-
মেকআপ বিভ্রাট (রম্যগল্প)
.বাদ জুম্মা আহারাদির পর মোহনিদ্রার জগতে অবস্থান করিতেছিলুম। পথিমধ্যে দৈবাৎ স্বপ্নঘোরে যাহা দেখিলুম, তাহা রীতিমত অবিশ্বাস্য!
.স্বপ্নে যাহা দেখিলুম–
আমার পরম প্রেমপূজ্য বালিকার সহিত আমি শুভ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধপ্রায়। ভালোবাসার ললনাকে জীবনতক চিরস্থায়ীভাবে অধিকার করিতে যাইতেছি – অনুভূতি বেগতিক উত্তেজনাপূর্ণ। ক্ষণিক পরেই প্রণয়িনীকে পত্নীরূপে পাইবার আহ্লাদে আবেগের পেয়ালা যেন উথলাইয়া পড়িয়া যাইবার উপক্রম এবং সেই মহানন্দে উত্তজনাসকল আপনিই আপনাকে ফুলশয্যার সুড়সুড়ি দিতে লাগিল। কাজী সা’বকে কোনোমতেই বিলম্ব করিবার সুযোগ না দিয়া বারংবার তাগাদা দিতে লাগিলুম এবং অবশেষে তাহার হস্ত হইতে রেজিস্ট্রি খাতাখানা হরণ করিয়া আপনিই লিখিতে আরম্ভ করিলুম। বিবাহের মজলিসে অবস্থা যাহা দাঁড়াইল, তাহা প্রত্যক্ষ করিয়া উভয়পক্ষের উৎসুখ কুটুম্ববর্গ কানাকানি করিতে লাগিল এই বলিয়া যে, ‘আবেগের গরমে পাত্র বেচারা লজ্জা-শরমের মাথা ধুইয়া খাইয়াছে’। খবর অন্দরে পৌঁছিতে পৌঁছিতে এমনি বিকৃতভাবে রটিয়া গেল যে, ‘পাত্র বেশরম’। হেতু একটাই, কাজী মহাশয় পুছিবার পূর্বেই আমি কবুল কহিবার লোভ সংবরণ করিতে পারি নাই।
.
অবশেষে সকল আনুষ্ঠানিকতার অবসান ঘটিয়া বিবাহের কন্যা পাত্রস্থ হইল। রাত্রি দেড় ঘটিকা পর্যন্ত কুটুম্বসকল একে একে বিদায়ের পর্ব সম্পন্ন করিল। রাত্রি দুই ঘটিকার সময় স্বজ্ঞানে দরওয়াজায় খিল দিয়া ফুলশয্যার বিছানার দিকে অগ্রসর হইলুম। কিন্তু বিছানায় চড়িয়াই যে অজ্ঞান হইবার উপক্রম হইব, তাহা কে জানিত?
.মনের মধ্যে তখন উত্তেজনার ঝড় কল্পনার প্রশান্ত মহাসাগরকে অশান্ত করিয়া তুলিবার উপক্রম। সেই ঝড়ে আবেগের ঢেউ তটে এমনি করিয়া আঁছড়াইয়া পড়িবার উপক্রম যে এক্ষুণি গোটা কয়েক টাইটানিক সলিলের অতলে সমাধিস্থ হইবে। আনন্দ আর উত্তেজনায় বুকের ধুকধুকানি ঘড়ির কাটার শব্দকেও হার মানাইল। রবিবাবুর ভাষ্যে আমি তখন নায়ক অপু এবং “নরমাংসের স্বাদ পাইলে বাঘের যে দশা হয়, তাহার সম্বন্ধে আমার সেইরূপ দশা হইল”।
.
অতঃপর আঁখিদ্বয় বদ্ধ করিয়া তাহার মুখোমুখি বসিয়া দু’হাতে ঘোমটা সরাইয়া দিয়া তাহার চন্দ্রমুখপানে আমার অক্ষিবাণ নিক্ষেপ করিলুম। কিন্তু হায়! এ কি দেখিলুম আমি! এ কোন ললনা আমার সন্মুখে দণ্ডায়মান? আমার প্রেমপূজ্য দেবী পার্বতী কই? তাহার পরিবর্তে শ্বেতচর্ম প্রাণিটিকে কাহারা পশ্চিমা দেশ হইতে আমদানি করিয়া আনিল? ইহাকে চাইনিজ, মঙ্গোল কিংবা জাপানি বলিলেও বিভ্রম ঘটিবে নাহ্! ইহাকে তো আমি কোনোদিনও প্রণয় নিবেদন করি নাই! আমার সেই দুধে-আলতা কৃষ্ণবরণ সুচয়িনী কই?
.
অবস্থা এমনই বেগতিক হইল যে ক্রমশ অস্বাভাবিক হইয়া পড়িলুম। দু’হস্তের তালু মুষ্ঠিবদ্ধ করিয়া বেঘোরে চক্ষুদ্বয় ঘর্ষণ করিতে লাগিলুম। তারপর ফের রক্তবর্ণ চক্ষু বড় করিয়া আমার কাক্সিক্ষত ললনার সন্ধান করিলুম। কিন্তু নাহ্; কোনোমতেই তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া গেল নাহ্। পাগলপ্রায় আমি জ্ঞান হারাইবার পূূর্বে শুধু এই বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিলুম, ‘কন্যার বাপ আমার সহিত প্রপঞ্চ করিয়াছে…’।
.যখন জ্ঞান ফিরিল, আপনাকে পারিবারিক ডাক্তার কাকুর হেফাজতে আবিষ্কার করিলুম। আরও দেখিলুম, মাতামহাশয়া আপনার কোলে পুত্রের মস্তক রাখিয়া তাহাতে করুণ মমতায় হস্ত বুলাইতেছে আর আঁখিনদে আপনার বুক ভাসাইতেছে। ভগ্নি আপনার নিরলস প্রচেষ্ঠায় ভ্রাতার মাথায় পানি ঢালিতেছে। আর আমার পদযুগল কোলে জড়াইয়া সেই নববধুটি কাঁদিয়া বুক ভাসাইতেছে। দেয়াল ক্লকে তখন ভোর চারটা বাজিতে মিনিট কয়েক বাকি! চতুর্দিকে একবার মস্তকাবর্তন করিয়া আমি আপনার পত্নীখোঁজে বিভোর। আকস্মাৎ বধুসাজে বালিকা এবার ডুকরাইয়া কাঁদিয়া উঠিল। ক্রন্দনের বেগ এমনই বেগতিক ঠেকিল যে, আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া গেলুম। ক্রন্দনের প্রলাপে তাহার কোনো ভাষ্যই বুঝিতে না পারিলেও ইহা ঠিকই কর্ণগোচর হইল যে, করুণ অভিমানে সে বলিয়া উঠিল, “ফুলশয্যার রাত্রিতেই যখন স্বামীধন আপনার পত্নীকে চিনিতে পারিল না, তখন ইহার চাইতে বড় পরিতাপের কি-বা আছে…”?
.ইহা শুনিয়া আমার মাথা ঘুরিয়া উঠিল! এই পশ্চিমাদেশীয় শ্বেতচর্ম ললনা কি বলিতেছে? বিছানা ছাড়িয়া বারেক তাহার মুখোমুখি বসিলুম। দক্ষিণ হস্তে টর্চলাইট ধরিয়া তাহার আলো নববধুর মুখমণ্ডলে নিক্ষেপ করিয়া টানা পনের মিনিট তাহাকে নিরীক্ষণ করিলুম। কি আশ্চর্য! আঁখিজলের প্রভাবে কপোলদ্বয়ের উপরিভাগ হইতে ময়দাসম গাঢ় মেকআপের প্রলেপে ধস্ নামিতে আরম্ভ করিয়াছে – নদীভাঙ্গনের প্রভাবে স্থলের মৃত্তিকা যেইরূপে নদীগর্ভে বিলীন হয় – সেইরূপে! যাহার ফলে আমার প্রকৃত প্রেমিকার সত্যিকারের মুখাবয়ব কিঞ্চিত দৃশ্যমান হইয়াছে – কালোমেঘের আস্তরণের অন্তরাল হইতে রুপালি চাঁদের অংশবিশেষ যেমনি করিয়া মর্ত্যবাসীর দৃষ্টিগোচর হয় – তেমনিভাবে। আমি বড় অবাক হইলুম! তবে কি ইহাই আমার সুচয়িনী? বড্ড উৎসুক হইয়া তাহাকে আরও গভীরভাবে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলুম। ব্যগ্রভাবে শেরওয়ানীর আঁচল অঙ্গুলির মস্তকে পেঁচাইয়া তাহাতে কিঞ্চিৎ থু-থু লেপিয়া তাহা দিয়া নববধুটির মুখমণ্ডলে বারকয়েক সজোরে ঘর্ষণ করিতে লাগিলুম – সিরিজ কাগজের মারফতে ইটের দেয়াল হইতে যেরুপে শ্যাওলার আস্তরণ জব্দ করে – সেই রূপে। মুহূর্তেই বুঝিলুম, আড়ম্বর জবরজং কড়া মেকআপের প্রলেপে তাহার প্রকৃত সৌন্দর্য ও কায়াকে লুকাইয়া রাখিবার চাতুরী করা হইয়াছে। মনে ভাবিলুম, স্নো-পাউডার নামক মেকআপ আর বিউটি পার্লারেরা আজকাল বালকদিগের সহিত চাতুরী করিবার নিমিত্তে কতই না কূটকৌশল রচনা করিতেছে। মুখে বলিলুম, ‘বউ…’
অমনি সে আমাকে জাপটে ধরিয়া ফের ডুকরাইয়া কাঁদিয়া উঠিল…
.এমন সময় মশা মহাশয়ের অতর্কিত আক্রমণে আমার নিদ্রাভগ্ন ঘটিল। জাগিয়া উঠিয়া আপনাকে বিছানার এক কোণে আবিষ্কার করিলুম। ব্যাপক অনুসন্ধানের পরও আমার প্রণয়পত্নী, সেই ফুলশয্যার বিছানা খুঁজিয়া পাইলুম না। বিছানা ছাড়িয়া উঠানে আসিয়া দাঁড়াইলুম। বেলা তখন গোধূলিপ্রায়। দূর গগনে পক্ষীসকল নীড়ে ফিরিতেছে…
4 Comments
Friends
ab titu
@abtitu
Foyzur Khan
@foyzur-khan
Nipun Chandra
@nipunch
স্মৃতি রানী রত্না
@srratna1990
Mohammad Al-Mamun
@mohammad-al-mamun-titu
ভাস্কর
@vaskarchou
Prithula Zaman
@prithula
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta


দারুণ লিখেছেন। পড়ে বেশ মজা পেয়েছি।