-
মঙ্গল গ্রহের অশিরিরি
আদনান আহমেদ মারা যাওয়াতে আকবর আলিকে অভিযানের দলপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
পৃথিবীর ইতিহাসে আমরা কয়েকজনই হলাম সবচেয়ে বেশী পরিক্ষিত, পর্যবেক্ষিত আর প্রশিক্ষিত মানুষের একটি দল। মঙ্গলে প্রথম অভিযান মোটেই ছেলেখেলা নয়, এই দীর্ঘ যাত্রায় দলের সদস্যদের কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পরুক কিম্বা মানসিক স্থিরতা হারিয়ে ফেলুক এটাও কাম্য নয় অবশ্যই – আর সবগুলো পরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণে আদনান আহমেদ আমাদের সবার মধ্যে সেরা হয়েছিল। তারপর, অভিযান শুরুর মাত্র সাত দিন আগে, সে মারা যায়। হাসপাতালের প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা ছিল হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু, কিন্তু চিকিৎসকদের সাথে কথা বলে আমি নিশ্চিত হয়েছি যে তারা আদনান আহমেদের মৃত্যুর যথার্থ কোন কারণ আসলে পায়নি। এমনকি, মৃত্যুর পরেও তার শারীরিক এবং মানসিক দৃঢ়তা ছিল বেচে থাকার সময় যেমন নিখুঁত ঠিক তেমন। আমার মতে, তার মৃত্যুর আসল কারণ, যে বিশাল দায়িত্বের বোঝা তার কাধে চেপে বসেছিল সেটা, মানবজাতির আশা, অভিযানের দলপতি, নতুন এক বিশ্ব, নতুন এক সূচনা, এই সব কিছু মিলিয়ে নিজেকে সে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। সুতরাং, অনুমান করে নিয়েছিলাম যে আকবর আলি নিশ্চয়ই আরো বেশী অভিজ্ঞ আর দক্ষ। কিন্তু, তিনমাসের যাত্রায়, আমরা সবাই আকবর আলির চক্ষুশূলে পরিনত হয়েছি। সে মনে হয় ধরেই নিয়েছে যে এই অভিযানে যতো সমস্যা তার সামনে উপস্থিত হয়েছে বা হবে সগুলোর জন্য আমরাই দায়ী। মহাকাশ আসলে এই রকমই- এখানে যে কোন কিছুই ঘটতে পারে। আর তাই আমি যখন দলপতির সাথে দেখা করতে গেলাম তখন তার হতাশ দীর্ঘশ্বাস আর চোখ-মুখের ভাব দেখে মোটেও অবাক হলাম না।
“আবার কি হলো?” জিজ্ঞেস করল সে। “আমার মনে হয় এই মহাকাশযানে একটা ভুত আছে,” আমি জবাব দিলাম।
তথ্যটা দিয়ে যেন আমি তাকে কৃতার্থ করলাম। কিন্তু তাকে মোটেও চমকিত মনে হলো না। বরং, আমার কাধের উপর দিয়ে পিছনে তাকালো, আমার দিকে আবার ফিরে তাকানোর আগে, নিশ্চিত হয়ে নিল যে এই মুহূর্তে এখানে আমরা দুই জন ছাড়া আর কেউ নেই ।
“সুইচ বন্ধ করেছ তুমি?” জিজ্ঞেস করল সে ।
“অবশ্যই,” বিরক্ত হয়ে জবাব দিলাম আমি। “তোমার কি মনে হয় যা বলছি সেটা পৃথিবীর নিয়ন্ত্রন কেন্দ্রের ওদেরকেও শোনাতে চাই?”
এমন ব্যবস্থা করা আছে যাতে করে এই অভিযানের নিয়ন্ত্রক আরে পরিচালকরা সবাই পৃথিবীতে বসেই মহাকাশ যানের প্রতিটি অংশে নজর রাখতে পারবে, এই নজরদারি থেকে এমনকি টয়লেট গুলোও বাদ যায়নি। আসল বিষয়টা হলো, আট মাসের দীর্ঘ যাত্রায়, কিছু দিন যেতে না যেতেই, অতি মাত্রায় কর্মঠ বিজ্ঞানী আর প্রকৌশলীরা করার মতো কোনো কাজ আর খুজে পাবে না। তাই সময় কাটানোর জন্য সবাই কোনো না কোনো উদ্ভাবন কিংবা গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তৃতীয় সপ্তাহের শেষ দিকে সুমন আরে সুমনা একটা ডিভাইস তৈরি করে যেটা ব্যবহার করে আমরা যে কোন সময় মহাকাশ যানের যে কোন অংশ পৃথিবীর নজরদারি থেকে মুক্ত করতে পারি। স্বাভাবিক ভাবেই, পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে আকবর আলির কাছে অভিযোগ জানানো হয়, কিন্তু সুমন আরে সুমনা এই ব্যপারে কিছু জানে না বলে নিজেদের নির্দোষ দাবী করে, তারপর আরো দ্রুততার সাথে আরেকটা ডিভাইস তৈরি করে যেটা দিয়ে মহাকাশ যানের যে অংশ যখন নজরদারি মুক্ত থাকে তখন পৃথিবীর নিয়ন্ত্রন কেন্দ্র ওঁই অংশের একটা নকল প্রতিবেদন পেতে থাকবে আর আমরা এই মহাকাশে কিছুটা সময় একান্তে কাটাতে পারব। হাজার হোক, পৃথিবী থেকে আমরা এই মুহূর্তে দশ কোটি কিলোমিটার দূরে – আর মহাকাশ যানের অভ্যন্তরে আমরা কি করি সেটা সবসময় পৃথিবীকে জানানোর ও প্রয়োজন নেই।
“ভুত,” আকবর আলি বলল। “আচ্ছা…” মহাকাশ যানের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করছিল সে, একই সাথে সৌর তরঙ্গের পরিবর্তন নোট করছিল। প্যানেল আর পর্দার উপর মৌমাছির মতন নেচে বেড়াচ্ছে তার হাত দুটো, আমি যা বলেছি তাতেও কোনো ভাবান্তর হলো না। “কি ধরনের ভুত?”
“আদনান আহমেদের ভুত।” আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল আকবর আলি। “কিভাবে যেন আমি অনুমান করতে পেরেছি।” ডিসপ্লে স্ক্রিনের উপর সমান করে হাত রাখল সে – নিজেকে একটা স্ট্র্যাপ দিয়ে হাল্কা ভাবে বেধে রেখেছে, আর তাই সে ভেসে কন্ট্রোল মডিউলের নিচে চলে গেলো না – এবং ঘুরলো আমার দিকে। “বুঝতে পারছি তোমার কষ্ট হচ্ছে, জুনায়েদ, আমি জানি তোমরা দু’জন খুব ঘনিষ্ঠ ছিলে, কিন্তু তোমাকে এটা মেনে নিতেই হবে – সে আর নেই। আদনান আহমেদ আর নেই।”
“সেটা আমি জানি,” বললাম আমি। “আমিই ওঁর মৃতদেহ প্রথম দেখতে পাই। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, শিয়ারাপেলি ফ্লাই বাইতে, ওঁর সাথে আমি ছিলাম প্রায় ছয় মাস; শুধু আমরা দুজন, একা। ওঁর ব্যপারে সবকিছুই, আমি জানি, জানতাম এবং আমি জানি কথাটা উদ্ভট শোনাবে, কিন্তু বিশ্বাস করো, সে আমাদের সাথে এই মহাকাশ যানেই আছে। আমি তার গন্ধ পাচ্ছি।”
সবচেয়ে কাছের মনিটরের দিকে তাকাল আকবর আলি; সেখানে একটা লাল আলো অত্যন্ত ধীরে জ্বলছে আরে নিভছে, যাতে বুঝা যাচ্ছে যে যন্ত্রটা আমাদের আলোচনা রেকর্ড করছে না। ওঁর তাকানো দেখে, আমি আবার বললাম, “ওটা বন্ধ । আমি আগেই দেখে রেখেছি।”
নিজের অবিভ্যাক্তি লুকিয়ে রাখার জন্য সীমাহীন দক্ষতার পরিচয় দিল আকবর আলি। আমি সঠিক বলতে পারবনা যে নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র আমাদের আলোচনা শুনতে পারছে না বলে সে বিরক্ত, নাকি বিষয়টা মহাকাশ যানের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ থাকাতে স্বস্তি পেয়েছে।
“আর কিছু আছে, নাকি আমরা শুধু গন্ধমাদন ভুত নিয়েই আলোচনা করব?” সে জিজ্ঞেস করল।
ইতস্তত করতে লাগলাম আমি। সত্যি কথা বলতে কি, পৃথিবীতে থাকলে এটা নিয়ে কারো সাথেই কথা বলতাম না; নিঃসন্দেহে, মন মূল্যায়নকারীরা চোখের পলক ফেলার আগেই আমাকে এই অভিযান থেকে বাদ দিয়ে দিত, কিন্তু এখানে, পৃথিবী থেকে অকল্পনীয় দূরত্বে এই মহাকাশে ওরা কিই বা করতে পারবে? আমাকে ফেরত পাঠাবে? মঙ্গলে পৌঁছানোর পর, বােয়া-ডোম স্থাপন, সহগামী স্বয়ংক্রিয় শিল্পসমুহ স্থাপন, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং পুনর্সরবরাহ নিশ্চিত করার পরেই কেবল তারা আমাকে ফেরত পাঠাতে পারবে। হয়তো মঙ্গলে এক বছর কাটানোর পর ওরা আমাকে ফিরিয়ে নেয়ার চিন্তা করতে পারে। কিন্তু এই মুহুর্তে ওরা কিছুই করতে পারবে না, এবং আকবর আলি অবশ্যই জানে –অথবা তার জানা উচিৎ – আমি কি দেখেছি।
“আমার ধারণা আমি তাকে দেখেছি। একবার। এক রাতে বিশ্রামের সময়, আমার ঘুম আসছিল না তখন। সে ওখানে বসে ছিল, মনে হচ্ছিল যেন সে আমাদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছিল, যেন লক্ষ্য রাখছে আমাদের উপর। মঙ্গল ছিল তার স্বপ্ন, আকবর, এই অভিযানের স্বপ্নই তাকে সারাজীবন তাড়িত করেছে। আমার মনে হয়, সে যে এখানে আছে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, অভিযানের প্রতিটি বিষয়ের উপর লক্ষ্য রাখছে।”
“এখানে বসে ছিল? আমার চেয়ারে?” মাথা নেড়ে আকবর আলি বলল। “তুমি জানো এটাকে কি বলে, জুনায়েদ? শোক। খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু এটা প্রচণ্ড শোক ছাড়া আর কিছু নয়।”
“তোমার জায়গায় আমি থাকলে ঠিক এই কথাই বলতাম। কিন্তু, সমস্যা হচ্ছে আদনান আহমেদের ভুত শুধু আমি একাই দেখিনি, তাই না, আকবর?” এবং অভিযান দলপতির দিকে প্রশ্নবোধক ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে তাকালাম। তার চেহারা মলিন হলো না, কিন্তু বিব্রত হয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। আমি দেখলাম সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু সেখানে ভেসে উঠা তথ্যগুলো তার মস্তিষ্কে প্রবেশ করছে না। বরং, সে আরো ভেতরের দিকে তাকালো, তারপর আমার দিকে না তাকিয়েই বলল, “সংযোগটা সত্যিই বিচ্ছিন্ন করা আছে, জুনায়েদ?”
“হ্যা,” আমি বললাম। “চাইলে নিজেই দেখে নিতে পারো।”
“না, দরকার নেই।” মলিন হাসি দেখা গেলো তার মুখে, ফিরে তাকাল আমার দিকে। “ওগুলো চালু থাকলে তুমি যা বলেছ তার কিছুই আমাকে বলতে না।” নাকের ডগা চুলকালো আল্বর আলি, তারপর চিবুকে আঙ্গুল বুলাতে লাগলো। “তুমি কিভাবে জানতে পারলে?”
“ওর সাথে তোমাকে কথা বলতে শুনেছি আমি। তিন পর্যবেক্ষণ আগে। ওকে আমি দেখতে পারিনি, কিন্তু আমি ওর গন্ধ পেয়েছি। তুমি কি ওকে দেখতে পেয়েছিলে?”
মাথা নাড়ল আকবর আলি। “পরিস্কার কিছু ছিল না। অস্পষ্ট, কিন্তু আমি ওর কথা পরিস্কার শুনতে পেয়েছিলাম। আমার সাথে কথা বলেছিল সে… পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে আসার পর থেকেই সে আমার সাথে কথা বলছে।” আড়চোখে আমার দিকে তাকাল আকবর আলি। “মনে হচ্ছিল আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।”
“আমারও একই অবস্থা,” বললাম আমি।
“আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ কি ওর উপস্থিতি টের পেয়েছে?”
“আমার জানা মতে, না। কিন্তু, কথা হলো গিয়ে এটা এমন একটা বিষয় যা নিয়ে তুমি সবার সাথে আলোচনা করবে না। তাছাড়া পৃথিবী ছেড়ে আসার পর থেকেই… মহাকাশ যানে অদ্ভুত একটা পরিবেশ বিরাজ করছে।” একটু বিরতি নিলাম আমি, তারপর আবার বলতে লাগলাম। “পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে আসার পর তুমি ওর কথা শুনতে পাও, কিন্তু ঠিক কখন তুমি ওকে দেখতে পেয়েছিলে?”
“একটু সময় লেগেছিল। তুমি বলেছ যে তুমি ওর গন্ধ পাও?”
সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়লাম আমি, অবশ্য তার আগে কিছু একটা ধরে নিজেকে সামলে নিতে হয়েছিল যেন মহাকাশ যানের ছাদে গিয়ে মাথা বাড়ি না খায়।
“আমি প্রথমে শুনতে পাই,” আকবর আলি তাকিয়ে আছে ডিসপ্লের দিকে, হারিয়ে গেছে জটিল হিসাব-নিকাশ আর স্মৃতির অলি গলিতে। “ওর নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ, যখন রাত্রিকালীন পর্যবেক্ষণ করছিলাম। এখন মনে পড়ছে যে আমি তখন ভাবছিলাম একজন মৃত মানুষের শ্বাস- প্রশ্বাসের শব্দ শোনা কি অদ্ভুত। কিন্তু আমি ঠিক তাই শুনছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন সে আমার ঠিক পাশেই বসে আছে।” চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল আকবর আলি। “প্রথমে আমি ভেবেছিলাম যে ওটা মহাকাশ যানের কোনো শব্দ, হয়তো বায়ু চলাচল ব্যবস্থার কোনো যন্ত্র এমন শব্দ তৈরি করছে, কিন্তু অল্প সময়েই বুঝতে পারলাম যে আমি যখন এখানে একা থাকি শুধুমাত্র তখনই এই শব্দটা কানে আসে।”
“সেটা কখন? কবে প্রথম ওর সাথে কথা বলেছিলে তুমি?”
“পৃথিবী ত্যাগ করার অল্প কিছুদিন পরেই। সম্ভবত আমরা তখন কেবল চাদের কক্ষপথ পার হয়ে এসেছি; সেটা ছিল আমার দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় রাত্রিকালীন পর্যবেক্ষণ। আগেই বলেছি, প্রথমে আমি তেমন একটা গুরুত্ব দেইনি; আমি তখনো মহাকাশ যানের বিভিন্ন রকম শব্দের সাথে নিজেকে অভ্যস্ত করে নিচ্ছিলাম। তারপর, আমি তাকে কথা বলতে শুনি, যখন আমি গতিপথের একটা সংশোধন করছিলাম, এবং সে আমাকে কোঅরডিনেটসে কিছু পরিবর্তন করতে বলে।”
“নতুন কো-অর্ডিনেটস গুলো কি সঠিক ছিল?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“হ্যা, আমার তাই ধারণা, যদিও বাস্তবে তেমন কোনো প্রমান নেই। কিন্তু ওর দেয়া কো-অর্ডিনেটস গুলো দিয়ে যখন সিমুলেটর তৈরি করি, তখন, স্বীকার করতেই হবে, গতিপথ সমস্যার অত্যন্ত ফলপ্রসূ সমাধান পেয়ে যাই । আর তাই কো-অর্ডিনেটস গুলো আমি পরিবর্তন করে দেই।”
“নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র কিছু বলেনি?”
“ওহ, পরিবর্তনগুলো করার আগে আমি ওদেরকে কিছু জানাইনি। অবশ্য ওরা যখন নিজেদের মনিটরে পরিবর্তনগুলো দেখতে পায় তখন অবাক হয়েছিল, কিন্তু আমি সিমুলেটরের ফলাফল দেখানোর পর, ওরা আর আপত্তি করেনি। তারপর থেকেই, আমি ওর পরামর্শের জন্য কান পেতে থাকি সর্বদা ।”
“আচ্ছা, সেজন্যই তুমি বেশীরভাগ রাত্রিকালীন পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব নিজের জন্য বেছে নিয়েছ। তোমার সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছিলাম আমি ।”
“আসলে, সেটা একটা কারণ, আরেকটা কারণ হলো রাতে ঘুমাতে পারছি না আমি । ঠিক কখন তুমি ওর উপস্থিতি প্রথম অনুভব করেছিলে?”
“মোটামুটি তোমার কাছাকাছি সময়েই। কিন্তু তুমি বলেছিলে যে, তুমি ওকে দেখতেও পেয়েছিলে?” আকবর আলি কেবল মাথা নাড়ল। কারণ সিট বেল্ট বাধার সময় সে ভেসে উপরে উঠে গেছে।
“ওটা ছিল শুধুই একটা ছায়া, একটা অস্পষ্ট অবয়ব। কিন্তু সম্প্রতি, রাত্রিকালীন পর্যবেক্ষণের সময়, মনে হয় আমি ওকে প্রায়ই স্পষ্ট দেখছি, কখনো তাকে দেখি পর্যবেক্ষণ পোর্ট দিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরে, অথবা দাড়িয়ে আছে এস্ট্রগেসন ডিসপ্লেগুলোর কাছে।” আমার দিকে ফিরল আকবর আলি। “মনে হয় সে আমাদের উপর নজর রাখছে, জুনায়েদ, আমাদের সবাইকে লক্ষ্য করছে। যখন বুঝতে পেরেছি যে সে এখানে আছে, আমাদের সাথে, আমি তার জায়গায় দায়িত্ব নেয়াতে এখন আর তেমন একটা খারাপ লাগছে না। আশা করি তোমারও খারাপ লাগছে না, জুনায়েদ?”
আমি মাথা নাড়লাম।
“হ্যা, খারাপ লাগছে… নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, আমাদের সব কথা শুনতে পেরেছ তোমরা?”
মনুষ্যবাহি প্রথম মঙ্গল অভিযানের পথে আমরা তিন মাস, দুই সপ্তাহ, এবং পাচ দিনের দূরত্ব পেরিয়ে এসেছি। আমার মেসেজটা পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে পৌছতে লাগলো ছয় মিনিট, আরো ছয় মিনিট লাগলো তাদের জবাব আমাদের কাছে পৌছাতে। এই সময়ের মধ্যে, আকবর আলি বিস্ময়ে স্থবির হয়ে গেলো, যখন বুঝতে পারলো যে আলোচনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোটাই পৃথিবীর নিয়ন্ত্রন কেন্দ্রে রিলে করা হয়েছে; প্রচণ্ড রাগে আমার উপর হামলে পড়ার জন্য আসনের বাকলস খুলতে শুরু করল সে, তখনই আমার হাতে ধরা স্টান্ট স্টিক চোখে পরল তার, অস্ত্রটা সতর্কতার সাথে লুকিয়ে রেখেছিলাম আমি এতক্ষণ; অভিযানের অন্য সদস্যরা যখন নিয়ন্ত্রণ কক্ষে প্রবেশ করতে লাগলো, হাল ছেড়ে দিল সে, কারণ বুঝতে পেরেছে যে আলোচনার পুরোটাই বা সে যা বলেছে, প্রতিটি কথা দাড়ি কমা সহ শুনেছে সবাই ।
“আমরা শুনেছি,” নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র জবাব দিল। “অভিযানের দলপতি পরিবর্তনের অনুমতি দেয়া হলো।”
মঙ্গল থেকে সংগ্রহ করা নমুনা রাখার সুরক্ষিত চেম্বারে আকবর আলিকে বন্দি করে রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা। অবশ্য, কাজটা করার ফলে চেম্বারটা দুষিত হয়ে গেলো, কিন্তু তাতে তেমন কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হবে না, যেহেতু আমরা আর কখনো ফিরে যাবো না, কোনো অবস্থাতেই না। আমরা প্রথম মঙ্গলবাসি, এবং আমরা আজীবন থাকতেই যাচ্ছি । অনেক আগেই সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্তটা নেয়া হয়েছে, আমাদের প্রশিক্ষণ শুরুর একেবারে প্রথম দিকে; আমরা, যারা সারাজীবন এমন একটা অভিযানের স্বপ্ন দেখেছি, আমাদের জন্য এটা অজানাকে জয় করার কোনো অভিযান নয়। না, বরং, এই প্রথম আমরা নিজ গৃহে ফিরে যাচ্ছি। আদনান আহমেদের মৃত্যুর পর, একমাত্র, আকবর আলি, অনধিকার প্রবেশকারি, নবাগত দলপতি, নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের ইচ্ছানুযায়ী আমাদেরকে আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারতো। কিন্তু, এখন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র নিজেই তাকে অপসারিত করেছে, আর আমরা তাকে বন্দি করে রেখেছি, সুতরাং অভিযান, আমাদের অভিযান, এখন নিরাপদ।
রাত্রিকালীন পর্যবেক্ষণের সময়, আমি, অভিযানের নতুন দলপতি, আসনে শক্ত করে নিজেকে আটকে নিলাম, তারপর কনসোল আর ডিসপ্লেগুলো দেখতে লাগলাম খুটিয়ে খুটিয়ে।
“সঠিক পথেই এগোচ্ছি,” জানালাম আমি।
ওর গন্ধ পাচ্ছি আমি।
“বাড়ি ফেরার জন্য,” ফিসফিস করে জবাব দিল আদনান আহমেদ, অভিযানের দলপতি, মঙ্গলের অশিরিরি।
6 Comments
Friends
shewly khatun
@shewlykhatun
মো. আবু মোহাদ্দেস
@mohaddesh1967
Shoriful Shoron
@shoriful-shoron
Nayeim Sheikh Kabir
@nayeim
অভিমানী মন
@ovimanimon
Neel tripura
@neel
Drako Shajib
@drako
Prithula Zaman
@prithula
Sohel Khondokar
@sodeshi-sohel



রহস্যে ভরপুর… দারুণ গল্পের প্লট, বুনোটঠাসা সাবলীল শব্দে গল্পটা উপভোগ্য ছিল। আরো এমন গল্প হোক এ আবদার রইল। ❤️