-
লাল ফিতে
প্রতিদিনের মত আজো সেই চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছে, উসমান। প্রতিদিন সন্ধ্যায় এই দোকানে এসে চা খেয়ে যাই সে, থাকে চকবাজার এলাকার একটি ছোট্ট গলিতে, চকবাজার এলাকার একটি ছোটখাটো খাবারের দোকানে কাজ করে সে।
আজ প্রায় ২ বছর হয়ে গেলো ঢাকা শহরে এসেছে উসমান, বলা যাই একরকম বাধ্য হয়েই এসেছে। বাবা মারা যাওয়ার পর তার মা অনেকদিন এই সংসারের হাল টেনেছে কিন্তু হঠাৎ করেই তার মা মারাত্তক রকম অসুস্থ হয়ে পরে, এখন তার মা প্রায় শয্যাশায়ী, উসমানের একটা ১০ বছরের ছোট বোন ও আছে, মা অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর বেচারির পড়াশোনা ও করা আর হলোনা, অনেক শখ ছিলো বোনটার স্কুলে পড়ার কিন্তু তা আর হলো কই, মায়ের অসুস্থতা যেনো কেড়ে নিলো তার ছোট্ট বুকে দেখা সপ্নটি।
দিনের পর দিন খেয়ে না খেয়ে যখন সহ্যের শেষ সীমায় পৌছে গেছে, তখনি উসমান সিদ্ধান্ত নেই সে ঢাকা যাবে, সে শুনেছে ওখানে গেলে নাকি ভালো ভালো কাজ পাওয়া যায়, এদিকে মায়ের অসুখ টাও যেনো দিন কে দিন বেড়ে যাচ্ছে, সাত পাচ চিন্তা না করে সে একদিন বোচকা বুচকি বেধে রওয়ানা দিয়ে দেই ঢাকার উদ্দেশ্য, ঢাকাতে এসে কয়েকদিন কাজের জন্য, এদিক ওদিক অনেক ঘুরেছে সে, অবশেষে কোনরকম হাতে পায়ে ধরে এই খাবারের হোটেলে চাকরি টা জুটিয়ে নেই সে, আর মাসে মাসে যে টাকা টা পাই তার কিছুটা নিজের জন্য রেখে সমস্ত টাই পাঠিয়ে দেই বাসাই।
কয়েকদিন হলো তার মাহাজন তাকে মাসের বেতন টা দিচ্ছেনা, চাইতে গেলেই এমন গালিগালাজ করে যে শোনার মতনা, এদিকে বাসাই যে তার টাকা পাঠানোই লাগবে, টাকা না পাঠালে, তার মা, বোন যে না খেয়ে থাকবে, এই চিন্তা যেনো উসমান কে ঠেলে দেয় গভীর অন্ধকারে।
চা খেতে খেতে হঠাৎ ভুম ভুম করে বেজে ওঠে তার মোবাইল ফোনটা, পকেট থেকে বের করে দেখে মা ফোন দিয়েছে, কিছুক্ষন নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে থেকে, ফোনটা ধরে সে,
বাবা অনেকদিন তো হয়ে গেলো টাকা পাঠাবিনা, তোর বোনটা যে না খেতে পেয়ে খুদার জালাই কাদে, এদিকে আমার শরীর টাও দিনে দিনে আরো খারাপ হয়ে যাচ্ছে, ওষুধ গুলো শেষ, মায়ের কন্ঠে স্পষ্ট কষ্ট দেখতে পাই উসমান।
কিছুক্ষন চুপ করে থেকে আস্তে আস্তে বলে ওঠে সে, মা তুমি একদম চিন্তা করবেনা মা আমি কালকেই তোমাকে টাকা পাঠিয়ে দেবো, কোন সমস্যা নাই।
আচ্ছা বাবা পাঠিয়ে দিস, এই নে তোর বোন কথা বলবে, বলে ফোনটা ধরিয়ে দেয়
উসমানের একমাত্র আদরের ছোট্ট বোন, যুথীর কানে।
ভাইয়া তোমার সাথে কথা নাই, গত বার আসার সময় বলেছিলাম আমার জন্য একটা লাল ফিতা আনতে, অথচ তুমি আনোনি, অনেক পচা তুমি, এক অজানা অভিমান ঝরে পরে যুথীর কন্ঠ থেকে।
নারে বোন রাগ করিস না, এবার বাসাই আসলে তোর জন্য একটা না দুইটা লাল ফিতা আনবো ঠিক আছে, খুশি হয়েছিস বোন।
আচ্ছা ভাইয়া, এবার কিন্তু এনো, ভুলে যেওনা যেনো, আচ্ছা রাখি বলে ফোনটা কেটে যায় ওপার থেকে।
উসমান ঠিক করে তার জমানো যে কয়টা টাকা আছে সেখান থেকে কিছু টাকা আপাতত বাসাই পাঠিয়ে দেবে।
চা টা শেষ করে, চায়ের বিল মিটিয়ে সে হাটতে থাকে সামনের দিকে, রাস্তার মোড় টাতে একটা লোক ঝুড়ি তে করে চুরি, ফিতা, আলতা এসব বিক্রি করে, উসমান সেইদিকে উদ্দেশ্য করেই হাটতে থাকে, কিছুদুর এগুতেই দেখা পাওয়া যাই লোকটার, দরদাম করে দুটো ফিতে কিনে ফেলে সে, পরে যদি আবার ভুলে যায় তাই এখনি কিনে ফেললো সে, বড্ড মন ভোলা হয়েছে সে ইদানিং।
হাতে ফিতা দুটো নিয়ে রাস্তার একপাশ দিয়ে হাটতে থাকে উসমান, মনে হাজারো রকম চিন্তা, হঠাৎ সে শুনতে পেলো কিছুটা সামনেই অনেক মানুষের চেচামেচির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, একটু উৎসুক হয়ে সেই আওয়াজ লক্ষ করে এগিয়ে যাই সে,
হঠাৎ কি থেকে কি হয়ে গেলো বুঝতে পারলোনা উসমান, একটা বিদ্যুৎ এর খুটি তে আগুন ধরে গেছে আর সেই খুটি টা এসে পরে একদম উসমানে পাশেই, সাথে সাথে তার গায়েও আগুন ধরে যাই, হতভম্ব উসমান কি করবে বুঝতে না পেরে এদিক ওদিক দৌড়াতে থাকে আর সমস্ত শরীর বেয়ে বাড়তে থাকে আগুনের লকলকে শিখাটা, সারা শহর যেনো এক পৈচাশিক হলুদ আলোই ভরে গেছে, আস্তে আস্তে পুরো এলাকাই আগুন ধরে যাই, এ যেনো আগুন নয় এক মস্ত বড় দানব।
সমস্ত শরীর টা যেনো জলে পুরে যাচ্ছে তার, কিন্তু এতকিছুর পরেও, বোনের জন্য কেনা ফিতা দুটি হাত ছাড়া করেনা সে, দৌড়াতে দৌড়াতে অবশেষে অজ্ঞান হয়ে পরে যায় উসমান।
উদ্ধারকারী দল এসে আগুনে পুড়ে যাওয়া মৃতদেহ গুলোকে উদ্ধার করতে আসার সময় দেখতে পাই, একটি কম বয়েসে ছেলে রাস্তাই শুয়ে কাতরাচ্ছে, তার শরীরের বেশির ভাগ অংশই পুড়ে গেছে, কয়েকজন উদ্ধারকারী দৌড়ে চলে যায় ছেলেটির কাছে,
স্যার ও স্যার স্যারগো আমাকে বাচান স্যার, আমার যে এই ফিতা গুলো আমার বোনকে দিতে হবে স্যার, আমার মা যে আমার জন্য অপেক্ষা করছে স্যার, এই দেখেন স্যার আমার বোনের জন্য কিনেছিলাম এই ফিতা গুলি, স্যার ওকে না দিলে যে অনেক অভিমান করবে স্যার।
উদ্ধারকারী দলটি নিরব হয়ে শুনছিলো ছেলেটির কথা, তাদের বুক টা যেনো পাথরের মত ভারী হয়ে গিয়েছে, কি পরিমান ভালোবাসা থাকলে একটা মানুষ মৃত্যুশয্যায় এসেও এমন কথা বলতে পারে।হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই মারা যায় উসমান, শুধু রেখে গেছে তার বোনের জন্য কেনা লাল ফিতা দুটি, নিষ্ঠুর প্রকৃতি টা কিছুতেই দিতে দিলোনা সেই ফিতা গুলো।
উসমানের মা যে এখনো অপেক্ষা করে আছে তার ছেলের জন্য।।লেখাঃ উসমান।
9 Comments
Friends
নন্দিনী
@nandini-chowdhuri
Mahmuda Sultana
@mahmudamahi
Prithula Zaman
@prithula
Shaikh-Mohidul-Islam
@shaikh-mohidul-islam
Md Tashnim Rahman
@wire-taseen
Reza e Rabbi
@rabbi121
Mesbah-Ahmed
@mesbah-ahmed
Rafiq-Ullah
@rafiq-ullah



গল্পটা পড়ে মন খারাপ হয়ে গেল লেখকবন্ধু! একটা মন ভালো করার মত গল্পের আবদার রইল!