরিয়া অাদায় করতে। কথাটা মনে ধরলো সাজুর বাপের। ইমাম সাহেব এর মতো এত পরহেজগার মানুষ না হলেও অাল্লাহর প্রতি অগাধ অাস্থা তার। এতকাল বাপ দাদার কাছ থেকে এই শিক্ষাই পেয়ে এসেছে সে। সব কিছুতেই অাল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করতেন তারা। যেকোন বিপদ-অাপদে সবর করতে হয় এটাই দ্বীন ইসলামের শিক্ষা। এতক্ষণে সাজুর বাপের বিলাপ বন্ধ হয়েছে। ইমাম সাহেব এর দিকে ইঙ্গিত করে সাজুর বাপে বলে উঠলো..
    সাজুক বাপ: অামার ভুল অামি বুঝতাম পারছি অহন। অাল্লাহ যা করে মানুষের মঙ্গলের জন্যই করে। অামি অার এমন কথা কমু না।
    ইমাম সাহেব: মাথা নেড়ে সায় দেয়। হ।
    ঐদিকে মাগরিবের অাযান হচ্ছে মসজিদে। সাজুর বাপকে সঙ্গে নিয়ে মসজিদের দিকে রওনা দিলো ইমাম সাহেব।
    গরু গুলোর চিন্তায় রাতে ভালো ঘুম হয়নি সাজুর বাপের। কত শখের গরু গুলো তার। এত সহজে কি ভুলা যায়। বোবা প্রাণী। হয়তো কথা বলতে পারতো না। তবুও যত্ন অাতির কম করে নায় সে। গরু গুলোর মায়ায় নিজের অজান্তেই চোখ বেয়ে দুই ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো তার। মানুষ ও প্রাণীর মাঝে এমন মায়া মহব্বত অাছে দেখেই তো জগৎ এত সুন্দর।
    হয়তো অাল্লাহ কপালে অারও ভালো কিছু রাখছে, সাজুর বাপ ভাবে।
    এত এত নিয়ামত তো বিনা দরখাস্তেই দিয়ে রেখেছেন অাল্লাহ। সব নিয়ামত গুণে শেষ করা এক জীবনে সম্ভব নয়। কোনভাবেই নয়। যুগে যুগে কত মানুষ অাসলো অার গেলো, কেউ পারেনি। পারবেও না কোনদিন।

Friends

Profile Photo
Md. Deloar Hossen
@md-deloar-hossen
Profile Photo
সৃষ্টি
@premdevota
Profile Photo
Pritam Biswas
@pritam-biswas
Profile Photo
Sirazam-Munira
@sirazam-munira
Profile Photo
Redwan Khan
@redwan-khan
Profile Photo
Kanej-Roksana
@kanej-roksana
Profile Photo
AdabenTatali
@adabentatali
Skip to toolbar