-
• 4 years, 11 months agoIshtiaq Alam• 4 years, 11 months ago
ভূত দেখা
ইশতিয়াক আলমকেউ বলে ভূত আছে। আবার কেউ বলে ভূত নেই। যারা ভয় পায় তারা বলে ভূত আছে। আর যাদের ভয় কম তারা বিশ্বাস করে না। তাচ্ছিল্য করে বলে, দূর ভূত বলে কিছু নেই।
ভূত থাকুক আর না থাকুক ভূতের ভয় কিন্তু আছে। আর যেহেতু ভূতের ভয় আছে সেইহেতু ভূতও আছে।
এসব কথা থাক। ভূতের গল্প বলি। আমার নিজের দেখা সত্যি ভূতের গল্প। সময়টা শীতের। পরীক্ষা শেষ। রাতের খাওয়া শেষ করে আমরা ছোটরা কাঁপতে কাঁপতে এসে লেপের ভেতর পা ঢুকিয়েছি। কেউ পুরো শরীর,কেউ আধাশোওয়া আধাবসা। রান্না ঘরের মেঝেয় পাটিতে বসে আব্বা আর মা খাওয়া শেষ করে বড়দের গল্প করছে। এই সময় সোরাব এলো। সোহরাবকে ঘন ঘন ডাকতে গিয়ে সোরাব হয়েছে। সোহরাবও ওর আসল নাম নয়, আসল নাম রুস্তম। কিন্তু পাশের বাসায় চাচার [তখনো আঙ্কেল ডাকা চল হয়নি। নাম রুস্তম সাহেব বলে আমাদের বাসার কাজের ছেলের নাম বদলে রাখা হয়েছে। সোহরাব।সোহরাব থেকে সোরাব।
নামে সোহরাব হলেও স্বাস্থ্যে কিন্তু তা নয়। ঝাঁটার কাঠির মাথায় ডুমুর ফলের মতো দেখতে। স্বাস্থ্যে যেমনি হোক খুব চটপটে। ডাকলেই সাড়া পাওয়া যায়। কিছু করতে বললেই কথা নেই, শুরু করে দেয় কাজ। আগের কাজের অর্ধেক বাকি থাকলেও। আর একটা কাজ করে সুযোগ পেলেই করে এবং খুব খুশি মনে করে। আর সেটা হচ্ছে গল্প বলা। লেখাপড়া না জানা গ্রামের ছেলের স্টকে যে এত গল্প থাকতে পারে তা আমরা ভাবতেই পারিনি। আর সে কত বিচিত্র গল্প। তার আরো গুণ ছিল সে সাহসী ও কৌতুকপ্রিয়।
ইদানীং চলছিল ভূতের গল্প বলা। টেন থেকে টু পর্যন্ত পিঠেপিঠি আমরা পাঁচ ভাইবোন। বড়ছোট মান্যি গন্যি কম, সবার মধ্যে খুব ভাব। আবার সদ্ভাবের অভাব হতেও দেরি লাগে না। কখনো কখনো পাঁচ জনের ঝগড়া-ঝাটিতে বেধে যায় ল-াকা-। ভূতের গল্প শুনেও মত প্রকাশে দ্বিমত হতে দেরি হলো না। কেউ বলল, ভূত-টূত নেই। যত গাঁজাখুরি গল্প!
সোরাব বা সোহরাব, আসলে রুস্তম, বড়দের মতো গম্ভীর হয়ে সংক্ষেপে মন্তব্য করল, ভূত আছে।
কøাস টেনে পড়া টুটুল ভাইয়া ওর কথাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে বলল,
: ভূত থাকলে দেখা।
সোরাব পাশ কাটাল না। চ্যালেঞ্জকে গাভাস্কারের ক্রিকেট বলের ক্যাচ ধরার মতো লুফে নিয়ে বলল,
: দেখাব।
: কবে? জানতে চাইল শুধু টুটুল ভাইয়া নয় টুটুলের পরের জন টীনা আপা এবং একদম ছোট টুনটুনিও।
ঝাঁটার কাঠির মাথায় ডুমুর ফলের মতো গোলমাথার সোরাব এক মুহূর্ত ভাবল। তারপর সবার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, আইজ ?
: হ্যা আজ। আমার পাঁচ ভাইবোন সমস্বরে বলে উঠি।
: হ্যাঁ। কিন্তু ভূত দেখে ডরাতি পারবেন না।
আমারা ভূত দেখতে পাওয়ার কৌতূহলে ভূতের ভয়ের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে বলে ফেললাম, না ডরাব না।
সোরাব প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেওয়ার মতো করে জিজ্ঞেস করল, ঠিক?
পাঁচজনের অন্ততঃ তিনজন বলল, ঠিক।
: চ্যাঁচাবেন না তো?
: না।
: ঠিক?
: ঠিক।
ভূতের কথা বাদ রেখে মাঝে একটু অন্য কথা বলে নিই। ভূত দেখা সে বছরে ঈদ-উল-আযহা হলো ডিসেম্বরের প্রথমে। [চান্দ্র বছর ৩৫৪ দিন বলে তেত্রিশ বছরে ইংরেজি বছর থেকে এক বছর পিছিয়ে যায়।] পাকশী নামের আধা মফস্বল শহর সাজানো-গোছানো কিন্তু খুব খোলামেলা। ক’দিন আগে ঈদ হয়ে গেছে বলে এখানে ওখানে দেখা যায় ছাগল কিম্বা গরু কোরবানীর চিহ্ন।
আমাদের সেই মফস্বল পাকশী শহরে তখনো সুইচ টিপলেই ঘরভর্তি আলো আসেনি। বাদুর মার্কা চিমনি লাগানো দুটি হারিকেন জ্বলছিল ঘরে। সোরাব একটা পাশের ঘরে রেখে অপরটার আলো কমিয়ে দিয়ে আবারো জিজ্ঞেস করল, সত্যি ডরাবেন না তো?
এবারে আর সবাই নয়, শুধু টুটুল এবং তার এক নম্বর সাগরেদ সিক্সে পড়া টিটো আগের মতোই জোর দিয়ে বলল, না।
দরজা ভেজিয়ে গিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে সোরাব শুধু বলল,
: আসতিছি।
আধো অন্ধকার ঘরে আমরা অপেক্ষা করতে থাকি। সত্যি বলতে কি একটু ভয় ভয়ও করে। তবু সবাই চুপ। চীনা টেবিল ঘরিটা শুধু টিক্ টিক্ শব্দ করে আমাদেরকে সাহস অথবা ভয়ের আগাম বার্তা দিতে থাকে।
টীনা আপা জিজ্ঞেস করল, ভূত আলোতে আসতে পারবে না।
টুটুল ভাইয়া বলল, ভূত যদি থাকে তবে অন্ধকারে আসতে পারলে আলোতেও আসতে পারবে।
টিটো ছিল হারিকেনের কাছে। ও লেপের মধ্য থেকে পুরো হাত বের করে হারিকেনের সলতে সোরাব যতটুকু কমিয়েছিল তার চেয়ে বেশ বাড়িয়ে দিল। আর ঠিক এই সময়ে ভেজানো দরজাটা সামান্য খুলে গেল। আস্তে আস্তে ঘরে ঢুকল দুটো লুঙ্গি। হাত না, পা না, মাথাও না।
শুধু দেখা যাচ্ছে দুটো লুঙ্গি, একটা লুঙ্গির ওপরে আরেকটা লুঙ্গি। লুঙ্গির ভেতরে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। টুটুল ভাইয়া ডাকল, সোরাব।
নাঁকি সুরে উত্তর এলো, উঁ।
ভাইয়া রেগে জিজ্ঞেস করল, তুই সোহরাব?
: নাঁ।
: তাহলে তুই কে?
: আঁমি ভূঁত।
আর ঠিক এই সময়ে গ্রামের বউ যেমন ঘোমটা খোলে তেনি পেটের কাছে ওপরের লুঙ্গির নিচের অংশ সামান্য ওপরে উঠলো আর সেখানে দেখা গেল ছাগল মুখো একটা কঙ্কালের মুখ। দাঁত বের করে চোয়াল আবার হা করল। ব্যস, আর যায় কোথা? ছোট না মেজ কে যেন একজন ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল। আর তা দেখাদেখি আমরা বাকি চারজন একসঙ্গে ভীত গলায় তাড়স্বরে চিৎকার দিয়ে উঠি, ভূ-উ-ত!!
এরপরে ভূত মানুষের গলায় কথা বলে উঠল না উপরের লুঙ্গি খুলে সোরাব না রুস্তম বেরুল, কে দেখে?
চোখ বন্ধ করে আমরা একটানা চেঁচিয়ে চলি। আর বন্ধ চোখের সামনে দেখতে থাকি দাঁত বের করা সত্যি ভূত। তবে ভূতের মাথাটা ঘাড়ের ওপর নয়, পেটের কাছে।
আমাদের পাঁচ ভাইবোনের আর্ত চিৎকারে প্রথমে ছুটে আসে আব্বা-আম্মা। তারপরে মেরিন পার্ক নামের রেল কলোনির অবশিষ্ট দশ বাড়ির সবাই। আমরা তো চোখ বন্ধ চেঁচিয়েই চলেছি, ভূউত, ভূ-উ-উ-ত।
আলো আর লোকজন এলে তবে ভয় কাটে।কেউ একজন লবণ গোলা পানি এগিয়ে দিলে তা খেয়ে কিছুটা সাহসও ফিরে আসে। আমাদের কাছে সব শুনে ভূত খোঁজা শুরু হলো।
এতো আর ভূতুরে গল্প নয় যে ভূত হাওয়া হবে। এ যে সত্যি ভূত। তাই তাকে পাওয়া গেল খাটের তলায়। যে কোরবানির খাসির গোস্ত খেয়েছি মজা করে। পাওয়া গেল সেই খাসির মাথাও। খাটের তলা থেকে চুল ধরে টেনে বের করা হলে কাঁপতে কাঁপতে আর কাঁদতে কাঁদতে ভূত বলল, আমি রুস্তম।
রুস্তম চাচা ছিলেন ঠিক সামনে। তিনি কষে এক চড় দিয়ে বললেন,
: বল সোহরাব।
একেতো বড় মানুষের জোরে মারা চড় তার ওপর নিজের নামটাও বলতে না পারার গাঢ় অভিমান। কান্নার সঙ্গে দন্তন্য যুক্ত হয়ে ভূতের গলা দিয়ে বেরুল, আমি সোঁরাব।এরপরে আর সোরাবকে রাখা হয়নি। যে লোক এনে দিয়েছিল আমাদের বাসায় তার হাতে দিয়ে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল উল্লাপাড়ার ঝিকরায় ওর নিজ গ্রামের বাড়িতে।
কিন্তু আমরা অনেকদিন ভূতের ভয় ভুলে গিয়ে সোরাবের কথা মনে করে মন খারাপ করে থেকেছি।টীনা আপু মাঝে মাঝেই বলতো,কেন যে ভূত দেখতে চেয়েছিলাম!3 Comments
ভূত এক প্রাচীন ভীতি। সংস্কারের সঙ্গে বেঁচে আছে। অভিনন্দন।