Profile Photo

Mahira SOffline

  • Rahman-N-Zinnia
  • Profile picture of Mahira S

    Mahira S

    3 years, 7 months ago

    গল্প- শ্রাবণ সন্ধ্যা
    পর্ব-৭
    নানু পরিস্থিতি হালকা করার জন্যে বললেন,

    -আরেহ, কখন এলে তুমি মা? বুঝিই নি। এসো, বসো। তুমি বিশ্রাম নিয়েছিলে?

    সন্ধ্যা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। মুখে শূন্য অভিব্যক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সে।

    কিছুক্ষণের মধ্যেই সন্ধ্যা তার মুখে নকল হাসি উপলেপন করে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

    -এইতো নানু, এখনই এসেছি। আসলে একটু বিশ্রাম নিয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু আপনাদের ছাড়া ভালো লাগছিল না।

    সন্ধ্যা কাছে যাওয়ার পর নানু খেয়াল করলেন সন্ধ্যার চোখে পানি।

    -একি, তুমি কান্না করছ?

    হাসি নিয়েই সন্ধ্যা বলল,

    -ওহ, না নানু, একটু আগে বাতাস এসেছিল রুমের জানালা দিয়ে, তখন চোখে বালি ঢুকে গেছে।

    -আহারে আমার সোনাটা। তোমার এখানে থাকতে কষ্ট হচ্ছে না তো?

    -না, নানু কি বলেন। অনেক ভালো লাগছে। সব চেয়ে ভালো লেগেছে আপনাদের আন্তরিকতা।

    শ্রাবণ চুপচাপ চোরের মত তাকিয়ে ছিল সন্ধ্যার দিকে। সে ওর কাছ থেকে কথা লুকিয়েছে দেখে খুবই অপরাধী মনে হচ্ছে। কিন্তু শ্রাবণ এটাও খেয়াল করেছে যে সে শ্রাবণের চোখে তাকাচ্ছেনা। সন্ধ্যার চোখ শ্রাবণের চোখকে এড়িয়ে চলছে।

    নানু সন্ধ্যাকে নানা আর উনার মাঝে বসিয়েছেন। নানু সন্ধ্যার মাথা হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। আর নানা প্রসঙ্গে কথা তুলছেন যাতে সন্ধ্যা ওই কথাটা ভুলে যায়।

    একটু পর নানু তাকে নানুর রুমে নিয়ে যান।

    -তোমার জন্যে একটা উপহার আছে।

    সন্ধ্যার মনটা একটু হালকা হয়েছে। তার মুখে এখন সত্যিকারের হাসি।

    -কি সেটা নানু? আগে বলো আমরা যেভাবে বলি সেভাবে করবে?

    -উমম, আমি চাচার বাসা থেকে আগেই বের হয়ে গিয়েছিলাম, আমার জীবন এখন আমিই চালাই। এখন আর কারও পারমিশন নেওয়ার প্রয়োজন হবেনা। বলুন কি করব?

    -তা এখন না। পরে বলব। আগে শাড়িটা পড়ে ফেলো চট করে।

    -আপনি যা বলবেন তাই হবে নানু। আচ্ছা নানু, এটা কি আপনার শাড়ি নাকি আন্টির শাড়ি?

    -এটা আমার শাড়ি।

    -ওয়াও নানু, আপনাদের সময় শাড়িগুলো এত সুন্দর ছিল?

    -হ্যাঁ। জানো প্রতিবার যখন আমি এই শাড়িটা পড়তাম, তোমার নানা প্রতিবারই আমার প্রেমে পড়তো।

    -নানা খুব রোমান্টিক ছিল তাইনা নানু?

    -হ্যাঁ, এখনো রোমান্টিক। দুই বুড়ো বুড়ি মিলে এখনো বৃষ্টিতে ভিজি।

    -ওয়াও নানু। আরও বলুন আপনাদের স্পেশাল মোমেন্টের কথা।

    নানু একটু লজ্জা পেয়ে বললেন,

    -বলবো সোনা, রাতে বলবো। এবার যাও, শাড়িটা পড়ে নাও। নিজে নিজে পড়তে পারো?

    -জ্বী নানু, পারি।

    -আচ্ছা আমি তাহলে একটু বাহিরে যাচ্ছি আমার কাজ আছে।

    সন্ধ্যার মুখের হাসিটা দেখে নানু রুম থেকে বের হয়ে গেলেন।

    বের হয়ে তিনি নানার কাছে গেলেন।

    -এইযে, একটু এদিকে আসবেন?

    নানা প্রায় দৌড়ে চলে এলেন,

    -বলেন বেগম সাহেবা, কি করতে পারি?

    -আপনার সেই পাঞ্জাবীটা শ্রাবণকে দিন।

    -কিন্তু কেন? এখন পাঞ্জাবী পরে কি করবে?

    -উফফ, আপনি সারাজীবন টিউবলাইটই থেকে যাবেন।

    নানু আস্তে করে সব বুঝিয়ে দিলেন নানাকে।

    -ইশশ, আমার বৌটা যদি এই কাজটা নিজের মেয়ের সাথে করতো, তাহলে হয়তো আজ কাছে থাকতে পারতাম।

    -হেহে, কারণ তখন আমিও আপনার মত টিউবলাইট ছিলাম।

    নানা নানুর কপালে চুমু দিয়ে শ্রাবণের কাছে গেলেন। এদিকে নানু সব কাজ সেরে নিলেন।

    সন্ধ্যা রেডি হওয়া শেষে নানুকে ডাক দিল। নানু ঘরে ঢুকে চোখ গুলো বড় করে ফেললেন।

    -কি হলো নানু? আমাকে দেখতে বাজে দেখাচ্ছে?

    -মাশাল্লাহ। এই জন্যই তো আমার শ্রাবণ তোমার প্রেমে পড়েছে।

    -হ্যাঁ? বাজে দেখাচ্ছে বলে প্রেমে পড়েছে?

    -আরে না। তুমিও কি এই বুড়ো বুড়ির মত টিউবলাইট?

    অনেক্ষণ পর সন্ধ্যা মন খুলে খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর সুন্দর করে শাড়ির আচল দিয়ে মাথা কাপড় দিল।

    -এবার ঠিক আছে নানু?

    -একদম পারফেক্ট। থু থু তোমার দিকে যেন নজর না লাগে। হাহা, চোখে কাজল নেই তাই থু থু দিয়ে দিলাম।

    অথৈ আবার খিল খিল করে হেসে উঠল আর এবার সে নানুকে জড়িয়ে ধরল।

    -এত কুল নানু কোনোদিন দেখিনি। আসলেই আমি অনেক ভাগ্যবতী।

    নানু অথৈয়ের কপালে চুমু দিলেন।

    -আচ্ছা একটু দাঁড়াও। আমার একটু আকজ আছে। তুমি বসে থাকো।

    -আচ্ছা নানু।

    এবারও নানু অথৈয়ের হাসিটা দেখে চলে এলেন বাহিরে। এসে নানাকে জিজ্ঞেস করলেন,

    -এইযে, শ্রাবণকে রেডি হতে বলেছেন?

    -হ্যাঁ হয়ে গেছে।

    -আর সন্ধ্যার চাচা চাচির খবর নিয়েছেন?

    -হ্যাঁ কাছাকাছিই আছে। আচ্ছা বলোতো ওর চাচা চাচি এত সহজে মেনে নিল কীভাবে?

    -আরে আমার টিউবলাইট জামাই, শুনো নি যখন শ্রাবণ বলছিল কিভাবে ওদের দেখা হয়েছে? তখন সে বলেছিল যে সে সন্ধ্যার চাচা চাচির সাথে আগেই দেখা করেছে।

    -ও হ্যাঁ তাইতো। মনে পড়েছে। হেহে, তোমার প্রেমে বুড়ো হয়ে গেছি তো তাই সব ভুলে যাচ্ছি।

    নানু মুচকি হাসি দিল। পরেই বেল বাজলো দরজার। শ্রাবণ দরজা খুলল,

    -আরেহ, চাচা চাচি আপনারা? ভালো আছেন? আসুন আসুন ঘরে আসুন।

    চাচি শ্রাবণের মাথায় আদর করে দিয়ে বললেন,

    -কেমন আছো বাবা?

    -আন্টি আমি ভালই আছি আর আপনাদের মেয়েটাও ভালো আছে আলহামদুলিল্লাহ। আসেন আন্টি বসেন।

    ড্রয়িং রুমে চাচা চাচি বসলেন।

    সন্ধ্যা অধির হয়ে বসে আছে খাটের এক পাশে। কিছুক্ষণ পর সে আবার একটা কলিং বেল শুনলো। এর আগেও সে বেল এর আওয়াজ শুনেছিল ঠিকই কিন্তু তখন কে এসেছিল বুঝতে পারেনি।

    কিছুক্ষণ পর নানু একজন হুজুর কে নিযে ঘরে নিয়ে এলো। সন্ধ্যা ঠিক মত মাথায় কাপড় দিয়ে দাঁড়াল।

    নানু সব বললেন সন্ধ্যাকে। সন্ধ্যা বলল,

    -নানু আমি রাজি আছি, কিন্তু আমার চাচা চাচি যারা আমাকে এত আদর করেছেন বাবা মা চলে যাওয়ার পর থেকে, তাদেরকে ছেড়ে কিভাবে এত বড় কাজটা করি?

    নানু শুধু একটা মুচকি হাসি দিল। এরপর যা ঘটেছিল, মনে হয়েছিল নানা যেন নানুর মনের কথা শুনতে পেরেছে। সুন্দর করে চাচা চাচিকে সেই রুমে নিয়ে এলো। সন্ধ্যা কান্না করে দিয়েছে তাদের দেখে। চাচি বললেন,

    -ওমা, আমার এতো স্ট্রং মেয়েটা কান্না করছে কেন? চুপ, কান্না করেনা।

    -না, চাচি আমি ভেবেছিলাম আপনাদের ছাড়া আমার এই বিশেষ দিনটার অংশীদার হতে হবে।

    -আহা, কান্না করবি না সোনা। আমরা আছি তো। তোর সাথে দেখা করার জন্যে তিশ্মাও এসেছে।

    তিশ্মা সন্ধ্যার চাচাতো বোন। তিশ্মাকে দেখে সন্ধ্যা জড়িয়ে ধরল।

    রাত আট টার দিকে সব কাজ শেষ করে নিল।

    ড্রয়িং রুমে বসে সবাই কথা বলছিল।

    শ্রাবণের রুমে বসে তিশ্মা, সন্ধ্যা আর সামিহা গল্প করছিল।

    একটু পর শ্রাবণ এলো, একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

    -তিশ্মা আপু খেতে আসেন।
    -আহা, ভাইয়া আমি মনে হয় আপনার ছোট হব। আপনি করে ডাকতে হবে না।
    শ্রাবণ মুচকি হাসি দিল,
    -যদি আমার মিসেস এর কোন সমস্যা না হয় তাহলে বলতে পারি।
    – আচ্ছা ওসব তুমি আপনি পরে দেখা যাবে এখন খেতে যাই। এসো সামিহা, আমরা খেয়ে আসি।

    যাওয়ার আগে মুখে মুচকি হাসি নিয়ে শ্রাবণের কাছে যেয়ে ফিসফিস করে বলল তিশ্মা,
    -ভাইয়া আপনি একটু পরে আসতে পারেন, যদি কিছুক্ষণ আপনার মিসেস এর সাথে সময় কাটাতে চান আমি কিছু একটা বলে বাহানা দিয়ে দিব।

    শ্রাবণ লজ্জা পেয়ে উল্টো মুচকি হাসি দিলো। তিশ্মা চলে যাওয়ার পর শ্রাবণ দরজাটা লাগিয়ে একটু গলা খাঁকারি দিলো সন্ধ্যা এর মনোযোগ পাওয়ার জন্য। তবুও সন্ধ্যা তার দিকে তাকালো না। শ্রাবণ বুঝতে পেরেছে যে মনটা এখনো সন্ধ্যা এর মুড অফ হয়ে আছে। এতক্ষণ সন্ধ্যা খাটের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। শ্রাবণ কাছে যেতেই সে দূরে চলে গেল। এবারও শ্রাবণের চোখে চোখ রাখছে না সন্ধ্যা। ড্রেসিং টেবিলের সামনে যেয়ে কানের দুল গুলো খুলছিল। শ্রাবণ আবার কাছে আসলো কিন্তু, এইবারও সে কোন কাজ করার বাহানা নিয়ে দূরে চলে গেল। এবার শ্রাবণ আরেকবার চেষ্টা করল। যখন চলে যেতে নিচ্ছিল তখনই সন্ধ্যার বাহু ধরে টান দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে এলো।

    – তুমি কি আমার উপর রাগ করে আছো?

    সন্ধ্যা কিছুই বলল না। নিজেকে শ্রাবণের হাত থেকে সরিয়ে নিয়ে জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। এত কিউট লাগছে যে তাকে আদর করতে মন চাচ্ছে শ্রাবণের।

    -প্লীজ কথা বলো, চুপ করে থেকো না। আমার ভালো লাগছে না আর। তোমার কি হয়েছে বলবে? তুমি কি….. আচ্ছা তুমি কি একটা সত্যি কথা বলবে? তুমি কি আসলেই শুনে ফেলেছিলে সেই কথাটা?

    এবারও সন্ধ্যা কোন উত্তর দেয়নি। জোড়ে নিঃশ্বাস ফেলে শ্রাবণ বলল,
    -আচ্ছা এতই যদি অভিমান থাকে, তাহলে শুধু মাথাটা নাড়িয়ে বল আমি বুঝে নেব আর যদি না থাকে তাহলে মুখেই বলো।

    সন্ধ্যা একটু মাথা নাড়ালো। যাক, কোন কিছুতে তো সাড়া দিয়েছে। শ্রাবণ তো ভাবতেই শুরু করেছিল যে সে অদৃশ্য হয়ে গেছে তাই সন্ধ্যা ওর কথা বুঝছে না।

    শ্রাবণ আলতো সন্ধ্যা এর কোমরে স্পর্শ করলো। কানের কাছে এসে বলল,
    -দেখো তুমি কষ্ট পাবে দেখে আমি তোমাকে বলতে চাইনি কথাটা। মা যে তোমাকে নিয়ে এত কিছু বলেছেন সব সহ্য করি নিয়েছি। আসলে মায়ের বুঝতে ভুল হয়েছে কি করবো বলো? মাকে তো আর ফেলে দিতে পারি না।

    সন্ধ্যা তার কোমর থেকে শ্রাবণের হাত সরিয়ে নিল। এবার সে মুখ খুলল,
    -দেখেন, কথাটা এটা না। আমি এজন্য আপনার সাথে রাগ করিনি বা মায়ের সাথে রাগ করিনি। কথাটা হচ্ছে আপনি আমাকে যথেষ্ট বিশ্বাস করতে পারেননি। আপনি ভেবেছেন এই কথাটা শুনে আমি খুবই ভেঙে পড়বো। আসলে খারাপ লাগবে, সবারই লাগবে। কিন্তু আপনি আমার কাছ থেকে কথাটি লুকিয়েছেন এই ভেবে যে আমার মনে আপনার মায়ের প্রতি অসম্মান বা ঘৃণা বেড়ে যাবে। কিন্তু আমি অমন মেয়ে না। আপনি যদি আমাকে বলতেন, মা যেমন ছেলের বউ চায় আমি সেরকম হওয়ার চেষ্টা করতাম। এটা সত্যি আমি কষ্ট পেয়েছি কিন্তু কষ্ট পেলেই কি জীবন শেষ হয়ে যাবে? না, কষ্ট পেয়েছি কষ্ট চলেও যাবে। আপনার শুধু আমার উপর বিশ্বাস রাখতে হবে।

    – না তুমি ভুল ভাবছো আমি তোমার ওপর যথেষ্ট বিশ্বাস করি কিন্তু আমি চাইনা তোমাকে কষ্ট দিতে আমি চাইনা তুমি কোন ভাবে কষ্ট পাও। কারণ তুমি কষ্ট পেলে আমিও পাবো, সন্ধ্যা। আমি অনেক স্বার্থপর। আমি আমার নিজেকে কষ্ট দিতে চাইনা, কারণ তুমি পেলে সেটা আমাকেও আঘাত করবে।

    আরও কিছু বলতে নিচ্ছিল শ্রাবণ কিন্তু সন্ধ্যা চট করে নিজের ঠোঁট শ্রাবণের ঠোঁটে বসিয়ে দিল।

    5
    3 Comments
Skip to toolbar